‘বা, অথবা কিংবা’। গল্প সংকলন। গল্পগুলো সময়ের। জীবনের। মানুষের।
সমাজ ধর্ম রাজনীতি আর নানা তন্ত্রের ক্রিয়া-বিক্রিয়ায় ঘুরপাক খেতে খেতে, একই মানুষ আমরা, চেহারা নিই নানান। ফুঁ দিয়ে কাউকে উড়িয়ে দিই কেউ; অন্য কারও ফুঁ’য় আবার নিজেরাই ঝরে পড়ি পাতার মতো। কেউ কেউ প্রতিবাদী- হয়ে উঠি গাছ। কেউ বোকা- অন্যের ফাঁসিকে গলায় পরি ভুল আবেগে। থাকি উঠোন হয়ে, অথচ জানতেও পারি না, কখন পুড়ে গেছে ঘর।
‘বা, অথবা কিংবা’র চরিত্রগুলোও এমন, আমাদেরই মতো। যন্ত্রণাক্লিষ্ট। অসহায়। নাচার। আমাদের মতো তারাও প্রতিবাদী। আশাবাদী। চাষাবাদি।
এ বইতে দেখা মিলবে এক টুকরো বাংলাদেশের -শীর্ণ,পীড়িত,লাঞ্ছিত,দগ্ধ এক বাংলাদেশের।সমসাময়িক স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে লেখায় একধরনের বক্তব্যধর্মী অতিনাটকীয়তা এসে পড়ার শঙ্কা থাকে।গদ্যশৈলীর গুণে "বা অথবা কিংবা" তা থেকে মুক্ত।আগেই বলি,গল্পগুলো স্বস্তিদায়ক নয়।প্রতিটি গল্প গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়তে হবে পাঠকের।লেখক আশান উজ জামান তার প্রথম গল্পগ্রন্থেই গুরুতর বিষয়ে প্রবল নির্লিপ্ততার সাথে লেখার কায়দা রপ্ত করেছেন।বর্ণনাভঙ্গিতেও আছে স্বকীয়তা ও অভিনবত্ব।সব ক্ষেত্রে লেখক সমানভাবে সফল হয়েছেন বলা যায় না।তবে সব গল্পেই লেখকের শক্তিমত্তা টের পাওয়া যায়।এ বইটা আরো অনেক পাঠকের কাছে পৌঁছে যাক,এই শুভকামনা রইলো।
(২৮ জানুয়ারি, ২০২২)
*গত কয়েক বছরে প্রকাশিত সেরা বাংলা বইয়ের তালিকা করলে সেখানে "বা অথবা কিংবা" স্থান পাবে।পাওয়া উচিত।
প্রথম গল্পগ্রন্থেই স্বকীয়তা বজায় রেখে নিজ সময় বা দেশকালের করুণ বিভৎস চিত্র মায়াময় অক্ষরে বেদনা কিন্তু নির্লিপ্ততার সাথে চিত্রিত করতে পারার জন্য লেখককে অভিবাদন জানাতেই হয়। এই বই পাঠের অভিজ্ঞতা সুখকর ছিলোনা।একেকটা গল্প পড়ার পর থেমে যেতে হয়েছে।মান্টোর মত তিনি ও আসলে একটি আয়না ধরিয়ে দিয়েছেন আমাদের সমাজের সামনে।আয়নাতে যদি এখন বিভৎস মুখ ভেসে উঠে তাতে তো আয়নার দোষ না, বুরি সাকালওয়ালে কা হি কাসুর হে ইসমে। তবে এই বই শুধু দর্পন নয়, ভাষাগত সৌন্দর্যের কারনে একেকটি গল্প হয়েছে করুণ সুন্দর। সবগুলো গল্পই যে একদম নিখুঁত তা হয়তো নয়, কিন্তু সমসাময়িক জীবনের চিরন্তন কাহিনীগুলো মসৃণ তলোয়ারের ধারের মত চকচক করছে।
বিন্দুমাত্র দ্বিধা না রেখে শুরুতেই বলে ফেলি, এ বছর সতীনাথ ভাদুড়ীর জাগরী ছাড়া স্ব-ভাষার আর কোনো বই-ই আমার পাঠকমনের এতটা কাছাকাছি যেতে পারেনি (এ যাবৎ), যতটা পেরেছে আশান উজ জামানের এই গল্পবই।
মস্তিষ্কের যাবতীয় চিন্তাভাবনাকে সমূলে উৎপাটন করে সেখানে নিজেদের জন্য এক প্রকার স্থায়ী আসন নিশ্চিত করে এ বইয়ের গল্পগুলো কেবলমাত্র মুগ্ধই করে যায়নি, করেছে বিমোহিত, কখনও সখনও সংবেশিতও। অন্যদিকে, বিষয়বস্তু কিংবা আঙ্গিক, সবকিছুতেই বৈচিত্র্য ধরে রেখে এবং যথাসম্ভব উৎকৃষ্ট লেখনশৈলীর মধ্য দিয়ে আশান উজ জামান যেন জানান দিয়ে গেলেন বাংলা ছোটগল্প এখনও কত জীবন্ত, প্রাণবন্ত, সৌন্দর্যমন্ডিত!
একটি গল্পগ্রন্থের সবকটি গল্প যে সমমানের হবে না সেটি পাঠকমাত্রই স্বীকার করে নেবেন। এটি সত্য এ বইয়ের দুয়েকটি গল্পের ক্ষেত্রেও, তবে সেই দুয়েকটি গল্পও যে কতটুকু প্রভাবী তা গল্পপাঠ শেষে টের পাওয়া যায় প্রকৃতিগতভাবেই।
প্রতিবার একটি ভালো বই আবিষ্কার ও পাঠশেষে পাঠক হিসেবে যতটা আপ্লুত হই, ভেতর থেকে ঠিক ততটুকু তাগিদ অনুভব করি বইটি যতটুকু সম্ভব আরো বেশি পাঠকের কাছে পৌঁছে দেয়ার চেষ্টার। ছোটগল্পের পাঠকদের জন্য অবশ্যপাঠ্য এই বইয়ের ক্ষেত্রে আপাতত এই শুরুটা হোক বন্ধুমহল দিয়েই।
গুডরিডসে আধেক দেয়ার সুযোগ নেই, তাই পূর্ণ পাঁচ তারকাই রইল।
লেখক বর্তমান সময়ের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে গল্প বলেছেন(উদাহরণ- রেপ, শিশু নির্যাতন, গ্রামের মানুষের বাবা/হুজুরদের প্রতি বিশ্বাস)। বেশিরভাগ গল্পে সমাজের বাস্তবিকতার প্রচন্ডতা তুলে ধরেছেন, তুলে ধরেছেন আমাদের দেশের বিছ্রি অনেক রূপ যেখানে লেখকের সাহসীকতার প্রকাশ পাওয়া যায়। উনার এই সমসাময়িক বিষয় নিয়ে গল্প বলাতে ছিলো না তেমন নাটকীয়তা, সহানুভূতি। একদম সত্য রূপ আনার চেষ্টা করেছেন। উনি যেন গল্পের মাধ্যমে সমাজের গায়ে চাবুক দিয়ে আঘাত করতে চাচ্ছেন...
শুধুমাত্র লিখনশৈলীর সৌন্দর্য এবং ভাষাগত বৈচিত্র্য দিয়ে এই বইকে অনেক উপরে রাখা যাবে। তাছাড়া অনেক গল্পে উনি যেন একটা চিত্র আঁকতে চেয়েছেন। আর প্রতিটা গল্পের গঠনশৈলী একদম ভিন্ন। লেখার স্টাইল বেশ গ্রিপিং এবং গল্প বলার ধরণই এমন যে, গল্পই আপনার মনোযোগ কেড়ে নিবে।
তাছাড়া লেখক দেশের বিভিন্ন ভাষা নিয়েও হয়তো লেখাপড়া করেছেন, জানাশোনা রাখেন। কারণ গ্রামের প্রেক্ষাপটের অনেক গল্প পড়তে গিয়ে পাঠক দেশের বিভিন্ন ভাষার দেখা পাবে এখানে। এক-দুটা আঞ্চলিক ভাষা বুঝতেও কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু লেখক একদম সেই জায়গায় মানুষজনের কথাবার্তার একটা raw ফিল দিতে, বাস্তবিক ফিল দিতে এমন ভাষা নিয়ে কাজ করেছেন। আমি দেখেছি গ্রামের মানুষের কথাবার্তার স্টাইল/ধরণ এমনই হয়, লেখক যেমনটা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তাদের কথাবার্তার ধরণ দিয়ে।
আসলে আমি যত যা বলি না কেন, গল্পগুলো যেমন বোধ সৃষ্টি করেছে, যতটা ভালো লাগা এবং মুগ্ধতা দিয়েছে তা আমি কখনো ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। যত যা বলি কম মনে হয়। আর রিভিউ লিখতে লিখতে মনে হচ্ছে আমি যেভাবে অনূভব করেছি তার তেমনকিছু তুলে ধরতে পারছি না এবং তা নিয়ে রাগও হচ্ছে আমার। আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার, গল্প বলার ধরণ, গল্পের পরিণতি, লেখকের লেখার বৈচিত্র্য সবমিলিয়ে প্রিয় একটা বই হয়ে থাকবে।
গল্পের বিষয়বস্তু নির্বাচনে স্পষ্টবাদিতা ও সাহসিকতা দেখানোর জন্য লেখককে বড়সড় একটা ধন্যবাদ জানাতেই হয়। অস্বস্তিকর, অকথ্য, আলগোছে এড়িয়ে যাওয়ার মতো বিষয়বস্তু নিয়ে এমন বোল্ড লেখা খুবই কম পাওয়া যায়। গল্পগুলো ইউটোপিয়ান না, আমাদের চারপাশেই আছে এসব গল্প, শুধু আমরা দেখতে চাই না। আমরা তখনই দেখি যখন কেউ সেগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। আশান উজ জামান সে কাজটাই করেছেন। চমৎকার, ঝরঝরে গদ্যে তিনি আমাদের দেখালেন কিছু অস্বস্তিকর কিন্তু বাস্তব জীবনের গল্প।
একদিন গল্প পড়ার ইচ্ছে হলো, নিয়ে বসলাম ' বা অথবা কিংবা'। বইয়ের পাতা ধরে হেঁটে বেড়ালাম, শেষ না হওয়া অবধি। বইয়ের একটা গল্পে নিয়ে বলি, লেখক আমাকে কয়েক লাইনে লাইনে একটা ছবি কল্পনা করতে বলেন। যেমন, "ঢুকে পড়তেন মাঝারি উচ্চতার কোনো চাকুরের বসার ঘরে । ঘরের মাথায় দেয়ালজোড়া একটা জানলা । আলো ঢুকবে ঢুকবে করছে । কিন্তু রঙচটা পর্দার নজর এড়িয়ে ঢুকতে পারছে না। তবে তার আভা একটা ঠিকই পড়েছে। দেয়ালের মিষ্টি রঙটা খোলতাই হয়েছে তাতে। হেসে উঠেছে বেতের সোফা, কাঠের টেবিল, নকশী কুশন। ভালো লাগছে দেখতে।" আপনি নিশ্চই এইটুকু পড়ে মনে মনে আপনার নিজের মতো করে কল্পনা করে নিতেন এইরকম একটি ঘর লেখকের দেওয়া বিশ্লেষণ অনুযায়ী। ঠিক এইভাবে প্রতিটা গল্প ছবি হয়ে ধরা দিবে মানসপটে। কখনো শহুরে একঘেয়ে জীবনে কাচঠোকরা পাখির মতো আপনিও মুক্তি খুঁজে যাবেন আবার নয়তো 'ফুঁ' পীরকেও একবার বিশ্বার করে ফেলতে চাইবেন, কিন্তু মাঝখানে বাগড়া দিবে নুরু কিংবা সাজু নামের চরিত্রগুলো। তারপরেও প্রতিটা গল্পকে যদি মনে করি একেকটা জংশন। গল্পের এক জংশন থেকে বের হয়ে অন্য জংশনে পৌঁছানোর আগে পর্যন্ত আপনি বাইরের দৃশ্য গোগ্রাসে গিলতেন। এবং ভাবতেন পরবর্তী জংশনে কী অপেক্ষা করছে আপনার জন্য! গল্পগুলো সমসময়ের। আমার আপনার চারপাশের, এই ভূখণ্ডের। তাই গল্পের সুতোর মাথাটা খুঁজে পেতেন সহজেই। আর আপনি নিশ্চয় জানেন যে সুতোর বান্ডিলে থেকে যদি একবার সুতোর মাথাটা বের করে নেওয়া যায় তাহলে বাকি সুতো অনায়াসে ছড়ানো যায়। গত কয়েকদিনে পড়া ভালো বইগুলোর একটি ' বা অথবা কিংবা'। বিশেষ করে 'কাচঠোকরা', 'শিশু | স্বর্গ | নরক', 'অ্যালবাম', 'ইন্টারভিউ', 'আকাশ ভেঙে মুখে দিলেই বিদঘুটে স্বাদ' এই গল্পগুলো বেশ ভালো লেগেছে। দোদুল্যমান এই সময়গুলোতে কিছু গল্প অনেকদিন পর্যন্ত মনে তার রেশ রেখে যাবে…
বইতে ১২টা ছোটগল্প সংকলিত হয়েছে। গত দু'মাসে ২৫টা গল্পগ্রন্থ পড়েছি। তারমধ্যে 'বা অথবা কিংবা' এক নাম্বারে স্থান পাবে। এত্ত সুন্দর গল্পগুলো! এত্ত ভাল্লাগছে আমার।
প্রতিটা গল্প সমাজের গভীরে প্রবেশ করে সমাজের স্বরূপ সমাজের ভাষায় বলেছে। 'ফুঁ' অথবা 'তন্ত্র' এর মতো গল্প যেন আমাদের সমাজের ছায়া।
এই ছোটগল্পের সংকলন যেন এক টুকরো বাংলাদেশ। ভিনদেশী কেউ যদি বাংলাদেশকে একটা বইয়ের ভেতর আবিষ্কার করতে চায় তবে এই বইটা পড়লে চলবে।
কোনো লেখকের পড়া প্রথম বই যদি আমার মন জয় করতে পারে তবে তার লেখা প্রতিটা বই আমার বুক শেলফে চলে আসে। সমসাময়িক লেখকদের মধ্যে আশান উজ জামানের 'বা অথবা কিংবা' আমার পড়া সেরা তিন ছোটগল্প সংকলনে জায়গা করে নিয়েছে।
চমক দিয়ে ছোটগল্প শেষ করার কায়দাটা আর উঁচু মানের সাহিত্য নয়! এই বিষয় টা আবার প্রমাণিত হলো।।
সেরা। লেখকের ন্যারেশন বেশ অভিনব, ঠিক নন-লিনিয়ার বলা যায় কিনা এইটা ভাববার বিষয়। একটা মুভি দেখেছিলাম অনেক আগে "ইরেভারসিবল''। মুভিতে ঘটনার ঘনঘটা ঠিক উলটো থেকে শুরু হয়। লেখকের গল্প বলার স্টাইলটাও অনেকটা তেমন (অধিকাংশ গল্পেই)! সমসাময়িক সমাজের অন্ধকার দিকগুলো গল্প আকারে এতো সুন্দর করে উপস্থাপন করাটা বেশ কঠিন। এই কঠিন কাজ বেশ সহজ করেই করেছেন। গল্পগুলো সম্ভবত লেখকের বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি। তাই হয়তো খুলনা আর রংপুরের লোকাল ভাষা গল্পে ব্যবহার হয়েছে। (লেখকের জন্ম ও কর্ম স্থান)
যারা ফিল গুড টাইপ বই পছন্দ করেন, তাদের জন্য না এই বই।
আমি আরেক জন ভালো লেখক কে আবিষ্কার করলাম। যার লেখা আমাকে স্বস্তি দিবে। এত সুন্দর বাক্য গঠন,এত চমৎকার শব্দ চয়ন। আহ্। একেকটা বাক্য পড়ছি,আমার মনে হচ্ছিল "কোন সুস্বাদু কেক এর একেকটা টুকরো আমার মুখের ভেতর গলে যাচ্ছে আর পুরো মন কে অপূর্ব একটা তৃপ্তি তে ভরিয়ে দিচ্ছে "। গল্পগুলোকে লেখক কবিতা ভেবে লিখেছেন, তা না হলে শব্দের এত অত্যাশ্চর্য সুন্দর ব্যবহার করা সম্ভব না। আরেকটা জিনিস ভালো লেগেছে, লেখকের " উপমা" দেয়া টা। পুরাই মাখন।
অন্যদের ক্ষেত্রে কেমন জানি না। আমি গল্প বা উপন্যাস পড়ার ক্ষেত্রে মূল গল্পকে যত টা গুরুত্ব দিই,লেখাকে ঠিক ততটুকুই। কারণ গল্প যতই ভালো হোক,লেখা দিয়ে যদি ছবিটা ঠিক ঠাক মত পাঠকের মনে এঁকে দেয়া না যায়,তাহলে পুরো প্রয়াস ব্যর্থ। সেদিক থেকে "আশান উজ জামান " পুরোপুরি সফল। উনার গল্প গুলো যেমন চমৎকার, তেমনি উনার লেখার ধার ও অত্যাধিক বেশি। ফলে বইটা হয়ে গেল একটা মাস্টারপিস।
যতই বছর পার হচ্ছে ততই ব্যস্ত হয়ে পড়ছিলাম। ২০ এর একুশে বই মেলায় তাই গল্পগ্রন্থের দিকে ঝোঁকটা বেশি ছিল যেন সময় পেলে একটু আধটু পড়ার সুযোগ পাই। কিনেছিলামও কিছু। তার মধ্যে আশান ভাইয়ের বা, অথবা কিংবা ১২টি গল্পের গল্পগ্রন্থ। তখন একদম অজানা অপরিচিত লেখকের বই কিনেছিলাম আরেক পরিচিত তরুণ কবি ও কথাসাহিত্যিক নাহিদ ধ্রুবের এক সাজেশ্চেনে। আশাহত হয়নি বরং অবাক হয়েছি গল্পগুলো পড়ে। যেন শব্দের মিহি তুষারপাত এ হাঁটছি আর শব্দের পরম ছোঁয়ার অনুভবে পুলকিত হচ্ছিলাম বারবার। তাই গল্পে ধীরে ধীরে হাঁটছিলাম যেন শব্দের এই পথ সহজে ফুরিয়ে না যায়।
গল্পগুলো সমসাময়িক সমস্যার আবৃত্তি। কখনো হিন্দু-মুসলিম ধর্মের পুলসিরাত বা ভুল চিকিৎসার গাফলতি অথবা কোন এক হারানো বিজ্ঞপ্তির আত্মচিৎকার কিংবা কৌটা ব্যাবস্থার পরিস্থিতি। আরো আছে ধর্ষণ, ভন্ডমী, অপবাদ, সুযোগ সন্ধানী ক্ষমতা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, বন্যা, প্রতিবাদ, দেশভাগ এর মত কিছু সাধারণ ঘটনাকে উপজীব্য করে তুখোর শব্দের প্রবাহ। কিছু গল্পে আঞ্চলিকতা আর ঘটনার বিবরণের সূক্ষ্মতা বেশিরভাগ সময় গল্পের গাঢ়ত্ব-এ ভরিয়ে দিবে। তার প্রথম বই অন্যচোখ পড়ার আগ্রহ বেড়ে গেলো।
পড়ার সময় কিছু লাইন হাইলাইট করেছিলাম। আপনাদের সাথে কিছু ভাগাভাগি করলে মন্দ হয় না। প্রথম গল্পের নামেই মায়ায় পড়ে গিয়েছিলাম, "কী আগুনে পুড়ে যায় ঘর, জানে না উঠোন" এই গল্পে যেমন জেনেছি, "ঘর ছেড়েই বুজলাম উটোন যেরম ঘর না, পতও সেরম উটোন না।" তেমন জেনেছি, "কারো কান্নায় মুখোশ ভিজছে, কারো কান্নায় মুখ।" আঞ্চলিক ভাষায় (সম্ভবত রাজশাহী/উত্তরবঙ্গের) গল্পের একটা অংশের মায়া আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
"সমাজটাও এমনই আজব চুলো, কোনো কাঠি কখন কাঠ হয়ে জ্বলে আর কোন কাঠ জ্বলে কাঠির মতো, বলা যায় না।"
"একজন মানুষের থাকায় না থাকায় এত পার্থক্য!"এই একজন মানুষটা কে?
"বেঁধে রাখার কাজ তো দড়িই করে সবচেয়ে ভালো। উল্টে গিয়ে সে-ই যখন ছাড়িয়ে নিয়ে যায় কাওকে, তাকে ধরে রাখার আর কী উপায় থাকে মানুষের?"
"তার শেষ নিঃশ্বাসে মেশা নাইলোনের দড়িটুকু যত্ন করে তুলে রেখেছেন। রেখে দিয়েছেন বালিশের নিচে। তা বেয়ে গেলে কি তার কাছে পৌঁছানো যাবে না?"
"হাঁটুর একটু উপর থেকে কেটেছে; অথচ পায়ে তার স্যান্ডেল আছে আগের মতোই। দেখে নিশ্চয় খুব খুশি হবে সমাজ।"
"লোকে বলে মিথ্যা নাকি জালের মতো। তা দিয়ে সুযোগের মাছ ধরা যায় ঠিকই, কিন্তু সত্যের জল তাতে আটকায় না।"
"মানুষ তো ঠিকই বাঁশের মতো, যত বয়স হয় তত পোক্ত হয়, তত বুঝতে শেখে।"
"যখন তখন যা কিছু ঘটে যেতে পারে। পাশের ঘরেই হয়তো বাসা বেঁধে আছে বিপর্যয়, আমরা খেয়ালও করিনি। পাশের ঘরই বা কেন, নিজের ঘরেই যে কত কিছু ঘটে যাচ্ছে, ঘটার আগে ধারণাও কি করতে পারছি?"
"আলাদা হয় মানুষের চেহারা, ধর্ষকের চেহারা এক। পৃথিবীর সব ধর্ষক একই চোখে দেখে। গলায় তাদের একই ডাক। নখে একই ধার।"
লাতিন আমেরিকার কোন এক অঞ্চলের ভূমিপুত্রদের কথা পড়েছিলাম, তাদের দেবতা ছিলেন একজন গল্পকথক। সেই জাতির পূর্বপুরুষদেরকে নিজের স্মৃতি থেকে তিনি শুনিয়েছিলেন মানুষের সৃষ্টির গল্প। বলেছিলেন মানুষের জন্ম হয় তাদের এই উৎপত্তির গল্প বলার সময়ে উচ্চারিত শব্দগুলো থেকে। যখনি তিনি সেই গল্প বলতেন, মানুষেরা জন্ম নিত। বারবার। মৃত ঈশ্বরের এই পৃথিবীতে এমন সৃষ্টিপুরাণ বড় চমৎকৃত করেছিল।
গল্পপাঠের অনুভূতি লিখতে গিয়ে এই কথা কেন?
গল্পগুলো পড়তে গিয়ে দেখা গেল আমাদের সামাজিক বাস্তবতার এই গল্পগুলো আমার কিংবা আমাদের কাছে একেবারে অচেনা নয়। সংবাদপত্রের পাতায় পাতায় কলামে কলামে এমন অসংখ্য ঘটনার মিছিল।
বেঁচে থাকার তাগিদে এমনভাবে নিজেকে বিবর্তিত করে নিয়েছি যে সেইসব রিপোর্ট মনে ক্ষীণতম আঁচড়ও কাটতে পারেনি। লেখকের কাঁধে এসে ভর করা সেই পূর্বপুরুষের দেবতা সেসব কাহিনী নতুন করে বলে গেলেন নানারকম শিরোনামে। ছোট ছোট বাক্যগুলো নিজেদের মাঝে ফিসফিস করে গেল। না তোলা ছবির সেই এলবামে গল্পগুলো ভেসে বেড়াল অনেকগুলো রক্তাক্ত আলোকচিত্র হয়ে। ক্ষণিকের জন্য অনুভব করলাম ভিতরের মরচে ধরা সংবেদনশীলতার জেগে ওঠা। এখনো তবে মানুষই আছি - ভেবে কি আশ্বস্ত হলাম?
গল্পগুলো নিয়ে অভিযোগ নেই তা বলব না। অনেকগুলো গল্প নিয়েই নালিশ আছে। কিন্তু সেইসাথে আছে ভালোলাগা। কেননা একটি গল্পও ক্ষণিকের জন্যও আরাম দেয়নি।
কী দুদার্ন্ত একেকটা গল্প! পড়ে বারবার মনে হবে এভাবেও লেখা যায়! খেলার ছলে পড়ে গেলে গল্প বোঝা যাবে না বা অথবা কিংবার। পড়তে পড়তে গল্পে ঢুকে গেলে অদ্ভুত মুগ্ধতা ভেসে যেমন আসে তেমনি বিষাদে ছেয়ে যায় মন। নিমগ্ন বয়ানে লেখা সবগুলো গল্প প্রাণ ছুঁয়ে যায়।
গল্পগ্রন্থ। শরীর জুড়ে বারোটা গল্প নিয়ে বেড়ে ওঠা "বা, অথবা কিংবা"র। উৎসর্গপত্র দেখেই চমকে উঠেছি। এমন করেও বই উৎসর্গ করা যায়! লেখকের প্রথম বই অন্যচোখের উৎসর্গটা দেখা থাকলে অবশ্য এটাকে তাঁর জন্য স্বাভাবিকই মনে হবে। যাহোক, বইটি লেখকের দ্বিতীয় গ্রন্থ হলেও সহজ সরল বর্ণনা, বুদ্ধিদীপ্ত আর চমৎকার উপমার প্রয়োগ দেখে মনে হয়েছে লেখালিখিতে হাত পাকিয়ে তবেই তিনি এসেছেন। বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে বইয়ের ব্যাপারে আমি আমার ভালো-মন্দ লাগা বিষয়গুলো সংক্ষেপে বলব।
বইয়ের অ্যালবাম খুব অভিনব একটা গল্প! প্রথাগত লেখা না, এটা একের পর এক ছবির বর্ণনা। ছবিগুলো বর্ণনার জোয়ারে ভাসিয়ে আবার ভাটির টানে ফিরিয়ে এনেছেন গল্পের রূপে। রূপ থেকে যেন ঠিকরে বেরোচ্ছে আলো কিংবা আগুন।
ঐ আগুনই বোধহয় জ্বলছিল রহমালির আকাশ সমান বুকে, পুড়িয়ে ফেলতে চাইছিল সব আইন, যা ভেঙে ফেলেছে তার আকাশ। কিংবা ছুটে যেতে চাইছিল এক নিশ্বাস দূরে থাকা করমালির কাছে।
'যতবার পানি হই, আহ্বানে আহ্লাদে লুটিয়ে পড়ি, কচুর পাতার মতো ততবারই এড়িয়ে যায় আাঁখি'- বাক্যটা পড়েই বোঝা উচিত ছিল মাস্টারপিস একটা গল্প পড়তে যাচ্ছি।
মাস্টারপিস আছে আরও। কাচঠোকরা। এক কাচঠোকরা দেখিয়েও যে, মানুষের ভেতরের কথা বের করে আনা যায়, গল্পটা না পড়লে বিশ্বাস হতো না।
ফুঁ এর জোর যদি সাজুর উপর না প'ড়ে শিক্ষকরূপী জানোয়ারের উপর পড়ত তাহলে শান্তি পেতাম। শান্তি পেত কৃষ্টি বা তার বন্ধুরাও। হয়ত পাল্টা হাওয়ার গানটা আর লিখতে হতোনা লেখককে।
মনে হয়েছে, গল্পগুলো গল্প না, জীবন্ত। নাড়ালেই টুংটাং বেজে উঠে হাসিয়েছে বা, কাঁদিয়েছে অথবা ভাবিয়েছে, খুব।
মনে হয়েছে 'বা, অথবা কিংবা' যেন গল্পগ্রন্থ না, একটা ফুল- পাপড়িগুলো আলাদা রঙের ভিন্ন ঢঙের কিন্তু সুন্দর তার সাজ কিংবা সজ্জা বা, যেন ভাস্কর্য- যার শরীর জুড়ে বাক্যের কারুকার্য আর কপালজুড়ে ভাবনার ভাঁজ অথবা সাগর- যার বুক জুড়ে ঢেউ তুলেছে সময় আর রুঢ় বাস্তবতা কিংবা জীবনগাঁথা যেখানে বিচরণ করছে,
'যে-ই হোক আর যেকেনেই হোক, পরুষমানুষ পুরুষই' বলতে থাকা, স্বীকৃতি না পাওয়া আঁখি বা, ভ্রুণের সন্ধানে ঘুরতে থাকা হক স্যার অথবা নানা তন্ত্র- ধর্ম, আইন বা সমাজ, নিয়ন্ত্রণ করতে থাকা তান্ত্রিক- রাজনীতিক কিংবা ঘোর লাগা চোখে ফাঁস পানে চেয়ে থাকা শেফালীরা।
কাচঠোকরা, অ্যালবাম বা আকাশ ভেঙে মুখে দিলেই বিস্বাদ গল্পগুলোর চিন্তার পরিধি বা দৃষ্টির গভীরতা এতটাই বেশি, মনে হয়েছে গল্পগুলো দিয়ে লেখক চাইলেই কয়েকটা উপন্যাস লিখে ফেলতে পারতেন।
ভালো লাগার কথা বলতে গেলে বলব, মুগ্ধ করেছে লেখকের স্বকীয়তা। মুগ্ধ করেছে গল্পের বয়ান এবং বয়নে লেখকের ভিন্ন মতে অন্য পথে হাঁটা। আর বাক্যে বাক্যে মুগ্ধতা এঁকে, গল্পে গল্পে ভাবনার খোরাক গেঁথে লেখাটাকে চমৎকার কিংবা দৃষ্টিনন্দন শিল্প তৈরির প্রচেষ্টা।
তবে খারাপ লেগেছে লেখকের নিষ্ঠুরতা। মনেহয়েছে অধিকাংশ গল্পই কোনো না কোনোভাবে দুঃখের কিংবা কষ্টের। তারপরই আসলো চিন্তাটা, গল্পগুলো যেহেতু আমাদের বা সমাজের অথবা সময়ের কথা বলছে সেক্ষেত্রে নিষ্ঠুর কে লেখক, নাকি সমাজ বা সময় নাকি আমরা??
গল্প সংকলন। বেশ ভালো একটা বই। আশান উজ জামানের গদ্য ভালো। গল্পে একটা মায়া মায়া ভাব আছে এবং এসবের মধ্য��ই তার গল্পে আছে প্রতিবাদ। ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন থেকে শুরু করে সমসাময়িক নানা বিষয় তিনি গল্পের মধ্যে এনেছেন। এই জায়গাটা বিশেষভাবে ভালো লাগল। এর বাইরে গদ্য, ভাষা, শব্দের ব্যবহার দারুণ।