১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের অক্সিলারী ফোর্স দ্বারা সংগঠিত জেনোসাইড থেকে বারোটি জেনোসাইডের সাক্ষ্য নিয়ে এই গ্রন্থ। প্রতিটি সাক্ষ্য এক বা একাধিক নারীর বয়ানে। এই নারীরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের, বিভিন্ন সামাজিক অবস্থানের, জেনোসাইড কালেও তাঁদের অভিজ্ঞতা বিভিন্ন রকম- কেউ প্রতিরোধ যুদ্ধে ছিলেন, কেউ ভয়ংকর যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন, কেউ নিজ স্বামী-সন্তান-ভাইয়ের হত্যা দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছেন।
নানা সামাজিক অবস্থানের নারীদের সাক্ষ্যে একটা দারুণ সাদৃশ্য দৃশ্যমান- চার যুগ পরেও স্মৃতি মন্থনে তাঁরা পুরুষদের চেয়ে বিস্তৃত অথচ সুগভীর।
এই নারীসাক্ষ্যগুলো জেনোসাইড '৭১ এর স্মৃতি ভুলিয়ে দেবার রাজনীতির বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রত্যয়।
হাসান মোরশেদের বেড়ে ওঠা এবং স্থায়ী আবাস সিলেট শহরে। পড়ালেখা এবং কর্মসূত্রে থেকেছেন ভারত ও যুক্তরাজ্যে। ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর করেছেন। সিলেট অঞ্চলের পর্যটন উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছেন।
জগতজ্যোতি দাস ও তাঁর গেরিলা দলের যুদ্ধের কথা সংগ্রহের জন্য, দাসপার্টির জীবিত গেরিলাদের সাক্ষাতের জন্য প্রায় একবছর ধরে ঘুরেছেন সুনামগঞ্জের তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, দিরাই হয়ে হবিগঞ্জের বানিয়াচং আজমিরীগঞ্জ পর্যন্ত।
'দাস পার্টির খোঁজে' হাসান মোরশেদের তৃতীয় গ্রন্থ, এর আগে রাজনৈতিক ফিকশন 'শমন শেকল ডানা' এবং অরুন্ধতী রায়ের আলাপচারীতার অনুবাদ 'দানবের রূপরেখা' প্রকাশিত হয়েছে ২০০৯ সালে।
এই লেখাটি যখন লিখতে বসেছি তখন রাত দ্বিপ্রহর। দুপুরে বইটি হাতে পাওয়ার পর থেকে থেমে থেমে পড়ে এইমাত্রই শেষ করলাম। ১১২ পৃষ্ঠার এই বইয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের 'জেনোসাইড'-এর প্রত্যক্ষদর্শী ১২ জন নারীর সাক্ষ্যকে এখানে নথিবদ্ধ করা হয়েছে। বইটির লেখক হাসান মোরশেদ ১৯৭১আর্কাইভ-এর প্রধান গবেষক, কিন্তু আমি তাকে চিনি সচলায়তনের উল্লেখযোগ্য ব্লগারদের একজন হিসেবে। যদিও তার সাথে সরাসরি আলাপ বা পরিচয় হয় নি কখনো, কিন্তু ভার্চুয়াল জগতের পরিচিত গণ্ডিতে কোনো কোনো সময়ে মন্তব্যের ঘরে আলাপ হয়েছে। বিভিন্ন বিষয়ে মতদ্বৈততা থাকার পরেও তার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণামূলক লেখালেখির আমি একজন নিবিষ্ট পাঠক। 'দাস পার্টির খোঁজে'র পর এই বইটির কথা শুনেই আগ্রহী হয়েছিলাম। রক্ত ও অন্ধকারমিশ্রিত ভয়াল প্রচ্ছদটি করেছেন স্যাম।
বইটির শিরোনামে জেনোসাইড শব্দটির ব্যবহার কিছুটা হলেও প্রশ্ন উত্থাপন করে। বিশেষ করে কৌতূহল জাগে যে উনিশশো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বহুল ব্যবহৃত শব্দ গণহত্যাকে বাদ দিয়ে কেন এই শব্দটিকে বেছে নেয়া হলো। হাসান মোরশেদ বইয়ের ভূমিকাতেই এর উত্তর দিয়েছেন- জেনোসাইড শব্দের একটি ছোট অংশ গণহত্যা। কিন্তু এর বাইরেও জেনোসাইডের বিস্তৃত ও সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞায়ন করা হয়েছে। সহজলভ্য উৎস উইকিপিডিয়া থেকে পাচ্ছি, 'Genocide is intentional action to destroy a people (usually defined as an ethnic, national, racial, or religious group) in whole or in part.' জাতিসংঘের জেনোসাইড কনভেনশন একে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে: "acts committed with intent to destroy, in whole or in part, a national, ethnic, racial or religious group, as such" including the killing of its members, causing serious bodily or mental harm to members of the group, deliberately imposing living conditions that seek to "bring about its physical destruction in whole or in part", preventing births, or forcibly transferring children out of the group to another group. অর্থাৎ শুধু গণহত্যাই নয়, পরিকল্পিতভাবে ঘটানো ধর্ষণ, উদ্বাস্তুকরণ, জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ, সম্পদ লুট, সংস্কৃতি ধ্বংসের মতো অনেকগুলো অপরাধের সমষ্টি হচ্ছে জেনোসাইড। এই সকল অপরাধকর্মই গণহত্যার মতো একটি জনগোষ্ঠীকে চিরস্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই একে আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ'কারণে মনে হয়েছে এই বইয়ের শিরোনাম জেনোসাইড হওয়াই সঠিক। যদিও আশা করি অচিরেই আমরা সবাই মিলে জেনোসাইডের একটি উপযুক্ত পারিভাষিক শব্দ গড়ে নিতে পারবো।
যে ১২ জন নারীর সাক্ষ্য এই বইতে লিপিবদ্ধ হয়েছে তাঁরা একেক আর্থ-সামাজিক পটভূমি থেকে এসেছেন, কেউ আছেন নৌকার কারিগর হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ, কেউ আছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কেউ বা সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের গৃহিনী, কেউ বা মাওবাদী বাম ঘরানার আন্দোলন-কর্মী। নানান ক্ষেত্র থেকে উঠে আসা প্রত্যেকেই এই বীভৎস যুদ্ধের মোকাবিলা করেছেন নিজ নিজ জায়গা থেকে, শুধু মিল হলো তাঁরা সকলেই পাকিস্তানি আর্মি এবং বাঙালি-অবাঙালি রাজাকারদের অবর্ণনীয় অত্যাচারের প্রত্যক্ষদর্শী। কেউ এক বিকেলে পাকিস্তানি আর্মির হত্যাকাণ্ডে নিজের পরিবারের সকল পুরুষকে শহিদ হতে দেখেছেন। কেউ কোলের শিশুকে নিয়ে পালাতে গিয়ে গুলির আঘাতে আহত হয়েছেন, নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে দেখেছেন এলোপাথাড়ি গুলির একটি এসে সেই শিশুর মাথা ভেদ করে চলে গেছে। কাউকে অকথ্য নির্যাতন করে জিপের পেছনে বেঁধে পুরো শহর প্রদক্ষিণ করে হত্যা করা হয়েছে।
এই বইয়ের প্রতিটি পাতায় প্রচ্ছদের এই কালচে রক্তের দাগের মতো গাঢ় কষ্ট আর যন্ত্রণা মিশে আছে। হাসান মোরশেদ এই যোদ্ধাদের সাক্ষ্যে আলাদা কোনো অলঙ্কার জুড়ে দেন নি। এজন্য তার সংবেদনশীলতার প্রশংসা করতে হয়। এক অদ্ভুত নির্মোহ লেখনীতে তিনি ঘটনা-পরম্পরা বর্ণনা করে গেছেন, যা যুদ্ধের এবং বর্তমানের বাস্তবতাকে আরো প্রকট করে তুলেছে। পাঠক এক মুহূর্তের জন্যেও নিজেকে নিস্পৃহ রাখতে পারে না, এসব নির্যাতন থেকে বিযুক্ত হতে পারে না। বরঞ্চ হাসান মোরশেদের দিনপঞ্জির মতো দিন তারিখ এলাকা উল্লেখ করা লেখায় একটি সাংবাদিকতার বিশ্লেষণের গড়ন পাই। তিনি যখন যেখানে গেছেন, যেখানে থেকেছেন, যার যার সাথে দেখা করেছেন, যার মাধ্যমে খবর পেয়েছেন, সাক্ষ্য নিতে গিয়ে যা যা ঘটেছে, কিংবা কথা বলার ফাঁকে বিভিন্ন টুকরো টুকরো তথ্য লিখেছেন - এসবই বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে যে এগুলো কোনোভাবেই দূরবর্তী কিছু না। আপনি বা আমি, যারা পড়ছি, তারাও চাইলে এই বর্ণনা অনুযায়ী সে জায়গাটিতে গিয়ে উক্ত যোদ্ধা ও সাক্ষ্যদানকারীদের সাথে দেখা করে আসতে পারবো।
সাক্ষ্যের বর্ণনার ভয়াবহতাকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রেখে অনুভব করতে পারি, এখানে যাঁরা কথা বলছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই মুক্তিযুদ্ধের প্রবল ভার বহন করে চলেছেন। আমাদের সমাজে পোস্ট-ট্রমাটিক-স্ট্রেস-ডিজঅর্ডার (PTSD) নিয়ে খুব বেশি সচেতনতা নেই, বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষেরা হয়তো জীবনে এর নামও শোনে নি। কিন্তু যুদ্ধের ভয়াবহতায় তাঁরা প্রত্যেকেই ভুগছেন। কেউ কেউ কথা বলতে গিয়ে বিচলিত হচ্ছেন, আবেগাক্রান্ত হচ্ছেন, কারো শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে যাচ্ছে - এসবই নিরাময় না হওয়া সেই গভীরতম ক্ষতকে স্মরণ করিয়ে দেয়। জাতিগতভাবে আমরাও এমন এক সামষ্টিক পিটিএসডির শিকার, কারণ আমাদের সম্মিলিত মননেও এই জেনোসাইডের বিচার ও যথাযথ ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা হয় নি। এজন্যই চার যুগ পরেও আমাদের বার বার ফিরে তাকাতে হয়। কাউকে কাউকে গ্রামগঞ্জ চষে বেড়াতে হয় যুদ্ধের সাক্ষীদের বয়ান গ্রন্থনার কাজে। এবং অবধারিতভাবেই, তাঁদের মাঝে কেউ কেউ যুদ্ধের অভিজ্ঞতার কথা জিজ্ঞেস করায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন, তীব্র স্বরে গালিগালাজ করতে থাকেন। কারণ তাঁদের অভিজ্ঞতা বলে, এই কষ্টকে বারবার অবহেলা করা হয়েছে, কিংবা একে পুঁজি করে কেউ না কেউ লাভের গুড় খেয়ে গেছে, কিংবা এই সাক্ষ্য দেয়ায় তাঁদের বর্তমান জীবনেও আরো লাঞ্ছনা-গঞ্জনা নেমে এসেছে ক্ষমতাশালীদের পক্ষ থেকে। তাঁদের যুদ্ধটা আজও হিংস্রভাবে বর্তমান।
নারী সাক্ষ্যে জেনোসাইড তাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। মুক্তিযুদ্ধকে শুধুই সাল-তারিখের হিসেবে দেখার মতো সরলীকরণের বিপদ কতটা, তা আমাদের জাতির চেয়ে বেশি কেউ জানে বলে মনে হয় না। এই সরলীকরণের কারণেই আমরা একদিকে যেমন দেখছি উত্তরপ্রজন্মের মাঝে মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক নিরাসক্ততা এবং অজ্ঞানতা, আরেকদিকে দেখছি পরাজিতপক্ষের মাঝে ইতিহাসকে বিকৃত করে জেনোসাইড অস্বীকারের হীনচেষ্টা। এই বইটি সেই যুদ্ধকে মানবিক ও বাস্তবিক করে তোলে, যুদ্ধের আপাত-মহত্ত্ব ও গৌরব-গাঁথার পাশাপাশি সে যুদ্ধ ও যুদ্ধপরবর্তী বাস্তবতাকে রুঢ়ভাবে দেখিয়ে দেয়। অস্বীকার করার উপায় নেই যে স্বাধীনতা-উত্তর প্রজন্মের হাতেই এই নথিবদ্ধকরণের মূল দায় ও দায়িত্ব পড়ে। হাসান মোরশেদ সেই প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে অত্যন্ত জরুরি এই প্রকল্পটি চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু গুটিকয়েক জেলার মাত্র ১২ জন নারীর বয়ানের এই ১১২ পৃষ্ঠার বই বলে দিচ্ছে যে এটি এত সীমিত পরিসরের প্রকল্প নয়। এটি একটি জাতীয় প্রকল্প হওয়ার দাবি রাখে। প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি উপজেলায়, প্রতিটি থানায় এখনো বেঁচে থাকা মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য নেয়ার এখনই শেষ সময়। আর দশ বা বিশ বছর পর এই প্রজন্মের সকলেই হারিয়ে যাবেন এবং আমাদের জনজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটির অনেক জরুরি বিবরণও তাঁদের সাথে চিরকালের জন্য হারিয়ে যাবে।
প্রথমে বলে নেই বইয়ের ল��খক আমার খুব প্রিয় একজন লেখক। তার সাথে পরিচয় তার লেখা দাস পার্টির খোঁজে বইয়ের মাধ্যমে। তার গবেষণাধর্মী লেখাগুলো অত্যন্ত সহজ ভাষায় ফুটিয়ে তুলেন পাঠকের সামনে। নারী সাক্ষ্যে জেনোসাইড বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। নারীদের নিয়ে বাংলাদেশে যে কয়টি বই লেখা হয়েছে নারী সাক্ষ্যে জেনোসাইড তার মধ্যে অন্যতম।