থ্রিলার ঘরানার অন্যতম সেরা মাঙ্গা Monster, যার রচয়িতা ও চিত্রকর নাওকি উরাসাওয়া। ১৬২টা চ্যাপ্টারের বিশাল পরিসরের এই মাঙ্গা থ্রিলার হলেও শক্তিশালী গল্প, অসাধারণ চরিত্রায়ন এবং মনস্তাত্ত্বিক গভীরতার মাধ্যমে পাঠকদের হৃদয়ে স্থায়ী ছাপ ফেলতে সক্ষম। ৯টা পার্ফেক্ট এডিশনে বিন্যস্ত এই মাঙ্গার ১ম এডিশনে রয়েছে প্রথম ১৬টা অধ্যায়।
এই সুবিশাল গল্পের সূচনা হয় ১৯৮৬ সালে, জার্মানির ডুসেলডর্ফের Eisler Memorial Hospital এ কর্মরত নবিশ জাপানিজ নিউরোসার্জন কেনজো তেনমার মাধ্যমে। তেনমা একজন প্রতিভাবান চিকিৎসক, শল্যচিকিৎসায় অত্যন্ত সুদক্ষ, যেকোনো জটিল অপারেশন সম্পন্ন করে রোগীকে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরিয়ে আনার সক্ষমতা রাখে। কিন্তু হাসপাতালের অসৎ ডিরেক্টর আর তার হসপিটাল পলিটিক্সের চক্করে সে নিজের মনে এক নৈতিক সংকটের দ্বন্দ্বে ভুগতে থাকে।
সবকিছু বদলে যায়, যখন হাসপাতালে গুরুতর আহত একটা বাচ্চা ছেলে জোহান লিবার্ট এবং তার যমজ বোন আন্নাকে ভর্তি করানো হয়। তৎকালীন পূর্ব জার্মানির সরকারি উপদেষ্টা মাইকেল লিবার্ট সদ্য পরিবারসমেত অ্যাসাইলামে পশ্চিম জার্মানিতে এসেছিল। কিন্তু এক রাতে মাইকেল লিবার্টকে তার স্ত্রীসহ মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়, খুন করা হয়েছে তাদের। পাওয়া যায় তাদের ছেলে জোহানকে, গুলিবিদ্ধ অবস্থায়। আর তার যমজ বোন আন্না অতিরিক্ত ট্রমায় মানসিকভাবে স্তব্ধ। ছেলেটার মাথায় গুলি লেগেছে, এবং তাকে বাঁচানোর দায়িত্ব পড়ে তেনমার ওপরে। কিন্তু ঠিক একই ���ময়ে, শহরের মেয়রেরও অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়। হাসপাতালের পরিচালক ও ঊর্ধ্বতনরা তেনমাকে মেয়রের অপারেশন করতে নির্দেশ দেয়। কিন্তু নৈতিকভাবে সঠিক কাজটা করার সিদ্ধান্ত নেয় তেনমা, সে নিজের ক্যারিয়ারকে ঝুঁকির মুখে ফেলে শিশুটির অপারেশন করে তাকে বাঁচিয়ে তোলে।
তবে এমন সিদ্ধান্তের জন্য তেনমাকে ভোগ করতে হয় কঠিন পরিণতি। হাসপাতালের অসাধু কর্তৃপক্ষ তার পদোন্নতি আটকে দেয়, এমনকি ভেঙে যায় তার বাগদানও। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে যেন এক ঝড় এসে এলোমেলো করে সবকিছুকে শান্ত করে দিয়ে যায়। সেই হাসপাতালের ডিরেক্টরসহ অন্যান্য উচ্চপদস্থ অসাধু চিকিৎসকরা রহস্যজনকভাবে মারা যায়, আর জোহান ও তার যমজ বোন হাসপাতাল থেকে নিখোঁজ হয়ে পড়ে।
৯ বছর পর, ১৯৯৫ সালে, তেনমা হাসপাতালের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিউরোসার্জন। সফলতার শীর্ষে থাকলেও, সে নৈতিকতার সাথে প্রত্যেক রোগীর চিকিৎসার কাজ করে যায়। নয় বছর আগের ঘটনার পর থেকেই সে ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করে প্রত্যেকটা মানবজীবন সমমূল্যের, যাদের যেকোনো পর্যায়ে রক্ষা করা উচিত। অন্যদিকে, সারা জার্মানি জুড়ে কয়েক বছর ধরে খুন হচ্ছে একের পর এক মধ্যবয়সী নিঃসন্তান দম্পতি। নৃশংসভাবে হওয়া এই হত্যাকাণ্ডগুলোর ব্যাপারে নেই কোনো ক্ল্যু, কোনো অভিযুক্ত কিংবা কোনো মোটিভ। জার্মানির ফেডারেল পুলিশ অর্গানাইজেশন BKA এর অনুসন্ধানী ও নাছোরবান্দা গোছের অফিসার হেনরিক লুঙ্গে এই কেসটা সমাধান করতে বদ্ধপরিকর। এরমধ্যে সে খুনগুলোর সাথে জড়িত একজনের খোঁজ পেলেও সেই লোক গাড়ি দূর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হয়। পরবর্তীতে সেই খুনের মামলার আহত রোগী অ্যাডলফ জাঙ্কারের চিকিৎসা করতে গিয়ে তেনমা মুখোমুখি হয় এমন এক ভয়ঙ্কর শীতল মস্তিষ্কের সিরিয়াল কিলারের, যেটার জন্যে তার ব্যক্তিগত জীবনে এক দুঃস্বপ্নের সূচনা হয়৷ সেটার কারণ হলো- সেই খুনি আর কেউ নয়, বরং সেই ছোট ছেলেটি, যাকে সে বাঁচিয়েছিল, জোহান! যাকে মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে এনে তেনমা অনুধাবন করতে পেরেছিল সব মানুষের জীবন রক্ষা করার গুরুত্ব, সেই কিনা চোখের পলক না ফেলে নরহত্যা করে চলেছে। জোহানের মুখোমুখি হয়ে তেনমা এক ভয়ংকর সত্য উপলব্ধি করে—সে নিজেই একটা "দানব" (Monster) সৃষ্টি করেছে!
নিনা ফোর্টনার, হাইডেলবার্গে বসবাসরত এক তরুণী। সদ্য তারুণ্যে পা দেওয়া নিনা একজন সুন্দরী, বুদ্ধিমতী, প্রাণ চাঞ্চল্যে ভরপুর মেয়ে, একাডেমিক জীবনেও তার অর্জন অনন্য। তবে তার বিস্মৃত শৈশবকালের কোনো ভয়াবহ স্মৃতি আজও তাকে অবচেতন মনে তাড়া করে বেড়ায়। ব্যাপারটা আরও ভয়ংকর হয়ে উঠে, যখন তার ২০তম জন্মদিনে সেই ভুলে যাওয়া অতীত আবার ফিরে আসে। তেনমা জানে, সে আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে না। যে বিশ্বাসের সাথে এতোদিন সে কাজ করছিল, তার মূল ভিত্তিটাই কিনা ভয়ংকর এক খুনীর পুনর্জাগরণের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে। জোহানের ব্যাপারে ব্যক্তিগতভাবে তদন্ত করতে গিয়ে সে টের পাই, সম্পূর্ণ ব্যাপারটা আরও অনেক গভীর আর ভয়ংকর। অন্যদিকে নানা পরস্পরবিরোধী ঘটনার মধ্য দিয়ে ইন্সপেক্টর লুঙ্গের প্রধান সন্দেহভাজনে পরিণত হয় তেনমা। ঘটনাচক্রে কিছু প্রমাণ পেয়ে তাকে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয় হত্যা মামলায়। কিন্তু তেনমা দায়মুক্তির চেষ্টার বদলে পলাতক হয়ে বেড়িয়ে পরে জোহানকে খুঁজে বের করার এক কোয়েস্টে। যেই দানবের পুনর্জন্মের সুযোগ সে করে দিয়েছিল, যেখান থেকে এসবের সূচনা, সে দানবের হননের মাধ্যমেই সবকিছু শেষ করতে হবে। তেনমা কি পারবে, নিজের বিশ্বাসের বিপরীতে গিয়ে এই কাজ করতে? কে এই জোহান? কোথা থেকে এই দানবের উৎপত্তি? কোন ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের রক্তাক্ত ইতিহাস জড়িয়ে আছে এর সাথে? আর কত রক্ত, দুঃস্বপ্ন, অবসাদ, গ্লানির পথ পাড়ি দিলে এর সমাপ্তি ঘটবে?
'মন্সটার', নাওকি উরাসাওয়া রচিত ও অঙ্কিত জনপ্রিয় মাঙ্গা সিরিজ। থ্রিলার জনরার এই মাঙ্গার এনিমে অ্যাডাপটেশনটা দেখেছিলাম, এক কথায় অসাধারণ লেগেছিল। এখন পর্যন্ত আমার দেখা সেরা এনিমে বলবো সেটাকে, এমনকি আমার অন্যতম পছন্দের থ্রিলার গল্পও। একটা সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারকেও যে এতো ভালোভাবে আর বিশাল পরিসরের ক্যারেক্টর ড্রিভেন কাহিনীর মাধ্যমে উপস্থাপন করা যায়, 'মন্সটার' না দেখলে বুঝতাম না। সবমিলিয়ে 'মন্সটার' এনিমেটা থ্রিলার হিসেবে আমার জন্য ছিল একটা লাইফটাইম এক্সপেরিয়েন্স, যেটাকে আমি সব থ্রিলার লাভারদের জন্যে মাস্ট ওয়াচ বলবো। এটা দেখেই আমি মাঙ্গাকা নাওকি উরাসাওয়ার ভক্ত হয়ে গিয়েছি, পড়েছি তার সবচেয়ে বড় মাঙ্গা '২০থ সেঞ্চুরি বয়েজ'ও। আর এই 'মন্সটার' মাঙ্গাটা পড়ার ইচ্ছাও আমার বহুদিনের।
মাঙ্গাটার মূল গল্পে প্রকাশকালের জনপ্রিয় ধারার সাইকো থ্রিলারের স্বাদ পাওয়া যায়, সেইসাথে ৬০-এর দশকের জনপ্রিয় টিভি সিরিজ 'The Fugitive' এর ইন্সপিরেশনও স্পষ্ট। তবে গল্পটা একেবারে শুরু থেকেই নিজস্ব হিচককিয়ান সাসপেন্সের আবহ তৈরি করে রাখে, যেটা পুরোটা সময় ধরে পাঠকের আগ্রহ ধরে রাখবে। একই সাথে রহস্যময়, শক্তিশালী, বিপদজনক ও আগ্রহোদ্দীপক প্রধান অ্যান্টাগনিস্টের সূক্ষ্ম উপস্থাপনা গল্পে অতিরিক্ত উত্তেজনা যোগ করে। প্রথম পারফেক্ট এডিশন ভলিউমে গল্পের প্রাথমিক বিল্ডআপটা রয়েছে। যদিও গল্পের এই আর্কটা থ্রিলার হিসেবে বেশ উপভোগ্য, তবে এটা 'মন্সটার' এর গ্রেটনেসটা সেভাবে তুলে ধরে না। এমনকি এখন পর্যন্ত গল্পটাকে সেভাবে সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারও বলা যায় না।
নাওকি উরাসাওয়ার রিয়েলিস্টিক আর্টওয়ার্ক দূর্দান্ত। পর্যাপ্ত ডিটেইলিং এর সাথে প্রতিটি দৃশ্যকে অনেক দক্ষতার সাথে আঁকা হয়েছে। প্রতিটা চরিত্রের চেহারার গঠন, অভিব্যক্তি একদম আসল হয়ে ধরা দিচ্ছিল। আর প্যানেলগুলোর ফ্রেমিং, বিন্যাস, ডায়লগ বক্সের সাথে সমঞ্জস্যতা, এত সূক্ষ্মভাবে করা হয়েছে যে, প্রতিটি প্যানেল থেকে পরবর্তী প্যানেলে চোখ অটোমেটিক চলে যায়। এভাবে নাওকি উরাসাওয়া গল্প বাদে আর্টওয়ার্কের মাধ্যমেও তার মাঙ্গাকে পেজ-টার্নারে পরিণত করেছে।
নাওকি উরাসাওয়ার মূল শক্তির জায়গা হলো চরিত্র গঠন এবং তাদের গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। বিশেষ করে এই ভলিউমে প্রোটাগনিস্ট ডক্টর কেনজো তেনমার চরিত্রায়নটা এত দুর্দান্তভাবে করা যে, এটা দেখলেই বোঝা যায় উরাসাওয়া চরিত্র নির্মাণে কতটা দক্ষ, যা কিনা গল্পের মূল থিমের ভিত্তি নিখুঁতভাবে গড়ে তুলে। যদিও এই ভলিউমে কাহিনীর বিল্ডআপ এবং প্রোটাগনিস্টের চরিত্রায়নের জন্য সাইড ক্যারেক্টারদের বিকাশ তুলনামূলকভাবে কম, তবুও ডক্টর তেনমার চরিত্রায়ন, অ্যাডলফ জাঙ্কার আর সাংবাদিক মাউরারের সঙ্গে তার স্বল্প সময়ের গভীর সম্পর্ক এবং নিনা ফোর্টনারের অতীত জীবনের অজানা ট্রমা গল্পে বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষ করে ভলিউমের শেষ অধ্যায় "Old Soldier and Young Girl" ছিল অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী; সেখান থেকেই মূলত ‘মন্সটার’-এর গল্পটা চরিত্রকেন্দ্রিক ও অসাধারণ হয়ে ওঠে।
গল্পের পরবর্তী অংশের ফোরশ্যাডোয়িং আর বিল্ডআপও এখানে অনেক নিপুণতার সাথে করা হয়েছে। পরবর্তী ভলিউমগুলিতে এই কাহিনী অসাধারণভাবে চরিত্রকেন্দ্রিক হয়ে উঠবে আর সেসব চরিত্রের গল্পগুলোর মাধ্যমে বহিঃপ্রকাশ ঘটবে ভালোবাসা, স্নেহ, কষ্ট, হিংস্রতা, অবসাদ, আবেগহীনতা ও আত্মত্যাগের মতো আরও নানান মানবিক আবেগ-অনুভূতির। হাড়হিম করা সাসপেন্সের সাথে থাকবে অসংখ্য স্মৃতি-বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যাওয়া প্রহেলিকাময় সব ঘটনা ভেদ করে ক্রমান্বয়ে এক জটিল চরিত্রের অন্ধকার মনস্তত্ত্বের বিকাসন। আর থ্রিলারের সাধারণ উপাদান যেমন- খুন, রহস্য, ষড়যন্ত্র, গুপ্তসংঘ, সাসপেন্স আর হালকা পাতলা কি��ু টুইস্ট তো আছেই। সেইসাথে আরও আসবে জার্মানির কোল্ড ওয়ার পরবর্তী সময়ের পরিস্থিতি, বার্লিন প্রাচীর পতনের পর সাধারণ মানুষদের অবস্থা। নৈতিকতা, পরিচয়, ক্ষমতা, অস্তিত্ববাদ, আইডিয়ালিজম ও নিহিলিজমের মতো নানান দর্শনের রূপক আলোকে গড়ে ওঠা গল্পটি ধীরে ধীরে একটা সত্যিকারের মাস্টারপিস সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারে পরিণত হবে।
📚 বইয়ের নাম : মন্সটার: পার্ফেক্ট এডিশন, ভলিউম - ১
📚 লেখা ও আঁকা : নাওকি উরাসাওয়া
📚 বইয়ের ধরণ : মাঙ্গা, সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার, ক্রাইম থ্রিলার, সাসপেন্স থ্রিলার, গ্রাফিক নভেল
📚 ব্যক্তিগত রেটিং : ৪.৫/৫