দীর্ঘদিন ধরে কবিতা লিখলেও 'স্মরণজিতের কবিতা সেভাবে পাঠকের সামনে আসেনি কখনও। এই ‘একটা জীবন তােমায় ছাড়া’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলাের মাধ্যমে মূলত প্রেমের চোখ দিয়ে এই শহর ও শহরতলির বেঁচে থাকাকে ধরেছে স্মরণজিৎ। মানুষের ছােটখাটো ইচ্ছে, তার ভাললাগা, মন্দ লাগা, তার জমে থাকা কথা না বলতে পারা মন খারাপের বিবরণী—কখনও ছন্দ-মিল আবার কখনও গদ্যকবিতার মধ্যে দিয়ে উঠে এসেছে সামনে।
এ ছাড়াও মানুষের জীবনে ভালবাসার জায়গা কোনটা, কীভাবে সে বেঁচে থাকতে চায়, কার কাছে তার পৌছতে ইচ্ছে করে, আর সেই ইচ্ছা অপূর্ণ থেকে গেলে মানুষ কেমন করে নিজের কাছেই দূরবর্তী অন্য কেউ হয়ে পড়ে, ‘একটা জীবন তােমায় ছাড়া’ কী করে কাটে, তারই কিছু মায়াময় ছবি ধরে রেখেছে এই কাব্যগ্রন্থ।
স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর জন্ম ১৯ জুন ১৯৭৬, কলকাতায়। বর্তমানে দক্ষিণ কলকাতার বাসিন্দা। পৈতৃক ব্যবসায় যুক্ত। প্রথম ছোটগল্প ‘উনিশ কুড়ি’-র প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত। প্রথম ধারাবাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত। শৈলজানন্দ স্মৃতি পুরস্কার ২০১৪, এবিপি এবেলা অজেয় সম্মান ২০১৭, বর্ষালিপি সম্মান ২০১৮, এবিপি আনন্দ সেরা বাঙালি (সাহিত্য) ২০১৯, সানডে টাইমস লিটেরারি অ্যাওয়ার্ড ২০২২, সেন্ট জেভিয়ার্স দশভুজা বাঙালি ২০২৩, কবি কৃত্তিবাস সাহিত্য পুরস্কার ২০২৩, উৎসব পুরস্কার ২০২৪, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড ২০২৪, আনন্দ পুরস্কার (উপন্যাস: '‘শূন্য পথের মল্লিকা') ২০২৫ ইত্যাদি পুরস্কারে সম্মানিত ।
"আর বাকি সব আবছা বীতরাগে অন্ধ আমি জ্যোৎস্না লিখে যাই ভাবতে আমার ভীষণ অবাক লাগে একটা জীবন তোমায় ছাড়া, ছাই!"
আমার কাছে কবিতার মূল্যায়ন মানে দৃষ্টিহীনের কাছে রামধনু পরিচয়। তবু এটুকু বুঝি যে এই বইটির কল্যাণে স্মরণজিৎ চক্রবর্তী জ্ঞানপিঠের দাবি জানাননি। স্রেফ কটা হালকা চালের কবিতা পড়ে শুনিয়েছেন নিজের পাঠককে। যা গুরুগম্ভীর না হলেও, মেলার মাঠের তুলোটে 'হাওয়াই মিঠাই' সম। রঙিন, নরম ও একটু বেশীই মিষ্টি। যার ফুলকো ছন্দে, পাহাড়ি প্রেম ও শহুরে বিষন্নতার গান। সাথে, ক্লান্ত আকাশে নীল-পাখির খোঁজ ও পুঞ্জীভূত স্মৃতিচারণার ঝড়।
মন কেমনের ছক্কা-পুটে, উন্মোচিত সরসঝাঁপি যেন...
"কী জানি আজ তোমার ছুটি কিনা! মেঘলা আলোয় ভিজল কি না ঠোঁট! কেবল জানি বাদলে, বিদ্যুতে তুমি আমার অলিভ রেনকোট"
আমার আর কি, যতগুলো ভালো লাগলো, ছবি তুলে দাগিয়ে রাখলুম খাতায়। যেগুলো ভালো লাগলো না, সেগুলোর উদ্দেশ্যে অশেষ দুচ্ছাই। একরাশ ভালো লাগা ও বেশ কয়েকবারের "ধুস, এটা আবার কি?" নিয়ে এই বইকে দিলাম তিন তারা। সাবাশ ক্রিটিক!
"আজকাল কষ্ট পেতেও ক্লান্ত লাগে আমার মনে হয় সেইসব রাত্রি আর সেইসব দিন আবার পেরতে হবে? তার চেয়ে এই ভাল, একা ও একক।"
কখনো স্মৃতিকাতর, কখনো গভীর অব্যক্ত আবেগের; আবার কখনো একেবারে গৎবাঁধা, একেবারেই সাধারণ কবিতা নিয়ে এই কাব্যগ্রন্থ। কিছু উজ্জ্বল কবিতার পাশে কিছু কবিতা দৃষ্টিকটুভাবে ম্রিয়মাণ। উপক্রমণিকার কবিতাটা আলাদাভাবে মনে থাকবে -
"সবটুকু রোদ রাংতা দিয়ে মুড়িয়ে দিতে হবে ফুলের বাগান তোমার দিকে ঘুরিয়ে দিতে হবে বকুল পারুল হাতের পাতায় কুড়িয়ে দিতে হবে এক জীবনের সমস্তটাই ফুরিয়ে দিতে হবে আর যা কিছু হাওয়ায় হাওয়ায় উড়িয়ে দিতে হবে নিজের লেখার সবটুকু আজ পুড়িয়ে দিতে হবে... একটা জীবন তোমায় ছাড়া পুড়িয়ে দিতে হবে"
"মেনে নিয়েছি আমিই সেই জন্মান্ধ মানুষ যে হাজার বছর ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে চাঁদে যে আসলে জানেই না চাঁদে জ্যোৎস্না বলে কিছু হয় না"
- স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর কবিতা পড়ার পুরো সময়টা উপভোগ্য ছিলো। বেশ সময় নিয়ে পড়েছি। অনেক সময় কবিতা বাছবিচারে সময় নষ্ট না করে শুধু উপভোগ করে যেতে হয়। প্রচুর কোটেবল লাইন পুরো কাব্যগ্রন্থ জুড়ে। যেমন-
"আর অক্ষম আমি আবছা আলোর ঘর থেকে শুনি কে যেন কাঁদছে সারারাত, কে যেন বাড়ি ফেরেনি আজও কে যেন আসবে বলেছিল, আসেনি! আমি ভাবি কবিতা বানাব এই নিয়ে ভাবি, লিখে ফেলব দীর্ঘ মেলানকলি, বিদ্রোহী সনেট অথবা ছায়াপথ সম্পূর্ণ... ভাবি, কিন্তু পারি না বরং স্মৃতিভ্রষ্ট মানুষ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি একা জানলা দিয়ে দেখি পোড়া শিশুর মতো আকাশ ছড়িয়ে রয়েছে নক্ষত্র অবধি আমি ভয়ে হাত বাড়িয়ে তোমায় খুঁজি। একদিন তোমার সঙ্গে গুটিশুটি ঘুমব বলে জেগে থাকি সারা জীবন। বুঝি, ওই দগ্ধ, হারিয়ে যাওয়া বাচ্চাটা আসলে আর কেউ নয়, আমি "
আমি বই কবিতা তেমন বুঝিনা। কিন্তু এটি পড়ে কবিতার প্রতি ভালো লাগা চলে এসেছে। সহজ কথায় মনের কতকিছু চমৎকারভাবে বলা যায়! শব্দ ও বাক্যের মাঝে এত জাদু!! আমি বিস্মিত এবং আনন্দিত।
প্রায় যতজন বাঙালি লেখক-লেখিকার নাম আমরা সাধারণত শুনে থাকি; তাঁদের প্রায় প্রত্যেকেরই লেখার জগতে প্রবেশ কবিতার হাত ধরে.. স্মরণজিৎ চক্রবর্তীও তাঁদের ব্যতিক্রম নয়.. ওনার কবিতার মধ্যে আমরা এক অন্য ঘরানার হদিশ পাই.. তাঁর রচিত বেশ অনেকগুলি কবিতা নিয়েই প্রকাশিত হয়েছে এই কবিতা সংকলন "একটা জীবন তোমায় ছাড়া".. এই সংকলনে ওনার লেখা কবিতাগুলির মধ্যে বিভিন্ন স্বাদের, বিভিন্ন ছন্দের ও বিভিন্ন সময়ের কবিতার সমারোহ দেখা গেছে.. আধুনিক কবিতার সংজ্ঞা না জানলেও এই কবিতাগুলি পড়লে বেশ বোঝা যায়, কবির আধুনিক চিন্তাভাবনার দিক.. তাঁর লেখা কবিতায় প্রেম-ভালোবাসার পাশাপাশি উঠে এসেছে হারিয়ে যাওয়া ছোটোবেলা, বর্তমান সময়, বাংলার সংস্কৃতি ও মানবজীবনে ঘটে চলা অনেক অজানা অচেনা অনুভূতি.. স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর এই কবিতা সংকলন এমন অনেক কিছুর সাথে পরিচয় করবে, যে সমস্ত অনুভূতি আমরা প্রত্যক্ষ করে থাকলেও কবিতারূপে কখনও দেখিনি.. এই সংকলনে স্থান পাওয়া কবিতার সংখ্যা অনেক.. তারই মধ্যে থেকে একটি প্রিয় কবিতার শেষ চারটি লাইন রইলো এখানে.. "শহর, তোমার ধূসর পথের মাঝে আমায় ওরা বন্ধু বলে চিনুক এই দুহাতে তোমায় ধরে রাখি মুক্তো যেমন আগলে রাখে ঝিনুক"
আজকের সকালটা স্মরণজিৎদার লেখার সাথেই কাটলো । হ্যাঁ, কাব্যগ্রন্থ ‛একটা জীবন তোমায় ছাড়া’ । কবিতা আমার খুব প্রিয় বিষয়, কিন্তু সবসময় পড়া যায় না । তাই, বইমেলায় কেনা বইটি এতদিন ছুঁয়েও দেখা হয়নি । হয়তোবা এমন একটা সকালের অপেক্ষায় ছিলাম...
যাইহোক... কিছু প্রশ্ন ছিলই, স্মরণজিৎদা ভালো লেখক ঠিকই.. কিন্তু কবি হিসেবে কেমন?? এত কবিতার বই থাকতে ওনার কবিতা পড়বো কেন??
প্রথমেই বলি... যারা ওনার উপন্যাস পড়েছেন, তারা কি ওনার কবিতার সাথে পরিচিত নন?? উপন্যাসের মাঝে বা শুরুতে সুন্দর সুন্দর কবিতাগুলো কি আপনার চোখ এড়িয়ে গেছে? ওনার কবিতা পড়বেন... কারণ ঠিক যেমন খুব সহজ সাধারণ ভাবে উনি ওনার গল্পগুলো বলে ফেলেন, কবিতার ক্ষেত্রেও ঠিক তাইই । বেশ কিছু কবিতা পড়ে আপনার মনেও হতে পারে, ‛আরে ঠিক এই কথাটাই তো আমার মনে হয়.. উনি তো আমার মনের কথাটা গুছিয়ে লিখে ফেলেছেন ।’
এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলির মাধ্যমে মূলত প্রেমের চোখ দিয়ে একটি শহর ও শহরতলির বেঁচে থাকার গল্প লেখা হয়েছে । মানুষের ছোট-খাটো সব ইচ্ছে, তার ভালোলাগা-মন্দলাগা, তার জমে থাকা যত কথা, না বলতে পারা মনখারাপের বিবরণী - কখনো ছন্দ-মিল আবার কখনো গদ্যকবিতার মধ্যে দিয়ে উঠে এসেছে আমাদের সামনে । এ ছাড়াও মানুষের জীবনে ভালোবাসার জায়গা কোনটা, কীভাবে সে বেঁচে থাকতে চায়, কার কাছে তার পৌঁছাতে ইচ্ছে করে, আর সেই ইচ্ছে অপূর্ণ থেকে গেলে মানুষ কিভাবে তার নিজের কাছেই অপরিচিত একজন হয়ে ওঠে... তারই কিছু মায়াময় ছবি ধরে রেখেছে এই কাব্যগ্রন্থ ।
প্রায় যতজন বাঙালি লেখক-লেখিকার নাম আমরা সাধারণত শুনে থাকি; তাঁদের প্রায় প্রত্যেকেরই লেখার জগতে প্রবেশ কবিতার হাত ধরে.. স্মরণজিৎ চক্রবর্তীও তাঁদের ব্যতিক্রম নয়.. ওনার কবিতার মধ্যে আমরা এক অন্য ঘরানার হদিশ পাই.. তাঁর রচিত বেশ অনেকগুলি কবিতা নিয়েই প্রকাশিত হয়েছে এই কবিতা সংকলন "একটা জীবন তোমায় ছাড়া".. এই সংকলনে ওনার লেখা কবিতাগুলির মধ্যে বিভিন্ন স্বাদের, বিভিন্ন ছন্দের ও বিভিন্ন সময়ের কবিতার সমারোহ দেখা গেছে.. আধুনিক কবিতার সংজ্ঞা না জানলেও এই কবিতাগুলি পড়লে বেশ বোঝা যায়, কবির আধুনিক চিন্তাভাবনার দিক.. তাঁর লেখা কবিতায় প্রেম-ভালোবাসার পাশাপাশি উঠে এসেছে হারিয়ে যাওয়া ছোটোবেলা, বর্তমান সময়, বাংলার সংস্কৃতি ও মানবজীবনে ঘটে চলা অনেক অজানা অচেনা অনুভূতি.. স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর এই কবিতা সংকলন এমন অনেক কিছুর সাথে পরিচয় করবে, যে সমস্ত অনুভূতি আমরা প্রত্যক্ষ করে থাকলেও কবিতারূপে কখনও দেখিনি.. এই সংকলনে স্থান পাওয়া কবিতার সংখ্যা অনেক.. তারই মধ্যে থেকে একটি প্রিয় কবিতার শেষ চারটি লাইন রইলো এখানে.. "শহর, তোমার ধূসর পথের মাঝে আমায় ওরা বন্ধু বলে চিনুক এই দুহাতে তোমায় ধরে রাখি মুক্তো যেমন আগলে রাখে ঝিনুক"