একবার এক মহীয়সী নারী তার ভুল সিদ্ধান্তের কারণে প্রিয়তম স্বামীর সঙ্গ না পাওয়ায় নিজেকে নিজে প্রচন্ড অভিশাপ দিচ্ছিলেন, ভাবছিলেন ঝোঁপ থেকে বেরিয়ে কোন সাপ যেন তাকে কামড় দেয়, আর সেই সাপের বিষেই যেন তার মৃত্যু হয়।
বলছিলাম, উম্মুল মুমিনীন (বিশ্বাসীদের মা) আয়িশা বিনতে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহা এর কথা। প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহা এর মৃত্যুর পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেকটা ভেঙে পড়েছিলেন। তার এই বিষন্নতা দেখে একজন নারী সাহাবী তাকে পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার প্রস্তাব জানায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আয়িশা (রা.) এর সাথে রাসূলুল্লাহ (সা.) বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
সাদ বিন উবাদা (রা.) নামের একজন সাহাবী সেই রাতে রাসূলুল্লাহ (সা.) কে এক পাত্র দুধ উপহার দেন। সেই দুধ রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে পান করেন, আয়িশা (রা.) কে পান করান ও ঘরে আরও যারা ছিলেন তাদেরকেও পান করতে বলেন। এই ছিলো রাসূলুল্লাহ (সা.) এর পক্ষ থেকে মা আয়িশা (রা.) এর জন্য বিয়ের উপহার।
ছোট আয়িশা (রা.) এর সাথে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সাথে যখন বিয়ের চুক্তি হয়েছিলো তখন তার বয়স ছিলো মাত্র ছয় বছর, এবং যখন তা কার্যকর হয়েছিলো (দাম্পত্য জীবনের সূচনা) তখন তার বয়স ছিলো নয় বছর। তার বিয়ের এ বিষয়টি তিনি নিজেই জানিয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে আমরা বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থের মাধ্যমে জানতে পারি।
সমসাময়িক উম্মাহাতুল মুমিনীনদের মধ্যে তিনি বেশ সুন্দরী ছিলেন, যা এই বইয়ের বর্ণনাকৃত বিভিন্ন ঘটনা থেকে আমরা তা জানতে পারি। একই সাথে আয়িশা (রা.) এর প্রতি রাসূলুল্লাহ (সা.) ভালোবাসার যে আধিক্য তা অন্যান্য উম্মাহাতুল মুমিনীন সহ সাধারণ মানুষেরাও অনুভব করতে পেরেছিলেন। ফলে দেখা যেত, রাসূলুল্লাহ (সা.) যে দিনগুলোতে আয়িশা (রা.) এর সাথে থাকতেন সে দিনগুলোতে অন্যান্য দিনের তুলনায় অনেক বেশি উপহার পেতেন। স্বাভাবিকভাবেই বিষয়টি অন্যান্য উম্মাহাতুল মুমিনীনদের ভালো লাগেনি। ফলে তারা ফাতিমা (রা.) এর কাছে আয়িশা (রা.) এর বিরুদ্ধে অনুযোগ করলেন। এর পরবর্তীতে কীভাবে মীমাংসিত হয়েছিলো তা জানতে অবশ্যই বইটি সম্পূর্ণ পড়তে হবে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর প্রিয়তমা স্ত্রী হুমায়রা/হুমাইরা (ডাকনাম। রাসূলুল্লাহ (সা.), আয়িশা (রা.) কে ভালোবেসে আদর করে এই নামে ডাকতেন) তিনি বলেন, "আমি এমন দশটি নিয়ামত পেয়েছি, যা অন্য উম্মাহাতুল মুমিনীনরা পাননি।" তবে কী সেই দশটি নিয়ামত?
স্বামীর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা, অধিক ভালোবাসা পাওয়ার জন্য ইর্ষা, মান-অভিমান থেকে শুরু করে জ্ঞানের প্রতি প্রচন্ড আগ্রহ, দানশীলতা, ফিকহী বিষয়ের মাসলা-মাসায়েল আরও অনেক কিছু নিয়েই আমাদের উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রা.) এর সংসার ও জীবন। তিনি যেমন তার স্বামীকে প্রচন্ড ভালোবাসতেন, সম্মান ও শ্রদ্ধা করতেন, তেমনি দ্বীন পালনের ব্যাপারেও ছিলেন বেশ যত্নশীল। তিনি দুই হাজার দুইশরও বেশি হাদিস বর্ণনা করেন, যা একজন নারী সাহাবিদের মধ্যে সর্বোচ্চ। ইবনে হাজার আসকালানি, আয়িশা (রা.) কে 'উম্মাহর ফকিহা' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
এই মহান মহীয়সী নারী হিজরি ৫৭/৫৮ তে ১৭ই রমজান সন্ধ্যায় এই জগৎ-সংসার ছেড়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করেন।
বর্তমানে আমরা নানা ধরণের বই পড়লেও আমাদের মধ্যে সিরাত (রাসূলুল্লাহ সা. এর জীবনী), সাহাবা, উম্মাহাতুল মুমিনীন, তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ী সহ অন্যান্য সকল মুসলিম মনিষীদের জীবনী পড়ার আগ্রহ দেখা যায় না। ফলে ইসলামের সূচনা, লড়াই, ত্যাগ এবং এর যথাযথ অর্থ আমরা জানতে ও অনুধাবন করতে পারি না। একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের সকলেরই উচিত এ বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখা। বিশেষ করে উম্মাহাতুল মুমিনীনদের জীবনী আমাদের ঘরের নারীদের জন্য অবশ্যই পাঠের বিষয়। ইসলামের ইতিহাসে উম্মাহাতুল মুমিনীন সহ যে সকল নারীদের ব্যাপক অবদান ছিলো তাদের নিয়ে বাজারে বিভিন্ন বই পাওয়া যায়, এর মধ্যে পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত আমেরিকান মুসলিম স্কলার ও জনপ্রিয় বক্তা ড. ইয়াসির ক্বাদি 'মাদারস অব দ্যা বিলিভারস' লেকচার সিরিজের মধ্যে উম্মাহাতুল মুমিনীনদের নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন। উক্ত সিরিজকে বাংলায় ভাষান্তর করে 'উম্মুল মুমিনিন (অখন্ড)' নামে প্রকাশিত করা হয়। এর পাশাপাশি 'উম্মুল মুমিনিন' সিরিজের প্রত্যেক উম্মাহাতুল মুমিনীনদের নিয়ে আলাদা আলাদা করে বই বেড় করার প্রক্রিয়া চলছে। এখন পর্যন্ত 'খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ (রা.)' ও 'আয়িশা বিনতে আবু বকর (রা.)' নামের আলাদা দুটি বই বাজারে পাওয়া যাচ্ছে।
শিক্ষা ও আমার মতামত, "একজন সফল পুরুষের পেছনে নারীর ভূমিকা ও ত্যাগ, ভালোবাসা, মান-অভিমান, শিক্ষা ও জ্ঞান। সংসার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সকল কাজ, দানশীলতা, পর্দা ও দ্বীনের ব্যাপারে কঠোরতার যে দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তা এই বই পড়লে বেশ ভালো ভাবেই উপলব্ধি করা যায়। ফলে এই বই থেকে নারীর মন-মনন এবং স্বামীকে সম্মান-শ্রদ্ধা সমপর্কে জানতে পারা যাবে। বইটি খুবই সংক্ষিপ্ত, যদি এখানে আরও বিস্তর আলোচনা করা যেত তবে মনে হয় পরিপূর্ণ হতো। রেটিং দেয়ার মতো যোগ্যতা আছে বলে মনে করি না, একজন লেখক কতটা রিসার্চ করে, পরিশ্রম করে একটি লেকচার, একটি বই প্রকাশ করে তা বলা বাহুল্য। ফলে আমার মনে হয়, এই অধমের রেটিং দেয়া মানে লেখকের লেখনীর অবমাননা করা। তবে এতটুকো বলাই যাই, বইটি বেশ ভালো।"
আয়িশা বিনতে আবু বকর (রা.)
মূল: ড. ইয়াসির ক্বাদি
ভাষান্তর: আলী আহমাদ মাবরুর
প্রকাশনী: প্রচ্চদ প্রকাশন
মুদ্রন মূল্য: ১৭০ টাকা
পৃষ্ঠা: ১৩৪ পৃষ্ঠা
- ফজলে রাব্বি শান্ত