শুভর সঙ্গে অশুভশক্তির, ভালোর সঙ্গে মন্দ, আলোর সঙ্গে অন্ধকারের দ্বন্দ্ব চিরন্তন। সৃষ্টির সূচনা থেকেই শুরু হয় ঈশ্বরের উপাসনা। সৌভাগ্যক্রমে বেশিরভাগ মানুষ ঈশ্বর বা শুভশক্তির প্রভুত্ব মেনে নিয়েছিলো, হয়তো সেটাই ছিলো ঈশ্বরের ইচ্ছা। কিন্তু তারপরেও অনেক মানুষ আলো ছেড়ে অন্ধকারের সাধক হওয়াকেই বেছে নিয়েছিল। শয়তানের পূজা কি সত্যিই আছে? নাকি নেই? ষোড়শ শতকের দিকে অসংখ্য মানুষকে শয়তানের পূজা করার জন্যে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। সেটা কি শুধু কুসংস্কার? নাকি তার মধ্যে সত্যতা ছিলো? হ্যারি পটারের জনপ্রিয় সিরিজের বইগুলোর ক্ষেত্রে আমাদের পরিচিত একজন চরিত্র লর্ড ভোলডেমর্ট কি এমনই ডার্ক লর্ডের রাজত্ব কায়েম করতে চেয়েছিলেন? অশুভের আস্ফালনের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে যেতে শুভশক্তি কি হেরে যাবে? নাকি পরাস্ত করতে পারবে অশুভের প্রতীক বহনকারী শয়তানের পূজারীদের? সুদূর অতীতের তলহীন কুয়া থেকে বের হয়ে আসা শয়তানের পূজারীরা এবার মেক্সিকো থেকে এসেছে বাংলাদেশে, খুব সাধারণ মেয়ে জরী তার উপর থাকা ঈশ্বরের আশীর্বাদ থেকে প্রাপ্ত ক্ষমতা দিয়ে কি পারবে বাংলাদেশকে বাঁচাতে? পৃথিবীকে বাঁচাতে? নাকি পরাস্ত হয়ে হারিয়ে যাবে নিজেই?
বইটির প্লট সিম্পল আর স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড। টপিকটা বড়দের কথা মাথায় রেখে বেছে নেয়া হলেও, লেখা হয়েছে অনেকটা কিশোর উপন্যাসের আদলে। প্লটে কমপ্লেক্সিটি কম। খুব সহজেই হয়ে যায় সব, গল্প কখনও তেমন একটা সিরিয়াস মুডে যায় না। ঘোরপ্যাঁচও সেই হিসেবে অনেক কম। লেখা খুবই স্মুথ এবং সহজপাঠ্য, ১৪৪ পৃষ্ঠার উপন্যাস বলে পাতা উল্টিয়ে যাওয়া যায় তেমন হোঁচট না খেয়েই। কিছুটা একঘেয়েমি আছে অবশ্য, লেখায় সেই ক্রিস্পভাবটা নেই যা সাধারণ থ্রিলারে এক্সপেক্ট করা হয়। তবে যেহেতু টপিক শয়তান উপাসনা নিয়ে, তাই স্বভাবতই থ্রিলারের অন্যান্য জনরার ক্রিস্পিনেসটা নেই। চরিত্রায়নের কথায় আসি—গল্পের চরিত্র খুব বেশি না হলেও, কোনোটাই ঠিক পূর্ণতা পায়নি। গল্পের দুই মূল নারী প্রোটাগনিস্ট: জরী এবং সুমনা, এক হিসেবে একে-অন্যের কার্বন কপি। একজন একটু বেশি স্পেস পেয়েছে, আরেকজন কম—এই যা। সেই হিসেবে বরঞ্চ দ্বিতীয় গল্পের ‘স্বপ্ন’ চরিত্রটা অনেক বেশি রহস্যময়। দ্বিতীয় গল্প বললাম কারণ আসলে এক বইয়ে ‘প্রথম খণ্ড’ আর ‘দ্বিতীয় খণ্ড’ ব্যবহার না করে দুটো ভিন্ন শিরোনাম ব্যবহার করেছেন। নইলে গল্প আসলে একটাই। বানান ভুলের কমতি এই বইয়ের অন্যতম প্লাস পয়েন্ট। যদিও প্রথম পাতার দশম লাইনেই বানান ভুল দেখে মনে হচ্ছিল যে সম্ভবত আশাহত হতে যাচ্ছি। কিন্তু পরেরদিকে তেমন একটা ভুল দেখতেই পাইনি। ১৪৪ পৃষ্ঠা হলেও উপন্যাস বললাম, কারণ তার মেকআপ। বইতে একটাও সাব চ্যাপ্টার ব্যবহার করা হয়নি, অথচ একাধিক জায়গায় তার দরকার ছিল। চারপাশে অনেকটা জায়গা ছেড়ে দিয়ে ব্যবহার করা হয়েছে ছোট্ট ফন্ট যা চোখের জন্যও খুব একটা আরামদায়ক মনে হয়নি। সেই সঙ্গে বইয়ের শেষের দিকে দুটো পাতায় অহেতুক আন্ডারলাইনের উপস্থিতি সন্দেহ জোগায়, পেলাম আর ছেলে দিলাম ধরনের কিছু করা হয়েছে নাকি। নতুন লেখকদের বইতে যত্ন দরকার হয় বেশি, সেটার অভাব পেলাম বইতে...যার আরেকটা প্রমাণ ‘কোটেশন মার্ক’। কোথাও স্ট্রেট (") কোট আবার কোথাও বা কার্লি (“”) ব্যবহার করা হয়েছে। বইয়ের সবচাইতে দুর্বল ও একমাত্র বিরক্তিকর দিক হচ্ছে অহেতুক ইংরেজির ব্যবহার। মৌলিক বইতে যদি অনুবাদের চাইতে বেশি ইংরেজি থাকে, তাহলে তো সমস্যা। মানছি গল্পের অনেক চরিত্র বিদেশি, তাই বিদেশি ভাষা ব্যবহার স্বাভাবিক। কিন্তু মেক্সিকানকেও কেন ইংরেজি ব্যবহার করতে হবে। যদি সামনে কোনো ইংরেজি লেখকের বইতে বাংলাদেশি চরিত্র থাকে, সে কি বাংলা হরফে বাংলায় কথা বলবে? নাকি ইংরেজি হরফে মুরাদ টাকলা স্টাইলে বাংলায়? নাকি ইংরেজিতেই? এবার আসি খুঁটিনাটির দিকে— তথ্যসংক্রান্ত গোঁজামিল আমার অপছন্দের। আপু নিজে ডাক্তার, পাঠক এবং সময় নিয়ে লেখা মানুষ বলে তেমন বড় ধরনের গোলমাল আমার নজরে পড়েনি। শুধু একটা ব্যাপার বাদে। আমার জানামতে—টেলিকাইনেসিস মানে মানসিক শক্তি ব্যবহার করে বস্তুকে নড়ানো (সম্ভবত সাইকোকাইনেসিস ব্যবহার করা হয় এখন), আর এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গমন হলো টেলিপোর্টেশন। তবে প্লট সংক্রান্ত কিছু পয়েন্ট না বললেই নয়: ***স্পয়লার অ্যালার্ট*** ১. এ ধরনের বইতে ধর্ম একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ রাখে। থিয়োলজিক্যাল ডিবেটে যাবো না, কিন্তু ঈশ্বর-শয়তান সব মিলিয়ে আসলে একই, বিভিন্ন ধর্ম বিভিন্ন ভাবে দেখে—কথাটা বাতুল। মুসলমান হলে জন্মান্তরে বিশ্বাস রাখবে না, খ্রিষ্টান হলেও রাখার কথা না। জগাখিচুড়ি না পাকিয়ে একটা লাইন অবলম্বন করলেই ভালো হতো। ২. হলিউডি মুভিতে যেমন সব ভিনগ্রহবাসীর আক্রমণ হয় আমেরিকায়, তেমনি আমাদের লেখাতেও সব কিছু হবে বাংলাদেশে—এটাই স্বাভাবিক। তবে আমেরিকায় আক্রমণের কারণ ব্যাখ্যা করতে হয় না, আমাদের দেশে হবার কারণ করতে হয়। চেম্বার অফ সিক্রেটস কেন বাংলাদেশে, সেটার ব্যাখ্যা একটা দাঁড়া করালে ব্যাপারটা সর্বাঙ্গে সুন্দর হতো। ৩. মূল চরিত্র অনেক বেশি ওপি (ওভার পাওয়ারড) ক্যারেক্টার। তার সামনে কিছুই কিছু না, তাই কখনওই ঠিক তাকে নিয়ে আতঙ্কের ফিলটা আসেনি। যখন যেই পাওয়ার দরকার হচ্ছে, দেখা যাচ্ছে ওর মধ্যে—টেলিকাইনেসিস, টেলিপ্যাথি, টেলিপোর্টেশন ইত্যাদি। ৪. এই ধরনের পাওয়ার আপের রিয়েল লাইফ কনসেকুয়েন্স আর ব্যবহার অনেকক্ষেত্রেই বইতে খেয়াল করা হয় না। টেলিপোর্টেশন পাওয়া আছে, নিজের সঙ্গে অন্যকে নেবারও ক্ষমতা আছে, তাহলে কেন হেলিকপ্টার পাঠিয়ে দেয়া লাগল? কেন কয়েক ট্রিপ দিয়ে নিজের কাছে সবাইকে আনা গেল না? শালবন থেকে ঢাকা যাবার সময়ের মাঝে নাগিব, সুমনা, সাকিব মানে দুই ফ্যামিলিকে এক করা গেল কীভাবে? শহর তো ঢাকা, এখানে বাসার একরুম থেকে আরেকরুমে যেতে জ্যামে পড়া লাগে! ৫. শক্তিগুলোকে ব্যবহার করে খুব সহজেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যেত, পুলিস অফিসারকে টেলিকাইনেসিস, টেলিপ্যাথি বা টেলিপোর্টেশনের ঝলক দেখালেই তো হয়ে যায়! ৬. চেম্বার অফ সিক্রেটস বাংলাদেশে হলেও, অতীতে মেক্সিকোর রানী ইসাবেলা সেটা খোলার চেষ্টা করছে সেই মেক্সিকো থেকেই। যদি তাই হয়, তাহলে বর্তমানে কেন বাংলাদেশে আসতে হবে? সব মিলিয়ে বইটা খুব বেশি সিরিয়াস কিছু না, তবে এক বসায় পড়ার জন্য ভালো। সেই সঙ্গে লেখিকার পটেনশিয়ালের প্রমাণ। প্রথম বই বলে কাউকে আলাদা নজরে দেখা হবে—এমনটা পাঠক আমি বিশ্বাস করি না। তবে লেখক আমার বিশ্বাস, নার্চার করলে এবং করতে দিলে, লেখিকার অনেক দূর যাবার সম্ভাবনা আছে। যে সমস্যাগুলোর কথা বললাম, এগুলো এই ধরনের বইয়ের কমন সমস্যা। তবে সেগুলোকে যথাসম্ভব কমিয়ে আনা আর মোটামুটি গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যার আড়ালে আনার জন্য চাই পরিশ্রম, খানিকটা চিন্তা আর অনেক বেশি ডেডিকেশন।
প্রি অর্ডার করে কেনা বই, তার উপরে আবার ফেসবুকেও আধা পড়া। ফেসবুকে পড়ার সাথে বই হাতে নিয়ে পড়ার তফাতটা হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায়। ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্টের সাথে গল্প পড়তে গেলে অনেক ক্ষেত্রেই অনেক কিছু চোখে পড়ে না, আবার অনেক অসংগতিও চোখ এড়িয়ে যায়। যেমন বই হাতে নেবার পরে মনে হয়েছে যে আমার বয়স ১৫-১৬ হলে বইটা পড়ে বেশ মজা পেতাম, এখন বুড়ো বয়সে এসে শয়তানের উপাসনা নিয়ে এত সিনেমা আর বই পড়েছি যে জিনিসটাকে আগ্রহোদ্দীপক করে তুলতে যে পরিমাণ ডিটেইলিং এর দরকার ছিলো, সেটা এখানে পাইনি। পড়তে খারাপ লেগেছে তা কিন্তু না, মৌলীর লেখার হাত ভালো, গল্প তরতর করে পড়ে ফেলা যায়, বানান ভুলও কম থাকে বাতিঘর ছাড়া অন্য প্রকাশনীর, তাই পড়েও আরাম, কিন্তু ধরেন বাংলা লেখায় ইংরেজি বাক্য পড়তে আমার ভালো লাগে না, তারপরে মেহিকোর লোকজন ইংরেজিতে বাক্যালাপ কেন করবে? সেটা স্প্যানিশ বা নেটিভ যেমন নাহুয়াতেল বা ইউকাতেকে হওয়া দরকার ছিলো, তাই না? মৌলী কতোটা খাটে তা জানা আছে, তাই আশা করি এই ধরণের ভুলও সামনে পাবো না। এছাড়াও চরিত্রগুলোর আরও বিন্যাস থাকলে শান্তি লাগত, সবকিছুতেই কেমন তাড়াহুড়োর ছাপ ছিলো, বিশেষত দ্বিতীয়ার্ধে তো সব কেমন জানি দৌড়ে দৌড়ে শেষ হয়ে গেলো, থই পেলাম না।
প্রচ্ছদ খুব বেশী পছন্দ হয়নাই, অতিরিক্ত এলিমেন্ট, সব ভরে ভরে দিয়েছে মনে হইসে।