"মানুষ পরিব্রাজক। জীবনের অন্বেষণে ঘুরতে ঘুরতে কোথা থেকে কোথায় সে পৌঁছে যায় নিজেও জানে না। উৎস থেকে মোহনায় এসে সমুখ শান্তি পারাবার দেখে তার মনে পড়ে শেকড়ের কথা। শেকড়ের খোঁজে সে ফিরতে চায় স্মৃতি বিস্মৃতির পথ বেয়ে তার প্রত্ন ইতিহাসে। যে ইতিহাসচর্চা থেকে উঠে আসে প্রান্তিক জনপদের কাহিনী। সাম্প্রতিককালে যা সাবলটার্ন ইতিহাস। আর এভাবেই সমুদ্রাগামী মোহনার মানুষ ফেরে তার শেকড়ে।"
সুবর্ণরেখা নদী তীরবর্তী, উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত, কতই না জনপদ, জনজীবন আর কতশত পরিবার! এমনই এক পরিবারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা, বিবর্ধিত ও আলোড়িত হওয়া এক আশ্চর্য আখ্যান শোনাচ্ছেন সাবলটার্ন লেখক নলিনী বেরা তাঁর এই 'ছাঁচ-ভাঙা' নদীছন্দিত উপন্যাস 'সুবর্ণরেণু সুবর্নরেখা'য়।
নলিনী বেরার জন্ম পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার গোপীবল্লভপুরের নিকট বাছুরখোয়াড় গ্রামে। ছোটবেলা থেকে দারিদ্রের সাথে লড়াই করে পড়াশোনা করেছেন তিনি। তাঁর শিক্ষা সম্পন্ন হয় মেদিনীপুর কলেজে ও পরে নকশাল আন্দোলনের কারণে ঝাড়গ্রাম রাজ কলেজে। ১৯৭৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের খাদ্য ও সরবরাহ দপ্তরের আধিকারিক হিসাবে চাকরিতে ঢোকেন।
কবিতা লেখা দিয়ে তাঁর সাহিত্য জীবন শুরু। ১৯৭৯ সালে নলিনী বেরার প্রথম গল্প 'বাবার চিঠি' দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তিনি পল্লীপ্রকৃতি নিয়ে সমাজসচেতন সাহিত্যরচনায় পারদর্শী। তাঁর উপন্যাসগুলি হল শবরচরিত, কুসুমতলা, ফুলকুসমা, দুই ভুবন, চোদ্দ মাদল, ইরিনা এবং সুধন্যরা, এই এই লোকগুলো, শশধর পুরাণ ইত্যাদি। চার দশকের সাহিত্যচর্চায় অজস্র ছোটোগল্প ও উপন্যাস লিখেছেন।
২০০৮ সালে বঙ্কিম পুরস্কার পান নলিনী বেরা তাঁর শবরচরিত উপন্যাসের জন্য। সুবর্ণরেণু সুবর্ণরেখা উপন্যাসের জন্য ১৪২৫ বঙ্গাব্দের আনন্দ পুরস্কারে সম্মানিত হন তিনি। পুরস্কার হিসেবে প্রাপ্ত ১০ লক্ষ টাকা আর্থিক দিক থেকে পিছিয়ে থাকা ছাত্রা ছাত্রীদের জন্য দান করেন এই সাহিত্যিক।
'বিধি যাহা লেখি আছে কপালে, বৈশাখী পালে গো বৈশাখী পালে'
বৈশাখী পালের পালা নিয়ে এই একটাই লাইন লিখেছেন ললিন বাবু। নলিনী বেরাকে এই নামেই ডাকতেন তার পরিজন। আর তার বৈশাখী পাল মূলত একটা চর। সুবর্ণরেখায় উঠেছিল। সেই চর দখলের গল্প আছে এখানে। অনেকটা পুরাণের মতো উঠে এসেছে বৈশাখী পালের গল্প। তবে সেটা এ বইয়ের ছোট একটা অংশ কেবল।
'সুবর্ণরেণু সুবর্ণরেখা' মূলত নলিনী বেরার নিজের গল্প। প্রান্তিক মানুষের মধ্যে বড় হয়েছেন তিনি। সেই বেড়ে ওঠার সময়ের গল্পটা তিনি বলেছেন। সুবর্ণরেখার তীরে বেড়ে ওঠার সময় যা দেখেছেন, যাদের সঙ্গে বাস করেছেন তাদেরই কথা লিখেছেন। সেই সঙ্গে, বড় হতে হতে বড় বড় সাহিত্যিকদের লেখা পড়ে দেখেছেন কখনো না কখনো তা নিজের সঙ্গে মিলে যায়। নিজের উপন্যাসে সেই মিলের কথাগুলোও তুলে ধরেছেন৷ এসেছে 'পথের পাঁচালী', 'হাঁসুলি বাঁকের উপকথা' থেকে অনেক আধুনিক লেখাজোকার কথাও।
এ বইটাও অনেক দিন নজরে ছিল। কারণ একটাই। মানুষের মধ্যে থেকে উঠে আসা লেখকদের গল্পগুলো অন্যরকম হয়। নলিনী বেরার এ বইও তাই। শকুনের পালক কানে গুঁজে মানুষের ভেতরের পশুকে দেখা, ব্রাহ্মণের চাল চুরি থেকে পিসীকে খুঁজতে গিয়ে ললিনের অপু হয়ে ওঠার মধ্যে আমরা সাঁওতাল-লোধা-কামহার-কুমহারদের জীবনও জানতে পারি।
তবে বইটা কেমন যেন অসম্পূর্ণ। যে গল্প নলিনী লিখেছেন সেখানেও যেন পুরোটা ডুব দেননি তিনি। যেমনটা দিয়েছিলেন অনিল ঘড়াই তার 'অনন্ত দ্রাঘিমা'য়। ফের বড়দার বিয়েতেই কেন গল্পটা শেষ হয়ে গেল তা-ও এক প্রশ্ন। ললিনের গল্পটা আরো বড় হওয়ার কথা।
গ্রামের এক সাঁওতাল দিদির সঙ্গে সই বা স্যাঙাত পাতানোর সূত্রে পরিচয় ছিল লেখকের। রক্তাক্ত পা দেখে কিনে দিয়েছিলেন চটি আর দিয়ে এসেছিলেন টাকা। অনেকদিন পর দেখা করতে গিয়ে দেখেন পায়ের অবস্থা একই। জিজ্ঞেস করেন চটি ছিঁড়ে গেছে কিনা। শুনে “হামাগুড়ি দিয়ে ঘরে ঢুকলেন মেজ্দি। বেরিয়ে এলেন বুকে জড়িয়ে একটা বড়সড় পোঁটলা। তারপর তো পরতের পর পরত ন্যাকড়া খুলে চলেছেন — ন্যাকড়া তো নয়, মনে হচ্ছিল অনার্য ভারতবর্ষের ইতিহাসের পাতা ওল্টাচ্ছেন! অবশেষে সেই চটিজুতা, অবিকল সেই স্টিকার — “তোর দেওয়া চটিজুতা আমি কি পায়ে দিতে পারি রে?”
এরকম ঘটনা ভুরি ভুরি আছে গোটা বই জুড়ে। একই শব্দের দ্বিত্ব প্রয়োগ করে করে অদ্ভুত মরমিয়া গদ্য লেখেন নলিনী বেরা। এর আগে 'তিরিয়ো আড়বাঁশি' বলে ওনার লেখা এক ছোটদের বই পড়েছিলাম, সেখানেও এই গদ্যের বৈশিষ্ট্য চোখে পড়েছিল। বাংলায় subaltern উপন্যাসই শুধু লেখেননি, সঙ্গে জুতসই ভাবে ভাষাকেও বিনির্মাণ করে নিয়েছেন তিনি। সেখানেই বোধহয় নলিনীবাবুর সবচেয়ে বড়ো কৃতিত্ব।