::::::: বইমেলা'২০২০- যে ছিলো অন্তরালে - সুস্ময় সুমন (বাতিঘর প্রকাশনী) ::::::
বানার্ড শ বলেছেন, পৃথিবী আসলে একটা নরক, প্রাণিরা এখানে এসেছে অন্য কোনো গ্রহ থেকে। এটা একটা রাশিয়ান কৌতুকও বটে। তবে এর ভেতরে চিন্তার খোরাক আছে। যেমন আছে "যে ছিল অন্তরালে" উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্রের মধ্যে। চরিত্রগুলোর প্রহেলিকাময় জীবন এবং পৈশাচিক কার্যকলাপ কখনো আপনার শরীরের পশম খাঁড়া করে দেবে, আবার কখনো আপনি রাগে, ঘৃণায় ভাববেন, এ বইয়ের পাতায় যা কিছু ঘটছে তা অসুস্থ কোনো জগতের আলামত, খোদ নরকের অধিপতির কারসাজি। সে যেন ছিনিমিনি খেলছে উপন্যাসের চরিত্রগুলোকে নিয়ে। কিন্তু সবগুলো চরিত্রের সাথে যখন একাত্ম হয়ে উঠবেন, চমকে যাবেন, টের পাবেন, বুকের মাঝে কোথাও যেন গভীর একটা ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে, জীবনটাকে ফাঁকা আর অর্থহীন মনে হচ্ছে। কিন্তু তারপরেও বেঁচে থাকার চেষ্টা চালিয়ে যাবেন আপনি, গভীর যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে ভাববেন, প্রতিশোধ...তীব্র একটা প্রতিশোধ নিতে হবে আপনাকেও!
কয়েকদিন থেকেই অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে গৃহিণী দিলশাদের সাথে। অদ্ভুত লোক, জন্তু দেখতে পাচ্ছে সে। আতঙ্কে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে সে। কি রহস্য এসবের?
জনপ্রিয় লেখক পঁচিশ আব্দুল। লেখালেখিতে আগের জনপ্রিয়তা নেই তার। কিন্তু আবারও আগের পাঠকপ্রিয়তা চাচ্ছে সে। ফেরত পাবে কি?
নিজের মামকে উঠিয়ে এনে আশফাক অমানুষিক নির্যাতন চালাচ্ছে। কেন?
শহরজুড়ে অদ্ভুত খুনী নারীদের হত্যা করে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে ভিক্টিমের মাথা। কে এই সাইকো?
এবারের বইমেলায় প্ৰকাশীত লেখক ও নাট্যকার সুস্ময় সুমনের সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার যে ছিল অন্তরালে। উপন্যাসের শুরু থেকেই অনেকগুলো রহস্যের জাল বুনেছেন লেখক। ওপরের তিনটা বাদেও আরও রহস্য আছে বইয়ে। প্রত্যেকটা রহস্যই কোনো না কোনোভাবে ব্রুটাল। নিঃসন্দেহে দুর্বল চিত্তের মানুষদের পেটে মোচড় দেয়ার মত। বীভৎস উপায়ে খুন খারাবী, টর্চার, গালাগালি ও মাইন্ড গেমের বর্ণনা করা হয়েছে। লেখকের কলমে দারুণ বাস্তবভাবে উঠে এসেছে বর্ণনাগুলো। পুরো বইয়েই ছিল রহস্যের ছড়াছড়ি, মধ্যখানে একটু হালকাভাবে হরর ভাবও এসেছে। আমার কাছে বেশ গতিশীল মনে হয়েছে কাহিনী। মারিবার হলো তার সাধের থেকে এবার বেশি জমেছে বলেই মনে হয়েছে আমার কাছে। অনেকগুলো সাবপ্লট, শেষে এসে একসূত্রে গাঁথা হয়েছে। একেবারে শেষে লেখক অল্পের মধ্যেই গুটিয়ে নিয়েছেন রহস্যের জাল। যদিও খুব বেশি অবাক হইনি, তবুও টুইস্টটা ভালো লেগেছে। শেষ আরেকটু বিস্তারিত হলে ভালো লাগতো। বানান বেশ কিছু জায়গায় ভুল ছিল। দুয়েকটা বাক্যেও গোলমাল আছে। ত্রুটি এটুকুই। কাহিনী নিয়ে খুব বেশি কমপ্লিন নেই। বিশেষ বিশেষ ভুলে ভরা সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার নিয়ে দেখি অনেক মাতামাতি চলে। তবে মাতামাতি না হলেও বেশ অভিনব একটা সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার যে ছিল অন্তরালে। যারা সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার পছন্দ করেন তাদের জন্য রিকমেন্ডেড।
যে ছিল অন্তরালে সুস্ময় সুমন পৃষ্টা ১৯০ বাতিঘর প্রকাশনী
যে ছিলো অন্তরালে একটি পিওর ডার্ক সাইকোলজিকাল থ্রিলার। এরকম ডার্ক ও ডিস্টার্বিং বই আগে কখনো পড়া হয়নি আমার । ডার্ক সাইকোলজিকাল থ্রিলার হিসেবে প্লটটা বেশ ভালো বলব। শুরুতেই রহস্যের জালে পাঠককে আঁটকে রাখতে পেরেছেন লেখক। অনেকগুলো খন্ড খন্ড ঘটনা আর চরিত্র নিয়ে সুন্দর একটা গতিতে গল্প এগিয়ে গেছে।
সুস্ময় সুমনের দুটো বই পড়লাম এই নিয়ে। উনার বর্ণনাভঙ্গী বেশ ঝরঝরে আর সাবলীল, পড়ার সময় কোথাও আঁটকে যেতে হয় না । বিশেষ করে গোর কন্টেন্টগুলোর বর্ণনায় লেখক দারুণ মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন। বলে নেয়া ভালো বইতে প্রচুর গোর, ডিস্টার্বিং ও এডাল্ট কন্টেন্ট আছে। বেশ কিছু বর্ণনা পড়ে গা গুলিয়ে উঠছিল এবং মাঝে বিরতি নিয়ে নিয়ে পড়ছিলাম 😬। তবে এই ব্যাপারগুলো অতিরিক্ত মনে হয়নি কারণ কাহিনীটাই আসলে এরকম। যারা এসব কন্টেন্ট নিতে পারেন না তাদের বইটা একদমই ভালো লাগবে না এবং আমার মতে তাদের না পড়াই শ্রেয়।
আগেই বলেছি ১৯০ পৃষ্ঠার বইতে অনেক চরিত্রের আবির্ভাব ঘটেছে। আমার মতে সব চরিত্রই যার যার জায়গায় ঠিকঠাক ফোকাস পেয়েছে। চরিত্রগুলোর ব্যাপারে আমার অনুভূতি ব্যক্ত করতে বইয়ের ব্যাক কভারের এই কথাটি তুলে দিলাম - "চরিত্রগুলোর প্রহেলিকাময় জীবন এবং পৈশাচিক কার্যকলাপ কখনো আপনার শরীরের পশম খাঁড়া করে দেবে, আবার কখনো আপনি রাগে, ঘৃণায় ভাববেন, এ বইয়ের পাতায় যা কিছু ঘটছে তা অসুস্থ কোনো জগতের আলামত, খোদ নরকের অধিপতির কারসাজি।"
যে ছিলো অন্তরালে বইয়ের সমাপ্তি আমার মোটামুটি লেগেছে। সবগুলো ঘটনা এক সুতোয় এসে মিশলেও কিছু চরিত্রের পরিণতি ব্যক্তিগতভাবে খুব একটা ভালো লাগেনি।
বইয়ে টুকটাক প্রিন্টিং মিস্টেক ও বানান ভুল ছিল। ডিলানের প্রচ্ছদটা মোটামুটি ভালো লেগেছে। তবে রিয়াদ মাহমুদের করা লেটারিংটা চমৎকার।
সর্বোপরি, যে ছিল অন্তরালে একটু ভিন্ন ধারার ও উপভোগ্য একটি ডার্ক সাইকোলজিকাল থ্রিলার। যাদের গোর ও ভায়োলেন্ট কন্টেন্টে সমস্যা নেই তাদের রেকমেন্ড করব।
যে ছিলো অন্তরালে সুস্ময় সুমন প্রকাশনীঃ বাতিঘর প্রকাশকালঃ ২০২০ গায়ের দামঃ ২২০
এ এক অদ্ভুত রহস্য! গল্পে উঠে এসেছে বেশ কিছু চরিত্র, যেসব চরিত্র তুলে এনেছে পেছনের অন্ধকার রাজ্যের, আবার কেউ কেউ চোখের সামনে ঠেসে ধরেছে সমাজের লুকিয়ে থাকা চরম সত্যগুলো। দিলশাদ, হুট করেই টের পায় তার কেউ পিছু নিয়েছে। রাস্তাঘাটে, বাসাবাড়ি সব জায়গায়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এই পিছু নেয়া রহস্যজনক লোকটাকে দিলশাদ ছাড়া আর কেউ দেখতে পারেনা। তাহলে? সে কি পাগল হয়ে যাচ্ছে? খুব দ্রুত? দিলশাদের স্বামী হাসিব ব্যাপারটা ঠাওর করতে পারলেও ধরতে পারেনি তার স্ত্রীর হুট করে এমন পালটে যাওয়ার ব্যাপারটা। কি এমন ঘটছে দিলশাদের সাথে যার কারণে মেয়েটা এমন গুটিয়ে যাচ্ছে? হুট করেই খুন হয়ে গেলো নুরু নামের এক বিরিয়ানী দোকানদারের বৃদ্ধা মা! যেমন তেমন খুন না, গলা কেটে খুন। পুলিশি তদন্তে যদিও সে মহিলার গলার হদিস আর পাওয়া যায়নি। এমন এক হত্যাকাণ্ডে বৃদ্ধার ছেলে আর ছেলের বউ শাপলার জবানবন্দিতেও বের হয়নি কিছুই। ঠিক তখুনি একই ধাঁচের খুন হলো শহরের এক টিনেজ মেয়ে। সেইম কেইস, গলা কেটে খুনি গলা নিয়েই পালিয়েছে। এমন এক অদ্ভুত হত্যাকাণ্ডে পুলিশ কর্মকর্তা খায়রুল যেনো চোখেমুখে অন্ধকার দেখতে লাগলো। গল্পে আরেকটি চরিত্র হচ্ছে আশফাক! বিভৎস প্রতিশোধ নেয়ার নেশায় রক্ত তাজা হয়ে উঠেছিলো যেনো তার। কি এমন হয়েছিলো যে তার নিজের আপন মামাকে বিভৎস কায়দায় ঘরে ফেলে বন্দি করে তার সাথে অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হয় আশফাকের মামা? খুন কিংবা এইসব ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা বেশ কিছু চরিত্র নিয়ে বেড়ে উঠেছে এই প্লট। অসম্ভব সাইকো রোগে ভোগা কিছু চরিত্রের গা ঘিনঘিন করা বর্ণনা শুনে যে কেউই ঘেন্নায় গল্পের শেষটা দেখতে চাইবে। এ গল্পের পরিণতি কি? খুন, রহস্য, এতো এতো মাথাচারা দিয়ে উঠা চরিত্রের শেষ আশ্রয় কি হবে?
যারা ডিপ কিছু নিতে পারেন না তারা চাইলে এড়িয়ে যেতে পারেন। অন্তত আমার মনে হয় এটা নেয়ার মতো যথেষ্ট মেন্টালি স্ট্রং থাকা দরকার। বিভৎস বর্ণনাগুলো পড়ার সময় প্রায়ই মনে হয়েছে ঘটনাগুলো চোখের সামনে ঘটলে নির্ঘাত চরিত্রগুলো ভয়ংকর হতো। অসাধারণ শব্দের গাঁথুনি পুরো গল্পকে টেনে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। কোথাও কোন মেদ নেই, অযথা টেনে নেয়ার বালাই নেই। থ্রিলার প্রিয় পাঠক পড়তে চাইলে অবশ্যই পড়ে দেখতে পারেন।
সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ 'যে ছিলো অন্তরালে' আমার মতো যেকোনো আমপাঠকদের জন্য নয়, ইহা উক্ত পাঠকসাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক!
২০২০ সালে প্রকাশ হওয়া লেখক ও নাট্যকার সুস্ময় সুমনের লেখা ডার্ক (সাইকোলজিক্যাল) থ্রিলার পড়া শেষ করলাম কিছুক্ষণ আগে। খুবই অস্বস্তিকর/ডিস্টার্বিং অনূভুতি নিয়ে পাঠপ্রতিক্রিয়া লিখতে চেষ্টা করছি। (বেশ কয়েকবার 'অস্বস্তিকর' শব্দটা আসতে পারে, আগেই দুঃখিত! 🙄)
আমি সাধারণত সর্বভূক পাঠক। কঠিন, কর্কশ, নৃশংসতা আমাকে ছোঁয় না সাধারণত। তবে এই বইটার ব্যাপার ভিন্ন। অত্যন্ত অস্বস্তি নিয়ে বইটা শেষ করেছি। বিশেষ করে ১০০ পৃষ্ঠা যেতে না যেতেই আমি প্রমাদ গুনতে শুরু করেছি, শেষ হয়না কেন?! বইটায় লেখক ফোর্থ ওয়াল ব্রেক করার চেষ্টা করেছেন। মানুষ্য চিন্তার নৃশংসতম স্তর কেমন হতে পারে সেটা কল্পনা করে মেটাফোরিক্যালি প্রয়োগের চেষ্টা করেছেন। প্রচুর ট্রিগারিং বিষয় আসয় আছে এখানে যে কারণে শুরুতেই সতর্কতা সাইনবোর্ড মেরে দিয়েছি। এখানে গল্প মূলতঃ ৪টা, প্যারালালি চলেছে। বেশ কিছু ক্যারেক্টার ছিলো এখানে। বইয়ের কাহিনীর জন্য এত ক্যারেক্টার কি আদতে দরকার ছিল কিনা বলতে পারছিনা। বইটায় দিলশাদ, লেখক শেখ পঁচিশ আবদুল আর আশফাকের চরিত্র তিনটা প্রথমদিকে ইন্টারেস্টিং লাগছিলো বেশ। মেজর কাহিনী এদের ঘিরেই ধারণা করছিলাম আমি। তো, blood, violence, gore কত প্রকার সেটা পড়তে পড়তে যখন পেটে মোচড় দিচ্ছে, তখন আমার একটাই এক্সপেকটেশন ছিলো যাতে শেষটা একটা দারুণ ফিনিশিং পাই। দুঃখের ব্যাপার আমার মনে হয় বইটার সবচেয়ে বাজে দিক হলো ফিনিশিংটাই!! লেখকের সহজ সুন্দর লেখনি আর বুদ্ধিদীপ্ত গেইমপ্লে থেকে এরকম ফিনিশিং পাওয়াটা হতাশাজনক। আর আমি দুঃখিত আবার টেনে আনার জন্য, তবুও না বলে পারছিনা যে এখানে অতিশয় নোংরা ভাষা, নোংরা বর্ণণা, আর ভায়োলেন্স এর ব্যবহার ছাড়াও পরিমিত ব্যবহার করেই আমার মনে হয় একটা সুন্দর বই লিখা যেতো।
কিছুটা হতাশাগ্রস্থ, কিছুটা ডিস্টার্বড হয়ে শেষ করলাম। আগামী কিছুদিন থ্রিলার হয়তো পড়বোনা। নার্ভ টেস্ট করতে চাইলে পড়ে দেখতে পারেন।
ধরুন, হুট করেই সমাজে ধর্ষণের বিরুদ্ধে আরোপিত সকল নিষেধাজ্ঞা তুলে দেয়া হলো। অর্থাৎ, আপনি ইচ্ছেমত ধর্ষণ করতে পারবেন, তথাপি কেউ কোনো ভ্রুক্ষেপ করবে না। এই পরিস্থিতিতে চারদিকে হাহাকার, বিশৃঙ্খলা এবং পৈশাচিকতা বাড়বে বটে, তবে পাশাপাশি একটা অদ্ভুত দৃশ্যের সম্মুখীন হবেন আপনি। দেখতে পারবেন, যাদেরকে আপনি মহান মানুষ ভাবতেন, যারা আজীবন নৈতিকতা ও সভ্যতার বুলি আওড়াতো, তাদের অনেকেই বন্দিশালা থেকে মুক্ত হয়ে পশুত্ব প্রদর্শন করবে। কোনোরূপ বাধাবিপত্তি না থাকায় হিংস্র পশুর মত ঝাপিয়ে পড়বে নারীদেহের উপরে, হৃদয়ের গহীনে সুপ্ত থাকা অন্ধকার দিকটা লাগামছাড়া হয়ে যাবে। মানবমনের এই অন্ধকার দিককে নিয়েই "যে ছিলো অন্তরালে", যেখানে সুশীল সমাজের বাহ্যিক চাকচিক্যের বিন্দুমাত্র দেখা পাবেন না। বরং সভ্য মানুষের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অন্ধকারতম পশুত্বের দেখা পাবেন, যে হিংস্র সত্তা বর্বরতা, ধ্বংস ও অনৈতিকতার উৎকৃষ্ট অনুসারী। দেখা পাবেন এক গৃহিনীর, যার সাথে ক্রমশ ঘটছে অদ্ভুতুড়ে কার্যকালাপ। দেখা পাবেন এক হিংস্র স্বামীর, যে স্ত্রীকে প্রহারেই খুঁজে পায় আত্মতুষ্টি। দেখা পাবেন প্রতিশোধের অনলে বর্বরতার চূড়ান্তে পৌঁছানো ভাগ্নের। দেখা পাবেন জোড়াকয়েক লোলুপ দৃষ্টি, কামনা আর প্রতিপত্তিই যাদের মুখ্য বিষয়। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বইটা পুরো জমজমাট ছিল। অনেক সাবপ্লটের মিশেলে সুন্দর সমাপ্তি টেনেছেন লেখক। লেখনশৈলী আর শব্দচয়ন প্রশংসার দাবিদার। চরিত্রগুলোর মনস্তাত্ত্বকে স্পষ্টত ফুটিয়ে তুলতে অনেক গালিগালাজ, ভায়োলেন্স এবং এডাল্ট বিষয়ের ব্যবহারে কার্পন্য করেননি লেখক, তাই যারা এসব দেখলে নাক কুঁচকায় তাদের জন্যে গল্পটা নয়।গল্পটা পড়ে মানুষদের নিয়ে নতুন করে ভাবতে শিখেছি, আদতে আমাদের সকলের মাঝেই আছে এমন ডার্ক সাইড। সবাই নিজেদের আলাদা খোলসে রাখতে ভালোবাসে।
নিসন্দেহে মারাত্মক প্লটবিশিষ্ট ডার্ক সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার এটি। ব্যক্তিগতভাবে বেশ লেগেছে। বইটার নাম কেন " যে ছিলো অন্তরালে" তা শেষদিকে বুঝতে পেরে রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম। এক কথায়- অনবদ্য! সুস্ময় সুমনকে ধন্যবাদ এত সুন্দর একটা গল্প উপহার দেয়ার জন্যে, নিশ্চয়ই বইটা আপনাকে চিন্তার খোরাক যোগাবে। ক্রুর বাস্তবতা আর মানবমনের অন্ধকার দিক নিয়ে ভাববার জন্যে হলেও বইটা পড়া উচিত সকলের।
"If we don't tell weird stories, when something weird happens we won't believe it. - Shannon Hale - যে ছিলো অন্তরালে - দিলশাদ, টিপিক্যাল এক গৃহিনী। স্বামী হাসিবকে নিয়ে মোটামুটি ঝঞ্ঝাবিহীন এক সংসার। কিন্তু হঠাৎ অদ্ভুত মানুষজন এবং প্রাণী দেখা শুরু করে সে। তার এই কেসে জড়িয়ে পড়ে তাদের বিল্ডিং এ থাকা টিয়া এবং তার মা নাজনীন। - শাপলা, স্থানীয় বিরিয়ানি বিক্রেতা নুরু এর স্ত্রী। যদিও ছোটবেলা থেকেই তার জীবনে শান্তি বলতেই নেই, কিন্তু এক অভাবনীয় ঘটনা তার জীবনে অশান্তি বাড়িয়ে দেয়। এই কেসের সাথে জড়িয়ে যায় খাদেম, বাহার উদ্দিন এবং তার নাতনী সুমাইরা। - শেখ পঁচিশ আব্দুল, বিশিষ্ট রহস্যপন্যাসিক। কাজ করছেন তার নতুন উপন্যাস "ঘোর" নিয়ে। কিন্তু এ কারণে তার ব্যক্তিগত জীবনে শুরু হয় নানা ধরনের অশান্তি। - এখন দিলশাদ কেন এরকম অদ্ভুত প্রাণী দেখছে? শাপলার জীবনের সেই অভূতপূর্ণ ঘটনা কি ? শেখ পঁচিশ আব্দুলের "ঘোর" উপন্যাসটি আসলে কি নিয়ে ? তা জানতে হলে পড়তে হবে লেখক সুস্ময় সুমনের ডার্ক সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার "যে ছিলো অন্তরালে"। - "যে ছিলো অন্তরালে" মূলত একটি ডার্ক সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার। গল্পের প্লট বেশ রহস্যময়। সামনে কি হবে তা গেস করা কঠিন। তবে বইতে সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটি আছে তা হলো ভায়োলেন্ট এবং গোর কন্টেন্ট। তাই প্রাপ্তবয়স্ক এবং প্রাপ্তমনস্কদেরই বইটি পড়া বেশি ভালো। - "যে ছিলো অন্তরালে" বই���়ের চরিত্র কাহিনীর তুলনায় অতিরিক্ত মনে হয়েছে। বেশিরভাগ চরিত্রের জেনেরিক পরিণতি ভালো লাগেনি। বইয়ের লেখনী অবশ্য ভালো এবং সোজাসাপ্টা, গোর কন্টেন্ট নিতে পারলে পাঠকদের তা ভালো লাগতে পারে। - "যে ছিলো অন্তরালে" বইয়ের প্রডাকশন মোটামুটি ভালোই। প্রিন্টিং মিস্টেক এবং বানান ভুল অবশ্য কিছু ছিল।বইয়ের প্রচ্ছদ এবং নাম ভালো লেগেছে। যারা প্রচুর ভায়োলেন্ট এবং গোর ক্রাইম কিংবা সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার পড়তে পছন্দ করেন তারা বইটি পড়তে পারেন।
কাহিনি সংক্ষেপঃ দিলশাদ ইদানীং অজানা এক আতঙ্কে আতঙ্কিত হয়ে থাকে সারাক্ষণ। হঠাৎ হঠাৎ বীভৎস কিছু অবয়বকে সে তার আশেপাশে দেখতে পায়, যারা তার অনিষ্ট করার চেষ্টা করে। ভয়ের ব্যাপার এই যে, অবয়বগুলোকে দিলশাদ ছাড়া আর কেউ দেখতে পায়না। স্বামী হাসিবকে সে পাগলের মতো ভালোবাসে। কিন্তু তাকেও সে কোনকিছুই বলতে পারেনা। সমস্যা দিনকেদিন বাড়তেই থাকে। তবে কি দিলশাদ পাগল হয়ে যাচ্ছে? কি থেকে কি হচ্ছে, কিছুই মাথায় ঢোকেনা তার।
শাপলা মেয়েটা জনমদুখিনী। স্বামী নুরু মিয়া ও বৃদ্ধা শাশুড়ী ছমিরনের অত্যাচার তার নিত্যসঙ্গী। সকাল থেকেই শাশুড়ীর কুৎসিত কথাবার্তা আর স্বামীর লাথি-ঝাঁটা খেতে খেতে শুরু হয় শাপলার দিন। নুরু মিয়ার কাচ্চির হোটেলের ব্যবসা। নুরু মিয়া বিশ্বাস করে শাপলাকে পিটিয়ে দোকানে গেলে তার ব্যবসা ভালো যাবে। আর তাই বউ পেটানোতে তার কোন ক্লান্তি নেই। এসবের শেষ কোথায়, জানেনা শাপলা।
আশফাক আর ফারিয়া দম্পতি একে অপরকে খুব ভালোবাসে৷ গ্রাম থেকে আশফাকের বৃদ্ধ মামা ইয়াসির কবির ঢাকায় আসলেন ভাগ্নের বাসায় বেড়াতে। আর এসেই পড়লেন বিপদে। ভাগ্নে আশফাক আর ভাগ্নে-বউ ফারিয়া বন্দি করে ফেললো মামাকে৷ অকথ্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতে লাগলো বৃদ্ধ লোকটার ওপর৷ কেন? কিসের প্রতিশোধ নিচ্ছে এই সাইকোপ্যাথ দম্পতি?
একসময়ের বিখ্যাত থ্রিলার ঔপন্যাসিক শেখ পঁচিশ আবদুলের লেখা পাঠক ইদানীং খায়টায় না। পঁচিশের প্রকাশক এবরাহিম কাকা বারবার তাকে তাগাদা দিচ্ছেন নতুন থ্রিলারের জন্য। পঁচিশ লিখছেও। আর সেই সাথে তার পুরোনো টেকনিকটা খাটাচ্ছে। টেকনিকটা হলো, কোন চরিত্র যখনই শক্তিশালী হয়ে উঠবে তাকে মেরে ফেলা। 'ঘোর' নামের উপন্যাসটা লিখতে গিয়ে যেন সত্যিই একটা ঘোরের জগতে বসবাস শুরু করলো শেখ পঁচিশ আবদুল। স্ত্রী সুমি আর একমাত্র সন্তান সামিকেও ত্যাগ করলো সে। সুতোটা কি আসলেই তার হাতে আছে?
এক দরিদ্র ও অসুস্থ বৃদ্ধাকে কে যেন জবাই করে খুন করলো। শুধু তাই না, ধরটা ফেলে রেখে খুনি গায়েব করে দিলো মাথাটা। কিছুদিন পর আরো একটা খুন হলো। এবারো মাথা গায়েব। কে করছে এসব? খাদেম নামের লোকটা যাবতীয় সম্ভব-অসম্ভব জিনিস যোগাড়ের জাদুকর। সে গায়েব কেন? মাসুম রহমান টিয়া ছেলেটার মাথায় সারাক্ষণ কি চলতে থাকে? প্রবল ক্ষমতাধর বাবার ছায়ায় থাকা একজন মানুষ নিজের পৈশাচিক চাহিদা মেটাতে আর কতো নিচে নামবে?
গল্পগুলো আলাদা আলাদা, তাইনা? কিন্তু সবগুলো গল্পই যখন একই জংশনে এসে মিলে যায়, তখন একইসাথে সবগুলোকে আলাদা লাগে আবার একীভূত হয়েছে বলেও মনে হয়। 'যে ছিলো অন্তরালে' এমনই এক অন্ধকার জগতের কাহিনি। যার জন্ম মানুষের অন্ধকার মনোজগতে।
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ সুলেখক সুস্ময় সুমনের স্নায়ুতে ঝড় তোলা ডার্ক সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার 'যে ছিলো অন্তরালে'। মানুষের মনের ভেতরের ভয়ঙ্কর অন্ধকার দিকগুলোই মূল উপজীব্য এই উপন্যাসের। বেশ কয়েকটা আলাদা আলাদা অন্ধকারের গল্পকে একইসাথে এগিয়ে নিয়ে গেছেন সুস্ময় সুমন। তারপর সবগুলো গল্পকেই একটা বিন্দুতে এনে মিলাতে চেষ্টা করেছেন। গা শিউড়ে ওঠার মতো অসংখ্য সিকোয়েন্স ক্রিয়েট করা হয়েছে এই বইয়ে। মানুষের ভেতরের চিরাচরিত অন্ধকার প্রবৃত্তি যেমন রাগ, ক্ষোভ, ঈর্ষা, প্রতিশোধপরায়ণতা যেমন এখানে এসেছে তেমনি দেখা পেয়েছি বীভৎস মানসিক বিকৃতিরও।
বইটা পড়তে গিয়ে একটা পর্যায়ে মনে হচ্ছিলো এতোটাও ডিস্টার্বিং হতে পারে বর্ণনা! প্রায় প্রত্যেকটা চরিত্রেরই ভালো দিকগুলোকে ছাপিয়ে গিয়ে সুস্ময় সুমন তাঁর পাঠকদের সামনে তুলে ধরেছেন তাদের চরিত্রের সবচেয়ে অন্ধকারতম দিকগুলো। প্রায় সব চরিত্রের ভেতরের বিকৃতিগুলো দেখতে দেখতে নিজেকেই অসুস্থ মনে হচ্ছিলো আমার। এই কারণেই বোধহয় কিছুটা বিরতি দিয়ে দিয়ে বইটা শেষ করতে হয়েছে আমাকে। প্রচুর পরিমাণে ডার্ক ও এক্সট্রিম অ্যাডাল্ট সিকোয়েন্স ছিলো, যেসব এই কাহিনির জন্য প্রয়োজনী মনে হয়েছে আমার কাছে।
'যে ছিলো অন্তরালে' বইটাকে পিওর ডার্ক সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার ঘরানায় ফেলা গেলেও এটার এন্ডিং আমার পছন্দ হয়নি৷ শেষ দিকে কিছুটা তাড়াহুড়ার আভাস পেয়েছি আমি। যদিও এটা আমার একান্তই ব্যক্তিগত অভিমত। বেশ কিছু ভুল বানান আর টাইপিং মিসটেক ছিলো। আর এই উপন্যাসটা পড়ার পরেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি পারতপক্ষে আপাতত কিছুদিন থ্রিলারের আশেপাশে ভিড়বোনা। আবারো কিছু জীবনমুখী বইপত্র পড়া দরকার।
রিয়াদ মাহমুদের লেটারিংয়ে ডিলান সাহেবের করা প্রচ্ছদটা ভালো লেগেছে। বাতিঘরের ইদানীংকালের বইগুলোর কাগজের মানের বেশ উন্নতি ঘটেছে দেখলাম। তবে বাঁধাই আগের মতোই আছে। এটার আরো একটু উন্নতি সাধন দরকার।
কাহিনী সংক্ষেপঃ দিলশাদ- এক আকস্মিক ভয় আর দুঃস্বপ্ন ওকে তাড়া করতেছে। ওর মনে হয় কেউ ওকে অনুসরন করছে, রাস্তা থেকে ওর বাসার বারান্দার দিকে তাকিয়ে থাকে। একেকদিন একেকজন। কিন্তু দিল��াদ ছাড়া কেউ তাদের দেখেনা। পাগলাগারদ পাঠানর ভয়ে হাসব্যান্ড হাসিব কেও ও বিষয়টা খুলে বলতে পারছে না। কেন? কি কারন?
নুরু মিয়াঃ বস্তির কাচ্চি দোকানদার। যে মনে করে সে যেদিন বৌকে পিটায় সেদিন তার দোকানে বিক্রি ভাল হয়। আর বৌকে অত্যাচার করে সে পৈশাচিক আনন্দ লাভ করে।
শাপলাঃ নুরুর বৌ। যে নিরবে শাশুড়ি আর জামাই এর অত্যাচার সহ্য করে যাচ্ছে। কেন?
ছরিমন বুড়ী- যে ছেলে নুরু কে ছেলেবৌ সাপলার নামে কান ভারি করে বিকৃত মজা পায়।
খাদেমঃ শাপলাকে ভালবাসে। যার প্রতিজ্ঞা একদিন সে নুরু মিয়া আর তার মাকে কঠিন শাস্তি দিবে তারপর শাপলাকে বিয়ে করবে।
শেখ পঁচিশ আব্দুলঃ স্বনামধন্য রহস্য ঔপন্নাসিক। যার খারাপ বেবহারের জন্য বৌ বাচ্চাকে নিয়ে চলে গেছে। কিন্তু তার কোন বিকার নাই। সে তার ভুবনে মত্ত। আসলে কি সে সুস্থ না সাইকো? আর কে সে ছায়ামানব যার সাথে সে কথা বলে?
আশফাক- কেন সে নিজ মামাকে আটকিয়ে রেখে নিকৃষ্টতম শাস্তি দিচ্ছে? সে কি মানসিকভাবে অসুস্থ নাকি এর পিছনে আছে কোন অতীত ইতিহাস?
ফারিয়া- আশফাকের স্ত্রী। বিনা দ্বিধায় স্বামীর সব কথা মেনে চলে। অন্ধ বিশ্বাস আর ভালবাসা স্বামীর প্রতি। স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে স্বামীকে সাহায্যকরতেছে মামাকে অত্যাচার করায়। সেও কি সাইকো?
মাসুম রাহমান টিয়াঃ বয়স ১৯। বাবা নাই। থাকে মা নাজনিন রহমানের সাথে দিলশাদদের উপরের ফ্ল্যাটে। টিয়া ছেলে হলেও ওর চালচলন মেয়েলী। আর তাই নিয়ে বন্ধুরা খেপায় ওকে। এগুলা নিয়ে টিয়া হীনমন্যতায় ভোগে। এদিকে দিলশাদ যে কন সমস্যায় আছে ছেলেটা বুঝতে পারে।
সুমায়রা- বাহার সাহেবের নাতনি। তারা থাকে আশফাকের পাশের ফ্ল্যাটে। একদিন নুরুর দকানে সুমায়রা আর বাহার সাহেব আসলে নুরুর বদনজর পরে সুমায়রার উপর। সুমায়রা কি তা বুঝতে পারে?
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ মানব মনের অন্ধকার গহীন যাত্রায় আপনাকে সাগতম। দুর্দান্ত একটা বই। শেষ পর্যন্ত কে ভাল, কে খারাপ বোঝাই যায়নি। প্রতিটি চরিত্রের পৈশাচিকতা শেষ না করা পর্যন্ত ধরা যাবেনা। আর শেষের টুইস্ট?? তব্দা খেয়ে যাবেন আর ভাববেন কি হল!!
কার কাছে কেমন লাগসে বইটা বলতে পারব নাহ তবে আমার কাছে এখন পরজন্ত সুস্ময় সুমনের সেরা কাজ এই বইটি, প্রচন্ড রকমের ডার্ক,গোরি আর ডিস্টারবিং,যারা এই এলিমেন্ট গুলা পছন্দ করেন পড়তে পারেন আশাহত হবেন নাহ।।।
লেখকের গদ্য খুব সাবলীল।মনস্তাত্বিক বিষয়গুলো উপভোগ্য ছিল।তবে এতগুলো চরিত্রের বোধহয় দরকার ছিল না। যে পরিণাম অবশেষে এসেছে, তারজন্য এতগুলো চরিত্রকে খানিকটা বাহুল্য লেগেছে বৈকি। লেখকের পড়া সব বইয়ের মধ্যে এটাকেই আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে।