কিছু ব্যাপার আমরা আমাদের প্রচলিত ইতিহাসে পড়ে এসেছি, কিছু জিনিস ইতিহাসের পাতায় সেভাবে আসেনি, একেবারেই আসেনি তা নয়, তবে হয়তো প্রচলিত ইতিহাসে সেভাবে স্থান পায় নি। শ্রীপান্থ তার এই বইয়ে প্রচলিত ইতিহাসের বাইরে ইতিহাসে আপাত উপেক্ষিত সেইসব ঘটনা তুলে আনতে চেয়েছেন। তাই বলে ব্যাপারগুলো কল্পনা যে এমনও না, হয়তো বেশিরভাগ মানুষই তার খবর রাখে না, এটাই হলো কথা। কালের স্রোতে গুরুত্বহীন হয়ে যাওয়া এমন কিছু ঘটনাই তুলে এনেছেন শ্রীপান্থ। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী বা তৎপরবর্তী বৃটিশ সাম্রাজ্যের সরাসরি শাসন আমলের মূলত ভারতীয় উপমহাদেশের এমন কিছু টুকরো ঘটনাই এই বইয়ের আলোচ্য। অবশ্য ঘটনা প্রবাহে মাঝে মাঝে এসে গেছে অন্য সময় বা অন্য স্থানের কথাও, কুইনাইন এর কথা ম্যালেরিয়া যে মশাবাহীত রোগ এই তথ্য প্রথম কবে জানা গেল, জাহাজ শিল্পে পরিবর্তন এর কথা কিংবা কেমন করে সুয়েজ খাল হলো এ বিষয়গুলো সরাসরি এই উপমহাদেশের সাথে সম্পর্কিত না হলেও এখানে ইউরোপীয় শাসনের সাথে তার গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ তো আছেই।
শ্রীপান্থ শুরু করেছেন সাদা চামড়ার দেশী স্বাধীন শাসকদের নিয়ে। এক ছিলেন এমন শাসক স্কিনার সাহেব, মা রাজপুত, বাবা ইংরেজ। অ্যাংলো ইন্ডিয়ান এই স্কিনার রীতিমতো এক স্বাধীন রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন, পরিচিত হয়েছিলেন সিকান্দার নামে। নিজের এমন রাজ্য আরও কয়েকজন ইউরোপীয়ও গড়ে তুলেছিলেন যদিও কোনটিই বেশিদিন টেকেনি, নিজের টাকশাল পর্যন্ত বসিয়েছিলেন একজন। সাদা চামড়ার এসব সুলতান বা রাজার রোমাঞ্চকর কাহিনী আজ আমরা কজনেই বা জানি। জানিনা নাবব শব্দটিও, নবাব নয় কিন্তু। নবাব হলেন বাদশাহের অধীনে কোন একটি প্রদেশের শাসক, স্বাধীন শাসক নন যদিও তবে এদের অনেকেই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন কালে কালে। নাবব হলেন ভারতবাসী সাদা চামড়ার লোক যারা নবাবদের মতোই বিলাসে আর অপচয়ে, অপরিনামদর্শিতায় ডুবে গিয়েছিলেন। এমন বেশ কয়েকজন অপরিনামদর্শী নাববদের কথাও শ্রীপান্থ তুলে এনেছেন, এনেছেন সেকালের বিখ্যাত সব বাইজীদের কথা, সেকালের ধনী ব্যক্তিদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত জলসা বা পার্টির কথা যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপীয় শাসকদের মনোরঞ্জন করা।
এসেছে অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের কথা, তাদের গৌরবের ইতিহাস, দুঃখ দূর্দশার কথাও। এদেশের মানুষ এককালে কিভাবে সাহেব ধরে এক পুরুষে বলতে গেলে রাতারাতি বড়লোক হয়ে গেল সেই কথাও। সেই সময়ের দুটো রোমাঞ্চকর প্রেম কাহিনীও বর্ণনা করেছেন তিনি যার একটির পটভূমি ভারতীয় উপমহাদেশ, অন্যটিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে রয়েছে এই উপমহাদেশ । যদিও ভারতীয় উপমহাদেশের পটভূমিতে সংঘটিত কাহিনীটিতে ইংরেজ নারীর ভারতীয় প্রেমিকটির বিস্তারিত পরিচয় লেখক দিলেন না কেন বা পেলেন না কেন সেটা বুঝলাম না। এদেশীদের পোশাকের যে পরিবর্তন শাসকদের পরিবর্তনের সাথে সাথে হয়েছে তার যে ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছিল সেই ব্যাপারটিও তুলে এনেছেন তিনি, এনেছেন এই উপমহাদেশের রসনা কারি কিভাবে বৃটেন জয় করলো সে কাহিনী ও, তাছাড়া এদেশীয়দের সাহেব সাজার বা সাহেব হবার বাসনার কথাও এসেছে। যদিও অনেক ক্ষেত্রে শ্রীপান্থ লেখা অনর্থক দীর্ঘায়িত করেছেন বলে মনে হয়েছে। তাছাড়া সালের উল্লেখে মাঝেমাঝেই গোলমাল হয়েছে বলে মনে হয়েছে, যদিও ইতিহাস নিয়ে লেখা বই, অসংখ্য সন তারিখের উল্লেখে ভুল কিছু হতেই পারে, তবুও এতগুলো সংস্করন হয়ে যাবার পর সে ব্যাপারে আরও সংশোধন কাম্য।