বাংলাদেশে সাহিত্য সাংবাদিকতার জগতে প্রবীণ ও শীর্ষস্থানীয় যাঁরা এখনও ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে বর্তমান অবক্ষয়গ্রস্থ জাতিকে উজ্জীবিত করতে নিরলস সাধনা করে যাচ্ছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় গুরুজন- মাওলানা মুহিউদ্দীন খান। তিনি শুধু মাত্র একজন আলেম হিসেবেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি বরং ধর্মীয় সাহিত্য, সাংবাদিকতা রাজনৈতিক নেতৃত্ব বা রাজপথের সংগ্রামী আন্দোলন, সামাজিক নেতৃত্ব , একজন ব্যবসায়ী, সমাজসেবক, আন্তর্জাতিক সংগঠক ইত্যাদি বহুবিধ কর্মকাণ্ডের সাথেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন তিনি। বাংলা ভাষায় সীরাত চর্চা প্রবর্তন, কোরআনের বৃহত্তম ও সর্বাধুনিক একখানা তফসীর গ্রন্থের অনুবাদ, ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহের দুষ্প্রাপ্য ও উচ্চাঙ্গের কিতাবাদী সহজ সরল প্রাঞ্জল ভাষায় সকলের বোধগম্য করে প্রকাশের অনন্য নজীরও স্থাপন করেছেন তিনি। তাই তাঁর লেখা পাঠের অদম্য আগ্রহ নিয়ে দেশে বিদেশে অপেক্ষমান থাকেন তাঁর লক্ষ লক্ষ ভক্ত পাঠকবৃন্দ।তাঁর সম্পাদিত বাংলাভাষায় দুই বাংলায় সর্বাধিক প্রচারিত সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা মাসিক মদীনও স্বদেশ ও বিশ্বে ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা লাভ করেছে। এ কারণে মওলানা মুহিউদ্দীন খান সম্পর্কে বিশদভাবে জানার আগ্রহ তাঁর অগণিত ভক্ত কুলের। ব্যক্তিগত নানা প্রশ্ন ও তাগিদের ফলেই তিনি এ গ্রন্থে নিজের শৈশব থেকে শুরু করে ক্রমান্বয়ে জীবনের মধ্যাহ্নকাল পর্যন্ত নিজের জীবন ও অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ও আবেগময় ভাষায়।
বৃটিশ-পাকিস্তান ও বাংলাদেশ ঘটনাবহুল ও ঐতিহাসিক এ সময়কে চাক্ষুষ করেছেন তিনি। নিজের এ বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতারই ফসল-জীবনের খেলাঘরে। একটি ছোট্র শিশুর বেড়ে ওঠা, কৈশোররের সূচনায় সবচেয়ে বড় আশ্রয় মমাকে হারানোর বেদনা, বৃটিশ শাসনে মুসলমানদের প্রতি শোষণ ও বঞ্চনা, সে সময়ের নেতৃ পুরুষদের সংগ্রামী জীবন ও কর্ম এসবই আলোড়িত করেছেন তাঁকে। তাঁর এ বই তাই কিশোর, তরুণ, যুবক, বৃদ্ধ সবাইকে নাড়া দেবে, অনুপ্রাণীত করবে সমভাবে।
ইতোপূর্বে সাপ্তাহিক মুসলিম-জাহানে ধারাবাহিকভাবে ‘জীবনের খেলাঘরে’ প্রকাশের পর থেকে দাবী উঠে এটি বই আকাশে প্রকাশ করার। পাঠকের সে দাবীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই এটি বই আকাশে প্রকাশিত হল। পাঠকের ভাল লাগলে আমাদের এ শ্রম সার্থক হবে।
কিছু মানুষ থাকেন, যারা নিজের বিশ্বাসকে একমাত্র সঠিক পথ গণ্য করে সিনা টান টান করে চলেন এবং বাকি সকল পথকে ঘৃণ্য ভাষায় আক্রমণকে সহিহ মনে করেন। মোটকথা, এরা বঙ্কিমচন্দ্রের মতো ঋজু অথচ সাম্প্রদায়িক ও উগ্রবাদী মানসিকতার। 'মাসিক মদীনা'র প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দীন খান সেই কিসিমের লোক। তার আত্মজীবনী 'জীবনের খেলা ঘরে'র পুরোটা জুড়েই তিনি সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প উদগীরণ করেছেন এবং প্রচণ্ড ঘৃণ্যভাবে চড়াও হয়েছেন তার বিপরীত মতের প্রতি। আরও আশঙ্কাজনক ব্যাপার হলো, তার ব্যক্তিগত ঘৃণা ও বিদ্বেষকে তিনি ইসলামের নামে হালাল করার চেষ্টা করেছেন! একটি নমুনা:
'বর্তমান এন.জি.ও কবলিত মুসলিম নারীদের বেহায়া বেলেরা কর্মকাও দেখার আগেই আমার আব্বা দুনিয়া থেকে চলে গেছেন। অনুমান করি, এ দৃশ্য সে সময়কার আমাদের পিতৃপুরুষেরা দেখলে হয়ত অনুশোচনায় কাঁদতেও ভুলে যেতেন! '
এই ধরনের ভাষাতেই মাওলানা মুহিউদ্দীন আক্রমণ করেছেন ভিন্ন ধর্মকে, ভিন্নমতকে।
বাঙালি মুসলমান সামাজিক ইতিহাসের একটি বয়ান মুহিউদ্দীন খান দিয়েছেন। তাতে নিশ্চয়ই তখনকার বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায়ের মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে অনেক কিছুই জানা যায়।
বিশেষত, 'মাসিক মদীনা' প্রকাশ করতে গিয়ে যে সংগ্রাম তিনি করেছেন তা স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার মতো। তবু মন বিষিয়ে উঠলো মুহিউদ্দীন খানের পরধর্মদ্বেষী মনোভাব ও উগ্রবাদী মানসিকতার জন্য। যার উদাহরণ বইয়ের পাতায় পাতায় পাওয়া যাবে।
কোনো অমুসলিম পাঠক তো দূরের কথা ; সুস্থ ও স্বাভাবিক চিন্তাশক্তিসম্পন্ন মুসলমানের পক্ষেও এই কেতাব পড়ে হজম করা সহজ হবে না।
" আমাদের পরদাদা বা তাঁদের আগের পুরুষের যাঁরা ছিলেন,তাঁরা ছিলেন পরাজিত মানুষ। সে কারণে তাঁদের আমলের কোনও ইতিহাস নাই, আছে কিছু গালগপ্পো।নিজেদের মধ্যেই তা তাঁরা বলা-কওয়া করতেন। আর এসব উপকথা দিয়েই তাঁরা কিছুটা হলেও আত্মপ্রসাদের প্রলেপ দিতেন পরাজিত মানসিকতায়। "
আত্মজীবনী " জীবনের খেলা ঘরে" এভাবেই শুরু করেছেন প্রায় ছয় দশক যাবত বাংলাদেশের লাখো ঘরের পাঠকপ্রিয় ইসলামী সাময়িকী 'মাসিক মদীনা'র সম্পাদক মুহিউদ্দিন খান (রাহিঃ)। এই পরাজিত মানসিকতার বিস্তার কতটুকু সেটা বুঝার জন্য একটা ঘটনা বলা যাক। ৬১' সালে যখন মাসিক মদীনা প্রকাশের খবর চাওর হলো, তখন নিউমার্কেটের কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটির মালিক ম্যাগাজিনের নাম শুনে মাওলানা মুহিউদ্দিন খানকে বললেন, " নামটা ঠিক হয়নি। দেশে এখন প্রবল বেগে প্রগতির বাতাস বইছে। ধর্মীয় পত্র-পত্রিকা এবং চকবাজারী মার্কা বই পুস্তকের দিন শেষ হয়ে গেছে। মক্কা-মদিনা নামের কোন পত্রিকা তো আমার দোকানে তুলতে পারবো না।
৩৫' সালে জনাব খান যখন জন্ম নিচ্ছেন, তখন বৃটিশ শাসনের শেষবেলা। বর্ণহিন্দুদের নিষ্পেষণের মাঝেও মুসলমানরা অনেকটাই গা-ঝাড়া দিয়ে উঠছে। ইংরেজদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষিতের সংখ্যা বাড়ছে। বাঙ্গালী মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজ গঠন হচ্ছে। এমন সময়ে মোমেনশাহীর পাঁঁচবাগ গ্রামের আনসার উদ্দীন খান- রাবেয়া খাতুন দম্পতি তাঁদের বড় সন্তানকে মাদ্রাসায় ভর্তি করাচ্ছেন। নিকটজনদের এই সন্তানের ভবিষ্যতের রুটি-রুজি নিয়ে সন্দেহ-ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ, যে ইংরেজরা এই উপমহাদেশের জনগণের দুর্দশার জন্য দায়ী,তাদের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সিস্টেমের সেবক হওয়ার আকাঙ্খা যেন মনে দানা না বাঁধে। বলে রাখা ভালো, এই শিশুর পরদাদা ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে অত্যাচারী নীলকর রবার্ট সায়েবকে জবাই করা এবং তার মেম সায়েবের নাককেটে দেওয়া বিপ্লবীদের মধ্যে সামিল ছিলেন। আর নানার দিকের বংশধরেরা হযরত শামসুদ্দিন তুর্ক রাহিঃ এর সিপাহসালারদের একজন।
স্বাধীনচেতা মনোভাব আত্মমর্যাদা-প্রতিবাদ যেন সেই পরিবার আর কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ অঞ্চলের লোকজনের ধমনীতে বয়ে যাওয়া বৈশিষ্ট্য । যার কারণে দেশভাগের আগে আগে পাকিস্তান আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন পাঁচবাগের মানুষজন স্বপ্ন দেখছেন, তারা কেবল বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা নিয়ে ' এমারত' নামে পৃথক একটা রাষ্ট্র গড়বেন। আবার এই এলাকার " গফরগাঁও এর ডাকাত " হিসেবে যাদের কুখ্যাতি সারাদেশে ছড়ানো, তারা আসলে নীলকর, জমিদার ও তার পাইক-বরকন্দাজদের অত্যাচারের প্রতিবাদে এমন রাস্তা বেছে নিয়েছিল। মুহিউদ্দিন খান সামসু মুন্সী নামের এমন এক দুর্ধর্ষ 'ডাকাত' এর বর্ণনা দিচ্ছেন যিনি মাদ্রাসার মেধাবী ছাত্র হওয়ার পরেও কিভাবে ডাকাতির রাস্তা বেছে নিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন কেরোসিনের দাম মজুতদারদের কারণে বেড়ে গেছে,তখন এক দিনমজুর তাঁর প্রসূতি স্ত্রীর জন্য তেল কিনতে গেছেন। কিন্তু তেলের ডিলার বাবু তেল দিলেন না। সেই সাথে খুব বিশ্রী ইংগিতও করেন। এর প্রতিবাদে সেই ডিলারের পশ্চাৎদেশে মুগুর দিয়ে পিটিয়ে এমনভাবে কেরোসিনের কাঁচের বোতল ঢুকানো হলো যে,যেই ব্রিটিশ সার্জন ডিলার বাবুর ক্ষত-বিক্ষত পায়ুপথের অপারেশন করেছিলেন,তিনি দেশ থেকে তল্পিতল্পা গুটিয়ে পালিয়েছিলেন।
মাওলানা মুহিউদ্দিন খান বইয়ের প্রথমার্ধে তাঁর শৈশব,বাবা-মা, পূর্বপুরুষ এবং মুরব্বিদের যে বর্ণনা দিয়েছেন,কেবল সেসবের বিস্তৃত বর্ণনা নিয়েই একটা খন্ড হতে পারতো। এত মুগ্ধতায় ভরা সে বর্ণনা। কিন্তু এই বর্ণনার ব্যাকড্রপ হচ্ছে পঞ্চাশের মন্বন্তর। দুনিয়া বুঝতে শুরু করার বয়সে সেই দুর্ভিক্ষের নির্মমতা যে তার মনে কতটা গভীর দাগ কেটে গেছে,সেটা বইয়ের বিভিন্ন জায়গাতেই বেশ টের করা গেছে। সে সময়ের বালকবেলার স্মৃতি থেকে তিনি যতটুকু স্মরণ করতে পেরেছেন অনেকটাই লিখেছেন। বেশ আফসোস করে লিখেছেন, সেই দুর্ভিক্ষ নিয়ে তেমন কোন লেখালেখিই হয়নি। জেমস যে. নোভাক তাঁর " বাংলাদেশ জলে যার প্রতিবিম্ব " বইতে এই দুর্ভিক্ষ-মন্বন্তর কিভাবে এই জনপদের মানুষের মনস্তত্ত্বে একটা গভীর ছাপ রেখে গেছে,তার কিছু হাইপোথিসিস দিয়েছেন। আবার সম্প্রতি এক গবেষণায়ও জানা যাচ্ছে, এই উপমহাদেশের জনপদের ডায়াবেটিসে বেশি আক্রান্ত হওয়ার সাথে এক প্রজন্মের দুর্ভিক্ষের যোগসূত্র আছে। আসামের মুসলমানদের বিষয়ে লিখছেন, হিন্দু জমিদার- সুদখোর মহাজনদের নিপীড়ন থেকে বাঁচতে এই অসহায় মানুষগুলো আসামের ঝোপজঙ্গল পরিষ্কার করে বসতি গড়েছিলেন। দেশভাগের পরে সেই মানুষগুলোকে এই বাংলায় ফেরত আসতে হয়েছে। এবং যারা নিপীড়ন করেছিল,তারা সেই সাজানো সাম্রাজ্য দখলে নিয়েছেন।
আমার কাছে বইয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ লেগেছে,উনার বিবাহপূর্ব জীবনের মুরব্বী শ্রেণীর মহিয়সী মহিলাদের বর্ণনা। ইদানীং নারীদেরকে 'মহিলা' হিসেবে সম্বোধন করলে আপত্তি তুলেন। কারণ, মহিলা শব্দের সাথে ' মহল' এর যোগ আছে,যেটা শৃঙ্খলে আবদ্ধ করার ফন্দি বলে নারীবাদী ভাষাসচেতনরা মনে করেন।। কিন্তু মুহিউদ্দিন খান তার জীবনে ছাপ রেখে যাওয়া যেসব নারীদের উল্লেখ করেছেন, তারা আক্ষরিক অর্থেই ' মহিলা' ছিলেন। এদের কেউই প্রচলিত অর্থে শিক্ষিত ছিলেন না। বড়জোর অক্ষরজ্ঞান ছিল। কঠোর পর্দাপ্রথা মেনে চলতেন। কিন্তু তিনি যে দরদ নিয়ে একেকজনের ব্যক্তিত্ব-প্রজ্ঞা-মমত্ববোধের কথা লিখেছেন,তাতে এই মহিয়সীদেরকে প্রভাববিস্তারী কিংবদন্তী মনে হয়েছে।
বইয়ের দ্বিতীয় চুম্বক অংশ উনার উস্তাদদের বর্ণনা ��� ৪৭ এর দেশভাগের পরের ঢাকা যেটা কিনা ভারতবর্ষের নানান জায়গা থেকে আসা প্রতিভাবান মুহাজিরদের কীর্তিকলাপ। নানা সংস্কৃতি আর বৈচিত্র্যময়তায় ঢাকা এমন এক কালচারাল মেল্টিংপটে পরিণত হয়েছিল, সেটা এই সময়ে ভাবলেও অবাক লাগে। মুহিউদ্দিন খান যদিও খুব স্পষ্টভাবে কিছু লিখেননি,তবে নানা বর্ণনায় বুঝা যাচ্ছিল, গুণের কদর করতে না পারা এক জাতির মধ্যে উগ্র জাতীয়তাবাদ চেপে বসে এই মিলনমেলার করুণ পরিণতি হয়।
" জীবনের খেলা ঘরে " আত্মজীবনী হলেও আবার ঠিক আত্মজীবনী নয়। কারণ, মুহিউদ্দিন খান একেবারে ক্রনোলজি মেইন্টেন করে নিজের জীবনী ও অভিজ্ঞতা লিখেননি। বরং তিনি কেন্দ্রে থেকে জীবনের নানান পর্যায়ে যাদের সাথে পরিচয় হয়েছে,তাঁদের পরিচিতি লিখেছেন। যার ফলে তাঁর চেয়ে নানান কুশীলবরাই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছেন। খান সাহেব সেখানে বর্ণনাকারী মাত্র। ষাটের দশকের শুরুতে মাসিক মদীনা প্রকাশিত হওয়ার ঘটনা বর্ণনা করে বইয়ের ইতি টানছেন। এবং তাঁর জীবনের এই অধ্যায়টার বর্ণনাই বোধহয় সবচাইতে বিস্তৃতভাবে লিখেছেন। ফলে ষাটের দশক থেকে ২০০১ এ প্রথম যখন এই বই বেরুচ্ছে,তার আর কোন বর্ণনা নেই। এতে করে এমন উম্মাহ নিয়ে চিন্তিত ও একজন রাজনীতিবিদ-লেখক-সাংবাদিকের গভীর পর্যবেক্ষণ থেকে পাঠক বঞ্চিত হলেন। দেশভাগ পূর্ব সময়ে বর্ণহিন্দুদের নানান নিপীড়নের কথা সংক্ষেপে লিখলেও বিশেষ করে যখন থেকে পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হচ্ছে,সে সময়ের তেমন কোন বর্ণনা তিনি করেননি। তবে এতটুকু আকারে-ইঙ্গিতে বুঝিয়েছেন যে, পাকিস্তান যে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল,তার স্বপ্নভঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল, ব্রিটিশদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া নকরশাহী বা আমলাতন্ত্র, মুহাজির হিসেবে আসা এক চাটুকারগোষ্ঠী এবং আলেমসমাজের সাথে শাসকগোষ্ঠীর দূরত্ব।
বইয়ের শেষভাগে মাসিক মদীনা প্রকাশের আগে তাঁর অর্থনৈতিক সংকটে পড়া নিয়ে কিছুটা লিখলেও তিনি বিবাহ পরবর্তী ব্যক্তিজীবন নিয়েও আর কিছু লিখেননি। অথচ তাঁর জৈষ্ঠ্য সন্তানের এক স্মৃতিচারণায় মনে হয়েছে, তাঁর দাম্পত্যজীবনও বেশ মধুর ছিল। ৭১ পরবর্তী সময়ে মাসিক মদীনা বন্ধ করা নিয়ে শেখ মুজিবের সাথে দেখা করার একটা ঘটনা ফেসবুকে বিভিন্ন সময় সামনে আসে। সেটাও অজানা রইলো। গুলতেকিন আহমেদের নানা প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁর সূত্রে হুমায়ুন আহমেদ তাঁর বিশেষ গুণগ্রাহী ছিলেন। এমনকি তাঁর অসমাপ্ত কাজ " নবীজি " লিখার সময়ে খান সাহেবের কাছে সিরাতের তালিকা চেয়ে সাহায্য চেয়েছেন বলে শোনা যায়। বৃটিশ রাজের শাসন শেষে পাকিস্তান হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশকে তিনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন বা কলম দিয়ে বাংলা ভাষায় ইসলামের খেদমতের যে স্বপ্ন তিনি তাঁর বাবা-মায়ের কাছ থেকে পেয়েছিলেন, সেটা কতটুকু পূরণ হয়েছে বলে মনে করেন - এইসব অতৃপ্তি একপাশে রেখে বলবো, এমন উপভোগ্য বই বারেবারে পড়ার মত। কোন রিভিউ বা সংক্ষিপ্ত বর্ণনা এই বইয়ের প্রতি সুবিচার করতে পারবেনা। বড়জোর বিজ্ঞাপনের কাজ করতে পারে। এই বইয়ের পড়ার আনন্দ শুধু পুরো বই পড়াতেই। হয়ত অতি সাধারণ নিউজপৃন্ট কাগজে ছাপা এবং সাদামাটা অনাকর্ষণীয় প্রচ্ছদের এমন সব বইয়ের জন্যই বিজ্ঞলোকেরা বলেন, Don’t Judge a Book by It’s Cover!
২০২২ সালে আমার পড়া সবচাইতে পছন্দের বই। খুব সম্ভবত আমার প্রিয় বইগুলোর মধ্যেও এই বইটা থাকবে।
দীর্ঘ বই । ২৬২ পৃষ্ঠা । একদম বাচ্চা বয়স থেকে বেড়ে ওঠা একজন সাদামাটা মানুষের জীবনকথা । অনেক স্বপ্ন অনেক প্রেরণা । দুঃখ কষ্ট । বেদনা এবং ভার ও নির্ভার জীবনের গুচ্ছ কথার সমাহার ।
আত্মজীবনী হিশেবে আলাদা প্রাণ পেয়েছে যদিও কিন্তু ইতিহাস ঐতিহ্য সংমিশ্রনে অনেক তথ্যের সমাহার ঘটেছে এখানে । মাসিক মদিনার সূচনা সময় । এতসব প্রতিকূলতার ভেতর পত্রিকা এগিয়ে নেয়ার উদ্যমতা । সাথে মদিনা নামের অদ্ভুত আকর্ষণ এবং এর প্রভাব । সব মিলিয়ে জীবন্ত স্মৃতি ।
একটা ভালো বই হিশেবে এ বইটা পড়া যেতে পারে ।
মাওলানা মুহিউদ্দীন খান । জন্ম ১৯ শে এপ্রিল ১৯৩৫ , মৃত্যু ২৫ শে জুন ২০১৬ ।
আল্লাহ তাকে জান্নাতে উচ্চ মাকাম দান করুন ।
জীবনের খেলাঘরে মুহিউদ্দীন খান মদিনা পাবলিকেশন্স । পৃষ্ঠা ২৬২ মূল্য ১৮০
আত্মজীবনী পড়তে গেলে অনেক রকম অভিজ্ঞতার বর্ণনা পাওয়া যায়। শেখার অনেক কিছু পাই সেসবে মধ্যে। আমার এ-পর্যন্ত পড়া আত্মজীবনীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ব্যতিক্রম লাগলো মাওলানা মুহিউদ্দীন খান সাহেবের এই বইটি।
খুব চমৎকার সংগ্রামপূর্ণ এক জীবনের, অনন্য সাধারণ সহজ-সরল বর্ণনা। ভাবতেই অবাক লাগে!
মানুষ কত মার্জিত হতে পারে, বিনয়ী হতে পারে, অন্যকে আল্লাহর দিকে আকৃষ্ট করতে পারে, জানলাম!
রব্বুল কলম লেখককে জান্নাতে উচ্চ মাকাম প্রদান করুন, আমিন।
যে বইয়ের রিভিউ লেখার যোগ্যতা আমার নেই। রিভিউ দিতে হলে বইয়ের প্রতিটি পাতার পাতার এক দুই পৃষ্ঠা করে রিভিউ দিতে হবে। আমার পড়া বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থগুলোর মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি <3