প্রকৃতি মানবমন মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়া বইগুলো পড়তে বরাবরই আমার ভালো লাগে। তারাপদ রায়ের "নিঝুমপুর" ঠিক তেমনই একখানা মিষ্টি মায়ার চাদরে মোড়ানো সহজ সরল জীবনের উপাখ্যান, যা গড়ে উঠেছে ২য় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্র করে।
উপন্যাসটির নামকরণ হয়েছে একটি ছিমছাম ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়রূপী গ্রাম নিঝুমপুরের নামে, যার
অবস্থান তৎকালীন ভারতবর্ষের বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলেরই কোথাও। সেই গ্রামের ছা-পোষা সাধারণ মানুষের আটপৌরে জীবনের বাঁকে বাঁকে ঘটতে থাকা কিছু চিত্তাকর্ষক ঘটনারই সেতুবন্ধন এই উপন্যাসটি!
উপন্যাসটিতে বেশ কয়েকটি চরিত্রের আনাগোনা থাকলেও যাকে ঘিরে এর মূলভাব আবর্তিত, তিনি তিনকড়ি সান্যাল। পোস্ট অফিসের মাস্টার এবং নিঝুমপুর বাসের টাইমকিপার
হিসেবে কর্মঠ তিনকড়িবাবুর জীবনে সংগ্রাম, সততা ও নিষ্ঠার কোনরূপ কমতি ছিল না, কিন্তু জীবনের ৩০টি বসন্ত পেরিয়ে গেলেও ছিল একমাত্র ভাললাগার নাম করে কারো আগমনের কমতি।
সময় গড়াতে থাকে,,তেমনি গ্রামীণ জীবনের মোড়ে মোড়ে ঘটতে থাকা অযাচিত ঘটনাগুলোও সেই জীবনে চড়াই উৎরাইয়ে রূপ নেয়। গ্রামবাসীর কাছে ঘটনাগুলো সাবলীল, কিন্তু আমার মত পাঠকদের কাছে ভাবনার খোরাক জাগানোর মতই বটে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের চমৎকার বর্ণনা এই উপন্যাসটিকে ভিন্ন মাত্রা দান করেছে এই অর্থে যে, এটি উপন্যাসের চরিত্র ও পাঠকের মাঝে একটি দৃঢ় মেলবন্ধন হিসেবে কাজ করেছে।
তবে শেষটা ভীষণ আকস্মিক ও কিঞ্চিৎ অযাচিত। যা আমি ব্যক্তিগতভাবে আশা করিনি।
এই উপন্যাসে থাকা কয়েকটি উক্তি বা লাইন আমাকে চমৎকৃত করেছে,,যা তুলে ধরার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইছি না।
১। এক একটা দিন অত উজ্জ্বল নয়। কিছুটা নিষ্প্রভ। মেঘ,, বৃষ্টি, কুয়াশা। চেনা লোককে কেমন অচেনা মনে হয়। অচেনা লোককে চেনা মনে হয়। ভুলে ভরা দিন।
২। এরপরেও এমন দিন আছে ঘষা পয়সার মত। অচল। কারো সঙ্গে কোন লেনদেন, বিনিময় নেই। জগৎ সংসারের চাকা আটকিয়ে যায়। দিন গড়াতে চায় না।
৩। বহুদূর কালের বহুদূর জগতের হারিয়ে যাওয়া অবলুপ্ত অরণ্যের ঘ্রাণ লেবুর গন্ধে মিশে থাকে।
পাঠ প্রতিক্রিয়া
নিঝুমপুর
তারাপদ রায়
ধরন: সামাজিক উপন্যাস
প্রথম প্রকাশ: জানুয়ারী ১৯৯৮
প্রকাশনী: দে'জ পাবলিশিং
মোট পৃষ্ঠাসংখ্যা: ৭৮