এই উপন্যাস প্রসঙ্গে লেখক নিজে বলেছেন - ‛পৃথিবীর মানচিত্র থেকে চিরদিনের মতো নিশ্চিহ্ন পূর্ববঙ্গের নদীতীরে পঞ্চাশ বছর আগের পল্লীজীবন । দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পটভূমিকায় গ্রামবাংলার একটি নিষিদ্ধ প্রেমের কাহিনী । এই রকম লেখা আমি আগে লিখিনি । লেখা ঠিক কি না পাঠক-পাঠিকা বিবেচনা করবেন।’
Tarapada Ray (Bengali: তারাপদ রায়) was a Bengali writer of poems, short stories, and essays. He is especially known for his satirical sense of humour. He was born on November 17, 1936 in Tangail, now in Bangladesh. He lived in Kolkata in the Indian state of West Bengal till his death on August 25, 2007. He had his schooling in Bangladesh where he passed his matriculation from Bindubasini High English School. In 1951, he came to Calcutta to attend college. He studied Economics in Central Calcutta College (presently Maulana Azad College). For a time he taught in a school in Habra in North 24Parganas. Apart from numerous short stories and essays (mostly satirical), he wrote many poems as well. His first collection of poems, "Tomar Pratima" was published in 1960. He also wrote several short shorties commemorating his childhood days spent in East Bengal (Bangladesh). Among his most important works are novel like Charabari Porabari and travelogue like Neel Digante Tokhon Magic. He died on 25 August 2007. He was survived a son and his wife. He was suffering from renal failure for the last few months. He was so enthusiastic about writing, that it was reported that he even wrote several pieces from his hospital. Tarapada had close friendship with Hollywood actor Wallace Shawn and famous author Deborrah Eisenberg.
দ্বিতীয়বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন দেশজুড়ে আকাল চলছে। এদিকে নিঝুমপুরের অবস্থা ফিরেছে, নতুন ডাকঘর, স্টিমারঘাট, বাস রোড। এ যেন এক এলাহী কারবার। নিঝুমপুর তার নিঝুমতা কাটিয়ে যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। পোস্টমাস্টার তিনকড়ি, পরেশ ডাক্তার, সনাতন, তরলা আর মহীরুহ এক প্রাচীন গাছ। এরা সব যেন শিল্পীর পটে আঁকা এক ছবির চরিত্র। ছবির চেয়েও যেন বাস্তব বেশি।
এমন অল্প পরিসরে লেখা উপন্যাসের রেশটা যে এমন গভীর হবে, এমন বাস্তবিক দৃশ্যের মতো হবে। কে ভেবেছিল? চমৎকার গল্প, মনকে আচ্ছন্ন করার মতো অনুভূতি হলো।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের এক নিভৃত পল্লীর গল্প "নিঝুমপুর।" তারাপদ রায় সে সময়ের পরিবেশ ও জীবনব্যবস্থা বিশ্বস্ততার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন। কিন্তু তিনি চরিত্রগুলোর মস্তিষ্কে ঢুকলেন না একেবারেই। শুধু উপরিতল থেকে তাদের দেখে গেলেন। দ্বন্দ্বগুলোকেও দ্বন্দ্ব বলে বোঝা গেলো না। তাই চমৎকার একটা গল্পও হয়ে গেলো ম্যাড়ম্যাড়ে।
অঝোর বর্ষা। নিস্তব্ধ শান্ত একটা গাঁ। নদীতীর। স্নিগ্ধ বাতাস। সবুজ চকচকে গাছপালা। গ্রামের মানুষ৷ এমন আবহে রচিত উপন্যাস একেক সময় ভীষণ উদাসীন করে দেয়। এমন উপন্যাসের সাথে পরিবেশের একটা যোগ আছে। এখন বর্ষা। তার মধ্যে নিঝুমপুর উপন্যাসের সময়টা বড্ড মিলে গেছে। চরিত্রগুলো আরেকটু বিকশিত, কাহিনীটা আরেকটু বড় হলে বইটা আরো অনেক বেশি উপভোগ্য হত৷ তারাপদ রায়ের এমন লেখা কি আর আছে? কী সুন্দর ভাষা, কী সুন্দর সব দৃশ্যকল্প। ভালো লেগেছে।
নিজের আদিনিবাসের সাথে সম্পর্ক শেষ সুতোটা আলগা করে নানাঘাটের জল খেয়ে শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা যখন বাজছে সর্বত্র সেই সময়ই পেলেন এই চাকরিখানা। বছর ত্রিশেক বয়সে ও নেই কোনো বাজে অভ্যাস,শান্ত ভদ্র নির্বিবাদী তিনকড়ির চারিত্রিক দৃঢ়তা দেখবার মত,পরেশ ডাক্তারের দেখানো নটীপাড়ায় ঘোরার প্রলোভন বা গুহবাড়ির মেজবৌ তরলার তারল্য কিছুতেই তাকে বিচলিত করা সম্ভব হয়নি.
কিন্তু শেষমেশ কি থেকে কি যেন হয়ে গেলো কুবের কপিলাকে নিয়ে যেমন হোসেন মিয়ার দ্বীপে অনির্দিষ্টকালের যাত্রা করেছিল,তিনকড়িও শেষ পর্যন্ত তরলাকে নিয়ে মাঝনদীতে ভাসিয়ে দিয়ে সব লোকলজ্জা পিছুটানের ভয়, শুরু করেছিল এক নতুন পথের যাত্রা যে পথে চলতে গেলে পুরানো পথে মতে কখনো যাওয়া বা ফেরা যায় না.
....দত্তপাড়ায় প্রত্যেক বাড়িতে একটা-দুটো কদমগাছ । শেষ গ্রীষ্মের প্রবল বৃষ্টিতে কোনো কোনো গাছে কদম ফুটেছে । বৃষ্টি ভেজা বাতাসে কদমফুলের মৃদু সৌরভ ভেসে আসছে । গুহবাড়ির সীমানায় রাস্তার দিকে একটা কদমগাছ । পরেশ ডাক্তার একটু আগেই নিজের বাড়িতে ঢুকে গেলেন । এখন তিনকড়ি একা । কেউ দেখছে না বুঝতে পেরে তিনি রাস্তার পাশ থেকে একটা বাঁশের কঞ্চি কুড়িয়ে নিয়ে দুয়েকটা কদম পাড়া যায় কিনা চেষ্টা করতে লাগলেন । কিন্তু ততক্ষণে তরলা আলো হাতে বাইরে উঠোনের দরজার মুখে চলে এসেছে , তাড়াতাড়ি তিনকড়ি নিজের ঘরে চলে গেলেন ।
পরদিন খুব ভোরবেলায় গণেশের হাঁকাহাঁকিতে ঘুম ভাঙলো । বিছানা থেকে উঠে দরজা খুলতে তিনকড়ি দেখলেন একগুচ্ছ কদমফুল, ডালপাতা শুদ্ধ, দরজার পাশে রাখা রয়েছে । নিশ্চয়ই তরলার কান্ড ।
🔷 এক অদ্ভুত সুন্দর উপাখ্যান। নিঝুম এক গ্রামের গল্প । আরব্য উপন্যাসের একটি মহীরুহ, কয়েকটি মানুষ, একটি স্নিগ্ধ প্রেম এবং তথাকথিত সমাজের গল্প ।
🔷 এই উপন্যাস প্রসঙ্গে লেখক নিজেই বলেছেন - ‛পৃথিবীর মানচিত্র থেকে চিরদিনের মতো নিশ্চিহ্ন পূর্ববঙ্গের নদীতীরে পঞ্চাশ বছর আগের পল্লীজীবন । দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পটভূমিকায় গ্রামবাংলার একটি নিষিদ্ধ প্রেমের কাহিনী । এই রকম লেখা আমি আগে লিখিনি । লেখা ঠিক কি না পাঠক-পাঠিকা বিবেচনা করবেন ।’
প্রকৃতি মানবমন মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়া বইগুলো পড়তে বরাবরই আমার ভালো লাগে। তারাপদ রায়ের "নিঝুমপুর" ঠিক তেমনই একখানা মিষ্টি মায়ার চাদরে মোড়ানো সহজ সরল জীবনের উপাখ্যান, যা গড়ে উঠেছে ২য় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্র করে।
উপন্যাসটির নামকরণ হয়েছে একটি ছিমছাম ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়রূপী গ্রাম নিঝুমপুরের নামে, যার অবস্থান তৎকালীন ভারতবর্ষের বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলেরই কোথাও। সেই গ্রামের ছা-পোষা সাধারণ মানুষের আটপৌরে জীবনের বাঁকে বাঁকে ঘটতে থাকা কিছু চিত্তাকর্ষক ঘটনারই সেতুবন্ধন এই উপন্যাসটি!
উপন্যাসটিতে বেশ কয়েকটি চরিত্রের আনাগোনা থাকলেও যাকে ঘিরে এর মূলভাব আবর্তিত, তিনি তিনকড়ি সান্যাল। পোস্ট অফিসের মাস্টার এবং নিঝুমপুর বাসের টাইমকিপার হিসেবে কর্মঠ তিনকড়িবাবুর জীবনে সংগ্রাম, সততা ও নিষ্ঠার কোনরূপ কমতি ছিল না, কিন্তু জীবনের ৩০টি বসন্ত পেরিয়ে গেলেও ছিল একমাত্র ভাললাগার নাম করে কারো আগমনের কমতি।
সময় গড়াতে থাকে,,তেমনি গ্রামীণ জীবনের মোড়ে মোড়ে ঘটতে থাকা অযাচিত ঘটনাগুলোও সেই জীবনে চড়াই উৎরাইয়ে রূপ নেয়। গ্রামবাসীর কাছে ঘটনাগুলো সাবলীল, কিন্তু আমার মত পাঠকদের কাছে ভাবনার খোরাক জাগানোর মতই বটে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের চমৎকার বর্ণনা এই উপন্যাসটিকে ভিন্ন মাত্রা দান করেছে এই অর্থে যে, এটি উপন্যাসের চরিত্র ও পাঠকের মাঝে একটি দৃঢ় মেলবন্ধন হিসেবে কাজ করেছে। তবে শেষটা ভীষণ আকস্মিক ও কিঞ্চিৎ অযাচিত। যা আমি ব্যক্তিগতভাবে আশা করিনি।
এই উপন্যাসে থাকা কয়েকটি উক্তি বা লাইন আমাকে চমৎকৃত করেছে,,যা তুলে ধরার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইছি না।
১। এক একটা দিন অত উজ্জ্বল নয়। কিছুটা নিষ্প্রভ। মেঘ,, বৃষ্টি, কুয়াশা। চেনা লোককে কেমন অচেনা মনে হয়। অচেনা লোককে চেনা মনে হয়। ভুলে ভরা দিন।
২। এরপরেও এমন দিন আছে ঘষা পয়সার মত। অচল। কারো সঙ্গে কোন লেনদেন, বিনিময় নেই। জগৎ সংসারের চাকা আটকিয়ে যায়। দিন গড়াতে চায় না।
৩। বহুদূর কালের বহুদূর জগতের হারিয়ে যাওয়া অবলুপ্ত অরণ্যের ঘ্রাণ লেবুর গন্ধে মিশে থাকে।
পাঠ প্রতিক্রিয়া নিঝুমপুর তারাপদ রায় ধরন: সামাজিক উপন্যাস প্রথম প্রকাশ: জানুয়ারী ১৯৯৮ প্রকাশনী: দে'জ পাবলিশিং মোট পৃষ্ঠাসংখ্যা: ৭৮
🏞️ বাংলাদেশের নদীতটে এক পল্লীগ্রাম নিঝুমপুর, নদীর ধারে বাজার, স্টিমার ঘাট, ডাকঘর, ডাক্তার, বাস রাস্তা —সব মিলিয়ে যেন একটা ছোট্ট জগৎ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সেই গ্রামের বা বলা ভালো সেই সময়কালের সমাজ, জীবন ধরন, লোকজন এসবের গল্প বলে নিঝুমপুর। তারাপদ রায় এই গদ্যে সেই সময়কাল টাই তুলে ধরতে চেয়েছেন, এবং তার গদ্যে সেই সময়ের বিবরণ দারুণভাবে ফুটেও উঠেছে।
📖 গদ্যের ভেতরে সেই গ্রাম্য আবহ দারুণভাবে ফুটে উঠলেও চরিত্র আর গল্পের দিক থেকে বইটা আমার কাছে বেশ ফ্যাকাশে লেগেছে।একটা প্রেমের গল্প ও বলতে চেয়েছেন লেখক , কিন্তু প্রেম নিয়ে গল্পের গভীরে ঢুকলেন না। এই গল্পে সব কিছুই ওপর ওপর দিয়ে বলা হয়েছে, চরিত্র গুলো বা তাদের গল্প গুলো সেভাবে মনে দাগ কাটতে পারলো না ।
📝 একটা সময়কাল তৈরি হয়েও যেন পুরোটা দাঁড় করাতে পারলেন না।যদি পুরোনো গ্রামবাংলার পরিবেশ পড়তে ভালো লাগে, নিঝুমপুর একবার পড়া যায়। তবে চরিত্র-কেন্দ্রিক বা আবেগঘন কিছু খুঁজলে হয়তো হতাশ হতে হবে।
🎨 তবে একটা জিনিস আলাদা করে বলতেই হবে—বইটির প্রচ্ছদ আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। সুধীর মৈত্রের আঁকা এই অসাধারণ সুন্দর জলরঙের কভার সত্যিই নজরকাড়া।
লেখক, একটা প্রেক্ষাপট, টাইমলাইন তৈরি করলেন। চমৎকার ওয়ার্ল্ড-বিল্ডিং করলেন, ইন্টারেস্টিং সব চরিত্রের সাথে পরিচয় করালেন এবং যে মুহুর্তে উপন্যাস শুরু হবার কথা ছিল তখনি শেষ করে দিলেন!
উপরন্তু, যে ঘটনাকে মূল উপজীব্য করে উপন্যাস রচনা করার প্রত্যয় ভূমিকায় ব্যক্ত করেছিলেন, সেটারও গভীরে প্রবেশ করলেন না, চরিত্রগুলোর টানপোড়েন আসলো না লেখায়। শেষ পর্যন্ত এটা একটা উপন্যাস লেখার “ইচ্ছা” হয়েই থাকলো আরকি।
ছোট্ট জনপদের কদাকার সব রূপ আর সংকীর্ণতা ঢেকে থাকে তার বিদেশী আদিম গাছ দিয়ে। পড়ে পাওয়া ব্যবসা, তা নটিপাড়া হোক, মিলিটারির সরবরাহ হোক আর বাস রুটের বদল হোক, তার মতই অবৈধ অন্যায় বংশজ গরিমাকেও পেড়ে ফেলে শেষ পর্যন্ত। এমন বর্ণনা, এমন স্থানকালপাত্র, এমন স্বাভাবিক যাপন তারাপদ রায় পান কোথা থেকে! ছোট্ট একটি অসামান্য বই।