বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনৈতিক বয়ানে অনেক ঐতিহাসিক বিষয়কেই ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়৷ এর একটা হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে৷ ভুল ইতিহাস চর্চা আমাদের রাজনৈতিক চিন্তাধারা ও আত্মপরিচয়ের পথকে কণ্টকাকীর্ণ করে রেখেছে৷ ইতিহাসের ভুল আর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ানের ফলেই বাংলাদেশে বিভাজনের রাজনীতি চর্চার সুযোগ তৈরি হয়েছে৷ ইতিহাসের ওপরে জমে থাকা ধুলোকালিকে যতটুকু পরিচ্ছন্ন করা যায়, ততই আমাদের জাতির মঙ্গল৷ এই বইটি আমাদের ইতিহাসের গায়ে লেপ্টে থাকা ধুলোকালি ঝেড়ে পরিস্কার করার একটি প্রয়াস৷
ফেসবুক স্ট্যাটাস জোগাড় করে একটি বই, তবে মন্দ নয়। পর্যাপ্ত রেফারেন্স এর ঘাটতি থাকলেও ওভারঅল শেখার মত বেশকিছু জিনিস আছে। সেকুলার মহলের বিভিন্ন সমসাময়িক ভ্রান্তির জবাব আছে। বইয়ের একটা ইন্টারেস্টিং প্যারা - ❝কোটা সংস্কার আন্দোলনে যে ছেলেটা 'আমি রাজাকার' লিখেছিল, সেও নিজেকে রাজাকার দাবি করেনি। সে নিজের শরীরে সেই ফেটিশকে ধারণ করেছিল, যেই জুজুর ভয় দেখিয়ে সকল ন্যায়সংগত লড়াইকে ডিলিজিটিমাইজ করেছে শাসক। এই প্রতিবাদের ভাষা জাফর ইকবাল বুঝবে না। কারণ, তিনি রাজনীতির মানুষ নন; স্রেফ দালাল।❞
ইতিহাসের ধুলোকালি, নাম থেকেই বুঝা যায় ইতিহাসে সত্য বলে লুকিয়ে থাকা কিছু মিথ্যার উন্মোচন হিসেবেই লেখা হয়েছে বইটি।
দেশ ভাগের সময় থেকে বর্তমান পর্যন্ত আমাদের যে ইতিহাস শেখানো হয় সেখানে অনেক কিছুই গভীর ভাবে না ভেবে কিংবা ইচ্ছাকৃত ভাবে মূল বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। যার কারণে এত বছর পর এসেও ইতিহাস নিয়ে আমাদের তর্কের শেষ নেই।
দেশভাগ, দেশভাগে ইসলাম ও মুসলিম ভূমিকা কিংবা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নিয়েও আমাদের রাখা হয়েছে অনেক আড়ালে। সেই সকল বিষয়গুলোর পিছনের গল্পই সামনে আনার চেষ্টা করা হয়েছে বইটিতে।
ভারতবর্ষ, ভারত ও বাংলা ভাগ, হিন্দু মুসলাম সম্পর্ক, মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি কমিউনিস্ট, রাশিয়া, আমেরিকার কিছু বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে বইটিতে।
সর্বোপরি বইটি আপনাকে কিছু বিষয়ের ওপর আরো জানতে আগ্রহ সৃষ্টি করবে। লেখকের ৩ টি বই পড়ে দেখলাম একই ধরনের। অনেক গুলো বিষয় নিয়ে আসে সেগুলো জানতে পড়তে হবে আরো অনেক বই। বিষয়টা ভালো খারাপ বুঝার উপায় নেই।
হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এবং ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ থেকে ইতিহাস নিয়ে প্রচুর মিথ্যা বয়ান তৈরি হয়েছে৷ এর একটা বড় অংশ এসেছে সেক্যুলার-বাম ঘরানার মুক্তমনাদের থেকে৷ সত্য ইতিহাসের সাথে মিথ্যার মিশ্রণের সবচে খারাপ দিক হচ্ছে, সামান্য মিথ্যা অধিকাংশ সত্য অংশের আবেদনকে ম্রিয়মান করে দেয়, তৈরি করে অবিশ্বাস৷ শুরু হয় ঘৃণার সংস্কৃতি৷ তবে সত্যের শক্তি হচ্ছে তা কোনও না কোনভাবে প্রকাশিত হয়ে পড়ে৷
সোশ্যাল মিডিয়া ও ব্লগগুলোতে প্রায়শই নানা বিতর্ক তৈরি হয়৷ বইটিতে এরকম বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে৷ যেমন: ভারতবর্ষের ইতিহাসে মুসলিমদের অবদানকে প্রায়ই মুছে ফেলার চেষ্টা চলে৷ বইটির প্রথমদিকে এ সংক্রান্ত ভুল বয়ানগুলো খণ্ডন করা হয়েছে৷ দেশীয় ইতিহাসের মধ্যে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গ, এর সাথে অবধারিতভাবে চলে আসা ভারত পাকিস্তান প্রসঙ্গ৷ এ ছাড়া হিন্দু মুসলিম সম্পর্ক, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, রাশিয়া, আমেরিকা, পশ্চিমা বিশ্ব, কমিউনিস্ট দলগুলোর সমস্যা, ধর্ম, সভ্যতা প্রভৃতি বিষয়ে ভুলভাবে উপস্থাপিত ইতিহাসের বিভিন্ন অংশ তুলে ধরা হয়েছে৷ অন্যদিকে মহানবী (সা) কে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের তিনটি চমৎকার বিবৃতি উল্লেখ করা হয়েছে, যা কবিগুরুকে জোরপূর্বক ইসলামবিরোধী হিসেবে উপস্থাপনের বঙ্গীয় মুসলিম বয়ানের অপনোদন করে৷
বাংলা ও মুসলমান প্রসঙ্গে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ইসলাম ও মুসলিমদের অবদান, বাংলায় ইসলাম প্রসারের কারণ, বাংলা ভাষার উৎপত্তি, নারীদের পর্দাপ্রথা, ওড়না-হিজাব নিয়ে সেক্যুলারদের জঘন্য মানসিকতা ও ঘৃণার চাষাবাদ প্রভৃতি বিষয় আলোচনায় এসেছে৷ এর বাইরে ইসলামে বিজ্ঞান, ইসলামী রাজনীতি নিয়েও লেখা রয়েছে৷
সমালোচনা: অনেকগুলো লেখা সম্ভবত ফেসবুক পোস্ট থেকে নেয়া হয়েছে৷ তাই কন্টেন্টগুলোর মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিকতা ও ধারাবাহিকতার অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে৷ কিছু লেখায় মূল বক্তব্য স্পষ্ট হয় নি, বিশেষত ছোট ছোট লেখাগুলোতে৷ প্রথমদিকে রেফারেন্স দেয়া হলেও শেষের লেখাগুলোতে তা অনুপস্থিত৷
সামগ্রিকভাবে তথ্যবহুল একটি বই৷ সত্যানুসন্ধানী পাঠকদের জন্য রেকমেন্ডেড৷ যারা দেশ, ধর্ম, রাজনীতি, মুক্তবুদ্ধি নিয়ে আর্গুমেন্টারি লেখালেখি করেন তাদেরও পড়ে দেখা দরকার৷ পাঁচে পৌনে চার৷
কিছু জায়গায় রেফারেন্স ছিলনা। কিন্তু বিষয় সেটা না, যে আলাপ, প্রশ্ন উঠাইছে সেটা নিয়া আলাপ উঠানো দরকার,পরিস্কার করা দরকার আমাদের বুদ্ধিজীবি মহলদের। নাস্তিকতা চর্চা ভালো, কিন্তু তার তলে, ইসলামবিদ্বেষ ছড়ানো প্রিপ্ল্যান্ড উদ্দেশ্যের এক নোংরা রুপ। এই খেলা অহন থামানো উচিৎ।
বইয়ের নাম 'ইতিহাসের ধুলোকালি' হলেও এতে আলোচিত সকল বিষয়বস্তু ইতিহাসের নয়। ইতিহাসের পাশাপাশি ধর্ম, রাজনীতি, কোনো কোনো ব্যক্তির বিশেষ দিক আলোচনা, বিভিন্ন মতবাদের পর্যালোচনা ইত্যাদি উঠে এসেছে।
প্রত্যেকটা লেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে আরেকটু বিস্তারিত আশা করেছিলাম। কিন্তু লেখাগুলো ছিল মূলত লেখকের সোশ্যাল মিডিয়ায় করা পোস্টসমূহের একটি সংকলন। বইয়ে উল্লেখিত প্রত্যেকটা টপিকই বর্তমান সময়ের সাথে চরমভাবে প্রাসঙ্গিক।
তবে যেহেতু এগুলো সোশ্যাল মিডিয়ার একেকটা পোস্ট ছিল তাই বইয়ে লেখাগুলোর সাথে ঐ পোস্ট লেখার উদ্দেশ্য বা প্রেক্ষাপট সংক্ষিপ্তভাবে উল্লেখ করে দিলে ভালো হতো। এই প্রেক্ষাপট বা কন্টেক্সট উল্লেখের গুরুত্ব বিশেষভাবে উপলব্ধি করেছি শেষের বিবিধ অধ্যায়টিতে।
ইতিহাসের পাতা থেকে তুলে আনা কিছু ধারণা , প্রচলিত মতামত বা মতাদর্শ নিয়ে আমাদের ভিতর প্রচলিত কিছু ভ্রান্ত ধারণার অবসান ঘটানোর উদ্দেশ্যে লেখা এই বই । লেখক কিছু ক্ষেত্রে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন তার ভাষায় আত্মগরিমার দোষে দুষ্ট কিছু তথাকথিত সমালোচক কিংবা বুদ্ধিজীবীদের । অত্যন্ত তথ্য বহুল ও সহজপাঠ্য হলেও বইয়ের বিষয় বস্তু প্রকৃতার্থেই সুগভীর ও চিত্তাকর্ষক ।
ইতিহাসের এক ধরনের নিজস্ব রং আছে।পুরো পৃথিবী একজোট হয়েও সে রং বদলাতে পারে না;উল্টো নিজের মত করে রাঙিয়ে যায় পৃথিবীকেই।অবশ্য বর্ণচোরা শ্রেণী ক্ষাণিক সময়ে কৃত্রিম রঙের কারসাজির আয়োজন করতে পারে।কিন্তু ইতিহাস তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় কারসাজির খেলাঘরে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। সেখান থেকে বেরিয়ে খাটি ও পরিশুদ্ধ ইতিহাস মাথা উঁচু করে ঘোষনা করে_ আমি সত্যের পক্ষে।
ইতিহাসের দেয়ালে মিথ্যার প্রলেপ দেওয়ার অপচেষ্টা পৃথিবীর শুরু থেকে চলমান।বিপরীতে এক শ্রেনীর সত্যাশ্রয়ী মানুষ সে মিথ্যার প্রলেপ সরানোর লড়াই জারি রেখেছে। দীর্ঘদিন ধরে কেউ প্রলেপ না সরালে স্বভাবতই ইতিহাসের হায়ে ধুলাকালির স্তুপ জমে যায়।এমন সন্ধিক্ষণে কাউকে না কাউকে ধুলাকালি সরানোর দায়িত্ব নিতে হয়,ইতিহাসের পায়ে জোর করে চাপানো শিকলের উপর হাতুরির আঘাত হেনে ইতিহাসকে শৃঙ্খলমুক্ত করতে হয়। এই বইটিকে আমার সেই আঘাত হানা হাতুরি মনে হয়েছে।
#গার্ডিয়ান প্রকাশনীর বাইন্ডিং প্রচ্ছেদ দেশ সেরা বলা যায়,বইয়ের নাম খোদাই করে লেখা,কত বার প্রচ্ছেদে যে হাত বুলাইছি তার হিসাব নাই।🤗