সোশ্যাল মিডিয়ায় মোটামুটি জনপ্রিয় এক লেখক কিছুতেই অভীষ্টের নাগাল পাচ্ছেন না। কী তার অভীষ্ট? জনপ্রিয়তা, তুমুল বিক্রি, খ্যাতি, সর্বোপরি সেনসেশন হওয়ার লোভে পাগল মানুষটির ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল একদিন। তাঁর সামনেই সেরা লেখার পুরস্কার নিয়ে গেল এক তরুণ লেখক। অন্ধ আক্রোশে লেখক ঠিক করলেন, তিনি যে তন্ত্রাচার্যের কাছে একসময় দীক্ষা নিয়েছিলেন, তাঁর সাহায্য চাইবেন। আচার্যের প্রশিক্ষণে শুরু হয় বিট্টালিনী নামে এক রহস্যময়ী, সমস্ত শাস্ত্র ও গ্রন্থ থেকে সযত্নে বাদ দেওয়া দেবীর সাধনা। সাধনার ধাপে-ধাপে প্রকট হয় লেখকের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক অতীত। কাহিনিতে তৃতীয় সমান্তরাল প্রবাহ হয়ে বয় প্রায় হাজার বছর আগের এক ঘটনা— যার মধ্যে লুকিয়ে আছে এই দেবীর ইতিহাস। শেষ পর্যন্ত কী হল? লেখক কি তাঁর অভীষ্টের নাগাল পেলেন? ওই ভয়াবহ সাধনার শেষে কী পেলেন তিনি?
ভূতভুতুম গ্রুপের জনপ্রিয় লেখক ত্রিজিৎ তাঁর প্রথম উপন্যাসেই প্রায় সিদ্ধিলাভ করে ফেলেছেন। অত্যন্ত ঝরঝরে, গতিময় লেখা। ইতিহাস ও তন্ত্র-বিষয়ক তথ্যাদি পর্যাপ্ত ও নির্ভুল হলেও তাদের উপস্থিতি গল্পের গতি মোটেই কমায় না। শুধু কিছু-কিছু বর্ণনার পুনরুক্তি এড়িয়ে এবং লেখাটিকে আরও একটু ছোটো করলে বেশ ভালো হত। 'খোয়াই' এই দ্বিতীয় মুদ্রণটিকে শুদ্ধতর রূপ দিয়েছে। তবে ফন্টের সাইজ ঠিকঠাক করলে ও অ্যালাইনমেন্ট নিয়ে ভাবলে লেখার আয়তন ও মূল্য দুই-তৃতীয়াংশ করে দেওয়া যেত। লেখকের আগামী প্রয়াসেরও সর্বাঙ্গীণ সাফল্য কামনা করি।
ত্রিজিৎ কর। লেখালেখির জন্যে যে কোন বয়স নেই, তার প্রমাণ এই ভদ্রলোক। "প্রথম উপন্যাস হিসেবে লেখনশৈলী চলনসই" কিংবা "ডেব্যু উপন্যাস হিসেবে জড়তার পরিমাণ কম"- এরকম বাক্য প্রায়শই পাঠপ্রতিক্রিয়াকে দেখে থাকি। হয়তো আমি নিজেও বলেছি এক সময়। তবে বিষয়টা কি- যারা পারেন, তারা পারেনই। নাজিম ভাইয়ের "নেমেসিস" তার রচিত প্রথম উপন্যাস হওয়া সত্ত্বেও ছিল ভীষণ সুখপাঠ্য। বিট্টালিনীর ক্ষেত্রেও এই কথাটি প্রযোজ্য। যাদের এই ধারার রচনা(তারানাথ তান্ত্রিক, কালসন্দর্ভা, কালীগুণিন ) ভালো লাগে, তাদের বিট্টালিনী ভালো লাগারই কথা।
আমি পরিমার্জিত সংস্করণটি পড়েছি। সটীক সংস্করণ বলাটাই উচিৎ হবে বোধহয়। তন্ত্রের বেশ কিছু বিষয়াদির বর্ণনা ছিল টীকাগুলোয়, যা পড়ার আনন্দ বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণে। লেখকের আগামী বইয়ের জন্যে শুভকামনা।
ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণুমান জনপ্রিয়তা্র সম্মুখীন হতে হতে, শেষ পেরেকটি পড়ল ২০১৯ সেরার সেরা বার্ষিক সাহিত্য-সম্মানের আসরে। সুদীপ চক্রবর্তী রচিত “কালচক্রযান”-কে টেক্কা দিয়ে, নতুন লেখক অরিজিৎ ভদ্র সম্মানিত হলেন বরেণ্য পুরষ্কারে। ক্ষুব্ধ সুদীপ ধৈর্য ধরে রাখতে না পেরে মারমুখী হয়ে ওঠেন। অতঃপর ক্রোধ, ঈর্ষা, মাৎসর্যের আগুনে জ্বলতে জ্বলতে তিনি দ্বারস্থ হন ব্রহ্মানন্দ মহারাজের কাছে। “বেস্টসেলার” হওয়ার কাঙ্ক্ষায় লিপ্ত হন “ভ্রমযোগিনী বিট্টালিনী”র তন্ত্রসাধনায়।
বিস্তৃত আখ্যানে লেখক- পাঠককে নিয়ে গেছেন সুদীপ, ব্রহ্মানন্দ ও বিট্টালিনী-র অতীতে, যেখানে তারা একে-অপরের সাথে জন্মান্তরব্যাপীসুত্রে আবদ্ধ, সাথে উঠে এসেছে সুদীপের ফেলে আসা জীবনের ক্রুর ও ভয়ঙ্কর কিছু ঘটনার উল্লেখ। দীর্ঘ তিনপক্ষ বা পঁয়তাল্লিশ দিনের সাধনারত সুদীপের আরাধনায়, পরতে-পরতে উঠে আসে এক বিভীষিকাময় কাহিনী, তাঁর সাথে সংযুক্ত হয় বাকি সূক্ষ্ম “কি-কেন-কেরকম-কখন”এর উপাদান।
দশম শতাব্দীর কোন ‘স্থান-কাল-পাত্র’ দ্বারা বিট্টালিনী-পুজার সুত্রপাত হল? তাঁর নাম ও উপাচার গুহ্য কেন? তাঁর পুজা-পদ্ধতি কোন তন্ত্রশাখার অন্তর্গত? তাঁর বিগ্রহর অদ্ভুত আকারের কারন কি?
বেশ উপভোগ্য ও সুখপাঠ্য, সরল অথচ বীভৎসরসের ১৭১ পৃষ্ঠার নির্মেদ কাহিনী। তারানাথ তান্ত্রিক ও মাতঙ্গীর(ভোগ) রেফারেন্সে বেশ কিছুটা ফ্যানবয়িং করা গেল। সিকুয়েল-এর ইঙ্গিত যথাযথ ভাবে পরবর্তী কাহিনীর জন্যে পাঠককে উন্মুখ করে রাখবে।
আপাত ভয়ভীতি ছাড়িয়ে, দুচারটে সম্পাদকীয় ভুল/টাইপো চোখে পড়ল যা পরের সংস্করণে প্রকাশকরা ঠিক করে নিলে,বইটির মুল্য সঠিকভাবে পাঠকরা আদায় করতে পারবেন বলে আশা রাখি- ১। বিট্টালিনী সাধনার ইতিহাসকথনে একাদশ শতাব্দীর বদলে “একবিংশ” উল্লেখ। (প৩২) ২। ‘খোলসা’,’জাদু’,’ইশারা’ – ইত্যাদি শব্দ যা পাল সাম্রাজ্যের অন্তর্গত শাসনকালে দশম শতাব্দীর চরিত্রদের বাচনীতে ব্যবহৃত হয়েছে। এ সবই পারস্য/আরব্য জাত। (প৩৭-৩৮) ৩। মিসেস চক্রবর্তী/ভট্টাচার্য-র গোলমাল। (প৩৯-৪০) ৪। সৌরেন্দ্র শিখর/শেখর (প৭১)
প্রচ্ছদটি অপূর্ব। কিন্তু ব্যাক্তিগত ভাবে, পাঠ শেষ করে মনে হল, কাহিনীর সাথে প্রচ্ছদচিত্রর বিগ্রহটি ঠিক মিলল না। আর শুরুর বৃহদারণ্যক উপনিষদের উক্তিটি “ইংরেজি” পরিবেষনাও একটু খাপছাড়া লাগল। বাকি বাঁধাই, মুদ্রণ ও পৃষ্ঠার মান সুন্দর। গল্পের বুনট অতি-উপাদেয়। লেখককে অভিনন্দন।
বই - বিট্টালিনী লেখক - ত্রিজিৎ কর প্রকাশনা - খোয়াই পাবলিশিং হাউস বিনিম়য় - ২৩০ ভারতীয় মুদ্রা
আদিম রিপু একটা মানুষকে কিভাবে পশুর অধিক নিচে নামাতে পারে "বিট্টালিনী" উপন্যাসিকাটি না পড়লে অনেকটাই অজানা থেকে যেত। গল্পের শুরুতে আমরা দেখি সুদীপ চক্রবর্তী নামক এক অবসাদগ্রস্থ পড়তি লেখক নিজের হারানো সম্মান ফিরে পাওয়ার জন্য মরিয়া। দ্বিতীয় এবং সর্বশেষ রিপুর বশবর্তী হয়ে এহেন কাজ নেই যা সে করতে পারেনা। তারপর সুদীপ তার মর্যাদা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টায় গুরুদেব শ্রী ব্রহ্মানন্দ মহারাজের কাছে শরণাপন্ন হয়। তখন তার গুরুদেব উপদেশ দেন এতো কম সময়ের মধ্যে প্রভূত খ্যাতি ও যশ লাভ করতে হলে ভ্রমযোগিনী বিট্টালিনীর সাধনা করতে। এরপর পাঠককুলের সাথে পরিচয় হয় দেবী বিট্টালিনীর। তন্ত্রশাস্ত্রে এবং গ্রন্থে কোথাও এই দেবীর উল্লেখ নেই, যেন সযত্নে বাদ দেওয়া হয়েছে বিট্টালিনীর অধ্যায়টি। বজ্রযান শাখার এই ভয়ঙ্কর দেবীর একমাত্র বিশদে বিবরন দেওয়া আছে "বিট্টালিনী সাধনম" নামক এক জীর্ণ তালপাতার পুঁথিতে। লেখকের প্রশংসনীয় পোক্ত লেখনীতে বর্ণনা আছে ভ্রমযোগীনির বিস্তারিত বিভীষিকাময় ভয়ঙ্কর সাধনা পদ্ধত���র। আমি গল্পের পরবর্তী ঘটনার বিবরণ দিয়ে বাকি পাঠকদের আসল গল্পরস থেকে বঞ্চিত করব না। গল্পের প্লট শিলাবৎ মজবুত, যেটা মূলত দুটি ধারায় অতিবাহিত হয়ে শেষে মিলেমিশে এক হয়ে গেছে। গল্পের বাঁধনে অতীব সুদক্ষ শিল্পীর পরিচয় পাওয়া যায়। প্রয়োজনীয় তন্ত্রবিশারদ তথ্য গুলির সাথে অতীতে ও বর্তমানে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলির চমৎকার মেলবন্ধন লক্ষ্য করা যায় l আমার ব্যক্তিগত মতামত অনুযায়ী সুবিশাল তথ্যের জন্য মূল গল্পের প্রবাহে কোথাও একটু বাঁধার সৃষ্টি হয়েছে কিন্তু সেটা একদমই নগন্য বলা যেতে পারে, কিছু জায়গায় অত বিস্তারিত তথ্য একটু অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হল। তবে একটা কথা আছে না, জাদুকরের শ্রেষ্ঠ ম্যাজিকটা আসে একদম শেষে, এই গল্পে আমরা সেরকমই কিছু আবিষ্কার করি। গল্পটি একদম শেষ অধ্যায়ের আগে অবধি পড়েও আমার এই ভ্রমযোগিনী যাকে নিয়ে এতো মাতামাতি, তাকে ক্রুর ও পিশাচিনী মনে হয়েছিল। কিন্তু এখানেই লেখকের মাস্টারস্ট্রোক, উনি শেষ ১০ পাতায় সেই পিশাচিনী কে সাক্ষাৎ মাতৃতুল্য দেবীর পর্যায়ে উন্নীত করেছেন। এতো সুন্দর ভাবে শেষে সঙ্গতি বিধান করেছেন যে দীনেশ কার্তিকের বাংলাদেশের বিরুদ্ধে শেষ বলে ছক্কা মেরে জেতানো খেলাটার কথা মনে পরে গেল।
পরিশেষে বলি, যারা তন্ত্রনির্ভর বই আগে কখনো পড়েননি বা কম পড়েন তাদের জন্য লেখক অনেক পরিশ্রম করে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর টীকাকরন করেছেন, যেটা অবশ্যই প্রশংসনীয় এবং বিরাট করতালির যোগ্য। এই বইয়ের প্রতিটি পাতায় এতো তথ্যের সমারোহ সেটা চাক্ষুষ করলেই বোঝা যায় যে লেখক কতটা সময় ব্যয় করে পড়াশোনা করেছেন। শুধুমাত্র ওম গুগুলায় নমঃ না করেও যে গল্প লেখা যায় সেটা "বিট্টালিনী" আবারও প্রমাণ করে দিল। লেখককে অনেক সাধুবাদ জানাই এইরকম একটা তন্ত্ররসে পরিপূর্ণ রোমাঞ্চকর উপন্যাসিকা পাঠকমহলে নিবেদন করার জন্য। অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষারত মহারাজের আর এক শিষ্য তপেনের কার্যকলাপ প্রত্যক্ষ করার জন্য। আপনার কলমের ধার এভাবেই শাণিত থাকুক। পরবর্তী কালে এরকম আরও লেখনী পাওয়ার আশা রইল। ধন্যবাদান্তে - অর্পণ
খুব ভালো লেগেছে বইটা পড়ে, একজন নামকরা লেখক হঠাৎই অজনপ্রিয় হতে শুরু করলেন, তার চেয়ে বয়সে নবীন লেখকরা তার চেয়ে বেশি জনপ্রিয় হতে শুরু করলো, লেখকের রচিত 'কালচক্রযান' উপন্যাসটি গুনিজনদের প্রশংসা লাভ করলেও পাঠকমহলে সেভাবে জনপ্রিয় হলো না, অস্তিত্বের সংকটে পড়েই লেখককে তার গুরুর কাছে যেতে হলো, গুরু জানালেন বৌদ্ধধর্মের ত্রিরত্ন সাধনায় এক দেবী আছেন যার সাধনা করলে অমিত খ্যাতি লাভ করতে পারা যায়, তার নাম বিট্টালিনী। তাকে ভ্রমযোগিনী বলেও ডাকা হয়, তবে দেবীর সাধনায় একটু ভুল হলে মারাত্মক বিপদ, সাধকের নানারূপ ভ্রম হয়ে থাকে, এই সাধনার সময়, যেমন কেউ হয়তো ঘরে ঢুকলো কিণ্তু দেখলো যে সে বারান্দায় চলে এসেছে, বা স্নানঘরে এসে শুয়ে আছে, বিট্টালিনী আসলে কে? তার পায়ের আঙুলেরই বা বিশেষত্ব কি? এর সাথে জড়িয়ে আছে পাল যুগের বৌদ্ধ ধর্মের কোন ইতিহাস? সে কি সাধনায় সিদ্ধিলাভ করতে পারলো? জানতে হলে পড়তে হবে ত্রিজিৎ করের 'বিট্টালিনী '
This entire review has been hidden because of spoilers.