তিন হাজার কবিতা লিখে মাত্র ১৬২টি কবিতা বইভুক্ত করে তিনি মারাই গেলেন।
বেশ অনেক দিন পর জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে লেখা একটা বই পড়তে এতই আরাম লাগল যে আজ দুপুর-বিকাল একটানা পড়েই শেষ করলাম জীবনানন্দ- গবেষক গৌতম মিত্রের ‘পাণ্ডুলিপি থেকে ডায়েরি, জীবনানন্দের খোঁজে’। বেশ অভিনবত্ব আছে প্রকাশনায়, আছে দুর্লভ সব তথ্য আর গুটিকয়েক দুর্লভতর আলোকচিত্রের সন্নিবেশন। কবি পূর্বপুরুষদের থেকে শুরু করে বছরের পর বছর লিখে যাওয়া ডায়েরি ও আবার সেই নিত্যকার জীবনের ডায়েরীর সাথে তখন লেখা পাণ্ডুলিপি মিল ও অমিল, কবির বেড়ে ওঠা, তাঁর নানা সৃষ্টি ইত্যাদি মিলিয়ে লেখক অসাধারণ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন মানুষ ও কবি জীবনানন্দকে ছোঁয়ার জন্য এক ভক্তের আকুতি।
‘যারা বলেন জীবনানন্দ দাশের গল্প অসম্পূর্ণ, অসংলগ্ন, প্লটহীন- তারা ঠিকই বলেন। এটাই জীবনানন্দ দাশের বিশ্ব। এটাই তাঁর যোগাযোগের এসথেটিক। কিনার ঘেঁষে।‘
মাত্র ২১৪ পাতার, স্বাভাবিক আকৃতির চেয়ে একটু ছোটই বইটা। তাঁরও অনেক অনেক পাতা জুড়ে কবির দিনলিপি, নানা হিসেব, তারপরেও কবির জগত নিয়ে জানার আগ্রহ ও মমতা চোখে পড়ে। এসেছে তাঁর শিশুকাল, চাকরি, গোপন প্রেম, অসুখী দাম্পত্য জীবন, আসামে মামার বাড়িতে ভ্রমণ, বুদ্ধদেব বসু এমন জানা অজানা সকাল অধ্যায়।
জানা গেল বুদ্ধদেব বসু কবির বই ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ প্রকাশের জন্য খুলে ফেললেন এক প্রকাশনা সংস্থা ‘কবিতা ভবন’, কার কেউ উনার বই ছাপাতে রাজী হচ্ছিল না।
স্ত্রী লাবণ্য দাশের বলা ‘ উনি যে চাকরি পেতেন না তা নয়। উনি চাকরি করতে চাইতেন না। বারবার বলতেন, বলো তো কি নিদারুন সময়ের অপচয়, বড়ো ক্ষতি হয়।‘ এসেছে কবির পাঠাভ্যাস, কবির মৃত্যু, তাঁর পছন্দ – অপছন্দ ইত্যাদি। জীবনানন্দ ভক্ত হিসেবে অপেক্ষায় আছি কিছুদিন আগে প্রকাশিত বইটির ২য় খন্ড পড়বার আশায়।
বইটি প্রকাশ করেছে কলকাতার ঋত প্রকাশন, দাম ৩২৫ ভারতীয় রূপী।
কুড়ি বছর ধরে জীবনানন্দ গবেষণায় মেতে থাকা দূরের বন্ধু গৌতম মিত্রকে এই অমূল্য কাজটি করবার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ, আশা করি ৩য় খন্ডও আমরা পাব অচিরেই।
গৌতম মিত্র জীবনানন্দ গবেষক হিসেবে বহুল পরিচিত ও সমাদৃত। উনার জীবনানন্দ ও তাঁর সাহিত্য নিয়ে অবসেশন ফেসবুক থেকে জানতে পারি। সম্প্রতি ইজেল ঈদসংখ্যায় তিনি উপন্যাস লিখেছেন জীবনানন্দ কে নিয়ে।
এককভাবে বইটি বেশ মূল্যবান; সুলিখিত ও তথ্যবহুল লেখা। জীবনানন্দ কে গভীরভাবে বোঝার জন্য বইটি সহায়ক। জীবনানন্দের জীবন ও সাহিত্য সম্পর্কে নানান উপলব্ধি সৃষ্টি করবে। সৃষ্টির কিনারে যে অস্পষ্ট কুয়াশার কথা জীবনানন্দ বলতেন তাতে তিনি কিভাবে নিমগ্ন ছিলেন সেই কথা টের পাওয়া যাবে বইটি পড়লে। গৌতম মিত্রের কাছে জীবনানন্দের গল্প ও ডায়েরীর মূল পাণ্ডুলিপি থাকায় এমন অনেক কিছু লিপিবদ্ধ করেছেন যা অদৃষ্টপূর্ব। গৌতম মিত্রের লেখনী আকর্ষণীয়। সাহিত্যকে তিনি জীবন থেকে আলাদা করে দেখেন না বলে তাঁর লেখায় কবিতার পঙক্তি চোখের মিশে থাকা কুয়াশায় একীভূত হয়ে যায়।
জীবনানন্দ দাশ কে গভীর বোধের সাথে উপলব্ধি করতে এই বই ভীষণ সহায়ক। তবু আমি জীবনানন্দ কে দেখলে গভীর মনোবেদনায় বলি - ' তোমাকে আমি ছুঁতে পারিনি! '।
পরিশ্রমলব্ধ কৌতূহলোদ্দীপক লেখা। ব্যক্তি ও সাহিত্যিক জীবনানন্দকে জানতে এ বই নিঃসন্দেহে সাহায্য করবে। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে জীবনানন্দ বিষয়ক কোনো বই পড়ে নতুন তথ্য বা আনন্দ পাচ্ছি না তেমন। পরের খণ্ড পড়ে জীবনানন্দ বিষয়ক সাহিত্য পড়ায় ইতি টানতে হবে।
জীবনানন্দ দাশের বাবা সত্যানন্দ দাশের ডায়েরি লেখাক অভ্যাস ছিল। তিনি তাঁর ডায়েরিতে তাঁদের পরিবার টাকে " আর্টিস্ট ফ্যামিলি" হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁদের পরিবারে কারা 'আর্টিস্ট' তার সবিস্তার বর্ণনা করেছেন।
জীবনানন্দ দাশ ও ডায়েরি লিখেছেন। সেই ডায়েরি ও পান্ডুলিপি নিয়ে গৌতম মিত্রের গবেষণাধর্মী এই বই " পান্ডুলিপি থেকে ডায়েরি জীবনানন্দের খোঁজে "। বহুল তথ্য বহুল এই বই। জীবনী নয় তবে জীবনের নানা অধ্যায়, অনেক ভুল তথ্যের সত্য টা এখানে মিলেছে। তাঁর সাহিত্য জীবন ও ব্যক্তিগত জীবনের নান উপলব্ধি এখানে উঠে এসেছে। তাছাড়া কবিতা ও জীবনের সঙ্গে কবির জীবন কেমন ভাবে মিলেমিশে ছিল তার সুক্ষ্ম এক বিশ্লেষণ এখানে দেখা যায়।
জীবনানন্দ দাশের সব পান্ডুলিপি যেমন পাওয়া সম্ভব হয় নি, তেমনি ডায়েরি বা পান্ডুলিপি বিশ্লেষণ করে কবিকে পুরোপুরি ভাবে বিশ্লেষণ করাও সম্ভব হয়নি। তবে লেখক গৌতম মিত্রের গবেষণায় ভিন্ন ভাবে জীবনানন্দ দাশকে দেখার সুযোগ হয়েছে। দুই খন্ডের অসাধারণ এক বই।
এি জীবনানন্দের খোঁজ আমি আগে কেন পেলাম না? আমি আমার পাঠক জীবনে জীবনানন্দ দাশকে শুধু কবি হিসেবেই জেনেছি। কিন্তু এই জীবনানন্দ দাশ ্যেন আলাদা এক সত্তা, অদ্বিতীয়। বইটা অবশ্য পাঠ্য।