কফিনের ভেতরে সায়ানাইড ফুলের গন্ধে আরিমাতানোর সমস্ত জীবন পুনঃপ্রদর্শিত হতে শুরু করলে সে দেখতে পেয়েছিল বারবার এড়িয়ে যেতে চাওয়া সত্যটা কী গভীর ব্যাপ্তি রেখেছে তার জীবনে। এমনও হতে পারত, আরিমাতানোর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে তার বাবা-মা শিশিরের শব্দ দিয়ে তাকে ডেকে তুলত অনন্ত ঘুম থেকে। আরিমাতানো শিশিরের শব্দ শুনে জেগে উঠে বলত, আমাকে একটু আলো এনে দাও। দাদী তখন ছুটে গিয়ে ধরে নিয়ে আসতেন একদল জোনাকি। জোনাকির আলোতে আরিমাতানো দেখতে পেত, তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে কাছের মানুষেরা যাদের হাতভর্তি ফুল। আরিমাতানো হাসত আর আরিমাতানোর হাসিতে ফুল থেকে ঝরে ঝরে পড়ত মুক্তো। ক্যাম্পাস জীবনের শুরুতেই একটা প্রেম হয়ে গেলে জীবনের মানে খোঁজার আগেই পেয়ে যেত জীবনের অর্থ, মনের ভেতরে পড়ত না অন্য মনের মায়া। হয়তো নিজের ছায়ার সঙ্গে কথা বলতে বলতে আরিমাতানো একদিন আবিষ্কার করত, আয়নায় যা দেখা যায় তা আসলে সত্যি নয়। এসবের কিছুই ঘটেনি। বরং জীবনের অর্থ খুঁজতে গিয়ে, পালাতে গিয়ে, আরিমাতানো বুঝতে পেরেছিল বাইরে থেকে যা দেখা যায় তা হয়ত আয়নার কোনো অংশ; যেগুলো দেখতেই শুধু একরকম, ভেতরে তার দ্বন্দমুখর মাদকতা। আরিমাতানো বুঝতে পেরেছিল, সে আসলে মানুষ হতে পারেনি।
মাহবুব ময়ূখ রিশাদের জন্ম ১৯৮৮ সালের ৩০ জুন। ২০০৫ সাল থেকে লেখালেখি শুরু করেন। প্রথম বই প্রকাশিত হয় ২০০৮ সালে। লেখকের পছন্দের জায়গা জাদুবাস্তবতা। প্রিয় লেখক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ ও শহীদুল জহির। ব্যক্তিজীবনে চিকিৎসক রিশাদ অর্জন করেছেন ইন্টার্নাল মেডিসিনের সর্বোচ্চ ডিগ্রি এফসিপিএস। পড়াশোনা করেছেন ময়মনসিংহ জিলা স্কুল, নটর ডেম কলেজ, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে।
জাদুবাস্তবতা, দর্শন, বিষণ্নতা দিয়ে মোড়ানো উপন্যাস 'আরিমাতানো'। উপন্যাসটি পড়ার পুরোটা সময় জুড়েই কেমন যেন অদ্ভুত এক ঘোরলাগানো ভালোলাগায় আচ্ছন্ন হয়ে ছিলাম, পড়া শেষে স্তব্ধ হয়ে বসেছিলাম কিছুক্ষণ। এই বইয়ের পাঠ প্রতিক্রিয়া জানাতে তাই কথাসাহিত্যিক হামিম কামালের কথার সুর ধরেই বলতে হয়, 'এটি সেইসব উপন্যাসের একটি যেগুলো কোনো ভাষার সাহিত্যকে প্রাচুর্যময় নতুন যুগে পৌঁছে দিতে গোপনে লেখা হতে থাকে।' মাহবুব ময়ূখ রিশাদ মূলত গল্পকার হিসেবে তুলনামূলক বেশি পরিচিত। 'আরিমাতানো' তার প্রথম ও এখনো পর্যন্ত একমাত্র উপন্যাস। তার ছোটগল্প পড়ার জন্য মুখিয়ে রইলাম।
" মানুষের একার, নিজের গল্পগুলো আসলে কাউকে বোঝানো যায় না। বাইরে থেকে গল্পের ভিন্নতা তেমন থাকেনা অথচ ভেতরে মহাকাব্যের গল্পের মতো দ্বন্দমধুর মাদকতা।"
আরিমাতানো ভাষাগত সৌন্দর্যে ভরপুর কিন্তু কাহিনীর দিক থেকে সামঞ্জস্যহীন এক অদ্ভুত উপাখ্যান। লেখকের গল্পকার সত্তা উপন্যাস সত্তা কে এগিয়ে যেতে দেয়নি।বইটি ক্যাম্পাস জীবনের রাজনীতি, জীবনের বিপন্ন বিস্ময়, নির্জনতার বিষাদময়তার আশ্চর্য সুন্দর উপাখ্যান হতে পারতো। জাদুবাস্তবময় অংশটি এককভাবে ভীষণ সুন্দর কিন্তু মূল গল্পের তালতো ভাই হবার যোগ্যতা ও তার নয় বলে কিসের মধ্যে কি পান্তাভাতে ঘি অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয় পাঠককে। শুধুমাত্র গদ্যের কাব্যিকতা,দার্শনিক উপলব্ধি আর সুখপাঠ্যতার জন্য খাপছাড়া এই বই একবার পড়া ডিজার্ভ করে।কিন্তু উচ্চাভিলাষী দারুণ কিছু পড়তে গিয়ে হতাশ হবার কারনে আমার মেজাজ বেশ খারাপ হয়েছিলো।
"শৈশব এক আশ্চর্য বিস্ময়, চিন্তাভাবনাহীন ফড়িংদিন। মানুষ সেই দিনে ফিরতে চেয়ে আরও দূরে যেতে থাকে। একসময় এতোটাই দূরে চলে যায় যে শৈশব কেবল জোনাকির মতো জ্বলে আর একদিন আচমকা সব নিভে যায়।"
কোন বই পড়া শুরু করার কয়েকটা পেজ পড়ার মধ্যে বলতে পারেন আপনার বইটা কেমন লাগবে? আমি মাঝে মাঝে বলতে পারি, মাঝে মাঝে পারিনা। তবে এই বইটা শুরু করার মূহুর্তেই আমি বুঝে ফেলেছিলাম যে বইটা আমার অসম্ভব ভালো লাগবে এবং ভালো লেগেছেও।
জাদুবাস্তবতা আর মেলানকোলিয়া দিয়ে মোড়ানো আরিমাতানো বইটা। লেখক এখানে নিজের তিনটা নামই ব্যবহার করেছেন আরিমাতানোর বন্ধুদের নাম হিসেবে। এই ব্যাপারটা আমার অনেক ভালো লেগেছে। বইটা কি সম্পর্কে এটা কয়েকটা লাইনে বলে বুঝানো যাবেনা, আরিমাতানোর গল্প অনেক বিস্তৃত। তারজন্য বইটা আপনাদের পড়তে হবে। মাঝখানে ছাত্র রাজনীতি নিয়ে আসার বিষয়টা ইমতিয়ার শামীমের একটা বইয়ের সাথে খুব মিল পাচ্ছিলাম, কিন্তু এন্ডিংটা আবার অন্যরকম অনূভুতি দিলো।
কবি ও গল্পকার নাহিদ ধ্রুব-র বইটা নিয়ে একটা মন্তব্য বেশ ভালো লেগেছে -- "যে জাদুর কৌশল ধরা যায় না, সে জাদুতে থাকে ভয়মিশ্রিত বিস্ময়। জীবনানন্দ বিস্ময়ের আরেকটা নাম দিয়েছিলেন বিপন্ন বিস্ময়। আরিমাতানো পড়তে পড়তে মনে হলো আমি হেঁটে যাচ্ছি এই দুই বিস্ময়ের পথ ধরে গাঢ় বিষণ্ণতার দিকে।"
লেখকের আগে একটা ছোট গল্পের বই পড়ার সুযোগ হয়েছিল, আরিমাতানোই তার একমাত্র উপন্যাস।লেখকের আরো কিছু বই পড়ার ইচ্ছা আছে। এই ২০২১ সালটা আমার বই পড়ার জন্য একটু অন্যরকম যাচ্ছে, অনেক নতুন লেখক আবিষ্কার করা হয়েছে এবং তাদের চমৎকার কিছু বই পড়ার সুযোগ হয়েছে। আরিমাতানো বেস্ট বইগুলোর মধ্যে একটা থাকবে নিঃসন্দেহে।
"আরিমাতানো" প্রথমবার পড়েছি ২০২১ এর জুন মাসে। শুরু থেকেই এতো সুন্দর!! আরিমাতানো মারা গেছে। তার গল্পই আমরা শুনি। ক্যাম্পাস রাজনীতির বিষয়টা যে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোকে রচিত এটা পড়লে যে কারোরই বুঝতে পারার কথা। সাথে আরিমাতানোর জন্মরহস্যটাও বেশ প্রহেলিকা ও কৌতূহলের সৃষ্টি করে। কিন্তু..
কিন্তু বইটা হুট করেই শেষ হয়ে গেলো। আরিমাতানো খুন হোলো। খুনের জন্য উপযুক্ত পটভূমি তৈরি হোলো না, সরাসরি কীসের প্রেক্ষিতে মারা গেলো তাও বোধগম্য হোলো না, তবে সে নিশ্চিতভাবেই মারা গেলো। গল্পের যে জাদুবাস্তবতার অংশ, সেটার সাথে আরিমাতানোর বর্তমান অবস্থান ও মৃত্যুর সম্পর্ক দুর্বোধ্য ও অস্পষ্ট। অস্পষ্টতা দূর করতে এবছর বইটা আবার পড়েছি কিন্তু কিছুই স্পষ্ট হয়নি। স্পষ্ট হওয়ার জন্য উপন্যাসের যে বিস্তৃতির প্রয়োজন ছিলো তার অনেক আগেই গল্পটা থমকে গেছে।
ব্যক্তিগতভাবে আমার ধারণা, "আরিমাতানো"য় লেখকের ঔপন্যাসিক সত্ত্বার সাথে গল্পকার সত্ত্বার একটা বিরোধ ঘটেছে। না হয় এ কাহিনি ১০০ পাতার মধ্যে শেষ হওয়ার কথা না। এতো চমৎকারভাবে এগোচ্ছিলো গল্পটা!!
এক ধরণের জাদু আছে যার কৌশল সকলেই জানে, তবু দেখতে ভালো লাগে। আরেক ধরণের জাদু আছে যার কৌশল কেউ জানে না। দ্বিতীয় জাদুতে থাকে ভয় মিশ্রিত বিস্ময়। জীবনানন্দ বিস্ময়ের আরেকটা নাম দিয়েছিল বিপন্ন বিস্ময়। এই বিস্ময় নিয়ে অনেক ভেবে দীর্ঘকাল ক্লান্ত ছিলাম। Mahbub Mayukh Rishadএর উপন্যাস 'আরিমাতানো' পড়তে পড়তে সে বিস্ময়ের সাথে দেখা হলো। দুটো জাদু যেন এক হয়ে গেলো। একবার মনে হয় এই কৌশল তো জানি, একবার মনে হচ্ছে এই কৌশল কখনওই জানা সম্ভব না। তবে, এটা নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি এটা জাদু। খুব সুন্দর একটা জাদু।
সাহিত্যে জাদুবাস্তবতা আমার প্রিয় একটা ঘরানা। কিন্তু বাংলাদেশী লেখকদের মধ্যে হাতেগোণা ক'জন বাদে খুব কমই এই ধারায় লেখেন। আরিমাতানোয় জাদুবাস্তবতা মিনিমাল হলেও ওই অংশটুকুই টেনেছে বেশি৷ মুরাকামির এই ধরণের উপন্যাসগুলো যেরকম বিষাদ উপজীব্য, আরিমাতানোও সেরকম। বিষাদ-স্মৃতিচারণ-আক্ষেপ-ছাত্র রাজনীতির মেলবন্ধন।
ভাষা আর শেষ অধ্যায়ে আরো সুচারুতার দাবি থেকে যাওয়ায় নম্বর দিতে একটু অসুখী কার্পণ্য করতে হলো। তারপরও লেখক যেভাবে নিজেকে অনেক ভাগে বিভাজিত করে একটা ফ্রয়েডীয় খেলা খেলেছেন (ইড, ইগো, সুপারইগো) যে খেলা আমাকে আনন্দ দিয়েছে, চমেক ক্যাম্পাসের অনন্য ছাত্ররাজনৈতিক সংকটসময়ের গল্প শুনিয়েছেন যে গল্প আমাকে শিহরণ দিয়েছে, গোটা ছবিটা এঁকেছেন অধিবাস্তব তুলিতে যে অধিবাস্তবতার প্রতি আমি চূড়ান্ত দুর্বল; তাতে এ বই আমার সবসময়ের প্রিয় বইগুলোর তালিকায় উঠে গেছে। বলতে লোভ হচ্ছে, আমি এই বইয়ের গর্বিত প্রাকপাঠকদের একজন।
"আরিমাতানো" শেষ করলাম পড়ে। একটা বিষন্নতা ঘিরে ধরেছে। অদ্ভুত একটা গল্প। জাদুবাস্তবতা,প্রেম,ছাত্র রাজনীতি সব কিছুর মিশেলে একটা মোহময় গল্প। গল্পের শুরুটা হয় আরিমাতানোর মুখে,শেষ হয় তার মিলিয়ে যাওয়া দিয়ে।
লেখকের একটা গল্প গ্রন্থ পড়েছিলাম আগে। এরপর পড়লাম "আরিমাতানো"। আমার ভালো লেগেছে। উনার লেখায় একটা বিষন্নতা মাখানো থাকে। উনার দর্শনগুলো আমাকে খুব প্রভাবিত করে,ভাবায়।
অযথা বাংলা শব্দের পরিবর্তে ইংরেজি শব্দ ব্যাবহারের পক্ষে নই আমি। কিছু কিছু শব্দ আছে, যেগুলো অহরহ বাংলায় লেখলে লেখার অন্তরঙ্গতা, ভাষাগত সৌন্দর্যে তেমন প্রভাব পড়ে না। কিন্তু যদি অতি সাধারণ শব্দ গুলোকে (সমস্যা, আশ্চর্য, অন্তহীন) ইংরেজিতে (প্রবলেম, স্ট্রেঞ্জ, অ্যাটার্নাল) লেখা হয়, তবে সেটা গল্পের ভাষাগত সৌন্দর্যে প্রভাব ফেলে। যেটা এই বইয়ে লক্ষণীয়। লেখকের লেখনী নিঃসন্দেহে সুন্দর। তবে এই ভুলটা সেই সুন্দরটাকে একটু হলেও ফিকে করে দিয়েছে (অন্তত আমার মতে এটা ভুল)।
যাইহোক, এটা আসলে আরিমাতানোর স্মৃতিচারণ টাইপের গল্প। গল্পের প্রেক্ষাপট একটা মেডিকেল কলেজ। ছাত্র রাজনীতি। আর আরিমাতানোর অতীত। তবে গল্পের লক্ষ্য তার জীবন রহস্য নিয়ে।
"চোখের পলক ফেলার মুহূর্তের মধ্যেই জীবনটা থেমে গেলো স্থবিরতায়। আমি কী পা পিছলে পড়ে গিয়েছিলাম? আমাকে কী কেউ ধাক্কা দিয়েছিল্ল, নাকি নিজেই বেছে নিয়েছিলাম সেচ্ছাপতন? উত্তরটা বদলে দিবে না কিছুই। এই নিরর্থকতা এতটা অসহায়ত্বের, আগে বুঝিনি এটা।"
ঠিক এই প্রথম প্যারাটাই বইয়ের মূল চালিকাশক্তি। এই বাক্যের টানেই যে কেউ পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উলটে যাবে। আর কী ন্যারেটিভ! একজন মৃতকে দিয়ে গল্প বলিয়েছেন লেখক, দেখিয়েছেন ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি-জীবনের অলি-গলি। বইয়ে লেখক আপনাকে ঘুরিয়ে আনবে আরিমাতানোর মনস্তত্ত্বে, নিয়ে যাবে তার অতীতে। অনুভব করাবে তার একাকিত্ব, নিঃসঙ্গতা। বইয়ে বেশ কিছু টুইস্টও ছিলো। লেখক বইটাকে আরও বড় করতে পারতো, আরও ডিটেইলড হতে পারতো। তবুও মুরাকামি স্টাইলের নিঃসঙ্গতা, বিষন্নতা, হালকা জাদুবস্তবতার মিশেলে মাহবুব ময়ূখ রিশাদের প্রাঞ্জল লেখনীতে বেশ উপভোগ্যই ছিলো বইটা।
কাহিনীর অধিকাংশ জুড়ে আছে ক্যাম্পাসের ছাত্ররাজনীতি। বইটায় দেখার বিষয় তা না। যাদুবাস্তবতা আছে। বাংলাদেশে অল্প লেখকই যেটার সার্থক ব্যবহার করতে পেরেছেন। তাও মূল না, এই বইয়ে। 'আরিমাতানো'র সৌন্দর্য তার লেখার ধাঁচে। কবিতা-সুলভ শব্দসজ্জার বাক্যগঠনে। আর নিতান্ত সাধারণ, যাদুহীন জীবনেরও পুরোভাগে মানুষ নিজেকে খোঁজার যে অস্থিরতায় ভুগে, সেরকম একটা নিঃসঙ্গ বিষন্নতায় মুড়ে দেওয়া হয়েছে উপন্যাসকে। যার কারণে, উচ্চারিত না হলেও সেই বিষন্নতার বোধ আপনাকে আবিষ্ট করে রাখতে পারে পড়ে যাবার পুরো সময়টায়। লেখকের নিজের ছন্দে বর্ণনা করার খামখেয়াল উপভোগ করেছি। খুব বেশি সন্তুষ্ট হয়েছি বলতে পারব না, তবে সত্যিই আরিমাতানো এমন একটা লেখা, যে ধারা টিকে থাকলে একটা নতুনত্ব আনতে পারে সাহিত্যের দৃশ্যপটে।
একটা গল্পের বই পড়ে দেখব লেখকের, তাও ভাল না লাগলে আর কখনো পড়ার আগ্রহ থাকবে না।
মূল আখ্যান, যেটি বইয়ের বেশিরভাগ জুড়ে, সেটি খুবই সাদামাটা। তবে জাদুবাস্তবতার অংশটুকু বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। এদিকে উপন্যাসের চরিত্রগুলো যেন প্রাণ পায়নি। কিছু চরিত্রের মৃত্যু আর এসব মৃত্যুর ফলে কথক আরিমাতানোর বিষাদগ্রস্ততা মন ছোঁয়নি। আরিমাতানোর জন্ম নিয়ে শুরু থেকে যে রহস্য ঘনিয়ে উঠেছিল, তা জানার জন্যেও কোনো তাড়া অনুভব করিনি। লেখকের গদ্যভাষা ভালো। তবে প্রায়শ বাক্যের মধ্যে শব্দ আগুপিছু করে ভিন্নতা আনার ব্যাপারটা পছন্দ হয়নি। যেমন, ‘সারারাত হয়নি ঘুম’ বা ‘মিতাকে করে নিয়েছিলেন আপন।’ এ রকম আরও অনেক। এটা কি কোনো প্রকার নিরীক্ষা? আমার কাছে পরিচিত ও প্রচলিত ধরনের বাক্যের মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ এমন বাক্য বেখাপ্পা ঠেকেছে।
সব মিলিয়ে পাঠ-অভিজ্ঞতা ভালো না হলেও হতাশাজনক নয়। বইটি পড়ার সময় রেখে দিতে মন চায়নি (বাজে বই পড়ার ক্ষেত্রে যেমনটা হয়), একটানা পড়েছি। আবার শেষ করে মনে হয়নি সময় নষ্ট হয়েছে কিংবা না পড়লেই পারতাম। আর এজন্য ‘আরিমাতানো’কে মাত্র দুই তারা দেওয়া সত্ত্বেও ভবিষ্যতে লেখকের অন্য কোনো বই হাতে তুলে নিতে সমস্যা হবে না।
বইটা শেষ করার পর এই একটা শব্দই মাথায় খেলছিল। আরিমাতানোর নিঃসঙ্গ বেড়ে উঠা, তার দাদা-দাদী, মেডিকেল জীবন, স্টুডেন্ট পলিটিক্স- এই সবকিছু মিলিয়ে যে খানা পাকিয়েছেন রিশাদ সাহেব তা যথেষ্ট উপাদেয়। বিষাদাক্রান্ত আখ্যান, কিন্তু ভালো।
মূল কাহিনী সাদামাটা এবং রিয়ালিস্ট ঘরানার। এর সাথে পরাবাস্তব অংশটি যদি যথাযথ ব্লেন্ড হতো, তাহলে চমৎকার ব্যাপার দাঁড়াতো। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, তা হয় নি। দুটি আলাদা কাহিনী মনে হয়েছে।
গল্পটা যেখান থেকে শুরু হইছিল, শেষটার ইঙ্গিত সেখানে ছিল। তবে আমি শুরু আর শেষটা বাদ দিয়ে মাঝের মূল গল্পটাই বেশি পছন্দ করলাম। মেডিকেল কলেজ, ইউনিভার্সিটিগুলোর রাজনীতি, নতুন স্টুডেন্টদের স্বপ্ন এসব মিলায়ে দারুণ একটা গল্প। ভাষা এক্সপেরিমেন্টাল। কিছুটা জাদুবাস্তবতা, কিছুটা মনোলগ মিলায়ে ভিন্ন একটা স্বাদ।
আপনার অতীত কী? অতীত বলতে আমি আপনার বংশবৃদ্ধির গোড়াপত্তনের কাহিনি বুঝিয়েছি। কোথায় থেকে এসেছেন আপনি? আপনার সৃষ্টির রহস্য জানেন? মৃত্যুর পর বদ্ধ কফিনের ভাষা জানেন? যে ভাষায় গল্প বলা হয়, গল্প লেখাও হয়। যদি না জানেন বা কখনও জানার অভিজ্ঞতা না থাকে তবে ❛আরিমাতানো❜ উপন্যাসিকা আপনাকে সেই অজানার গল্প জানাবে। পড়তে চান কীভাবে বদ্ধ কফিনে শুয়ে নিজের জন্ম রহস্যের বৃত্তান্ত বলছে আরিমাতানো? আরিমাতানো! হ্যাঁ, এই আরিমাতানো এক যুবকের নাম। যে জীবিত থাকাকালীন জন্মের রহস্য খুঁজে হয়রান হয়েছে; তা-ও জেনেছি কি না অতর্কিত মৃত্যুর সন্নিকটে এসে? বন্ধুত্ব, ��্যাম্পাস জীবন ও ছাত্ররাজনীতির গ্যাঁড়াকলে ডুবে থাকা অদ্ভুত এক যুবকের গল্প। কী এত রহস্য, কেন এত ম্লানতা আরিমাতানোর জীবনে?
জাদুবাস্তবতার মোড়কে দর্শন, বিষণ্ণতা, উপলব্ধি ও বাস্তবতায় মোড়ানো ❛আরিমাতানো❜ উপন্যাসিকা। চিন্তার খোরাকে তা দেওয়ার জন্য যেন এই উপন্যাসিকার জন্ম৷ গতানুগতিক প্লট থেকে পৃথক হয়ে, মোলায়েম লেখনশৈলী দিয়ে চক্রান্তজালে আবদ্ধ করে লেখা ছিমছাম দারুণ এক গল্প। গল্পের শুরু থেকে শেষ হওয়া পর্যন্ত প্রত্যকটি পর্বের বর্ণনা যেন সজীবতার পরশ বুলিয়েছে মস্তিষ্কের কোষে। লেখক উক্ত উপন্যাসিকায় আরিমাতানো ছাড়াও অন্যান্য চরিত্রে ব্যবহার করেছেন নিজের তিনটি নাম। তিনটি নাম হচ্ছে আরিমাতানোর তিনজন বন্ধু! নামগুলো হচ্ছে—মাহবুব, ময়ূখ, রাশিদ! দারুণ না? আরও দারুণ তো অবসানের শেষ দিকের টুইস্টগুলো। কী জানতে চান সেটা? তাহলে দেরি কেন? দ্রুত কিনে পড়ে ফেলুন।
❛আরিমাতানো❜ প্রচ্ছদ দুর্দান্ত লেগেছে। নামলিপি ইউনিক। তবে প্রোডাকশনে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। তার আগে বলতে হয়, সম্পাদনা ও প্রুফিং নিয়ে। এদিকে আরেকটু মনোযোগী হওয়া দরকার ছিল, কিছু টাইপো বাক্যে ঝামেলা পাকিয়েছে। প্রোডাকশনের ফন্টের সাইজ ছোটো, কিছু পৃষ্ঠায় কালি কমের কারণে পড়তে অসুবিধা হয়েছে। সংলাপে (“ ”) উদ্ধৃতিচিহ্ন ছিল না। দাম অনুযায়ী আরও বেটার প্রোডাকশন দেওয়া যেত।
ছোট্ট বই, চাইলে একবারেই পড়ে ফেলা যায়, এবং সেটা সুখকরও। ক্যাম্পাস রাজনীতির (ইশারা ইঙ্গিতে জাতীয় রাজনীতিরও নয় কি?) মতো জটিল কুটিল রক্তাভ বিষয় উঠে এসেছে, ভারাক্রান্ত হয়ে যেতে পারত। কিন্তু লেখক তার সুখপাঠ্য গদ্য আর সুরময় আবহ তৈরির ক্ষমতাবলে এটাকে একেবারেই অন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পেরেছেন। সঙ্গে আয়নাঘর আর সায়ানাইড ফুল বিষয়ক যে জাদু তিনি দেখিয়েছেন, তা বিশেষ জাদুময়। চমৎকার কিছু চরিত্রের দেখা মেলে, তাদের সঙ্গে থাকতে ভালো লাগে। চরিত্রগুলো আরও খানিকটা বিকাশ দাবী করে বলে মনে হয় যদিও, তবে সবমিলিয়ে দারুণ এক সময়ই কাটল আরিমাতানো’র সঙ্গে। লেখকের জন্য শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।
মেডিক্যাল ক্যাম্পাসের ছাত্ররাজনীতিকে উপজীব্য করে ম্যাজিক রিয়েলিজম ধারার একটি গল্প হচ্ছে "আরিমাতানো"। বইয়ের লেখনশৈলী বেশ অন্যরকম, কিন্তু আমি বইটাকে একেবারে অসামান্য লেভেলের বলবোনা। বইয়ের মেডিক্যাল লাইফ এবং ছাত্ররাজনীতিকে যেভাবে হাইলাইট করা হয়েছে তার সাথে দুঃখজনকভাবে খুব একটা কানেক্ট হতে পারলাম না। জাদুবাস্তবতার ব্যাপারগুলো অবশ্য ভালো ছিলো, তাই যাদের এ ঘরানার উপন্যাস পড়তে ভালো লাগে তাদের হয়তো বইটা আমার যতটুক ভালো লেগেছে তার থেকে আরো বেশি ভালো লাগবে।
A remarkable novel on nostalgia, melancholy, death, and campus politics. The minimal but atmospheric magic realism is something you don't want to miss. A very engaging read.
আরিমাতানো। মাহবুব ময়ূখ রিশাদ রচিত বইটির নাম শুনলে মনে হয় কী এক অজানা লুকিয়ে আছে দুই মলাটের মাঝে। যে অজানা আসলে একটা ধাঁধাঁ। সেটির সমাধান করতে পারলে বুঝা যাবে প্রায় সবকিছুই।
জাদুবাস্তবতার ধারাটি লেখকভেদে বিভিন্ন ধরণের হয়। মানে এক এক লেখকের জাদুবাস্তবতার থিম এক এক রকম। মাহবুব ময়ূখ রিশাদের জাদুবাস্তবতা মূলত বিচ্ছিন্নতার। নিজের মূল পরিচয় জানতে আগ্রহী মানুষ ক্রমাগত আইডেন্টিটি অনুসন্ধানে ব্যস্ত থাকায় যেরকম বিচ্ছিন্নতার বোধে ডুবে যান, বিপণ্নতার ঘোরে চলে যান, হয়ে পড়েন বিষাদ সমুদ্রের ব্যর্থ এক কান্ডারি, সেই ধরণের জাদুবাস্তবতা নিয়ে এসেছেন লেখক।
সেনাসমর্থিত সরকারের আমলে চমেক ক্যাম্পাস এবং তৎসংলগ্ন হোস্টেলে উঠে পড়ার পরবর্তিতে আরিমাতানো কীভাবে নানামুখি রাজনৈতিক জটিলতায় জড়িয়ে যায়, তাঁর প্রেম কিংবা অপ্রেমের কাহিনী, বিভিন্ন জটিল সমীকরণ বুঝে ওঠার পরও সেসবের প্যারাডক্সে ভুগার মানবসন্তানসুলভ প্রতিক্রিয়া এবং সেই আরিমাতানো আসলেই জাদুকর পরিবারের কি না সেসব ঘিরে আবর্তিত হয়েছে এ বড়গল্প।
মজার ব্যাপার হল লেখক নিজেও আছেন তিন রূপে এ আখ্যানে। তবে সেই থাকাটা পাঠক নিজেই খুঁজে নিক। মাহবুব ময়ূখ রিশাদ জাদুবাস্তবতার অংশগুলি যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন সেই সবের সাথে গল্পের অন্যান্য অংশের ঠিক যুৎসই মিথষ্ক্রিয়া হয়ে ওঠে নি। ভাষিক সৌন্দর্য, এক ধরণের ঘোর লাগানোর ক্ষমতা তাঁর লেখনিতে আছে তবে প্রয়োজনীয় চরিত্রায়ন কম-ই পড়ে গেছে।
ঠিক এসব কারণেই 'আরিমাতানো'কে ঠিক নভেল কিংবা নভেলা বলতে চাই না। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে উপন্যাস বা উপন্যাসিকা না হয়ে ওঠায় কি বইটির সার্থকতা কমে গেছে?
আমার মনে হয় নিরীক্ষামূলক এ বইয়ে লেখকের গল্পকার সত্তার সাথে ঔপন্যাসিক সত্তার একটা ভালোই বিরোধ ঘটে গেছে। মাহবুব ময়ূখ রিশাদ সম্ভবত উপন্যাস রচনা করতে নেমেছিলেন পরবর্তিতে সেদিকে সচেতন না থেকে হাত খুলে লেখার চেষ্টা করেছেন। এবং শেষ করে দিয়েছেন একদম দুম করে। এই কান্ড তাঁর সচেতন প্রয়াস কি না তা আমার জানা নেই।
বড়গল্পের শেষের দিকে, আরো কিছু অংশে অনেক কিছুই অস্পষ্ট। অবশ্য এই স্পষ্ট নয় ব্যাপার খানা ঘটেছে মূল চরিত্র সম্ভবত ক্ষেত্র বিশেষে আনরিলায়েবল ন্যারেটর হওয়ার কারণে। ফলে পাঠকভেদে গল্প শেষে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যার সুযোগ থাকছে।
নিরীক্ষাধর্মী এ বড়গল্পে শেষের দিকটা খাপছাড়া লাগলো। কারণ শুরুটা যেরূপ চমৎকারিত্বের সাথে লেখক করেছিলেন তাতে তাঁর কাছ থেকে আশা একটু বেশি-ই ছিলো। 'আরিমাতানো' হতে পারতো আরো বিস্তৃত পরিসরে লিখা এক অসাধারণ উপন্যাস।
তবে মাহবুব ময়ূখ রিশাদের অন্যান্য গল্পের বই পড়ার দিকে আমার আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। খুব সম্ভবত তিনি বেশ ভালো গল্পকার।
লেখকের প্রতি শুভকামনা রইলো।
বই রিভিউ
নাম : আরিমাতানো লেখক : মাহবুব ময়ূখ রিশাদ প্রথম প্রকাশ : অমর একুশে বইমেলা ২০২০ দ্বিতীয় প্রকাশ : সেপ্টেম্বর ২০২১ প্রচ্ছদ : সিপাহী রেজা অঙ্কন : হামিম কামাল প্রকাশক : চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন অলংকরণ, মুদ্রণ ও বাঁধাই : চন্দ্রবিন্দু ডিজাইন এন্ড প্রিন্টার্স জনরা : জাদুবাস্তবতা রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ
আরিমাতানো এমন এক সময়ের কথা বলে যে সময় ছাত্র রাজনীতি হয়ে উঠেছিলো অস্থিতিশীল(যদিও বাংলাদেশে ছাত্র রাজনীতির স্থিতিশীল অবস্থা দেখিনি কখনো।) এবং এই গল্পের ছাত্র রাজনীতির কে���্দ্র হলো একটি মেডিকেল কলেজ। সাথে গড়ে উঠেছিলো জাদুবাস্তবতার একটি জগৎ। যে জগতের কেন্দ্রে আছে গল্পের নায়ক আরিমাতানো। জাদুবাস্তবতার মিশ্রণ এবং বাস্তবতার মিশ্রণে গল্পের ডালপালা বেশ ভালো ভাবে ছড়িয়ে পড়ে। আমরা জানতে পারি আরিমাতানো সম্পর্কে। সেই সাথে তার অতীত সম্পর্কে। কিন্তু এই জানার পরিধিটা আরো বিস্তার লাভ করতে পারতো। ধীরে ধীরে গল্পটাকে আগানো যেত। শেষ মুহূর্তে এসে লেখকের ত���ড়াহুড়ো ভাবটা ভালো লাগলো না।
গল্পটা কি নিয়ে? কফিনের সাথে লেগে থাকা সায়ানাইড ফুল শুকতে শুকতে এক মৃত তরুণের স্মৃতিচারণ! তার অদ্ভুত জন্ম, জাদুকর দাদা, আয়নায় বাস করা দাদীর দাদী বা দাদাদীর সাথে কথা বলা বা কোনো এক মেডিকেল কলেজে তার গুডবয় ইমেজ থেকে ধীরে ধীরে নেতা হওয়ার গল্প এই বইটা। বইটার কাহিনীতে যেমন বাস্তব-অবাস্তব মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে তেমনি লেখকও লিখেছেন এক ঘোরলাগা ভাষায়! মাঝখানে একটু ঝুলে গেলেও প্রথম আর শেষটা দুর্দান্ত। এমন অভিনব প্লটের গল্প আগে কখনও পড়া হয় নাই।
চেতনার অন্য পাশে মানুষের স্মৃতির সাথে সাথে সঞ্চিত হতে থাকে দীর্ঘশ্বাস, তাড়না ও বিষাদের অধঃক্ষেপ। জমা হয় বিচ্ছিন্নতা আর অবদমনের ছাই। মগ্নচৈতন্যের সেই গ্রীনহাউসে জন্ম নিয়ে ডালপালা মেলে দেয় গল্প। আরিমাতানো তেমন এক প্রকোষ্ঠে বসে বলে চলে তার জেনেসিস আর জীবনের গল্প। মনে প্রশ্ন জাগে কেন এই কফিনের আড়াল? কেন সে দাবি করে তার জন্ম পিতামাতার মৃত্যুর পর? সে কি নির্মূল করতে চায় অন্তর্গত সকল পক্ষপাত কিংবা অতীতের কোন দায়? যতটা পক্ষপাত হারালে প্রখর বাস্তবতাকেও জাদু বলে মনে হয় কিংবা খুব বেশি স্বাভাবিক হয়ে ওঠে কলেজের করিডোরে হাঁটতে হাঁটতে আত্মহত্যাসংঘের পদযাত্রায় ভুল করে মিশে যাওয়া?
মাহবুব ময়ূখ রিশাদের ছোটগল্প পড়েছি প্রায় সব। এবার তাঁর প্রথম উপন্যাসটি পড়া হল। যখন দুঃস্বপ্নকে বাস্তব হিসেবে মেনে নিয়ে অদ্ভুত নির্বিকার জীবনযাপন করছি - এমন একটা ভীষণ অন্যরকম সময়ে আরিমাতানোর সাথে পরিচিত হয়েছি, বারবার ভেবেছিঃ সত্য আসলে কী?
ভালো লেগেছে লেখকের এই নিরীক্ষার প্রয়াস। আরো বেশি কেটেছেটে ফেলে দিতে দ্বিধা করবেন না, আর তার চেয়ে অনেক বেশি লিখবেন - এই প্রত্যাশা রইল।
আরিমাতানো হয়তো নিঃসঙ্গতায় কাটিয়েছেন জীবন, কিন্তু জাদুকর(লেখক) কি সুন্দর আদর দিয়েই না তার পুরোটা জীবন তুলে ধরেছেন এই বইটিতে! শুরু থেকে শেষ অবদি পুরোটা গল্প যেন আমার চোখের সামনে ভাসছিল! এত্ত সাবলীল এত্ত সুন্দর! সাধু সাধু।
বইটি পড়ে লেখকের প্রখর কল্পনা আর পর্যবেক্ষনশক্তির প্রশংসা না করে পারা যায়না। কখনো মনে হয়েছে এটি একটি কাল্পনিক গল্প, কখনো মনে হয়েছে এই আরিমাতানো লেখক নিজে আবার কখনো মনে হয়েছে এটি তো আমারও গল্প। লেখককে ধন্যবাদ।
🌐 "আরিমাতানো" বইটা অদ্ভুত সুন্দর। কেমন যেন বিষণ্ণতায় মোড়ানো গল্পের প্রতিটি অধ্যায়, প্রতিটি পাতা। একটি ছোটো উপন্যাসিকা, যেখানে একজন গল্প-ই কেবল বলা হয়েছে।
গল্পটা আরিমাতানোর। আরিমাতানোর জীবনে অনেক গল্প আছে। জন্মের গল্প, মৃত্যুর গল্প; আবার জন্ম-মৃত্যুর মাঝের সময়ের জীবনের গল্প। কোন গল্পটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ? জন্মের, না-কি মৃত্যুর? জন্ম তো অপার সম্ভাবনার দুয়ার খোলা, আর মৃত্যু- সে তো সবকিছুর পরিসমাপ্তি।
আচ্ছা, মৃত্যুর পর মানুষ কী করে? কবরের অন্ধকার ঘরে শুয়ে ভাবনার সুতো জট ছাড়ায়? কে জানে? তবে আরিমাতানো কফিনের ভেতর শুয়ে স্মৃতির ঝাঁপি খুলে দিয়েছে। সায়ানাইড ফুলের তীব্র গন্ধে নিজের ফেলে আসা জীবন পুনঃপ্রদর্শিত হতে শুরু করেছে।
আরিমাতানোর বাবা-মা নেই। দাদা দাদীর কাছে মানুষ হওয়া ছেলেটা নিজের জন্ম পরিচয় খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু কোনো এক অদ্ভুত কারণে তাকে সেসব থেকে দূরে রাখা হয়। আরও অনেক কিছু থেকেই নাতিকে আড়াল করার চেষ্টা করেন দাদা-দাদী। কিন্তু কেন? তাদের পরিবারের কী এমন ইতিহাস আছে, যা জানা উচিত না? আরিমাতানো প্রশ্ন করে। উত্তর মেলে না। কোনো এক ক্লান্ত সময়ে মৃত্যু পথযাত্রী দাদী আরিমাতানোকে সব বলে গিয়েছেন। জানিয়েছেন আরিমাতানোর জন্মরহস্য। আরিমাতানোর এসব বিশ্বাস করা উচিত? এসব কেউ বিশ্বাস করে? অনেক প্রশ্ন জমা হয়। সেসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই দাদী চলে গেলেন। যাওয়ার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানিয়ে গেলেন, আরিমাতানোর জন্ম হয়েছিল তার বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর। কীভাবে সম্ভব?
আরিমাতানোর জীবনের একটি বিশেষ সময় কেটেছে মেডিক্যাল কলেজে। ডাক্তার হওয়ার সামনে বিভোর ছেলেটা একটু একটু করে বদলে যেতে শুরু করেছে। নিজেকে গুটিয়ে রাখা, জীবন থেকে পালিয়ে বেড়ানো আরিমাতানো হঠাৎই মেডিক্যাল কলেজে সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। অপরিসীম সাহস নিয়ে রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিল। হয়তো কোনো খেয়ালের বসে, কিংবা জীবনের একটি অংশ ভুলে থাকার জন্য। ছাত্র রাজনীতি, পড়াশোনা, বন্ধুর প্রতি ভালোবাসা অথবা প্রেমে ব্যর্থ আরিমাতানোর জীবন ছুটছে অন্য এক গতিতে। এই গতি একদিন থমকে দাঁড়ায়। নিঃশেষ হয়ে যায় জীবনীশক্তি। আরিমাতানোও একদিন এভাবে হারিয়ে গেল। কফিনের বদ্ধ ঘরে শুয়ে স্মৃতি রোমন্থনের আয়োজন যে বড্ড পীড়া দেয়! কী হয়েছিল আরিমাতানোর?
🌐 পাঠ প্রতিক্রিয়া :
লেখক মাহবুব ময়ূখ রিশাদের লেখা এই প্রথম পড়া। ব্যতিক্রমী কাব্যিক ভাষায় গল্প বলা বেশ লেগেছে। আরিমাতানোর বয়ানে লেখক গল্প বলেছেন। অনেকটা কারো ব্যক্তিগত ডায়েরি পড়ার মতো অনুভূতি হচ্ছিল। আরিমাতানো নিজে বর্ণনা করেছে তার ছোটো থেকে বড়ো হয়ে ওঠার গল্প, মেডিক্যাল কলেজে পার করা জীবনের একাংশ। বন্ধুদের প্রতি ভালোবাসা উঠে এসেছে এখানে। উঠে এসেছে ছাত্র রাজনীতির উত্তাল সময়।
জাদুবাস্তবতার সাথে সম্পর্কিত আরিমাতানোর বিষণ্ণতায় মোড়া জীবনের গল্প লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন। বাল্যকালে একা একা জীবন কাটানো রহস্যময় যুবক কলেজে এসে সবার মধ্যমণি হয়ে ওঠা, অসীম সম্ভাবনা নিয়ে রাজনীতিতে নাম লেখানো কিংবা বন্ধুদের কষ্টে নিজেকে তুচ্ছ মনে করা; লেখক সব সাজিয়েছেন খুবই সাবলীলভাবে। কলেজ জীবনের উত্তাল রাজনীতির চিত্রও লেখকের লেখায় উঠে এসেছে। কিছু জায়গায় বিষণ্ণতা এসে ভর করেছিল। শেষে এমন কিছু প্রত্যাশা করলেও, মৃদু ধাক্কা খেয়েছিলাম।
লেখকের লেখনী অসাধারণ। আমরা যেমন নিজের কথা, সাধারণভাবে বলতে পছন্দ করি, লেখক সেখানে মাঝেমাঝে কাব্যিক ছন্দ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। যেমন, আমরা যদি বলি "সেবা করে মন জয় করে নিয়েছিল" কিংবা "সকল সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল"; সেখানে লেখক লিখেছিলেন, "সেবা করে নিয়েছিল মন জয়" অথবা "ছিন্ন করেছিলেন সকল সম্পর্ক"। প্রথম প্রথম এমন ধারার লেখা অসুবিধার সৃষ্টি করলেও পরে সামলে নিয়েছি।
লেখক তার নিজের নাম মাহবুব, ময়ূখ, রিশাদ; তিনটি অংশ দিয়ে তিনজন চরিত্র তৈরি করেছিলেন। ব্যাপারটা খুব মজার লেগেছে। ছোট্ট উপন্যাসিকায় চরিত্র নিয়ে কাজ করার খুব জায়গা থাকে না; যেখানে গল্প কেবল আরিমাতানোকে কেন্দ্র করে এগিয়ে গিয়েছে। তবুও লেখক চেষ্টা করেছেন উপস্থিত চরিত্রগুলোকে সঠিকভাবে বিন্যাস করার। পড়ার সময় একবারও মনে হয়নি অকারণে কোনো চরিত্রের আবির্ভাব হয়েছে। যতটুকু প্রয়োজন ছিল, ঠিক ততটুকুই।
সব ভালোর উলটো পিঠে কিছু খারাপ লাগা থাকে। এই উপন্যাসিকাতেও তেমন লেগেছিল কিছু জায়গায়। বিশেষ করে প্রচলিত বাংলা থাকার পরও কিছু ইংরেজি শব্দের আনাগোনা মেনে নিতে পারিনি। অনেক ক্ষেত্রে অপ্রচলিত ইংরেজি শব্দের দেখা পাওয়া গিয়েছে, যেখানে বাংলা শব্দের যথাযথ ব্যবহার করা যেত বলে মনে হয়েছে। এত সুন্দর শব্দচয়ন, কাব্যিক ভাষায় লেখার মাঝে এভাবে ইংরেজি শব্দের আধিক্য বিরিয়ানির খাওয়ার সময় দাঁতের নিচে এলাচিতে কামড় পড়ার মতো অনুভূতি দিয়ে যাচ্ছিল।
🌐 বানান, সম্পাদনা, প্রচ্ছদ ও প্রোডাকশন :
বানান ভুল তেমন ছিল না বললেই চলে। বেশ কয়েক জায়গায় মুদ্রণ প্রমাদ ছিল। কিছু জায়গায় সম্পাদনার ঘাটতি অনুভব করেছি। বইয়ের প্রচ্ছদ অসাধারণ। যেন আরিমাতানোর গল্পকেই মনে করিয়ে দেয়! ইউনিক নামলিপি বেশ ভালো লেগেছে।
🌐 কিছু ভালো লাগার উক্তি :
• যে ব্যথা নিতে চায় না তাকে ব্যথা দেয় সাধ্য কার?
• যা কিছু ভয়ের, যা কিছু অজেয় তাই কি মূলত সুন্দর?
• খোলা ময়দানে দাঁড়িয়ে ঘাড়টা বাঁকা করে ওপরে তাকালে যে আকাশ চোখে পড়ে সেটা আদৌ আকাশ নয় বরং শূন্যতার অনন্ত যাত্রাপথ।
• মানুষ না পাওয়াকে, না জানাকে কল্পনা দিয়ে পূরণ করতে চায়। দুঃখজনক হলো কল্পনার অধিকাংশ কিন্তু বাস্তবতাকে তুচ্ছ করতে চায়, বাস্তবতা নিয়ে একটা ভুল ডাইমেনশন ক্রিয়েট করে।
• একজন মানুষের স্মৃতিতে আরেকটা মানুষ থেকে যায় তবে স্মৃতির মানুষটা বেঁচে থাকে ততদিন যতদিন স্মৃতি বহন করা মানুষটা থাকে।
🌐 পরিশেষে, "আরিমাতানো" এমন এক মানুষের গল্প, যায় অস্তিত্ব আমাদের জগতে বিলীন। যেন অন্য জগত থেকে তার আবির্ভাব। যে জগতের গল্প আমাদের জানার প্রয়োজন নেই। জানার প্রয়োজন নেই আরিমাতানোরও। তবুও সে জেনেছিল, বিশ্বাস করেছিল কি?
বই : আরিমাতানো লেখক : মাহবুব ময়ূখ রিশাদ প্রচ্ছদ : সিপাহী রেজা প্রকাশনী : চন্দ্রবিন্দু পৃষ্ঠা সংখ্যা : ১০৪ মুদ্রিত মূল্য : ২৪০৳ ব্যক্তিগত রেটিং : ৩.৭৫/৫
মাহবুব ময়ূখ রিশাদের "আরিমাতানো" একটি অনন্য গল্প, যেখানে বাস্তবতা, রহস্য আর কল্পনার সংমিশ্রণ ঘটেছে। উপন্যাসের মূল চরিত্র আরিমাতানো—এক রহস্যময় যুবক, যে নিজের পরিচয় ও অতীতের খোঁজে ছুটে চলে। দাদা-দাদীর কাছে বড় হওয়া এই চরিত্রটি তার শৈশব থেকে জীবনকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে, যা তাকে ভেতরে ভেতরে এক গভীর শূন্যতার দিকে ঠেলে দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ার পর তার ব্যক্তিত্বে পরিবর্তন আসে, যা পাঠকের মনে নানা প্রশ্ন জাগায়। লেখকের কাব্যিক ও গভীর ভাষাশৈলী পাঠককে বইটির প্রতি আবিষ্ট করে রাখে। উপন্যাসটির গভীর ভাবনা ও চরিত্রায়ন এটিকে বিশেষভাবে স্মরণীয় করে তুলেছে।
যারা ভিন্নধারার বই পড়তে ভালোবাসেন, তাদের জন্য "আরিমাতানো" নিঃসন্দেহে একটি মনোগ্রাহী পাঠ্য।