অনেক-অনেকদিন আগে যখন সুনীলের অবিস্মরণীয় 'বন্দি, জেগে আছো?' পড়েছিলাম, তখন দুটো লাইন আমার মাথায় গেঁথে গেছিল— "বন্দি কি ঘুমোয়? না কি জাগরণই তার বন্দিশালা মাথার ভিতর জ্বালা যাবজ্জীবন পল অনুপল..." নিজের কারাগার নিজের ভেতর বয়ে বেড়ানোর অনুভূতি ঠিক কেমন? "প্রেমের নিভৃত শিল্পে, পণ্যে, পিপাসায়, লোভে" ভরা আমাদের জীবনে অন্ধকুঠুরি আর শিকল হয়ে আসে অনেক কিছু— কিছু অভ্যাস, সংস্কার, বিশ্বাস... যৌনতা! আর ঠিক এখানেই উদয় হয় প্যারাফিলিয়া। শব্দটার অর্থ কী? আমেরিকান সাইকায়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন থেকে প্রকাশিত ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্যাল ম্যানুয়ালের ফিফথ এডিশন (২০১৩) অনুযায়ী প্যারাফিলিয়া মানে হল~ "any intense and persistent sexual interest other than sexual interest in genital stimulation or preparatory fondling with phenotypically normal, physiologically mature, consenting human partners.” বুঝতেই পারছেন, এই সংজ্ঞার ভাঁজে-ভাঁজে লুকিয়ে থাকা নানা শব্দের মধ্যে সবচেয়ে জোরালো হয়ে উঠে আসছে একটাই কথা: অস্বাভাবিক। এমনই অস্বাভাবিক যৌনতার কুড়িটি আখ্যান ধরা পড়েছে আলোচ্য বইটিতে। তাদের মধ্যে কয়েকটি (যেমন পেডোফিলিয়া) শুধু ডিসঅর্ডার নয়, সেক্সুয়াল অফেন্সও বটে। আবার অন্য একঝাঁক প্রবণতা এমন যে তারা নিজেরা হয়তো অপরাধ বলে গণ্য হয় না, তবে অপরাধের জন্ম দেয়। সুমুদ্রিত, সামান্য কিছু বানানভুল ও অন্তে 'ও'-কার ব্যবহার জাতীয় ত্রুটি বাদে শুদ্ধ এই বইয়ের শুরুতে আছে: * দেবদত্তা ব্যানার্জি'র 'সম্পাদকীয়'; * ডক্টর অনির্বাণ ঘোষের বিশ্লেষণাত্মক 'কিছু কথা'; * চয়ন সমাদ্দারের গভীর ও নির্মোহ 'কথামুখ'। তারপর এসেছে গল্পরা: ১) হিমাংশু চৌধুরী'র 'সর্বনাশিনী'; ২) হিমাংশু চৌধুরী'র 'স্মরগরল'; ৩) দেবদত্তা বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'বনসাই'; ৪) দেবদত্তা বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'রক্ত যখন'; ৫) অন্বেষা রায়ের 'বেনোজল'; ৬) অন্বেষা রায়ের 'হেল্প'; ৭) শুভম মজুমদারের 'নীল চোরাবালি'; ৮) শুভম মজুমদারের 'বিমর্ষ স্মৃতির স্পর্শ'; ৯) বনবীথি পাত্রের 'ঘরে ফেরার গান'; ১০) বনবীথি পাত্রের 'খিদে'; ১১) কলমচি কৌশিকের 'উত্তরণ'; ১২) কলমচি কৌশিকের 'অপরাজিতা'; ১৩) শেলী ভট্টাচার্যের 'অ্যানাটমি রুম'; ১৪) শেলী ভট্টাচার্যের 'প্রতিশোধ'; ১৫) সিলভিয়া ঘোষের 'আকর্ষণ'; ১৬) পরীক্ষিৎ দাসের 'খাঁচা'; ১৭) সন্দীপা সরকারের 'অপকর্ষ'; ১৮) প্রিয়ঙ্কন চ্যাটার্জি'র 'পুতুল খেলা'; ১৯) চয়নিকা যশের 'আদর'; ২০) স্নিগ্ধা ঝা'র 'বৃষ্টির পর রোদ্দুর'। অকপটে লিখি, বইটি পড়ার অভিজ্ঞতা সবসময় সুখপ্রদ হয়নি। কিন্তু তার জন্য লেখনীর বা গল্পের দুর্বলতা দায়ী নয়। বরং এই গল্পগুলোতে উল্লিখিত অনেক থিম চেনাজানা মানুষের আচরণের আলোকিত আচরণের পেছনে জমাট ছায়ার মধ্য থেকে উঁকি দিয়েছে বলেই এক-একসময় শিউরে উঠেছি। তাই এই তেরোজন লেখককে আমি আভূমি সেলাম ঠুকব তাঁদের সাহস ও সততার জন্য। আলাদাভাবে নাম নেব হিমাংশু চৌধুরী, দেবদত্তা বন্দ্যোপাধ্যায়, অন্বেষা রায়, বনবীথি পাত্র, কলমচি কৌশিক, সিলভিয়া ঘোষ, পরীক্ষিৎ দাস এবং প্রিয়ঙ্কন চ্যাটার্জির— যাঁদের লেখার পরিমিতিবোধ এবং দৃঢ়তা গল্পগুলোকে ভীষণভাবে বাস্তবিক করে তুলেছে। প্রথাগত অলৌকিক বা থ্রিলারের খাঁচায় বন্দি পাঠককে সত্যিকারের অন্ধকারের স্বাদ দিতে এঁরা সক্রিয় থাকবেন— এই আশায় রইলাম। যদি মনের ল্যাবিরিন্থে নিজস্ব মিনোটরের মুখোমুখি হওয়ার সাহস থাকে, তাহলে লকডাউন কাটলে এই সংকলনটি অতি-অতি অবশ্যই সংগ্রহ করবেন ও পড়বেন।