দ্যা নর্থ এন্ড উপন্যাসের পটভূমিতে রয়েছেন প্রাক্তন স্কুলশিক্ষিকা রোজম্যারি ইম্যাকুলেট-যাঁকে কেউ-না-কেউ প্রায় প্রতিদিনই ফোন করত। বলত ইয়েমেনের স্কুলে বাচ্চাদের ওপর শিলাবৃষ্টির মতো বোমাবর্ষণের গল্প, বলত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দুঃখ-দুর্দশার কথা। কী করবেন রোজম্যারি? কতজন মানুষের দুঃখ লাঘব করবেন? মর্নিংওয়াকে গিয়ে একদিন ব্রিস্টলের ঝুলন্ত ব্রিজ থেকে তিনি লাফিয়ে পড়েন। ঠিক সেই সময়েই রোজম্যারির ফটোগ্রাফার-নাতি কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শরণার্থীদের ছবি তোলায় ব্যস্ত। এক বিবাহিত বাঙালি উন্নয়নকর্মীর সঙ্গে তার প্রেমের পরিণাম চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা হয়ে কোপেনহেগেন পর্যন্ত একটা বক্ররেখায় সঞ্চারিত হয়। এই যুগল শুধু পালাতে চায়। ওরা উন্নয়ন চায় না, ত্রাণের রাজনীতি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি চায় না, চায় না উত্তর ঢাকার উত্তরোত্তর বর্ধমান বিত্তের ভাগ-কিন্তু না-চাইলেও এর অংশভাক না-হয়ে ওদের উপায় কী?
বর্ণালী সাহার জন্ম ১৯৮৩ সনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইন্সটিটিউট থেকে স্নাতক এবং মেলবোর্ন বিজনেস স্কুল (মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়া) থেকে ব্যবসায় প্রশাসন বিষয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষা সমাপ্ত করেন। শৈশব থেকে রাগসংগীতের চর্চা করছেন-শিক্ষার্থী এবং গবেষক হিসাবে কলকাতার আইটিসি সংগীত রিসার্চ একাডেমির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ঢাকা, লন্ডন এবং মেলবোর্নে একাধিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বস্থানীয় পরামর্শক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে মেলবোর্নে বসবাস করছেন।
‘আম্মা ও দূরসম্পর্কের গানগুলি’ (২০১৫) বর্ণালী সাহার প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ, এটি একটি গল্পসংকলন। ‘দ্যা নর্থ এন্ড’ (২০২০) প্রথম উপন্যাস। ২০২৩ সালের বইয়ের প্রকাশিত হয় তাঁর দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ ‘জবরখাকি’।
বইটা পড়তে যেয়ে শুরু থেকেই স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। এর একমাত্র কারণ লেখিকার গদ্যভাষা যা আকর্ষণীয় কিন্তু কিছু কিছু জায়গা পড়ে মনে হচ্ছিলো, কোনো কাঠখোট্টা অনুবাদক বিদেশি ভাষা থেকে আক্ষরিক ও যান্ত্রিক অনুবাদ করে রেখেছে। এরপরেও বেশ মনোযোগ সহকারে বইটা পড়েছি। এই নিখাদ সামাজিক উপন্যাসের উপসংহারটা আমূল নাড়া দিয়ে গেলো। পরপর দুইটা উপন্যাস পড়লাম যেগুলোর পরিসমাপ্তি একদম নিখুঁত। (আরেকটা হচ্ছে এনামুল রেজার "চায়ের কাপে সাঁতার।") অথচ গল্পটা একদম সহজ।এতোই সহজ যে দ্বিতীয়বার মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। স্বামীকে ছেড়ে ডেনমার্কে নিজের প্রেমিকের কাছে চলে যাবে গল্পকথক বর্ণালী । তার প্রেমিক ডেনিশের দাদি আত্মহত্যা করেছে। বর্ণালী ঢাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে বন্ধু রাহাতের সাথে। সবকিছু চলছে পরিকল্পনামাফিক। মজার ব্যাপার, উপন্যাসের সব চরিত্রই ভালো। এমনকি বর্ণালীর স্বামী শাওনও অতিরিক্ত নিরীহ। নিরীহ ও আপাত নিস্তেজনাপূর্ণ গল্পটির সমস্ত লুকানো ইঙ্গিত, ভাব ও পরিণতি পুরো গল্প জুড়েই ধীরে ধীরে পাঠকের অগোচরে বিস্তার লাভ করেছে।একদম শেষে এসে লেখিকা এক লহমায় পুরো কাহিনির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন। যা দেখা যাচ্ছে, তার চেয়ে যা দেখা যাচ্ছে না সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যেন এটাই হওয়ার ছিলো (আর এটাই হয়ে থাকে।) অদৃশ্য শিকারী আর শিকার এখানে যেন পূর্বনির্ধারিত। ভালোরা কেন আর কীভাবে এতো ভালো সে প্রশ্নের উত্তরও লেখিকা চুপিসারে জানিয়ে দিয়েছেন। গল্পের পরিণতি পাঠককে বই শেষ হওয়ার পরও ভাবতে বাধ্য করে।এই নিরাপদ সন্ত্রাস কি এভাবেই চলবে চিরকাল?
বর্ণালী সাহার প্রথম উপন্যাস “দ্যা নর্থ এন্ড”কে যুক্তিবুদ্ধি কাটাছেঁড়া করার চেয়ে আবেগ-অনুভূতির জায়গা থেকে আলতো করে উল্টে-পাল্টে দেখা আমার জন্য সহজ। বইটার ভবিষ্যত পাঠকদের উচিত হবে জাস্ট এইটুক পড়ে আমার রিভিউটা আর না পড়া কারন যে কথাটা বললাম সেটাই এই বইয়ের এক ধরনের স্পয়লারই বটে। আর দ্বিতীয়ত, আবেগ-অনুভব দিয়ে একটা বইকে বিচার করলে সেটা সচেতন পাঠকের কতটাই বা নেয়া উচিত?
যে উপন্যাস গুলো আমার খুব ভালো লাগে খেয়াল করে দেখেছি, তাদের একটা কমন প্যাটার্ন হল – কোন একটা দৃশ্যের কেমন মাঝখান থেকে সেগুলা শুরু হয়। তাই প্রথমেই প্রশ্ন জাগে – how did we end up here? আর মোটামুটি তখনই বুঝতে পারি আমি নিজের অজান্তে লেখকের গল্পের ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছি (উল্টোটা অবশ্য সবসময় খাটে না, প্রথম দৃশ্যে নেশা ধরায়ে পরে একটুও ভালো লাগে নাই এমন অনেক বইই আছে)। “দ্যা নর্থ এন্ড”র শুরুর দৃশ্যটা এমনই - দূর্গাপূজার প্যান্ডেলের একদম পেছনের দিক থেকে বর্ণালিকে (গল্পের প্রোটাগোনিস্ট/ন্যারেটরের নামই বর্ণালি) খুঁজে বের করে বগলদাবা করে বের হয়ে আসছে রাহাত। রাহাত আসা মাত্র স্টেরিওটিপিক্যাল পাঠক হিসাবে মনে হয়, রাহাত বুঝি বর্ণালির প্রেমিক বা প্রাক্তন প্রেমিক ইত্যাদি। তখনও ধরতে পারা যায় না যে, এই উপন্যাসটা হতে পারে শাওনের স্ত্রী বর্ণালি-তিথির স্বামী রাহাতের Heterosexual বন্ধুত্বের গল্প। কক্সবাজারের এক রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাজের করতে গিয়ে উন্নয়ন কর্মী বর্ণালির প্রেম হয়ে যায় ডেনমার্কের এক ফটোগ্রাফারের সাথে (উপন্যাসজুড়ে ইনাকে “ডেনিশ” নামে ডাকা হবে)। ডেনিশের সাথে বর্ণালীর প্রেমের আসলে শুরুটা কোথায় বা কেন ঠিক ভালো করে বোঝা যায় না। দুইজন একসাথে বসে “The Last Tango in Paris” দেখতে দেখতে বর্ণালির কথায় যা একটু ইঙ্গিত পাই –“দুইজন ক্ষয়িষ্ণু, নিরুপায় মানুষের পক্ষে এরকম মারমুখী যৌনতায় ডুবে যাওয়া ছাড়া আর কীই বা করার থাকতে পারে।“ আবারও স্টেরিওটিপিক্যাল পাঠক হিসাবে মনে হয় – তাহলে হয়ত শাওনের সাথে বর্ণালির সম্পর্ক একেবারেই ভালো নয়। ভাবছি শাওনকে হয়ত এবার লেখক একেবারে ভিলেনের ভূমিকায় মঞ্চে নামাবেন। কিন্তু এবারেও চমকে যেতে হয়। কারন শাওন তো আমাদেরকে মুগ্ধ করে আরও বেশি। পৃথিবীর প্রায় সব Sapiosexual নারীই হয়ত শাওনের মধ্যে কখনওবা হারিয়ে যাওয়া বহুযুগ আগের কোন প্রেমিককে খুঁজে পাবেন। আর যারা এখনো এমন কারও দেখা পাননি তাদেরও মনে হাহাকার লাগবে কারন আঁতেল+রোমান্টিক – কে না জানে না এর চেয়ে lethal combo আর হয় না। ঠিক এ জায়গাতে এসেই তথাকথিত নারীবাদী (!) আপুদের আর বইটা আর ভালো লাগবে না যে মূহুর্তে গল্পের বর্ণালি বলে যে শাওন ছিলো অন্য মার্গের মানুষ, বর্নালি সে মার্গের যোগ্যই ছিলো না কখনো, আর এই হীনন্মন্যতাতেই ওদের যৌথতার কারন সুন্দর রূপ পরিগ্রহ করেছিল। কিন্তু লেখক বর্ণালি এই জায়গাতেই অনেক বেশি সুন্দর করে বুঝিয়ে বলেন যে – শাওনের সাথে একই মার্গের হওয়া না হওয়া যোগ্যতার প্রশ্ন নয়, যতখানি ভালোলাগা বা নিবেদনের। আমার মনে হয় নিতান্ত মেয়েদের শরীরী স্বাধীনতা নিয়ে গলার রগ ফুলানো নারীবাদীদের সাথে বর্ণালির এই পার্থক্যটাই আমার এতো এতো বেশি ভালো লাগে।
আবার রাহাতের প্রসঙ্গে ফেরা যাক কারন শাওন বা ডেনিশের কথা আসবে-যাবে তবু উপন্যাস জুড়ে থাকবে রাহাত। হলিউড-বলিউডের কল্যাণে বিপরীতলিঙ্গের বন্ধুত্ব আমাদের কাছে এখন বেশ চোখসওয়া হয়ে গেলেও খুব একটা মনসওয়া মনে হয় হয়নি – তার উপর যদি এদের মধ্যে কেউ একজন বা দুইজনেই যদি হন অন্য কারও সাথে বিবাহিত। গল্পের বর্ণালি রাহাতের ব্যাপারে বলছে যে রাহাত ওর স্খলন কে গ্রহণ করেনি, কিন্তু ভোগান্তিকে, অপরিণামদর্শিতাকে রাহাত গ্রহণ করেছিল। এই বন্ধুত্বের মধ্যে- “আমি যেন স্পিরিচুয়ালিটির খোঁজ পেলাম। আহারে, স্রষ্টা যদি মানুষের শুধু বন্ধু হতে পারত! কিম্বা যদি পারত মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করতে চাওয়ার লোভ সামলাতে! হয়ত পারত আগের দিনে – গীতার শ্লোকের আমলে। ত্বমেব বন্ধুশ্চ সখা ত্বমেব?” বর্ণালি-রাহাতের এতো এতো সুন্দর কথোপকখন আছে এই বইটায়!
এই উপন্যাসের কাঁটাকম্পাসের এক পা যেমন ঢাকায়, তেমনি অন্য পা ঘুরছে পৃথিবীর অন্য অনেক জায়গায়। তাই বলতে হয় রোজম্যারি ইম্যাকুলেটের (৯২) গল্প। ব্রিস্টলের এই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের কাছে প্রতিদিন ফোন আর চিঠি আসত ইয়েমেনের শিশুদের জন্য বা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের শরণার্থীদের জন্য। একদিন সকালে ব্রিস্টেলের ঝুলন্ত ব্রিজের কাছে ওর রক্তাক্ত শরীর মেলে। ধারনা করা হয় সাহয্যের আবেদন চেয়ে পাঠানো চিঠিপত্র আর ফোন, কিন্তু আর্থিক অবস্থার অবনতির কারনে এদের সবাইকে অর্থ সাহয্য করতে না পারায় তাঁর মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে আর এর পরিণতিতেই রোজম্যারির আত্মহত্যার চেষ্টা। যদিও মনে হয় বর্নালি আর রোজম্যারির গল্পের সংযোগ করেছে ডেনিশ (যেহেতু বর্ণালির প্রেমিক ডেনিশ আবার রোজম্যারির নাতি), তবুও আমি বলব আসল সংযোগ আমি টের পাই যখন বর্নালি তার নতুন অবসেশন – রোজম্যারি “ক্লেমসেন” এর ব্লগ খুঁজে খুঁজে পড়ে।
বর্ণালি নিজেই বলেছেন, কখনও কখনও ফ্লাইটের চেয়ে ল্যান্ডিং বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমার মনে হয় তাঁর নিজের ত্রুটিও এই জায়গাতেই – উনি ফ্লাইটটা করেছেন যতটা সুন্দর, ল্যান্ডিংটা যেন তেমন স্মুথ হল না। উপন্যাসের শেষটার কথা বলছি। আরেকটু অন্যরকম কি হতে পারত না? তবে আমি কী দেখতে চেয়েছিলাম আমি নিজেই জানি না, শুরু থেকে বর্ণালি (কখক বা লেখক) যেভাবে আমার যাবতীয় প্রেডিকশন নস্যাৎ করে দিচ্ছিলেন তাতে ওই পর্যায়ে আমি যেকোন কিছুর জন্যই প্রস্তুত ছিলাম। তবু কী যেন একটা হল না। সেজন্য অবশ্য পুরো বই জুড়ে যে ভালোলাগাটা ��িলো সেটার কোন ক্ষতি অন্তত আমার ক্ষেত্রে হয়নি।
বর্ণালি সাহার সামনের লেখাগুলোর জন্য অধীর আগ্রহে থাকলাম।
"স্থানিক গন্তব্য সেই একই—রাহাতের গাড়িটা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত টাইম-পোর্টালের মতো আমাকে সময় থেকে সময়ান্তরে বহন করে গেল।" —এই এক লাইনের মধ্যেই গল্পের ঘটনা দিগন্ত। এর বাইরে কিছু নেই। যা আছে সবই এর ভিতরে।
দুই বন্ধুর স্পিরিচুয়াল জার্নি, ত্রাণসংস্থাগুলির চিঠি আর ফোনের অত্যাচারে অতিষ্ঠ স্বেচ্ছাসেবক রোজম্যারি ইম্যাকুলেট এর আত্মহত্যা, গল্পকথকের প্রেমিকা ডেনমার্কের ডেনিশের পারিবারিক জীবন, কর্পোরেট জব আর ওষুধ কোম্পানির ভন্ডামি— সবই গল্পকথক বর্ণালীর কাফকায়েস্ক অভিজ্ঞতা যার পরিধি চট্টগ্রাম-ঢাকা-কোপেনহেগেন। তাই পাঠকের পাঠ অভিজ্ঞতা প্রথমে কিছুটা এলোমেলো লাগতে পারে কিন্তু সমাপ্তিতে একেবারে শকড হয়ে যাবেন।
লেখিকার গদ্যভাষা একেবারে স্বতন্ত্র, প্লট এলোমেলো কিন্তু মনোগ্রাহী, আর গল্পের এন্ডিং পাঠককে বিস্মিত করতে বাধ্য। সবমিলিয়ে বর্ণালী সাহা আমাদের ভিন্নধর্মী অভিনব এক গল্প উপহার দিয়েছেন যা পাঠককে ভাবিত করবে এবং লেখিকার পরবর্তী বইয়ের জন্য মুখিয়ে রাখবে।
বইয়ের বিষয়বস্তু খুবই ইন্টারেস্টিং। ব্যক্তিগত চ্যারিটির উপর প্রাধান্য বেড়ে যাওয়ায় উন্নত দেশে সহানুভূতি উদ্রেককারী ফোনকল কিংবা মেইলের সংখ্যা এত বেশি যে রোজম্যারি ইম্যাকুলেট ব্রিস্টলের ঝুলন্ত ব্রিজ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েন হতাশায়। তার নাতির সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন গল্পকথক। কাহিনীর শেষে এসে তার রোজম্যারির প্রতি অবসেশন ও দেখতে পাই আমরা। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইস্যু উঠে এসেছে, উঠে এসেছে বৈবাহিক জীবনের ক্রাইসিস গুলোর কথা। স্পিরিচুয়াল বন্ধুত্বের একটা দৃষ্টান্তের দেখা মিলে দ্যা নর্থ এন্ডে।
ফার্স্ট পারসন ন্যারেটিভে লেখা বইটার লেখনী দুর্দান্ত। গল্পের প্রগ্রেসের সাথে ঢাকাইয়া ভাষায় কনভারসেশনের যে মিশেল তা আসলে আমাদের দৈনন্দিন কথাবার্তার বহিঃপ্রকাশ। সমস্যা হচ্ছে, সাধারণত কনভারসেশন হাইফেন দিয়ে আলাদা আলাদা লাইনে লিখলে বুঝতে সুবিধা। বইয়ে প্যারা প্যারা করে থাকায় হঠাৎ হঠাৎ ধরতে অসুবিধা হচ্ছিল।
উপন্যাসের সাধারণত একটা সীমারেখা থাকে। খাপে খাপে কাহিনীর অগ্রসরে পরিপূর্ণ রূপ লাভ করে তা। দ্যা নর্থ এন্ডে কাহিনী পূজামণ্ডপ থেকে শুরু করে দশদিনের জন্য ভাড়া করা অ্যাপার্টমেন্টে এসে শেষ হয়। মধ্যপথে কাহিনীর সূত্রপাত এবং বিক্ষিপ্তভাবে তার বিস্তৃতি - ভিন্নধারার অ্যাপ্রোচ ই বলা চলে। লেখকের ভাষায়, গাড়িটা যেন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত টাইম-পোর্টালের মত সময় থেকে সময়ান্তরে বহন করে গেল। খুব ই সুন্দর একটা বই!
বিক্ষিপ্ত, সুন্দর। অসংখ্য সুতা কোথায় গিয়ে বাঁধতে হবে সেটার কোনো দিশা এই বইয়ে নাই, এতে কিছুটা বিরক্ত হয়েছি। মুগ্ধ হয়েছি বাসের এবং গাড়ীর দৃশ্যে। মজা পেয়েছি প্রেমিকের নাম পড়ে! খুব যাপনঘনিষ্ঠ বই। হয়তো শুধু পারটিকুলার একটা ক্লাশের যাপন সেটা, যেই ক্লাশে আমার বিচরণ। হা হা।
বর্ণালী সাহার " দ্যা নর্থ এন্ড " পড়লাম। জগাখিচুরি! ঘটনা শুরু হয় দূর্গা পুজোর মন্ডপ থেকে। শুরুতে চরিত্র থাকে গল্প কথক আর রাহাত নামের একজন। কিছু দূর যাওয়া গল্পের খেই হারিয়ে যায়। এলোপাতাড়ি ঘটনা। কোথেকে কি এসে যাচ্ছে, বুঝতে পারা যায় না এক পর্যায়ে! তাও ধর্য্য ধরে পড়ে গেলাম,যদিও পড়তে কষ্ট হয়েছে। কষ্ট হয়েছে কারণ লেখিকার গদ্যের কোন শৃঙ্খলা নায়! পড়তে পড়তে মনে হবে কোন আনকোরা লোকের অনুবাদ পড়ছি যেনো। বাংলা গদ্যের একটা স্বাদু ব্যাপার আছে। একটা সাবলীলতা আছে। এসব জিনিস না থাকলে লেখার সৌন্দর্য হারিয়ে যায়। উপন্যাস লেখা ডাল-ভাত হইত,দুনিয়াবি সবাই ঔপন্যাসিক হইয়া যাইতো। হাহাহা...
বর্ণালী সাহার গল্পের বই জবরখাকি, যেটা ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয় সেইটা আগে পড়েছিলাম। এখন তার ৩ বছর আগের উপন্যাস দ্যা নর্থ এন্ড পড়তে গিয়ে বুঝলাম লেখিকার গদ্যে এখন উন্নতি হয়েছে। এই বইটাতে কিছু জায়গায় গদ্য খুব সুন্দর আবার কিছু জায়গায় পড়তে আরাম পাওয়া যায় না এমন। তবে গল্প বলেছেন স্ট্রংলি আর সমাপ্তিটা দিয়েছেন ধীরে।
গল্পগ্রন্থ ‘জবরখাকি’ মুগ্ধ করেছিল। উপন্যাস ‘দ্যা নর্থ এন্ড’ বেশ ভালো লাগল। কয়েকটি ভালো ও সবিস্তার রিভিউ এসেছে বইটির, আমি আর নতুন করে কী বলব! বর্ণালী সাহার নতুন বইয়ের অপেক্ষায় রইলাম।
এই বইয়ের রিভিউ দেয়ার মত ভাষা আমার নেই। তবে যারা দারুণ গদ্যশৈলীর বই পড়তে চান তারা নিঃসন্দেহে বইটা তুলে নিতে পারেন। রেটিং যেহেতু ভালো দিয়েছি, বুঝতেই পারছেন বইটা আমার ভালো লেগেছে।
Barnali Saha’s debut novel The North End came out at the 2020 Boimela. It’s a simple story—the narrator, a young NGO worker, arrives in Dhaka seeking help from an old friend so she can leave her husband to fly off to be with her Danish photographer boyfriend. Saha uses this narrative as a springboard to explore the significance of why the popular, pricey coffee joint The North End has eight branches in Dhaka, and a single branch in the remote, tiny border town of Ukhiya (locale for the largest Rohingya refugee camp); the narrator’s day and night in the capital city takes the reader on an exploration of globalization, international aid, the refugee crisis, but also sounds the intimate notes of friendship, love and betrayal.
I’ll admit I wasn't a huge fan of the ending, but Barnali Saha's linguistic dexterity is enviable as she straddles the gap between literary Bangla and the urban, hip version of Dhakaite Bangla. This is a novel with a soul rooted in desh while it casts a keen eye to the bigger world out there; and does so utilizing a female voice that is contemporary, urban and self-aware. Definitely a writer to watch.
বর্ণালী সাহার গদ্য স্মার্ট, মেদহীন-ঝরঝরে। পড়তে ক্লান্তি আসে না। উপন্যাসের সচরাচর যে ভারিক্কি চাল বা আয়োজনের বাগাড়ম্বর তা একেবারেই নেই এখানে। মুলত একদিনের গল্পে ক্রমেই সবকিছু থেকে এলিয়েনেটেড হয়ে পড়া ব্যক্তি মানুষের ভেতরকার চিরাচরিত মুক্তিপ্রবণতাকেই তিনি উপন্যাসে তুলে ধরেছেন তার নিজস্ব ভাষায়। এইখানে "ভাষা" শব্দটার প্রতি আলাদা করে জোর দিচ্ছি কারণ এই উপন্যাস বিষয়বস্তুতে খুব একটা বিশেষ কিছু না হলেও ভাষার বিবেচনায় আলাদা গুরুত্ব পাবে।
বর্ণালী সাহার ভাষা আধুনিক- শক্তিশালী। পপকালচার জেনারেশানের পাঠকদের রিলেট করতে বেগ পেতে হবে না একেবারেই।তাছাড়া লেখার ধরণটাও নিরীক্ষাধর্মী এবং সেটা সফলও হয়েছে শতভাগ।
ক্যাজুয়াল ঢংয়ে বলে যাওয়া গল্পের ভেতর আকস্মিক ভাবে ঢুকে পড়া রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনৈতিক এলিমেন্টগুলো বেশ জোরেসোরেই ঝাঁকুনি দিয়ে যাবে পাঠক কে। গল্পটাকেও তখন আর সচরাচর বলে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। রুদ্ধশ্বাসে পড়ে ফেলা যাবে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা। আর সেই গল্পের প্যারাডক্সেই তো পাঠক আটকে পড়ে যেখানে পাঠক খুঁজে পায় তার নিজস্ব ব্যক্তি মানুষ ও সংকটের প্রবল উপস্থিতি।
চমৎকার! ভাষা নিয়ে যে ধরণের খেলা আমি দেখতে চাই, একটা পরিচিত কাহিনিকে যে রকম ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা দেখতে চাই, তা সবই ছিল এ বইয়ে। এন্ডিং যথাযথ। বর্ণালী সাহার প্রতি শুভেচ্ছা। ভবিষ্যতে তার বইয়ের কাছে আবার ফিরে আসতে হবে।
Barnali’s first novel littered with stunning images made with words, sudden dry humor then countering with another humor. The underlying sadness holding the book like the relentless strike on the base string is striking. A book that requires many readings.