চলচ্চিত্রে কবরী অতুলনীয় তা তাঁর দর্শক মাত্রই জানেন। কিন্তু লেখনীতে তিনি যে এতটা মুগ্ধকর তা কয়জন জানে!
"স্মৃতিটুকু থাক" কবরীর ঠিক জীবনী নয়, জীবনের টুকরো টুকরো কিছু স্মৃতি। তাই যারা জীবনী পড়ার জন্য বইটা কিনবেন তারা কিছুটা হতাশই হবেন।
কবরীর স্মৃতির টুকরোগুলোর বড় অংশ জুড়েই আছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। আছে শরনার্থী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভারতে কাটানো একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা। শৈশবের কিছু স্মৃতি, চলচ্চিত্রযাত্রার সূচনার কথার পাশাপাশি অবলীলায় লিখেছেন নিজেদের পরিবারের অভাব অনটনের কথা, মায়ের ত্যাগের কথা।
এত ঝড়ঝড়ে কাব্যিক ভাষায় লেখা গদ্য, পড়তে পড়তে অনেকেই হারিয়ে যেতে পারে নিজেদের শৈশবে। চলচ্চিত্রে শীর্ষস্থানে থাকা একজন অভিনেত্রী নিজের কাজের পাশাপাশি তখনকার সময়ের শিল্প, সাহিত্য, চারুকলাসহ বিভিন্ন অঙ্গনের মানুষদের সাথে মিশেছেন। খান আতা, আলতাফ মাহমুদ, কাইয়ুম চৌধুরী, সৈয়দ হক, সত্য সাহা, সলিল চৌধুরীর মত মানুষদের সাথে তার ছিল ভীষণ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।
জানার আগ্রহ ছিল তার প্রবল। কবরী যে শুধুই একজন চলচ্চিত্রের নায়িকা নয় তা স্পষ্টই বোঝা যায় টুকরো টুকরো স্মৃতির এই বইটি পড়লে। নিজেকে তিনি কীভাবে দেখেন, এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন...
" নারী শিশু অধিকারে আমি সোচ্চার, বাল্যবিবাহ রোধে আমি অনড়, মানুষের ভালোবাসা আমার উচ্ছ্বাস, স্বাধীনতার জন্য আমি লড়াকু, মায়ের চরণে আমি প্রণত, প্রিয়র ঠোঁটে আমি চুম্বন, আলিঙ্গণে আমি উষ্ণ, ভালোবাসা আমার স্বপ্ন, বিষাদে আমি রোদন, হাসিতে আমি অমলিন।"
হ্যাঁ, এই আমাদের কবরী। "স্মৃতিটুকু থাক" পড়ে কবরীকে কিছুটা হলেও জেনে যতটুকু না তৃপ্তি পেয়েছি, তার চেয়েও বেশী আফসোস জন্মেছে আরো অনেক 'না জানা' নিয়ে। তাঁর জীবনের আরো অনেক গল্প, অনেক সময়, আরো অনেক প্রশ্নের উত্তর, আরো কিছু স্মৃতি জানার ক্ষুধা তৈরী হয়েছে। কবরীর সাথে আমার দুইবার দেখা হয়েছিল। একবার কথা হয়েছিল অনেকক্ষন। আহা! বইটি আগে পড়া থাকলে কত কত প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইতাম। উত্তর না দিক, অন্তত পুরো জীবনের গল্পগুলো নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনী লিখে ফেলুন এই কথাটা তো বলতাম।
কবি নির্মলেন্দু গুণ বইটিকে চিত্রকল্পময় সুললিত গদ্য বলে অভিহিত করেছেন।
কেমন হঠাৎ করেই চলে গেলেন মিষ্টি মেয়ে কবরী। থাকলে হয়তো এমন সুললিত গদ্যে ফেলে আসা বাকি স্মৃতিকথা গুলো পড়তে পারতো ভাগ্যবান পাঠকেরা।
#হ্যাপিরিডিং
মে, ২০২১