লেখাটি ১৯৫৭ সালের। কিন্তু যে সময়কে ঘিরে এই লেখা, তা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কাল। তখন একটি এগারো বছরের মেয়ে তার ফরেস্ট অফিসার স্বামীর সঙ্গে রওনা হল স্বামীর কর্মক্ষেত্র সুন্দরবনের দিকে। সুন্দরবনের নদী ও অরণ্য ঘেরা নানা কোণে তাকে যেতে হয়, থাকতে হয় স্বামীর কর্মসূত্রেই। বিচিত্র মুহূর্ত ও মানুষের সমাবেশে ভরে উঠতে থাকে তার জীবন। সদ্য কিশোরী থেকে একটু একটু করে বড়ো হতে থাকে মেয়েটি। পরিণত বয়সে সেই চার/পাঁচ বছরের স্মৃতিকথা এক ঝরঝরে গদ্যে লিখে ফেলেন তিনি। গড়ে ওঠে নারীবিশ্বের এক অদ্ভুত দলিল।
সময়টা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের, সরলা বসু, এগারো বছরের ছোট্ট বউটি চলেছে সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে ফরেস্ট অফিসার স্বামীর কর্মক্ষেত্রে। ছোট নৌকা, বড় নৌকা বদলে বদলে নদী থেকে নদী পেড়িয়ে চলেছেন চারপাশের বনানী দেখতে দেখতে আর চোখের জল ফেলতে ফেলতে।
স্বামীর বদলীর চাকরির সুবাদে সরলা বসুকেও ঘুরতে হয়েছে সুন্দরবনের নানান জায়গায়। দেখেছেন কত না গাছ-পালা, বৃক্ষ-লতা, পশু-পাখি আর মানুষ। এক জায়গায় বন্ধুত্ব গড়ে উঠার পরই তাকে ছেড়ে আসতে হয়েছে মনের কষ্ট মনে চেপে, দেখেছেন কলেরার মহামারী, টানা তিনদিন থেকেছেন জলহীন হয়ে শুধু ডাবের জল খেয়ে, দেখেছেন ঝড়-বন্যা, দেখেছেন মানুষের অদ্ভূত বেঁচে থাকা। এভাবেই কেটেছে কৈশোরকালের ৪/৫ টি বছর, সেইসব অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন এই বই। চমৎকার গদ্যে, সহজ-সরল ভাষায় লেখা স্মৃতিকথাটি পড়ে ভালো লেগেছে খুব।
প্রকৃতি নিয়ে বিভূতিভূষণের চেয়ে ভালো লেখা আমার অন্তত চোখে পড়েনি। বিভূতিভূষণ এই জঁরার মাস্টার। তার প্রকৃতিবিষয়ক লেখালেখির সবচেয়ে উৎকৃষ্ট রুপ - 'আরণ্যক'। আমি এ যাবত যত বইপত্তর পড়েছি, তার মধ্যে সবচেয়ে সেরার যদি একটা ছোটখাট লিস্টও করি তবে তাতে আরণ্যকের নাম অতি অবশ্যই থাকবে। আরণ্যকের প্রভাব আমার কাছে এতটাই।
তুলনায় যাবো না। বাংলা সাহিত্যের গ্র্যান্ডমাস্টার বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে এরকম তুলনা উচিতও নয়। তবে সরলা বসু বিভূতিভূষণের দেখানো ঐ পথে হাঁটার একটা চেষ্টা চালিয়েছেন তার জল বনের কাব্যে। এবং দেখলাম তিনি বইটা উৎসর্গও করেছেন বিভূতি বাবুকেই।
তো কেমন লাগলো জল বনের কাব্য? এক কথায়, অসাধারণ। এক কিশোরী বধূর সুন্দরবন যাত্রা ও সেখানে বসবাসের স্নিগ্ধ বর্ণনায় ভরপুর জল বনের কাব্য। ফরেস্ট অফিসার স্বামীর পিছু পিছু সুন্দরবনের বেশ কিছু ফরেস্ট অফিসে ঘুরে বেড়িয়েছেন সরলা বসু। তারই অভিজ্ঞতার ফসল বইখানা।
অফিসের ব্যস্ততায় বিরতি দিয়ে দিয়ে পড়তে হয়েছে। তবে যতক্ষণ পড়েছি ততক্ষণ এক অদ্ভুত মায়াময় আবেশে ডুবে ছিলাম।
সুন্দরবনে কাটানো সময় নিয়ে লেখিকার স্মৃতিচারণ। আলাদা একটা জায়গা করে নেওয়ার মতো একটা বই। কি সুন্দর, কি মায়া ভরা লেখা! আর প্রকৃতির কি সুন্দর বর্ণনা!!
প্রকৃতি ছাড়াও ঐখানে থাকা অবস্থায় অনেকরকম মানুষের সাথে লেখিকার কথা হয়, পরিচয় হয়, আপন হয়। তাদের নিয়েও অনেককিছু বলা হয়েছে।
সাল ১৯৫৭। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কাল। সেই সময় এগারো বয়েসের এক ফুটফুটে মেয়ে তার স্বামীর সাথে পাড়ি দিল সুন্দরবনে।তার স্বামী ফরেস্ট অফিসার। । সুন্দরবনের নদী ও অরণ্য ঘেরা নানা কোণে তাকে যেতে হয়, থাকতে হয় স্বামীর কর্মসূত্রেই। সুন্দরবনের বিচিত্র মুহূর্ত ও মানুষের সমাবেশে ভরে উঠতে থাকে তার জীবন। সদ্য কিশোরী থেকে একটু একটু করে বড়ো হতে থাকে মেয়েটি।
স্বামীর কর্মক্ষেত্র পরিণত বয়সে সেই চার/পাঁচ বছরের স্মৃতিকথা এক ঝরঝরে গদ্যে লিখে ফেলেন তিনি।
তার স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে পাখিদের স্মৃতি, নটবরের আদর-মমতা,সই পাতানোর গল্প, সুন্দরবনের কানন-প্রান্তর, আকাশ-বাতাস, লতা-পাতা, সাপ-বাঘ, মাছ-পাখি, ফুল নদী!কি স্নিগ্ধতা,কি সুন্দর সাবলীল বর্ণনা।পড়ার পর মুগ্ধতার রেশ থেকে যায় অনেকক্ষণ।
সরলা বসু। কবি অরুণাচল বসুর মা।সুকান্তের বাল্যবন্ধু ছিলেন কবি অরুনাচল বসু। সুকান্ত সমগ্রতে লেখা সুকান্তের চিঠিগুলির বেশিরভাগই অরুনাচল বসুকে লেখা। অরুনাচল বসুর মাতা কবি সরলা বসু সুকান্তকে পুত্রস্নেহে দেখতেন।তিনি কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের মাতৃসমা।
সরলা বসুকে প্রভাবিত করেছিলেন বিভূতিবাবু(বিভুতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়)। তার বর্ণনায় বিভুতিবাবুর প্রভাব স্পষ্ট ভাবেই লক্ষনীয়।আমার প্রিয় কিছু বর্ণনা তাই জুড়ে দিলাম-
'পথে-পথে তখন নতুন ধানের গন্ধ। দু'পাশে সজনেফুল, নামের বোল, কুল-ভরাক্রান্ত গাছ। পথের দু'ধার দিয়ে টানা রৌদ্রে লঙ্কা-বেগুন, মটর-খেসারি, সোনার ফুলে ভরা সরষে ক্ষেত। আম্রমুকুলে, সজনে ফুলে, ভ্রমর গুঞ্জন। শাদা বাসক পুষ্পগুলি ধু-পূর্ণ। পাথরকুচি মঞ্জরীও মধুভরা। আর পথে, মাঠে, বাতাসে খেজুররস জ্বালানো মধুগন্ধ। আমরাও চলেছি ধীরে, গ্রাম তে গ্রামান্তরে মধু অপরাহ্ণে।'
'জলার কিনারে কলমী ঝোপেও নীল কলমী ফুল। খৈয়ের মতো ফুটে আছে শাদা ছোট্ট-ছোট্ট শালুক ফুলগুলি। জলাটা যেন রূপকথার মালঞ্চ বন। জলের তলায় কালো ফুটি-ফুটি দেওয়া ছোট্ট তিতপুঁটির ঝাঁক। রুপোলী চওড়া সরপুঁটিরাও কেমন ঘুমোয়। সত্যিই শরতের ধরা-ভরা সুন্দরবন মানুষকে আকুল করে, মুগ্ধ করে তোলে। উচ্ছ্বসিত পূর্ণা কপোতাক্ষী, ওপারের পল্লবাকীর্ণ বনশ্রী অতিবড় রিক্ত মনকেও পূর্ণ করে দেয়। ভাদ্রের রৌদ্রে হীরকের মতো ঝিক-মিক করে জলস্রোত। রাত্রের জ্যোৎস্নায় মায়াময়ী হয়ে ওঠে রূপসী নদী। ভেড়ির নিচের বন্য গাছগুলির মাথায় জ্যোৎস্না পড়ে। মনে হয় জ্যোৎস্নাই যেন রাত্রির ফুল।
নদীর ধারে বন্য কেয়া ঝাড়ে শাদা-শাদা লম্বা ফুল ফুটেছে অনেক সুগন্ধ আসছে পুবের জালালাটা দিয়ে। পুবালী বাতাসটাই হয়ে উঠেছে কেতকীগন্ধ সুরভিত।'
এই হাসির মিষ্টি সুর যেন মিছরির টুকরোর মতো খচ খচ করে বেঁধে বুকে। মনকে দোলায় ভোলায়, জীবন-দৈন্যকে মুছে দেয়। যৌবন-প্রাতের একান্ত সাথীটিকে ফিরিয়ে আনতে আজও মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে।'
'হাওয়ায়-হাওয়ায় জেলের খটি থেকে ভেসে আসে কার জানি সুমধুর কণ্ঠস্বর অপূর্ব গান ও বাঁশীর সুর। কে জানি সারারাত বন- বাতাসের দোলায় মন-উদাস-করা বাঁশী বাজায় আর গান করে। সে অপূর্ব সুরে মন আকৃষ্ট করে, দূর-দূরান্ত ভাসিয়ে নিয়ে যায়। বেশ স্পষ্ট শুনতে পাই যে গানটা ও গায়। সেই গান বাঁশীতে সুর তোলে। যে গান গায়, সে নাকি খটির মালিকদের ছেলে। সুগায়ক ছেলেটিকে দেখতে বড়ো কৌতূহল হয়।খটির ছেলেটি বাঁশী বাজায়, গান করে:
কাঁহা জীবন ধন,
বৃন্দাবন কাঁহা মেরি হৃদয় কি রাজা,
শূন্য হৃদয়-পুরী,
আও আও মুরারী, মোহন বাঁশরী বাজা..
কোন অতীত যুগের বিধুরা কোন গোপ বধূর আকৃতি ওই গানের মূর্ছনায়, বাঁশীর সুরে।
শ্রাবণের ভারাক্রান্ত বনের মাথায় মেঘ ঝ'রে পড়ে বেদনাতুর গানের সুরে।সুগায়ক ছেলেটিকে নিয়ে মন নানা জল্পনা-কল্পনা করে। ওকে যেন কেমন রসস্যময় লাগে। ওকে দেখবার একটা অদম্য কৌতূহলও পোষণ করি।একদিন সুযোগও এলো ওকে দেখবার। আপিসে একদিন হরির লুট হলো। কয়েকজন কীর্তনিয়া গান করলো। আর
একজন ছড়াকার ছড়া কাটলো। ছড়াকার লোকটি একেবারেই নিরক্ষর। কিন্তু আশ্চর্য! তাকে যাই বলা যায়, সে অমনি সুন্দর ছড়া তৈরি করে। একটুও অমিল হয় না। মানেও ঠিক হয়। সারা জীবন ধরে মানুষে যা পারে না ও মূর্খ নিরক্ষর মানুষটি কি করে তা পারলো অবাক হয়ে ভাবি।
ছড়াকার একজন কাঠ-কাটা বাওয়ালি। আর কীর্তনিয়াদের বাড়ি নিকটের গ্রামে। কীর্তনের আসরে নিমন্ত্রিত হয়ে এলো খটির গায়ক বাঁশীওয়ালা ছেলেটি।
এতোদিন যাকে কতো কল্পনার রঙে অপরূপ রহস্যময় ভেবেছি, আজ বলিষ্ঠ গাঁট্টাগোট্টা, মুখ গোল, নাক চেপটা কালো ছেলেটিকে দেখে, আমার কল্পনার সৌধ ভেঙে পড়লো। ও বাঁশী বাজালো, গান গাইলো-আমি কিন্তু তেমন ভালো শুনলাম না। কতো গভীর রাত্রে বন-বাতাসে, নদীর কল-সুরে ওর গান আমায় ভাসিয়ে নিয়ে যেতো কোন দূরান্ত পারে। ওকে দেখার পর থেকে বাঁশী-গান আমার কানে একঘেয়ে হয়ে গেলো। আর তেমন ভালো লাগে না।'
সরলা বসুর "জল-বনের কাব্য" কোন কাব্যগ্রন্থ নয়। তবে জল ও বন শব্দ দুটো চোখে পড়ার সাথে সাথে মনে ভেসে ওঠে সুন্দরবনের কথা। সময়টা ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের, এগারো বছরের ছোট্ট একটা মেয়ে বাবা মা আত্মীয় পরিজন ছেড়ে স্বামীর সাথে চলেছেন সুন্দরবনে, স্বামী সেখানে ফরেস্ট অফিসার। গহীন অরণ্যে তার কাজ।
নদ-নদী বন পেরিয়ে গহীন সেই অরণ্যে স্বামীর সাথে কেটেছে কয়েটা বছর। বদলীর চাকরি তাই নানা বনে ঘুরেঘুরে জীবনে জমিয়েছেন অনেক স্মৃতি, নানা জায়গায় নানা মানুষ, নদ-নদী, বন ও অপকৃতির মধ্যে কেটেছে জীবনের অনেকগুলো বছর। সেই সব সঞ্চিত স্মৃতি নিয়েই সরলা বসুর এই বই "জল-বনের কাব্য" স্মৃতিকথা।
বইয়ের নামে কাব্য থাকলেও এ আসলে স্মৃতিকথা। সে আজকালকার কথা নয়, আজকালকার স্মৃতিকথাও নয়। নয় বছরের একটি মেয়ের বিয়ে হয়েছিল সুন্দরবনের এক ফরেস্ট অফিসারের সাথে। সরলা বসু নামের মেয়েটি আর তার স্বামী অশ্বিনীকুমার বসু দুজনেরই বাড়ি ছিল যশোর জেলায়। এগার বছরের বালিকা বা কিশোরীটি তার স্বামীর সাথে গিয়েছিল স্বামীর কর্মস্থল সুন্দরবনে। সে আজকের সুন্দরবন নয়, সেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের গোড়ায় ১৯১৪ সালে। দেশভাগ তো আর সবকিছুর মতোই সুন্দরবনকেও দু দেশের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছে, তখন তো সে বিভক্তি ছিল না। স্বামীর বদলীর সুবাদে বেশ কয়েকবছর কাটিয়েছিলেন সুন্দরবনের নানা স্থানে সরলা বসু। কৈশোর আর প্রথম তারুণ্যের সেই মধুর দিনগুলোর স্মৃতিই তিনি লিখেছেন বহু বছর পরে ১৯৫৭ সালে। অখ্যাত প্রকাশণীর, বিজ্ঞাপন বা প্রচারবিহীন বইটিও জয় করে ছিল পাঠক হৃদয়। তারই পূনঃমূদ্রণ হয়েছে আবার বহু বছর পরে। কোথায় যেন একবার পড়েছিলাম- নারীর চোখে বিশ্বকে দেখুন। সরলা বসুর এই লেখাটি যেন নারীর চোখে একটি সরলা কিশোরীর চোখে অতীতের সুন্দরবন, সেখানের জীবনযাত্রা, মানুষ আর সুন্দরবনের তাবৎ জীবকূলকে দেখা। বইটি লেখিকা উৎসর্গ করেছিলেন তার সাহিত্য রচনার প্রেরণা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। লেখার ভঙ্গীতে মিল হয়তো বা নেই, তবু এ যেন আরেক আরণ্যক অথবা আরেক অভিযাত্রিক- কেবল স্থান, কাল, পাত্র ভিন্ন।
প্রথমবার তো গিয়েছিলেন একেবারে বালিকা বয়সে। সেকালের সুন্দরবনের যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল আদ্যিকালের মতোই। জলপথে দিনের পর দিন বোটে করে গিয়েছিলেন তার স্বামীর তৎকালীন কর্মস্থল সৌলা নদীর ধারে সুপতিতে। তার খুব কাছেই সাত নদীর মোহনা। তখন বর্ষাকাল। সে এক নির্জন বন প্রান্তর। আশেপাশে কোথাও লোকালয় নেই। তার দেখাশোনার জন্য দায়িত্বে ছিল যে লোকটি অক্ষয়, এই ছোট্ট বালিকা বধূটিকে দেখে বলেছিল তোমার নিশ্চয়ই মা নেই, আর থাকলেও সে নিশ্চয়ই সৎমা। নাহলে এই টুকুন একটি মেয়েকে কেউ এই বন জঙ্গল বাঘের দেশে পাঠায় কখনো? সুপতি অফিসটি ছিল সুন্দরবনের দূর্গমতম এলাকায়। জোয়ারের জলে ভেসে আসতো সাপ, মাছ এমনকি কুমীরও। সন্ধ্যার পরে প্রাচীর ডিঙিয়ে হাজারে হাজারে হরিণ উঠে আসতো অফিসের পাশের মাঠের ঘাস খেতে। বুড়ো বাবুর্চি ভাড়ার থেকে ছোট্ট মেয়েটিকে খেতে দিত পেস্তা, বাদাম, কিসমিস বা চিনি আর গল্প করতো ওর মেয়ে পরীবানুর। অলস দুপুরে শোনা যেত ঘুঘু আর বনমুরগীর ডাক। সকালবেলা উড়ে যেত গাঢ় সবুজ রঙা বন টিয়ের দল সৌলার এপার থেকে ওপারে। অফিসের পিছনের শিসেখাল দিয়ে ভেসে যেত বনহাঁস আর পানকৌড়ি। লতা ঝোপে খেলা করতো ডাহুকের দল। শাক সবজি পাওয়া যেত না, তবে মাছ পাওয়া যেত প্রচুর- ভেটকি, পারসে, কান-মাগুর, বাগদা চিংড়ি আরও কতো কি। জঙ্গলে গাছ ছিল কতো- সুন্দরী, পশুর, গরান, কেওড়া, ধোঁদল, বাইন আরও কতো কি। এই নির্বান্ধবপুরীতে একলা মেয়েটির অফিসের কোয়ার্টার থেকে বাইরে যাবার উপায় ছিল না। তবু স্বামী অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকলে বা দূরে গেলে নিচে নেমে গল্প জুড়ে দিতো বুড়ো অক্ষয়, বোটম্যান, চাপরাশী আর বাওয়ালীদের সাথে। বর্ষার আকাশে মেঘের সারি দেখে ওর মনে হতো ওরা নিশ্চয়ই তার বাপের বাড়ি হয়েই এসেছে। একদিন শোনা গিয়েছিল খোঁয়ারে আটকে পরা বনের রাজা বাঘের গর্জন, পরদিন দেখার সুযোগ হয়েছিল মৃত বাঘটিকেও, ঠিক যেন ঘুমিয়ে আছে, এক্ষুনি জেগে উঠবে। সুপতি থেকে স্বামীর বদলী হলো ফিউয়েল কুপে। এগার বছরের মেয়েটি আবার ফিরলো বাপের বাড়ি।
আবার সে ফিরলো যখন সুন্দরবনে তখন তার বয়স চৌদ্দ। আগের মতো আর চঞ্চল বালিকা নয়, লজ্জানম্র বধূ। এবার স্বামী যে অফিসে আছেন তার নাম বুড়ি-গোয়ালনী। এবারের অভিভাবক আরেক পিতৃসম প্রৌঢ় কর্মচারী নটবর। দূরে ছিল বুড়িগোয়ালনী গ্রাম। সেই নতুন অফিসের পিছনের জঙ্গলে মেয়েটি ঘুরতে ঘুরতে না জেনে চলে গিয়েছিল বন বিবির থানে। স্বপ্নে দেখা দিয়েছিল বনবিবি আর তার সখীরা। হয়তো সে স্বপ্নই কেবল। তারপরের বদলী সাহেবখালিতে। এবারে আলাপ আর বন্ধুত্ব হলো সন্ধি বুড়ি আর বিন্দি বুড়ির সাথে আর উত্তম নস্করের বড় বউয়ের সাথেও। স্নেহময়ী এই বড় বউকে গ্রামবাসী ডাকতো ডাইনী বলে, সন্ধি বুড়িকেও তাই। অথচ কাছে এসে দেখা গেল সরল আর বুদ্ধিমতী দুই নারী এরা। এমনি আরেক অফিসে গিয়ে বন্ধুত্ব হলো কাছের গ্রামের মেয়ে সরলা মিতিন আর তার পিসতুতো বোন জহ্লাদির সাথে। আরেক অফিসে এসে বন্ধুত্ব হলো আছিরদ্দি মাঝির মেয়ে আলেতম আর তার চাচাতো বোন জালেতম এই দুই সরল বালিকার সাথে। পরিচয় হয়েছিল গ্রামের সরল বিত্তশালী বুড়ো শের আলীর সাথেও। শুধু মানুষ আর জঙ্গল বা তার পশুপাখির সাথে না পরিচয় হয়েছিল কলেরার মহামারী আর দুর্ভিক্ষের সাথে। আর সেন সাহেবের মতো খল চরিত্রের মানুষের সাথেও। ভাগ্যের খেলায় একসময় স্বামীর সাথে সুন্দরবন ছেড়ে আসতে হয় সরলা বসুকে। তখনও তার বয়স হয়তো আঠার পার হয় নি। কিন্তু রয়ে গিয়েছিল শত শত স্মৃতি, ছবির মতো সেইসব স্মৃতিই সরলা বসু লিখেছিলেন বহু বছর পর তার প্রৌঢ় ��য়সে। ভাগ্যিস লিখেছিলেন নাহলে এই অমূল্য রত্নসম স্মৃতিকথাটি আমরা পেতাম কোথায়।
কিছুই মনে নেই, কি পড়েছি! কিন্তু পড়ে ভালো লেগেছে । একজন কিশোরীর সুন্দরবনের কাটানো বিবাহিত জীবনের এক মিষ্টি বর্ণনা ।ভালো লাগছিল, উনার এই নির্জন পরিবেশে নতুন নতুন মানুষদের সাথে স্নেহ মমতার সম্পর্কের বর্ণনা, সুন্দরবনের শ্যামসুন্দর রূপ, কখনও বা কঠোর রূপ, অফিসের বিবরণ, নদীপথের বিচিত্র অভিজ্ঞতা গুলো ।কখনো সুন্দরবন ঘুরতে যাইনি । উনার বই পড়ে যেতে ইচ্ছা করছে অনেক ।অন্তত বর্ষাকাল টা সেখানে কাটাতে মন চাইছে । কিন্তু সুন্দরবনের অনেক জিনিস নিয়ে কিছুই বুঝিনি বইতে অজ্ঞতার কারণে । অনেক জায়গার অনেক বিষয় নিয়ে লিখা, নতুন নতুন জায়গার নাম লিখা,যেগুলো কখনো শুনিনি, তাই অনেক ঘটনা মনে নেই পড়ার পর ।তবুও ভালো লেগেছে ।
বই: জল-বনের কাব্য লেখক: সরলা বসু প্রকাশনী: পার্চমেন্ট প্রচ্ছদ: খালেদ চৌধুরী রচনাকাল ও প্রথম প্রকাশ -১৯৫৭ প্রথম পার্চমেন্ট সংস্করণ -২০১৯ পৃষ্ঠা: ১২২ মূল্য: ২৫০ রূপী
জল-বনের কাব্য।
কোথা থেকে শুরু করা যায় ঝরঝরে গদ্যে আঁকা এই স্মৃতিকথা?
যে মায়া জড়ানো লেখা রয়েছে দুই মলাটের মাঝে তা পড়ে ফ্রয়েডের লুসিডিটির মতো একটা অনুভূতি হয়। ইলিউশন হয়। অবসেসন হয়। যে দিকেই তাকাবেন অরণ্য ও নদী। সাথে অজস্র নাম না জানা ফুল, ফল এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বাঁক। মাত্র এগারো বছর বয়সে বিয়ের সূত্র ধরে ফরেস্ট অফিসার স্বামীর সাথে সুন্দরবনের বন্যতায় শুরু বসবাস। সেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পোয়েটিক মেটাফোর আচ্ছন্ন করে রাখবে পাঠকের মুগ্ধ দৃষ্টি।
সেই মুগ্ধ দৃষ্টির কাছে পাঠকের প্রকাশের শব্দ ভান্ডারও হয়ত হয়ে পড়ে অপ্রতুল। জল-বনের কাব্য প্রসঙ্গে কবি সুভাস মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন -
"আমার সব হিসেব গোলমাল ক'রে দিয়েছিল "জলবনের কাব্য"। অখ্যাত প্রকাশক। অনাদরে ছাপা। বিজ্ঞাপন নেই। বাঁশ দিয়ে তোলা অনুকূল সমালোচনা নেই। এ সত্বেও, যতদূর মনে পড়ে, বই বিক্রি খারাপ হয়নি। পুরোটাই লেখার কব্জির জোরে।"
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের এই কথাগুলোও সরলা বসুর "জল-বনের কাব্য" কতটা মিষ্টি সেটা হয়তো সম্পূর্নরূপে উঠে আসে না। এই স্মৃতিকথা যেমন সরল তেমিন আলাদা মাত্রায় মায়াময়।
সরলা বসুর জন্ম ১৯০৩ সালে। ১১ বছর বয়সে সুন্দরবন যাওয়া। মানে ১৯১৪ এর দিকের উদার সুন্দরবন তার সবটুকু রূপ, রহস্য ও কাব্যময় বর্ণনা পাঠককে দুটো দিকেই ঠেলে দিবে। হয়তো পাঠক সেই আবসেসন বা ইলিউশনের দিকে যাবে, নচেৎ স্রেফ প্রেমের দিকে। প্রাকৃতিক প্রেমের এক আখ্যান সরলা বসুর "জল-বনের কাব্য"। এই স্মৃতিকথায় লেখিকা নিজের ব্যক্তিগত কথাগুলো বলে এর গতিপথ খুব একটা বিঘ্নিত করেননি, বরং সেগুলো খুবই স্বল্প পরিসরে এনে দৃশ্যায়িত করছেন প্রকৃতির নিজের নিয়মে বেড়ে ওঠা নদী, সুন্দরবন এবং সেখানকার মানুষদের কথা। বন আইনের হালকা কিছু কথা, নারীজীবনের প্রচ্ছন্ন কিছু দৃশ্য তুলে ধরেছেন পাশাপাশি।
সোজাসাপ্টা সরলরৈখিক বর্ণনার মধ্যে দিয়ে সরলা বসু শুধু তার নিজের উপভোগ, অভিজ্ঞতা ও রসবোধকে বিস্তারিত করে পৃষ্ঠায় আটকে রাখেননি - বরং এই অসম্ভব সুন্দর বই তার পাঠককেও আটকে রাখবে এক চমৎকার ছন্দময়তায়।
যে কোন সৌন্দর্য বা শ্রেষ্ঠত্ব আপেক্ষিক এবং দৃষ্টিকোণের উপর নির্ভরশীল জানা কথা। তবে সরলা বসুর "জল-বনের কাব্য" অসাধারণত্বের দাবি নিয়েই ঠায় দাঁড়িয়ে আছে পাঠকের সামনে। আশ্চর্য গল্প বলার জার্নিতে সরলা বসুর আঁকা ছবিটা আমাদের কাউকেই হতাশ করবে না। বরং সরলা বসুর সরল শব্দে "সুন্দরবন" যেন রূপান্তরিত হয়ে হয়েছে "পরমাসুন্দরী-বন"।
খালেদ চৌধুরীর আঁকা অসাধারন এই প্রচ্ছদ অসাধারণত্বের দাবিটুকু আরও জোরালো করে বৈকি। এবং একি সাথে "পার্চমেন্ট" প্রকাশনীর ফাল্গুনি ঘোষকে ধন্যবাদ ইতিহাসের এরূপ মনি-মুক্তাগুলো তুলে ধরার কাজে নিয়োজিত হবার জন্যে।
জল বনের কাব্য, সরলা বসু। প্রকাশক মনোরঞ্জন মজুমদার, আনন্দধারা প্রকাশন, ৮ শ্যামাচরন দে স্ট্রীট, কলিকাতা- ১২, ১৯৫৭ খৃষ্টাব্দ। ১৫৬ পৃষ্ঠা। দামঃ চার টাকা। নতুন প্রকাশঃ পার্চমেন্ট, ৩০/১এ কলেজ রো, কলিকাতা ৯, ভারত। ১২২ পৃষ্ঠা। ISBN, মুল্য ও অন্য প্রকাশনা তথ্য বিক্রয় ওয়েবসাইটে দেয়া নেই।
এক দুর্লভ ধরনের বইয়ের একটি এই জল বনের কাব্য। ১৯৫৭ খৃষ্টাব্দ এর রচনাকাল বলা আছে বইতে, ঘটনার সময় তার বেশ আগের বলে অনুমান।
যশোরে জন্ম নেয়া ১১ বছরের এক বালিকা সরলা বসু (১৯০৩-১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দ) সদ্য পরিণীত স্বামীর সাথে স্বামীর কর্মস্থল সুন্দরবন বনাঞ্চলে যাচ্ছেন। স্বামী বন বিভাগের কর্তা। তারপর ঘুরে ফিরে স্বামীর অকস্মাৎ-সমাপ্ত কর্মজীবনের পুরোটা জুড়ে সুন্দরবন ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলে বাস করেছেন।
সে জীবনের স্মৃতিচারণ এই বই। তবে লেখিকা সব স্মৃতিকে সমান গুরুত্ব দেন নি, তাঁর প্রথম সন্তানটি অকালে মৃত্যু বরণ করে জন্মের কিছু পরেই (পৃষ্ঠা ৮২), তা নিয়ে দু’চার বাক্যের বেশি নেই। আছে কেবল বাদা বনের প্রাচুর্য, বনের অপার সৌন্দর্য, ঘোর বনাঞ্চলের রহস্য, সুন্দরবনের মাছ, সুন্দরবনের মানুষ, আর তাঁর সরল আনন্দময় জীবনের খতিয়ান। সুন্দরবনের মাছ একটা প্রধান বিষয়, মাছে ভাতে বাঙ্গালী। এ দেশের মানুষের কাছে মাছের প্রাচুর্য সকল প্রাচুর্যের ওপরে, “জেলেদের নিয়ম, বনকরের বাবুদের নৌকা দেখাতে হবে। মাছ দিতে হবে।” (পৃষ্ঠা ১০)। এভাবে বহু জেলে নৌকোর মাছে একটা ঘর ভরে যেত প্রায়ই, সেখান থেকে নিজেরা খেতেন, আশপাশের মানুষদের বিলোতেন – “রেখা, রুচো, দাঁতনে, ভাঙান, কালভোমরা, পানখাওয়া, পারসে, তপসে, কুঁচো চিংড়ী” (পৃষ্ঠা ৬৯), আরও কত নাম না জানা মাছ। এর অধিকাংশ নামই আমি কখনও শুনিনি। গলদা চিংড়ীর ‘ভাতে ভাত’, “পারসে মাছ ভাজা, ঘি, মধু” দিয়ে ভাত খাওয়া (পৃষ্ঠা ৭২), হরিণের মাংস খাওয়া ও বিলানো (পৃষ্ঠা ১৩৩) – সে বড় লাবণ্যময় জীবন। এমন লাবণ্যময় জীবনের বর্ণনা পড়েছিলাম বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৯৪-১৯৫০ খৃষ্টাব্দ) ইছামতী (১৯৫০) উপন্যাসে, সেখানে প্রাচুর্য ছিলোনা, তবু লাবন্য ছিল।
প্রকৃতি উদার সুন্দরবনে – এমন সব প্রাণীর সাক্ষাত ঘটে যা বনের বাইরের মানুষ কল্পনাও করেনা দেখার – বাড়ির উঠোনে, বারান্দার নীচে সাপেরা জ্যোৎস্নায় নৃত্য করছে, পাখীর ছানা ধরে খাচ্ছে (পৃষ্ঠা ১২৫), উঠোনের পরের নদীর ঘাটের নীচে বুড়ো বুড়ি কুমীরের আস্তানা, তাদের ঝাপটা ঝাপটি শব্দ নিত্য কানে আসে ((পৃষ্ঠা ১৩৪), পুকুরে জোঁকের ঘন বসতি (পৃষ্ঠা ১২৫), আবার কোথাও ঘটি ডোবালেই তাতে ডিম ভরা টেংরা মাছ উঠে আসে কয়েকটি, গ্রামের লোকেরা গরু পালে, একটি দুটি নয়, দুই তিন শত একেজনের গরু।
বন আইনের অনেক প্রয়োগ লেখিকার কাছে প্রহসন মনে ���য়েছে লঘু গুরুর পার্থক্য না থাকায় – “চাঁদপাই আপিসে তিনটে ‘ঘু-ঘু ধরা’ মোকর্দমা হয়েছিল ছ’মাস। সুন্দরবন থেকে একটা ঘুঘু ধরলে বেআইনি। আবার ধানসাগর আপিসে এককাঁদি গোলফল কাটার মোকর্দমা হয়েছিল শুনেছিলাম।“(পৃষ্ঠা ১১১)।
লেখিকা বনের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন, সে মুগ্ধতাই এ বইয়ের কারন ও প্রধান বিষয়ঃ “উচ্ছসিত পূর্ণা কপোতাক্ষি, ওপারের পল্লবাকীর্ণ বনশ্রী, অতিবড় রিক্ত মনকেও পূর্ণ করে দেয়। ভাদ্রের রৌদ্রে হীরকের মতো ঝিক-মিক করে জলস্রোত। রাত্রের জ্যোৎস্নায় মায়াময়ী হয়ে ওঠে রূপসী নদী। ভেড়ির নিচের বন্য গাছগুলির মাথায় জ্যোৎস্না পড়ে। মনে হয় জ্যোৎস্নাই যেন রাত্রির ফুল।“(পৃষ্ঠা ৮০)।
এমন কাব্যময় বর্ণনা বইয়ের স্থানে স্থানে।
সুন্দরবনে একবার লেখিকার এক রহস্যময় আধিভৌতিক অভিজ্ঞতা হয়, তা অসাধারণ বলে উল্লেখ না করে পারলাম নাঃ
“একদিন দেখা হল একটি মজার জন্তুর সঙ্গে। আয়তনে শেয়ালের মতোই, গায়ে ডোরাকাটা বাঘের মতো। মুখখানা কতকটা আমাদের দেশের কেঁদোর মত। জন্তটা আমায় চেয়ে দেখে আর সামনে এগোয়। … একটা জায়গা বেশ উঁচু ঢিবির মত। তার ওপর প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড গাছ। গাছগুলি বন্য লতা-বেষ্টিত। গাছ লতা-পুষ্পময়। ভোমরা মৌমাছিরা গুনগুন করছে। বন্য পাখিরা কিচির-মিচির করে উড়ে-উড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে গাছে গাছে। বন্য ফুলের মৃদু গন্ধ-সুরভিত শান্ত-শীতল স্থানটিকে যেন মনে হয় কোন দেবালয়। কি একটা পাতা-লতার সৌগন্ধে আমি যেন কেমন হয়ে গেলাম! কতক্ষন দাঁড়িয়ে ছিলাম তারও ঠিক নেই। হুঁশ হল আমার সেই বিস্ময়াবিষ্ট জন্তটিকে আবার দেখে। … ওর নাম নাকি বাগরোল। …
রাত্রে ঘুমিয়ে-ঘুমিয়ে স্বপ্নে দেখলাম আমি যেন ওখানে গেছি। কতগুলি আমার মত মেয়ে, ফুলের গহনা পরে বাঁশী-বীণা বাজিয়ে ঘুরে-ঘুরে নেচে-নেচে গান গাইছে। কি সুন্দর দেখাচ্ছে ওদের! যেন ফুলের মুকুট পরা রানী। … আমিও ওদের সঙ্গে নাচতে-গাইতে লাগলাম।… ঘুম ভেঙে গেল। … সেদিন সকাল করেই বেরিয়ে পড়লাম। কোন সময় যেয়ে দাঁড়ালাম ভ্রমরগুঞ্জিত ফুলপুষ্প মণ্ডপের সামনে। আনন্দে হাত বাড়ালাম ফুল তুলতে। …
… সে কি কাণ্ড! ছপাৎ করে লতাতি সরে গেল বহু দূরে। ঝুপঝাপ দুপ্ দাপ্ ছপাৎ শব্দে পুষ্পময় লতা গাছগুলি হঠাৎ আন্দোলিত হ’তে লাগলো। ভয়ে ছিটকে এসে পড়লাম বহুদূরে। যেন হতভম্ব হয়ে গেছি। মনে করলাম হঠাৎ ঝড় এল বুঝি। কিন্তু চেয়ে দেখি বনের একটি পাতাও নড়ছে না।“(পৃষ্ঠা ৫২-৫৪)।
বন সম্পর্কিত সাহিত্য খুঁজতে গিয়ে অনলাইনে এই বইটির একটি ডিজিটাল কপি খুঁজে পেয়ে পড়ি। ডিজিটাল লাইব্রেরী অফ ইন্ডিয়া এটিকে পাঠকদের জন্য প্রকাশ করেছেন। অনলাইনে বইয়ের বাংলা নাম দিয়ে অনুসন্ধান করলেই পাওয়া যাবে একটি ‘পিডিএফ’ সংস্করণ। নতুন প্রকাশিত বইটি আমাদের দেশে পাওয়া যায় কিনা জানি না।
--- আবু রায়হান মুহম্মদ খালিদ ।
সুত্রঃ --- ১। জল বনের কাব্য, সরলা বসু। প্রকাশক মনোরঞ্জন মজুমদার, আনন্দধারা প্রকাশন, ৮ শ্যামাচরন দে স্ট্রীট, কলিকাতা- ১২, ১৯৫৭ খৃষ্টাব্দ। ১৫৬ পৃষ্ঠা। দামঃ চার টাকা। ২। লেখিকা সরলা বসুর জীবনী, উইকিপিডিয়া পাতাঃ https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%..., ঠিকানা ১৩ জানুয়ারি, ২০২৩ তারিখে শেষবার পরীক্ষিত। ৩। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর জীবনী, উইকিপিডিয়া ভুক্তি, https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%..., ঠিকানা ১৪ জানুয়ারি, ২০২৩ তারিখে শেষবার পরীক্ষিত।
• জল-বনের কাব্য • সরলা বসু • প্রচ্ছদ -খালেদ চৌধুরী • পার্চমেন্ট • রচনাকাল ও প্রথম প্রকাশ -১৯৫৭ • প্রথম পার্চমেন্ট সংস্করণ -২০১৯
সহজ ভাষায় লেখা স্মৃতি কথা অথবা আত্মকথন পড়তে আমার বেশ ভালো লাগে। এই ধরনের লেখার মাধ্যমে জীবন,সমাজ সম্পর্কে লেখকের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা জানতে পারা যায়। সরলা বসুর লেখা জল-বনের কাব্য পড়লাম সম্প্রতি। প্রকৃতিকে বিশেষ করে অরণ্য ও নদীকে কেন্দ্র করে লেখা রোজনামচা পড়তে খুবই ভালো লাগলো। ফরেষ্ট অফিসার অশ্বিনীকুমার বসুর সাথে মাত্র ৯ বছর বয়সে সরলা বসুর বিয়ে ও ১১ বছর বয়সে স্বামীর কর্মস্থল সুন্দরবনে যাওয়া । এই স্মৃতিকথা তাঁর ১১ বছর বয়স থেকে ১৫/১৬ বছর পর্যন্ত সময়কে কেন্দ্র করে। এই স্বল্প সময়কালে তিনি জীবনকে যেমনভাবে কাটিয়েছেন সেই সব সুখ ,দুঃখ, ভয় এবং প্রকৃতির সঙ্গে কাটানোর মুহূর্তগুলো তুলে ধরেছেন এই বইতে। এই সময়কালে তাঁর পরিচয় হয়েছে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে। তাদের সাথে কিছুদিন কাটানোর পর আবার মায়া ত্যাগ করে আবার নতুন কোনো জায়গায় চলে যাওয়া আবার সেখানে নতুন মানুষদের সাথে আলাপচারিতা ও প্রকৃতিকেও ভিন্ন রূপে পাওয়া। বাড়ি,মা,বাবা,দাদা থেকে অনেক দূরে চলে যাওয়ার কষ্ট, নতুন নতুন জায়গায় মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা, চোখের জলে প্রিয় ও কাছের মানুষদের কাছ থেকে বিদায় নেওয়া ইত্যাদি ঘটনার মধ্য দিয়ে এক কিশোরীর বড়ো হয়ে ওঠা এই নিয়ে এই রচনা।সঙ্গে রয়েছে সুন্দরবনের বিভিন্ন অঞ্চলের অপূর্ব বর্ননা এবং ওখানকার নদী ও বনকে কেন্দ্র করে সেই সময়ের মানুষদের জীবন জীবিকার কথা ,পশু পাখি, গাছপালা, ফল,ফুল এর বর্ননা। এছাড়া বিভিন্ন ঋতুতে সুন্দর বনের প্রকৃতির যে ছবি এঁকেছেন তা এককথায় অনবদ্য। প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে এতো সরল সুন্দর ও উপভোগ্য রচনা আগে পড়েছি বলে মনে পড়ছে না। তাই "জল-বনের কাব্য" এই নামকরণ সার্থক হয়েছে বলেই মনে হয়।
প্রচ্ছদ এই বই এর সম্পদ। আত্মকথার সাথে সামঞ্জস্য রেখে এই প্রচ্ছদের প্রতিটি স্কেচ অসাধারণ হয়েছে।বই এর প্রোডাকশন ভালো।ফন্ট সাইজ বড়ো । পড়তে সুবিধা হয়েছে। বানান ভুল পায়নি।
এই বই এর মাধ্যমে সরলা বসু ও প্রচ্ছদ শিল্পী খালেদ চৌধুরী সম্পর্কে জানতে পারলাম। ৫৪ বছর পর ২০১৯ সালে এই বই আবার প্রকাশিত হলো। প্রকাশককে ধন্যবাদ জানাই এমন সুন্দর একটি স্মৃতিকথা যত্নসহকারে পুনঃ প্রকাশ করবার জন্য। নিঃসন্দেহে এই রচনা বাংলা সাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি।
সরলা বসু নয় বছর বয়সে বিয়ে করেন ফরেস্ট অফিসার অশ্বিনীকুমার বসুর সঙ্গে। তার স্বামী ফরেস্ট অফিসার হওয়ায় বিভিন্ন ফরেস্ট অফিসে পাঠানো হতো বিভিন্ন সময়। সেই সূত্রে সরলা বসু মাত্র এগারো বছর বয়সে তার স্বামীর সঙ্গে রওনা দিল সুন্দরবনের সুদূর দুর্গম সুপতি ফরেস্ট অফিসে। তারপর আর এক অফিস, তারপর আর এক। এই করে করেই তার অভিজ্ঞতার ঝুলি ভারী হতে থাকে। সরলা বসু তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় কাটিয়েছেন কী না জানিনা তবে আমার নিজের পড়তে পড়তে মনে হয়েছে সরলা বসুর সাথে আমার নিজের গোটা সুন্দরবন ঘোরা হয়ে গেল। সরলা বসু প্রত্যেকটা যাওয়ার অভিজ্ঞতা এত সহজ ও সরল করে লিখেছেন পড়তে পড়তে দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠবে। কত কাহিনী, কত রকমের মানুষ, কত জীবজন্তু, কত জায়গার কথা জেনেছি এই বই থেকে। এই বই কত কত স্মৃতি বিজড়িত।
এক একটা ফরেস্ট অফিসে গিয়ে এক একটা অভিজ্ঞতা এই যাত্রা গুলোকে আরও ইন্টারেস্টিং করেছে - কখনও ওনা, কখনও আলেতম জলেতম, কখনও অক্ষয়, কখনও কুমিরের সংসার, কখনও মিতিন, কখনও সন্ধিবুড��ি, কখনও বনবিবি, কখনও বেড়াল ও পাখিদের সংসার, কখনও ম্যানা মাছ, আরও কত কী স্মৃতি থেকে উঠে এসেছে ঝরঝরে প্রাণবন্ত গদ্য হয়ে বইয়ের পাতায়। সরলা বসুর জীবন কীভাবে প্রকৃতির কোলে, প্রকৃতির ভিন্ন ভিন্ন রূপে একাত্ম হয়ে গিয়েছিল তা প্রতিটা পৃষ্টায় জ্বলজ্বল করছে। বিভিন্ন জায়গার বিভিন্ন মানুষ, তাদের খাওয়া দাওয়া, তাদের ব্যবহার, তাদের চালচলন লেখিকার অন্তরে থেকে গেছে অপরূপ চিত্র হয়ে। এই বই নিছক একটি স্মৃতিকথা নয় একটি কিশোরীর পরিবার আত্মীয়স্বজন ছেড়ে প্রকৃতির সাথে বেড়ে ওঠার ও সখ্যতার বুনন। এই বই সুন্দরবনের অপরূপ বর্ণনার দলিল।
অসাধারণ প্রচ্ছদটি করেছেন খালেদ চৌধুরী। চোখ জুড়িয়ে যায় যেন বইয়ের ভিতরে প্রবেশ করার আগে এক ঝলক প্রকৃতির রঙিন ভালো-খারাপ মেশানো রূপ চোখের সামনে ভেসে উঠছে। যেন খেলে বেড়াচ্ছে আলেতম জলেতম ও সরলা। যেন হরিণ ছুটছে, উঁকি মারছে বাঘ, ভেসে বেড়াচ্ছে মাছেদের দল ও কুমিরনি
সরলা বসুর 'জল-বনের কাব্য' কেবল একটি সাহিত্যকর্ম নয়; এটি পাঠকদের জন্য একটি নতুন জগতে প্রবেশের আহ্বান। প্রতিটি পৃষ্ঠা যেন একটি ছবি, যা সুন্দরবনের অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্য ধারণ করে এবং আমাদের মনে সেগুলোর সজীবতা পুনরুদ্ধার করে।
সরলা বসুর জীবনগাথা শুরু হয় তাঁর নয় বছর বয়সে, যখন তিনি ফরেস্ট অফিসার অশ্বিনীকুমার বসুর সঙ্গে ব���বাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এরপর, এগারো বছর বয়সে, তিনি তাঁর স্বামীর কর্মস্থল সুন্দরবনে চলে আসেন। এই বইটি সেই সময়কালকে কেন্দ্র করে লেখিকার জীবনের নানা ঘটনার স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছে। এটি যেন এক কিশোরীর বেড়ে ওঠার গল্প, যেখানে সুখ-দুঃখের পাশাপাশি প্রকৃতির রূপ ও গন্ধ মিশে রয়েছে।
লেখিকার ভাষা সাবলীল ও প্রাণবন্ত। তিনি কেবল দৃশ্যাবলী বর্ণনা করেননি, বরং সুন্দরবনের প্রাণ ও রক্তস্রোতকে পাঠকের সামনে জীবন্ত করে তুলেছেন। তাঁর গড়া কথামালা সুন্দরবনের বন ও নদীর পরিবেশ, সেই সময়ের মানুষের জীবনধারা, এবং প্রাণী ও উদ্ভিদের বৈচিত্র্যকে সুনিপুণভাবে উপস্থাপন করেছে। এর ফলে পাঠক সুন্দরবনের হৃদয়ে প্রবেশ করতে পারবেন এবং প্রকৃতির মাঝে নিজেকে আবিষ্কার করার সুযোগ পাবেন।
খালেদ চৌধুরীর করা প্রচ্ছদটি অনবদ্য। এটি কেবল বইটির বাহ্যিক শোভা নয়, বরং লেখিকার ভাবনার গভীরতাকেও সুন্দরভাবে প্রতিফলিত করেছে।
অতএব, "জল-বনের কাব্য" কেবল একটি স্মৃতিকথা নয়; এটি আমাদের জীবনের প্রতিচ্ছবি, প্রকৃতির সঙ্গে মানব সম্পর্কের একটি চিত্রায়ণ, যা পাঠকদের জন্য একটি নতুন জানালা খুলে দেয়। বইটি যত্নসহকারে প্রকাশ করার জন্য পার্চমেন্টকে ধন্যবাদ।
🌿"এগারো বছরের বালিকা তাঁর ফরেস্ট অফিসার স্বামীর কর্মসূত্রে শহরের অভ্যাস ছেড়ে চললেন সুন্দরবনের গভীরে ছড়িয়ে থাকা নানা অঞ্চলে। সময়টা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আঁচে গনগনে - ১৯১৪। নাগরিক দৃষ্টির আড়ালে থাকা এক আরণ্যক জীবন আর বিস্ময় অভিমান সুখ দুঃখের বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে কাটতে থাকল দিনগুলি।" নব-আষাঢ়ের জলভারাক্রান্ত এক দিনে জলে টইটুম্বুর কত শত নদী পেরিয়ে সুপতি ফরেস্ট অফিসে পৌঁছানো। সুন্দরবনের বৃষ্টিস্নাতা প্রকৃতির সঙ্গে প্রথম পরিচয়। গভীর বন, লবনাক্ত নদী, ডিমভর্তি মাছ ও কয়েকজন অপরিচিত মানুষের মধ্যে এগারো বছরের বাচ্চা মেয়েটির নিঃসঙ্গ জীবনযাপন। সেই বন্য প্রকৃতিতে অনভ্যস্ত ও ভীত মেয়েটির মনে তখন থেকেই যেন একটু একটু করে জায়গা তৈরী করে নিচ্ছিল "শ্যাম গম্ভীর অরণ্যানী" । তারপর চোদ্দ বছরের কিশোরী হয়ে আবার তার সুন্দরবনে আগমন। সেখানকার মাঠ, বন, নদীর মতোই সহজ সরল কিছু মানুষের স্নেহ, মিতিন পাতানো, আপাত সাধারণ কিন্তু মনে দাগ কেটে যাওয়া কত ঘটনা। তারপর আঠেরো বছরের যুবতী হয়ে শেষবারের মতো সুন্দরবনে যাওয়া। সুন্দরবনের বিভিন্ন জায়গায় কাটানো তার মেয়েবেলার নানা টুকরো টুকরো মুহূর্তগুলি ধরা পড়েছে তার লেখা এই স্মৃতিকথা "জল-বনের কাব্য" -তে।
🌿 " সুশ্যাম বনজ সৌগন্ধ এখনও আমায় আকুল করে।..... স্মৃতির পার থেকে ফিরে এসো তুমি শ্যাম গম্ভীর অরণ্যানী! "
🌿 পাঠপ্রতিক্রিয়া : - ছোটবেলায় আমার খুব পছন্দের একটা বই ছিল সুকান্ত সমগ্র। তখন আমার ন - দশ বছর বয়স, কবিতাগুলো না বুঝেই পড়তাম, আর বিশেষ করে ভালো লাগতো চিঠি গুলো। সুকান্ত ভট্টাচার্যের ওই চিঠিগুলির কয়েকটা ছিল তার বন্ধু অরুণ (অরুণাচল বসু)-কে লেখা, কয়েকটি লেখা 'মা' সম্বোধন করা জনৈক মহিলাকে। তখন জানতাম না তিনিই অরুণাচল বসু-র মা সরলা বসু (এই বইয়ের লেখিকা) , মা-হারা সুকান্তকে একান্তভাবে কাছে টেনে নিয়েছিলেন যিনি। এই বইতে লেখিকার সংক্ষিপ্ত পরিচয় পড়তে পড়তে আমার ছোটবেলার সেই স্মৃতিগুলোকে নতুন করে আবিষ্কার করলাম।
কিছু কিছু লেখা থাকে ধীরগতিতে না পড়লে যার সম্পূর্ন মাধুর্য অনুভব করা যায় না। সরলা বসুর "জল-বনের কাব্য" এরকমই একটি লেখা। এক পশলা বৃষ্টির পর প্রকৃতিতে যে স্নিগ্ধতা বিরাজ করে, সেই বৃষ্টিভেজা স্নিগ্ধতার পরশ যেন সমস্ত রচনা জুড়ে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে উৎসর্গ করা এই বইটিও যেন "আরণ্যক " বা "পথের পাঁচালি"-র কথা মনে করায়। তার সঙ্গে উপরি পাওনা খালেদ চৌধুরীর আঁকা প্রচ্ছদটি। বর্তমানে AI দিয়ে তৈরী সব প্রচ্ছদের ভিড়ে এরকম স্নিগ্ধ ও মিষ্টি একটা প্রচ্ছদ দেখলেই মন ভালো হয়ে যায়। সবমিলিয়ে বেশ ভালো লাগার মতো একটি বই।
🌻 কবি অরুণাচল বসুর মা এবং কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের মাতৃসম সরলা বসু। সেই সরলা বসুর লেখা জল বনের কাব্য এক মায়াময় স্মৃতিকথা, যেখানে প্রকৃতির সৌন্দর্যের সাথে ভাষার মাধুর্য মিলে মিশে এক সরস লেখা তৈরি হয়েছে।
🛶সরলা বসু ১১ বছর বয়সে বিয়ের পর ফরেস্ট অফিসার স্বামীর কর্মসূত্রে চলে যায় সুন্দরবন। এই বইতে তিনি তার সেই সুন্দরবনে কাটানো মেয়েবেলার দিনগুলোর কথা তুলে ধরেছেন। শহর থেকে দূরে এক নদী কেন্দ্রিক জায়গার জীবন, পরিবেশ, মানুষজন, পশু পাখি, গাছপালা সবকিছু যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে তার এই লেখার মাধ্যমে। এই বইয়ের প্রতি পাতায় যেন গদ্য দিয়ে তিনি সুন্দরবনকে এঁকেছেন। উনি তার এই সুন্দরবনে থাকার সময় বেশ কিছু জায়গায় ছিলেন, সেখানে বিভিন্ন লোকেরা তার খেয়াল রাখত। পরে সেখান থেকে চলে যাওয়াও তাদের সাথে গোটা জীবন আর দেখা হয় না। নটবর, অক্ষয় এর মতো লোকেদের সাথে আর দেখা না হওয়া মনে করিয়ে দেয় আমাদের জীবনেও তো এমন অনেক প্রিয় লোক ছিলো যারা আজ কোথায় সেটাও জানি না।
🌀 আমার মনে আছে যখন yass নামক ঘূর্ণিঝড় সুন্দরবনে আছড়ে পড়েছিল তার পরবর্তীতে ২-১ দিন সুন্দরবনের এক গ্রামে কাটিয়েছিলাম, জলের মধ্যে বোট এ করে ত্রাণ নিয়ে ঘুরছিলাম। স্থানীয় মানুষদের থেকে অনেক গাছের নাম জেনেছিলাম। এই বই যেন আমার সেইসব স্মৃতি উস্কে দিল আবার।
📝পাঠ প্রতিক্রিয়া- 🔸 বইটা দেখা ছোট মনে হলেও এই বই পড়তে আমার সময় লেগেছে, বইয়ের প্রতি পাতা উপলব্ধি করার মতো। 🔸এই বইয়ের উৎসর্গ যথার্থ। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর স্মৃতির উদ্দেশ্যে এই বই উৎসর্গ করে সরলা বসু এই বইতে সুন্দরবনকে অপরূপ সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন। 🔸এই বইটির ভাষা সাবলীল এবং প্রাণবন্ত।যা সচরাচর পড়ার সুযোগ হয় না। 🔸 আর এই বইয়ের সবচেয়ে দারুন জিনিস হলো খালিদ চৌধুরীর করা এক অসাধারণ প্রচ্ছদ।
🌱 শেষে বলব এ শুধুই এক স্মৃতিকথা নয়, সুন্দরবনের দুর্গম আঁকে বাঁকে ঘুরে যে জীবন তিনি দেখেছেন, যা উপলব্ধি করেছেন তাই তার লেখার মাধ্যমে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। এ যেন দুই মলাটের মাঝে তার একটুকরো মেয়েবেলা।
লেখিকার এগারো বছর বয়সে সুন্দরবনে ফরেস্ট অফিসার স্বামীর সাথে দিনযাপনের বিচিত্র ঘটনাবলীর সমাহার এই ছোট্ট বইটা। সুন্দরবনের প্রকৃতি আর লোকাল��়ের মানুষজনের এমন সহজ-সাবলীল বর্ণনা পড়াটা আনন্দদায়ক এক অভিজ্ঞতা। প্রকৃতির বর্ণনা কিছু কিছু জায়গায় এত মনোহর যে পড়ার সময় মন অবসন্ন হয়ে আসে! যেমন, এক জায়গায় লেখিকা শরৎকালের সুন্দরবনের বর্ণনা দিচ্ছেন এভাবে—
"শরতের ধরা-ভরা সুন্দরবন মানুষকে আকূল করে, মুগ্ধ করে তোলে। উচ্ছ্বসিত পূর্ণা কপোতাক্ষী, ওপারের পল্লবাকীর্ণ বনশ্রী অতি বড় রিক্ত মনকেও পূর্ণ করে দেয়। ভাদ্রের রৌদ্রে হীরকের মতো ঝিকমিক করে জলস্রোত। রাত্রের জ্যোৎস্নায় মায়াময়ী হয়ে ওঠে রূপসী নদী। ভেড়ির নিচের বন্য গাছগুলির মাথায় জ্যোৎস্না পড়ে। মনে হয় জ্যোৎস্নাই যেন রাত্রির ফুল!"
লেখিকা এবং উনার স্বামী দুজনেই বড় মনের মানুষ যেটা উনাদের কর্মকাণ্ড দেখে বুঝা যায়। কিছু বাওয়ালি ভাত খেতে গিয়ে শুধু লবণ চাইলে উনার স্বামী তরকারিসুদ্ধ খেতে দিয়ে যে নির্মল উদারতা দেখিয়েছেন তা চোখ এড়াবার মতো না। এমন ব্যাপার পড়তেও ভালো লাগে।
কিন্তু সবকিছুরই শেষ আছে। লেখিকার এই বিচিত্র ঘটনাবহুল ঘুরে বেড়ানোর শেষটা হাহাকারভরা বর্ণনায় এসে থামে এমন কিছু কথায়—