পি এ নাজির সেন্ট্রাল সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান তথা সিএসপি কর্মকর্তা ছিলেন। ১৯৭০ সালে ইয়াহিয়া যে ৩শ' ৩ জন কর্মকর্তাকে দুর্নীতির দায়ে সাময়িক বরখাস্ত করেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম এই পি এ নাজির। আইয়ুবের আমলে তিনি রাজশাহী, ময়মনসিংহ ( বইতে মোমেনশাহী লিখেছেন) এবং '৬৬ এর ছয়দফা আন্দোলন সময় ঢাকার ডিসি ছিলেন। তার পেশাগত জীবনের স্মৃতি নিয়েই এই বই৷ আইয়ুব এবং মোনায়েম খানের 'গুডবুকে' ছিলেন। পেশাগত আনুগত্যের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছিলেন তমঘা ই পাকিস্তান খেতাব। যারা রাজনৈতিক ইতিহাসে উৎসাহী, তাদের জন্য এই বই পড়া মানে সুখকর অভিজ্ঞতার ঝুলি পূর্ণ করা।
আমাদের পরিবেশ, প্রতিবেশের গড়ন বেশ বদলে গেছে। একমুখিনতা চারিদিকে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ঐতিহাসিক কিংবা সামাজিক, দশদিকেই এখন শুধু একরৈখিক ন্যারেটিভের জয়জয়কার। আলাদা তথ্যপ্রবাহ মোটামুটি সঙ্কুচিত। এই পি এ নাজিরের বইটির কথাই বলি। 'ভদ্রলোক' কট্টরভাবে মুসলিম লীগ সমর্থক। সাম্প্রদায়িক মনসম্পন্ন বললে অসত্য বলা হবে না। অথচ তার কথাগুলোও শোনা খুব দরকার। কেননা ষাটের দশকের অনেক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী তিনি নিজে। দিনের কতশত রাজনৈতিক সাধুকে রাতের আঁধারে মোনায়েম, আইয়ুবের মোসাহেবি করতে দেখেছেন। ময়মনসিংহের ডিসি থাকাকালে দেখেছেন ইংরেজির এক নামকরা অধ্যাপক মোনায়েম খানের পা ধরে বসে আছে। মজার ব্যাপার হলো এই অধ্যাপক মশাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পুঁজি করে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপক পর্যন্ত হয়েছিলেন!
ব্যাংক থেকে টাকা ধার নিয়ে বাঙালির ফেরত না দেওয়ার মানসিকতা নতুন নয়। পি এ নাজির সমবায় ব্যাংকের রেজিস্ট্রার ছিলেন। গোপন ফাইল ঘাঁটাঘাঁটি করে তিনি দেখেছেন, সরকারি-বিরোধী সবাই মিলেই ঋণ নিয়েছে৷ কিন্তু কারোই টাকা ফেরত দেওয়ার ইচ্ছা নেই!
আইয়ুবের সঙ্গে মওলানা ভাসানীর সুসম্পর্কের সূক্ষ্ম ইঙ্গিত দিতে ভোলেন নি পি এ নাজির।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম সিএসপি কর্মকর্তা ছিলেন৷ পি এ নাজিরের অধীনে মহকুমা অফিসারের দায়িত্ব পালন করেছেন। পি এ নাজির তরুণ এইচ টি ইমামের কর্মদক্ষতা, কৌশল এবং বুদ্ধির তখনই তারিফ করেছিলেন৷
ছয়দফা আন্দোলনের সময় ঢাকার ডিসি পি এ নাজির নিজেই চাক্ষুষ করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারকে স্রেফ ব্যক্তিগত রোষানলের কারণে ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে৷
তিনি কট্টরভাবে পাকিস্তানপন্থী এই বিশ্বাস লুকানোর বেশি চেষ্টা করেন নি। আইয়ুব, মোনায়েমের বেশিরভাগ কর্মকাণ্ডের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন অপ্রত্যক্ষভাবে। '৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান পুরো অরক্ষিত ছিল একথ জেনেও যুদ্ধের পক্ষে অযৌক্তিক কথা বলেছেন। অহেতুক হিন্দু বিদ্বেষ দৃষ্টি এড়ান নি। আওয়ামী লীগের প্রতি সুপ্ত ক্ষোভ লক্ষণীয়৷ এই বই পড়লে মনে হবে পাকিস্তানের শাসনে বাঙালিদের কোনো সমস্যাই ছিল না। শুধু রাজনৈতিক দলগুলো ঝামেলা তৈরি করতো৷ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর প্রতি তার এতটাই বিশ্বাস ছিলে যে ইয়াহিয়া এসে তাকে 'অন্যায়ভাবে' চাকরিচ্যুত করলেও সেখানে মূলত দায় খুঁজে পেয়েছেন শেখ মুজিবের!
লেখার হাত ভালো। গতিময় গদ্যরীতিতে লেখা। কতিপয় স্পর্শকাতর তথ্য আছে যা যাচাই-বাছাই করা মোটামুটি অসম্ভব।
সবশেষে বলবো স্মৃতিকথা হিসেবে পি এ নাজিরের 'স্মৃতির পাতা থেকে' মন্দ নয়। পড়লে 'ওদের' ন্যারেটিভটাও জানতে পারবেন।
পি এ নজির সাহেব পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তা ছিলেন। বইটায় তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে উঠেছে। লেখক তাঁর কর্মজীবনের একটা সময় নাটোরের এসডিও ও রাজশাহীর জেলা প্রশাসক ছিলেন। উভয় জেলায় আমার বেশ কিছু সময় কেটেছে। তাই লেখকের বয়ানে রীতিমতো স্মৃতি কাতর হয়ে পড়লাম। লেখক মালদা কলোনী কিভাবে কোন পরিস্থিতিতে গড়ে উঠেছে সেটার বর্ণনা রয়েছে বইয়ে। এছাড়াও জিন্নাহ স্কুল অর্থাৎ বর্তমানে নাটোর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের নামটা বারংবার এসেছে। স্কুলটা থেকে আমি এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছি।
লেখকের দৃষ্টিতে সে সময়টার কথাটা বেশ ভালো মতোই ফুটে উঠেছে। লেখক পাকিস্তান আমলে সরকারের বেশ সুনজরে ছিলেন। তাঁর পোস্টিংগুলো দেখে অন্ততপক্ষে সেটাই মনে হয়েছে। এছাড়াও তিনি তৎকালীন সরকারের কাছ থেকে এর স্বীকৃতিও পেয়েছিলেন।
লেখকের সমবায় ব্যাংকে কাজ করবার অভিজ্ঞতা পড়ে বর্তমান সময়ের ব্যাংক লুটপাটের ঘটনা মনে হলো। অর্থাৎ ব্যাংক লুটপাটের ঘটনা অপরিবর্তিত রয়েছে বলা যায়!
লেখকের বয়ানে ১৯৬৫ সালের পাক ভারত যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আসলেই বিরল। সে সময়টাতে তিনি ময়মনসিংহ জেলায় কর্মরত ছিলেন।
লেখক ডিআইটির প্রধান থাকা অবস্থায় সরকারের কোপানলে পড়েন। সে সময়টাতে তাঁর দৃঢ় অবস্থান প্রশংসনীয়।
বইয়ে সরাসরি না লিখলেও তিনি যে তৎকালীন সময়ে মুসলিম লীগের সমর্থক ছিলেন তা অবলীলায় বলা যায়। তাই পড়ার সময় এ বিষয়টা বিবেচনায় নেয়াটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি।
তবে বইটা পড়ে মনে হলো এ দেশের রাজনীতিবিদগণের মৌলিক চরিত্রগত কোনো পরিবর্তন হয়নি। এ ইস্যুতে লেখক সময়ের সাথে এখনকার সময়টা যেন একসূত্রে গাঁথা।
বইটায় লেখকের পরবর্তী জীবনের তেমন কিছুই পাইনি। এটা নিয়ে কিছুটা অতৃপ্তি রয়ে গেছে।
বইটা ইন্টারেস্টিং। সদ্য প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করা মানুষের মনস্তত্ত্ব কেমন ছিল, একটা চিত্র পাওয়া যায়। আমলাদের আকাশচুম্বী ক্ষমতার দাপট কেমন, তারা কেমন নিজেদের হর্তা কর্তা বিধাতা মনে করে, তা বুঝা যায়। ভদ্রলোক অকপটে লিখেছেন বলে সাধারণ গণমানুষের প্রতি উনার উন্নাসিকতা সুস্পষ্ট। সাধারণ নাগরিক মানেই নাবুঝ অবুঝ নিম্ম শ্রেণীর মানুষ, আর আমলা হওয়ায় নাজির সাহেব বিরাট মাতব্বর, স্যুপেরিয়র মানুষ, প্রতি পাতায় পাতায় তিনি সেটা মনে করিয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশ হওয়ার পর প্রশাসনের এই এলিটিজম বিন্দুমাত্র কমে নাই, বরং বেড়েছে। প্রশাসনের এলিটিজমের শিকড় কোথায়, বুঝতে এ বই পড়া জরুরী।
ভদ্রলোক আইউব খান আর মোনায়েম খানের বিরাট অনুরাগী ছিলেন, তাদের সামনে এই এলিট স্যার কিভাবে লুটোপুটি খাওয়া বিড়ালছানা হয়ে যেতেন, সেটা পড়া খুবই আমোদজনক। এ পরিস্থিতি এখনো বদলায় নাই, বরং আরো প্রকট হয়েছে।
A memoir from an Ex CSP officer. Probably he was from West Bengal or some other part of India. He was highly influenced by the events he experienced migrating from West Bengal to East Pakistan. These unfortunate events deeply influenced his professional life. Therefore he cannot see things from many sides and explain things in his way. There are some information given in this book is quite sensitive and questionable. Apart from all this, the shared experience in this book is valuable for the upcoming and currently serving civil servants of Bangladesh.
পড়াশোনার সূত্রে একজন প্রাক্তন সিএসপি অফিসার এর স্মৃতি কথা পড়তে পারা আমার কাছে লোভনীয় ছিল এবং পড়ে খুবই ভালো লেগেছে। নাজির সাহেবের গদ্য ভালো, একনাগাড়ে পড়া যায়। অনেক কৌতুহল উদ্দীপক তথ্য আছে বইয়ে, যদিও তা যাচাই বাছাই করা প্রায় অসম্ভব। প্রশাসনে জেনেরালিস্ট ও স্পেশেয়ালিস্ট দ্বন্দ্ব সম্পর্কে তার মতামত গুলো পড়ে কোনো বিশেষত্ব খুঁজে পাই নি। সর্বোপরি পুরো বই সুখপাঠ্য, অন্তত আমার কাছে তাই লেগেছে।