এন্তার ‘গন্ডগোলিয়াস’ ঘটনায় জেরবার হয়ে চন্দ্রহাস ভট্টশালী বন্ধুবর রসিকবাবুকে নিয়ে পাড়ি দিলেন কাঠফাটা গ্রামের উদ্দেশ্যে। ইচ্ছে মামার বাড়িতে নির্মল বাতাসে একটু বুক ভরে নিঃশাস নেবেন। কিন্তু জানতেন না যে ঈশ্বর দায়িত্ব নিয়ে ভদ্রলোককে বাঁশ দেবেন বলে চারদিকে ফাঁদ পেতে রেখেছেন। কথায় বলে দশচক্রে ভগবান ভুত.... কিন্তু কাঠফাটার আধ-পাগল,তারকাটা আর বেকুব গ্রামবাসীদের চক্রব্যুহেফেঁসে চন্দ্রবাবু রাতারাতি হয়ে উঠলেন সাক্ষাত যমরাজ প্রেরিত মৃত্যুদূত। এমন কি ঘটনার ঘোর ঘনঘটায় বেচারীকে শেষে জীবিতাবস্থায় উঠতে হোলো শ্মশানের চিতায়! আর এমন সময় আবির্ভাব এক ভয়াল কাপালিকের, যে চন্দ্রহাসের সৎকারের জন্য তৎপর..... তারপর? মামার বাড়ি দু-দন্ড শান্তি পেতে এসে কি বেঘোরে পুড়ে মরলেন শ্রীযুক্ত চন্দ্রহাস ভট্টশালী?
বাংলা সাহিত্যে হাসি আর হাসানোর মতো লেখার খুব একটা দাম দেওয়া হয় না। শিব্রাম চকরবরতির অর্থকষ্ট থেকে শুরু করে তারাপদ রায়ের বিদেশি জোকবুক থেকে টুকে বই লেখার ফলে তাঁর অমন কবিতাগুলো তুশ্চু হয়ে যাওয়া— সবই হাসির বিরুদ্ধে একজিবিট হিসেবে পেশ করা হয়। করোনার করুণায় ক্লিষ্ট জীবনে তো হাসি বলতে শেয়ার করা মিমই সম্বল হয়ে উঠেছে। এই কঠিন সময়ে সৌভিক মুখার্জি ওরফে রসিক উপাধ্যায় আমাদের উপহার দিয়েছেন একটি বিশুদ্ধ হাস্যোৎপাদক উপন্যাস। তার ঠেলায় আমি বিস্তরে শুয়ে বিস্তর হেসেছি। হেসে-হেসে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটিয়েছি বলে গৃহিণী এতই রুষ্ট হয়েছিলেন যে এই করোনার বাজার না থাকলে তিনি আমাকে পাতালে, নিদেনপক্ষে হাসপাতালে পাঠাতেন। কী নিয়ে লেখা হয়েছে 'চন্দ্রহাসের ষোলোকলা'? রসিকবাবুরই আবাসনে থাকেন চন্দ্রহাস ভট্টশালী। তিনি... না, তিনি কেমন দেখতে বা কেমন আচরণ করেন— সেগুলো আমি লিখব না। তার বদলে এই বইয়ে সে-সব পড়লেই আপনারা যথাযথভাবে লেখাটির রসাস্বাদন করতে পারবেন। সংক্ষেপে বলি, চন্দ্রহাস প্রায় রাবণের অসির মতোই অঘটন-ঘটনপটু। শহরে একটি মর্মান্তিক ব্যাড-ভেঞ্চারের পর চন্দ্রহাসকে গ্রামনিবাসী এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়। সেখানে যাওয়ার পথে ট্রেন থেকেই শুরু হয় তাঁর ও রসিকের অ্যাডভেঞ্চার। আর তারপর...? তারপর যা হয় তাতে ওতপ্রোতভাবে মিশে গেছে শিব্রামীয় pun আর শীর্ষেন্দু'র অদ্ভুতুড়ে সিরিজের অনন্য পুষ্পরেণু। সেই pun-পরাগ আরও মশলাদার হয়েছে লাগসই জায়গায় প্রযুক্ত তৎসম শব্দের অনুপানে। সব মিলিয়ে ষোলোটি অধ্যায়ে বিভক্ত এই কাহিনি শেষ হওয়ার পর থম মেরে বসে (বিনা শিসেই) ভাবতে হয়েছে, এটা কী ছিল? এই বইয়ের সম্পদ লেখার সঙ্গে থাকা অলংকরণ, যার রচয়িতা লেখক স্বয়ং। বইটির ন্যূনতম প্রুফও দেখা হয়নি বলে ভারি কষ্ট পেলাম। এমন একটি বইয়ে এত-এত ভুল বানান বইটির গুরুত্ব কমিয়ে দেয়। লেখক পরবর্তী মুদ্রণের আগে কড়া করে প্রুফ দেখানোর ব্যবস্থা করুন। নইলে চন্দ্রহাসে জং ধরে তার সর্বনাশ হবে। ইতিমধ্যে বইটি জোগাড় করতে পারলে অবশ্যই পড়ুন।
বর্তমানের জেট গতির জীবনে সবচেয়ে দ্রুত অদৃশ্য হতে থাকা বস্তুটি কি বলতে পারেন?হাসি।এবং তার চেয়েও বিরলতম বস্তুটি হচ্ছে -হাসির গল্প।কিন্তু বাঙালির জীবনে হাসির গল্প এবং গল্পকারদের কি অভাব ছিল কখনো? সুকুমার রায়ের পাগলা দাশুর কীর্তি বা শিব্রাম চক্রবর্তীর অনন্য সৃষ্টি হর্ষবর্ধন গোবর্ধন বাঙালীকে ৩২ পাটির সফল প্রদর্শন করিয়ে ছেড়েছে। কিন্তু আজকাল? সত্যিই ভাবতে হয়।রহস্য আছে,প্রেম আছে,থ্রিলার আছে,হাসি কই? এমনই হাস্যকৌতুক দুর্ভিক্ষের সময় চোখ পড়ল একটি বই এর উপর। 'চন্দ্রহাসের ষোলকলা' লেখকের নাম রসিক উপাধ্যায়। নামটা সত্যি বলতে বেশ উপাদেয় লাগল।কিন্তু কিন্তু করে দু চার পাতা উলটে বুঝলাম- এ মিত্র ক্যাফের ছানার পুডিং এর মতোই দুর্লভ এবং দেবভোগ্য।অতএব বসে পরলুম বই নিয়ে।পাতায় পাতায় কিম্ভুত ঘটনার কিমাকার বিবরণ, তার সাথে এমন সাহিত্যগুন,সত্যিই খুব তৃপ্তি করে পড়ছিলাম। এর পর যখন লেখক মশাইএর স্বহস্তে চিত্রিত কার্টুন গুলি দেখলাম, বুঝলাম 'cherry on the top' বোধহয় একেই বলে। যাই হোক বই এর এত গুনগান যখন করছি, তার কিঞ্চিৎ পরিচয় দেওয়াও আবশ্যক মনে করি। বই এর নাম চন্দ্রহাসের ষোলকলা হলেও এটি খাদ্যদ্রব্য বিষয়ক কিছু নয় এটা আগেই বলে রাখি। যদিও লেখকের খাদ্যপ্রীতির পরিচয় লেখার ছত্রে ছত্রেই পাওয়া যায়। যাকগে গল্পে ফিরি।চন্দ্রহাস ভট্টশালী লেখক রসিক উপাধ্যায়ের প্রতিবেশী ও বন্ধু।এই চন্দ্রহাস ভট্টশালী এক অদ্ভুত ব্যক্তিত্বের অধিকারী। এবং তার ব্যক্তিত্বের আকর্ষন এমনই যে শনিগ্রহ অত্যন্ত আগ্রহের সাথে সর্বক্ষণ তার পদানুসরণ করে।ফলত তিনি কখনও ষাঁড়ের গুঁতো খান,কখনও বউয়ের গুঁতো খান, কখনও বা তান্ত্রিকের গুঁতো খান।এবং এক যাত্রায় পৃথক ফল যেহেতু শাস্ত্রে মানা সেহেতু লেখক মশাইও তার আট আনা অংশীদার হন।এবং তারপর...নাহ্! আর বলা ঠিক হবে না।বাকিটা আপনারাই পড়ে নিন। ওহো! বলতে ভুলে গিয়েছিলাম।বইটিতে লেখকের রচিত কিছু কবিতাও আছে, যা সত্যিই গল্পে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। অতএব বাঙালী বিশ্বায়নের তালে পা মেলালেও শিকড় কে ভুলে যাবেন না। Stand up comedy তে অভ্যস্ত হয়ে হাসির গল্পকে ভুলে যাবেন না। আর হাসির গল্পকে মনে রাখতে হলে সংগ্রহের তালিকায় অবশ্যই রাখতে হবে -চন্দ্রহাসের ষোলকলা।