'চরিত্রই মানবতার প্রধান উপকরণ। ঐহিক ও পারত্রিক উন্নতির মূলে চরিত্র। ' - আহছানউল্লা
আহছানিয়া মিশনের প্রতিষ্ঠাতা খান বাহাদুর আহছানউল্লার আত্মজীবনী ও ধর্মচিন্তার নিদর্শন 'আমার জীবন ধারা'।
প্রায় শতায়ু আহছানউল্লা ১৮৭৩ সালে সাতক্ষীরার নলতা গ্রামের একটি বনেদি মুসলমান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পশ্চাৎপদ বাঙালি মুসলমান সমাজে তখন ইংরেজিশিক্ষার চল বিরল। তা-ও আহছানউল্লা কলকাতায় পড়তে আসেন। প্রথমদিকে একজন সুহৃদের কল্যাণে লজিংয়ের ব্যবস্থা হয়। কিন্তু সেখানে প্রায় সমকামী এক মুনশিজির খপ্পর হতে অল্পের জন্য রক্ষা পান। লেখকের পরিবার আর্থিকভাবে অত্যন্ত স্বচ্ছল ছিল। তাই তাকে অনেক টাকা দিয়ে একটি বাসা ভাড়া করে দেওয়া হয় কলকাতায়। প্রায় এক শ ত্রিশ বছর আগের কলকাতা শহরের বর্ণনা আহছানউল্লা দিয়েছেন। ১৮৯৫ সালে এমএ পাস করেন লেখক। তখন পাসের হার ও পরীক্ষার্থী উভয় ছিল কম। উপরন্তু, মুসলমান গ্রাজুয়েটের আরও খরা।
পাস করার পরপরই কলেজের ইংরেজ অধ্যক্ষের সুপারিশে রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে ৫০ টাকা বেতনে শিক্ষকতার চাকরি পেয়ে যান। তখন তিনি ম্যালেরিয়ায় গুরুতর অসুস্থ। তবুও চাকরির মায়ায় তৎক্ষণাৎ রওনা হন রাজশাহীর উদ্দেশে।
তকদির আহছানউল্লা সাহেবের সব সময় পক্ষে থেকেছে। স্কুলে চাকরিতে যোগদানে করার কিছুদিন পরেই সহকারী স্কুল পরিদর্শকের চাকরি পেয়ে যান এবং মাইনে পাবেন এক শ ২৫ টাকা৷ প্রশ্নফাঁস তখনও ছিল। এমনই একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন লেখক,
'একটী বালক টেষ্ট পরীক্ষার প্রশ্ন প্রকাশ করিয়া দেয়। বালকটী ছিল স্থানীয় সম্মানিত উকিল পরিবারের সন্তান, সেজন্য তাহার অযথা সাহস ছিল। শিক্ষকদিগের কমিটী আহ্বান করিলাম, বালকটীকে শাস্তি দেওয়ার বিধান হইল। আমি সকল শ্রেণীতে নোটিশ পাঠাইলাম যে, উক্ত বালককে শাস্তি দেওয়া হইবে ও সকল শিক্ষক ও ছাত্রকে বৈকাল ৪ ঘটিকার পর ঐ দিনে শাস্তি দেখিবার জন্য সমবেত হইতে হইবে। যথাসময়ে বালককে ডাকিয়া পাঠান হইল ও তাহাকে তাহার অপরাধ বুঝাইয়া দেওয়া হইল। চারিদিকে ছাত্র ও শিক্ষক সমবেত। আমি সৰ্ব্বসমক্ষে তাহাকে এইরূপ আদেশ করিলাম- “দেখ ভাদুড়ী, তুমি গুরুতর অপরাধ করিয়াছ । ভালরূপে প্রমাণিত হইয়াছে যে, তুমি টেষ্ট পরীক্ষার মুদ্রিত প্রশ্ন অফিস হইতে বাহির করিয়া বন্ধু-বান্ধবকে বিলি করিয়াছ—যাহার ফলে অধিকতর অর্থ ব্যয়ে পুনরায় প্রশ্ন ছাপাইতে হইয়াছে এবং সবাইকে অযথা তরদ্দুদের মধ্যে পড়িতে হইয়াছে। সমবেত শিক্ষকদের অভিমত যে, তোমাকে এজন্য ২৫টী বেত্রাঘাত সৰ্ব্বসমক্ষে গ্রহণ করিতে হইবে, অন্যথা তোমাকে স্কুল হইতে বিতাড়িত হইতে হইবে এবং তোমাকে কুত্রাপি পড়িবার অনুমতি দেওয়া হইবে না। আমি হঠাৎ ক্রোধপরবশ হইয়া এই শাস্তি দিতেছি না, পূর্ণ এক সপ্তাহ ধীরভাবে চিন্তা করিয়া আমার সহকর্মীদের সহিত একমত হইয়া স্কুলের ভবিষ্যৎ শৃঙ্খলার প্রতি লক্ষ্য করিয়া এই শাস্তি দিতে বাধ্য হইয়াছি। এখন যদি তোমার শান্তি গ্রহণের ইচ্ছা থাকে, তবে হাত বাড়াও।”
বালকটী লজ্জায় মস্তকোপরি চাদর দিয়া মুখ ঢাকিল এবং অনুতপ্ত হৃদয়ে অশ্রুসিক্ত লোচনে শাস্তি গ্রহণ করিল- এক, দুই, তিন, এইরূপে ২৫টী বেত্রাঘাত। পরে ভবিষ্যতের জুন্য তাহাকে সাবধান করিয়া দেওয়া হইল। এই শাস্তিদানের এরূপ প্রভাব হইয়াছিল যে, আর ভবিষ্যতে কখনো কোনো বালক এরূপ অপরাধ করিতে সাহসী হয় নাই। '
রাজশাহীর পর চট্টগ্রামে শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। সেখান বিভিন্ন মাজার শরিফের ওলি-আউলিয়াদের নিয়ে লিখেছেন। লিখেছেন চট্টগ্রামবাসী মুসলমানদের শিক্ষায় পশ্চাৎপদতা নিয়ে। মুসলিম শিক্ষার হিতাকাঙ্ক্ষী হয়ে চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলাশহরে সরকারি উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার তার ভূমিকার কথা আহছানউল্লা লিখেছেন।
চট্টগ্রামে থাকতেই মনের ওপর এক ধরনের 'আধ্যাত্মিক প্রভাব' আবিষ্কার করার অভিজ্ঞতা আহছানউল্লা লিখেছেন। উল্লেখ্য, তিনি স্থানীয়ভাবে পির হিসেবে খ্যাত ছিলেন এবং এখনও তার সমাধিকে ঘিরে ওরস হয়ে থাকে। তাই পুরো বই জুড়ে বিভিন্ন আধাত্মিক অভিজ্ঞতার কথা নানাভাবে আহছানউল্লা দিয়েছেন। যা পাঠক হিসেবে আমাকে তত মুগ্ধ করেনি।
চট্টগ্রামের শিক্ষা বিভাগে দীর্ঘদিন কাজ করেন আহছানউল্লা। সেই সময়েই ছুটি নিয়ে তার পিরসহ তিনি মক্কায় হজব্রত পালন করতে যান। এই বইয়ের অন্যতম আকর্ষণ আজ থেকে শতবর্ষ আগের হজযাত্রার বিবরণ। মুম্বাই বন্দর থেকে জাহাজে করে রওনা হতে হতো। পথে বিভিন্ন বন্দর ও দৃশ্যাবলিসহ ঝড়ের কবলে পড়ার অভিজ্ঞতা আহছানউল্লার হয়েছিল। জাহাজ জেদ্দায় পৌঁছানোর পর কোয়ারান্টাইনে থাকতে হতো।
তখন আজকের সৌদি আরবের জন্ম হয়নি। মক্কার শাসনকর্তা শরিফ হোসেন। কিন্তু প্রথম মহাযুদ্ধ সেই সময় শেষ হয়ে গেছে। বেদুইনদের সাথে শরিফ পরিবারের সম্পর্ক ভালো নেই। ফলশ্রুতিতে হজযাত্রীদের ওপর যখন-তখন হানা দিচ্ছে বেদুইনরা। লেখক যাদেরকে 'বদ্ধু' সম্বোধন করেছেন৷ আরবের অধিবাসীদের আর্থিক অবস্থা নিয়ে আহছানউল্লা লিখেছেন,
'স্থানীয় অধিবাসী অতি দরিদ্র, খেজুর তাহাদের একমাত্র সম্পত্তি। অনেকেই পূর্ণ বৎসরটী হজ্জ মৌসুমের প্রতীক্ষা করে। এই সময়ে কেহ বা ভিক্ষা করে, কেহ বা সওদাগিরী করে, কেহ বা তরী-তরকারী খরিদ বিক্রী করে। অধিকাংশই পাকা খেজুর বা কাঁচা শুষ্ক খেজুর (খোরমা) বিক্রী করে। তাহারা অতি কাতরতার সহিত বলে যে, অর্দ্ধ আহারে সারা বৎসরটী অতিবাহিত করিয়া হাজীদের মুখপানে চাহিয়া থাকে। মঞ্জিলের যাত্রীগণ আহারান্তে যে সকল দস্তরখান-ঝাড়া (sweeping) ফেলিয়া দেয়, সেগুলি গরীবেরা আসিয়া কুড়াইয়া লয় ও বাড়িতে গিয়া ক্ষুধার্ভ সন্তানদিগকে খাইতে দেয়। তরমজ খাইয়া খোসাগুলি ফেলিলে সাগ্রহে তাহারা উঠাইয়া লয় ও ধুইয়া আহার করে। বাঙ্গালীরা মঞ্জিলে আহারে বসিলে গরীব ভিক্ষুক আসিয়া কাতর স্বরে বলে— আল্লাহো করীম। অর্থাৎ আল্লাহ দয়াময়, আপনারা তাঁর খাছ বান্দা, আমাদিগকে কিছু খেতে দিন। ক্রোধ ভরে গালি দিয়া তাহারা ভিক্ষুকের দিকে পিঠ ফিরাইয়া উদর পুরিতে থাকে, আর ভিক্ষুক হতাশ হইয়া ফিরিয়া যায়। '
মক্কার লোক হজ পায় না - এমন একটি কথাকে রূপকার্থে এতদিন ধরে নিতাম। কিন্তু আহছানউল্লা লিখেছেন,
'মক্কাবাসী দেখিতে কিঞ্চিৎ ক্ষুদ্রাকায়, অপেক্ষাকৃত মলিন, বাক্য ও ব্যবহারে হঠকারী, ক্ষিপ্র ও কলহ-প্রিয়। আহারাদির ব্যবস্থা সুখপ্রদ নহে। অধিবাসীদিগের মধ্যে অনেকেই আছে, যাহারা জীবনে হজ্জব্রত পালন করে নাই। অন্যপক্ষে মদিনাবাসী দেখিতে সুশ্রী, দীর্ঘকায়, সত্যবাদী, কোমল স্বভাব, অতিথি-প্রিয় ও দান-পরায়ণ। বহু অধিবাসী প্রতিবৎসর হজ্জ উৎসবে যোগদান করেন। অতিথি আসিলে সমাদার করেন, স্বয়ং ক্ষুধার্ত্ত থাকিয়া অতিথির সম্মান রক্ষা করেন। কাহারও নিকট কেহ হাত বাড়ান না। যাহারা গরীব, বস্ত্রাচ্ছাদিত অবস্থায় পড়িয়া আছে, কেহ দয়া করিয়া দিলে প্রফুল্লচিত্তে গ্রহণ করে ও সমস্ত অন্তঃকরণটী দিয়া দোওয়া করে। সকলেই পরিষ্কৃত পরিচ্ছন্ন, কলহ নাই, বাদানুবাদ নাই। '
হজ করে আসার পরেও দীর্ঘদিন তিনি চট্টগ্রামে চাকরি করেন এবং ফজলুল হক শিক্ষামন্ত্রী হওয়ার পর প্রথম ভারতীয় হিসেবে বাংলার শিক্ষা বিভাগের সহকারী পরিচালক নিযুক্ত হন। তার প্রচেষ্টাতেই এইচএসসি, অনার্স ও মাস্টার্স পরীক্ষায় নামের বদলে রোল নম্বর লেখার পদ্ধতি চালু হয়। হিন্দুদের প্রবল আপত্তির কারণে এসএসসিতে তিনি তখন এই ব্যবস্থা চালু করতে পারেননি।
তার বড় ছেলে শামসুজ্জোহার সাথে ঢাবির প্রথম বাঙালি মুসলমান গ্রাজুয়েট ফজিলতুন্নেসার সাথে বিয়ে হয়। দুইজনের বিলাতে পরিচয়। পুত্রবধূকে নিয়ে নিজের গর্বের কথা লিখেছেন আহছানউল্লা।
ব্যবসায় ধস ও ব্যক্তিজীবনের কিছু ক্ষতির ঘটনা লিখেছেন।
অবসর নেওয়ার পর জন্মস্থান সাতক্ষীরার নলতায় ফিরে যান। সেখানেই মানুষ মানুষ তাকে ঘিরে জড়ো হয়। পির হওয়ার প্রাথমিক ঘটনার ইঙ্গিত তিনি পাঠককে দিয়েছেন। জন্মস্থান তাকে আগ্রহী করে তোলে মানবতার জন্য কিছু করার। সেই চিন্তা থেকেই গড়ে তোলেন আহছানিয়া মিশন।
বইটি সাধুভাষায় লেখা। গদ্য তত সচল নয়। আবার, লেখকের ধর্মভাবকে প্রকাশ করার ভঙ্গি পাঠক হিসেবে আমার পছন্দ হয়নি। সবকিছু মিলে, 'আমার জীবন ধারা' অনেকটাই নিম্নমাঝারি মানের আত্মকথা।