প্রাচীন জনজাতির মধ্যে মাতৃপ্রাধান্য বহুবিবর্তিত রূপে মাতৃপূজায় পর্যবসিত হয়। অশোক রায়ের ‘মাতৃকাশক্তি’ গ্রন্থে মাতৃপূজা ও শক্তিসাধনার সমগ্র ইতিকথা সাবলীলভাবে পরিবেশিত। গ্রন্থের প্রথম অধ্যায় ‘সৃষ্টি’-তে আছে বিজ্ঞানী, পাশ্চাত্য দার্শনিক, আর্য ঋষি, পরিণামবাদের জনক মহর্ষি কপিল প্রমুখ সৃষ্টির যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তার সারাত্সার। দ্বিতীয় অধ্যায়ে মধ্য-প্রস্তর ও নব-প্রস্তর যুগে মাতৃপূজার উন্মেষ কথা। পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে সিন্ধু সভ্যতায় মাতৃপূজা, আর্য বৈদিক সভ্যতা ও পৌরাণিক যুগ, বৌদ্ধ ধর্ম, বৌদ্ধ দেবদেবী, তন্ত্রচর্চার ভাবনায় নারীই শক্তির উত্স, শক্তি ও শাক্তধারা, দেবীপূজার কথা, মা কালী, ৫১ পিঠের তত্ত্ব, সনাতন ধারার তন্ত্রের তত্ত্বকথা, বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির ধারা প্রাঞ্জল ভাষায় আলোচিত। সেই সঙ্গে আছে হিমাচলের শক্তিপীঠ ভ্রমণ এবং কামাখ্যা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। প্রামাণ্য গ্রন্থনির্ভর, পরিশ্রমী এই প্রয়াস পাঠককে ঋদ্ধ করবেই।
"বল মা আমি দাঁড়াই কোথা আমার কেহ নাই শঙ্করী হেথা, বল মা আমি দাঁড়াই কোথা।" মায়ের শাসন মেনে 'মানুষ' হওয়ার চেষ্টা বাদে আমার সঙ্গে 'মাতৃকাশক্তি'-র প্রথম পরিচয় হয় 'শেয়াল দেবতা রহস্য'-তে পড়া এই 'রামপ্রসাদী' দিয়েই। কার লেখা, কথাগুলোর অর্থই বা কী— এ-সব তখন জানার প্রশ্নই ছিল না। তবে ছোটোবেলা থেকেই আমার মতো অজস্র মানুষ দেখেছেন, ঘরে-বাইরে আমাদের জগত শাসিত ও সংজ্ঞাত হয় মায়েদের দ্বারাই। কিন্তু ঠিক কীভাবে 'মা' এতটা শক্তিশালী হয়ে দাঁড়ালেন? অধিকাংশ বিবাহিত পুরুষ এই প্রশ্নের মুখোমুখি হলে সশঙ্ক চিত্তে এদিক-ওদিক দেখে নিতে চাইবেন, বিশেষত বর্তমান অন্তরীণ অবস্থায়। কিন্তু প্রশ্নের উত্তর তো বটেই, সেটা খোঁজার চেষ্টাও যে মোটেই সহজ নয়— তা বোঝার জন্য আলোচ্য বইটি পড়া প্রয়োজন। নামে 'মাতৃকাশক্তি' হলেও আদতে এই বই এই উপমহাদেশে, বিশেষত বাংলায় ধর্মাচরণের একটি ইতিহাস তথা সিংহাবলোকন— যার মাধ্যমে খুঁজে নেওয়া হয়েছে 'মা'-র নানা রূপ ও ভূমিকা। 'ভূমিকা'-র পর যে-সব অধ্যায়ে এই বইটিকে আলোচনার সুবিধার্থে ভাগ করা হয়েছে, তারা হল: ১) সৃষ্টি ২) প্রাগৈতিহাসিক যুগ ও আদিম মানবের ধর্ম ৩) সিন্ধু সভ্যতায় মাতৃপূজা ৪) মাতৃপূজা বৈদিক ও পৌরাণিক যুগে ৫) বৌদ্ধ ধর্ম ৬) বৌদ্ধ দেবদেবী ৭) তন্ত্র ১ ৮) শক্তি ও শাক্তধারা ৯) দেবী পূজার কথা, দেবী শিবশক্তি না বিষ্ণুমায়া ১০) মা কালী ১১) একান্ন পীঠের তত্ত্ব ১২) তন্ত্র ২ ১৩) হিমাচলের শক্তিপীঠ ভ্রমণ ১৪) বাংলা দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির ধারা ১৫) কামাখ্যা ভ্রমণ সব শেষে আছে গ্রন্থপঞ্জি ও নির্দেশিকা।
আগেই বলেছি, মাতৃসাধনার বিকাশ, বিবর্তন ও প্রকাশের নানা রূপ নিয়ে আলোচনার সুবাদে এই বইটিকে ভারতে তথা বাংলায় হিন্দু(?)-বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাসই বলা চলে। তার সঙ্গে লেখক মিশিয়ে দিয়েছেন নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি— যা লেখাটিকে আরও সুখপাঠ্য করেছে। কিন্তু এই বইয়ের কয়েকটি মস্ত দুর্বলতা আছে, যা ইতিহাসের অনুরাগী হিসেবে আমার কাছে পীড়াদায়ক ঠেকল। সেগুলো হল: ১] সিন্ধু সভ্যতা নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে লেখক একটিও সাম্প্রতিক গবেষণার প্রয়োগ করেননি। দেখে স্তম্ভিত হলাম, ১৯৩৬ সালের বই এবং ১৯৩১ সালের খনন-বিষয়ক (কুখ্যাত) রিপোর্ট পুঁজি করে অধ্যায়টি লেখা হয়েছে। তাতে নৃতাত্ত্বিক উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে ডক্টর অতুল সুরের বইগুলো, যাদের রচনাকাল গত শতাব্দীর ছয়ের দশক। ভারতের ইতিহাস অনুসন্ধানে সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতার গুরুত্ব তর্কাতীতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে প্রায় দু'দশক আগেই। তা সত্বেও দিলীপকুমার চক্রবর্তী এবং অন্য গবেষকদের বইয়ের সাহায্য না নেওয়ার অধ্যায়টি তথ্যগত ভ্রান্তি ও অপব্যাখ্যায় আকীর্ণ হয়েছে। ২] 'আর্য বৈদিক সভ্যতা' বিষয়ক আলোচনা তো আরও ভয়ানক! অধুনা হাসির খোরাক হয়ে ওঠা 'এরিয়ান ইনভেশন থিওরি'-র যথেচ্ছ প্রয়োগ করেছেন লেখক। এমনকি তথাকথিত আক্রমণকারী/অভিবাসী-দের প্রকৃতি বোঝার জন্য তিনি ব্যবহার করেছেন রাজনৈতিক মতাদর্শে দুষ্ট একটি বিশেষ শিবিরের বইপত্রই। ২০১৮ সালে প্রকাশিত বইয়ে এমন পক্ষপাতদুষ্ট ও একদেশদর্শী লেখার উপস্থিতি একেবারেই অনভিপ্রেত— বিশেষত যেখানে সাম্প্রতিক গবেষণামূলক প্রবন্ধগুলো আন্তর্জালে উপলব্ধ। ৩] মাতৃপূজার সঙ্গে যে উর্বরতা (ফার্টিলিটি কাল্ট)-র সম্পর্ক আছে— এ-কথা নিয়ে কেউ কোনোদিন বিবাদ করেনি। কিন্তু যেভাবে এই বইয়ে লিঙ্গপূজা নিয়ে আলোচনার সূত্রে লেখক ইতিমধ্যেই তাঁর লেখা একটি পৃথক বইয়ে সন্নিবিষ্ট উপাদান ('বিবর্তনের ধারায় শিব ও শিবলিঙ্গ' দ্রষ্টব্য)-এর পুনরাবৃত্তি করেছেন সুযোগ পেলেই, তা দেখে খারাপ লাগল।
এই বিষয়গুলো নিয়ে আক্ষেপ ও ক্লেশ থাকলেও বাকি বইটি অসামান্য। কেন? একে-একে লিখি। (১) শক্তিসাধনা ও তন্ত্রের ঐতিহাসিক তথা বিবর্তনমূলক দিকটি নিয়ে এত সহজ ভাষায় লেখা তথ্যনিষ্ঠ আলোচনা বাংলায় আমি আর একটিও পাইনি। (২) বিনয়তোষ ভট্টাচার্য রচিত 'বৌদ্ধদের দেবদেবী' পড়তে গিয়ে যাদের নাড়ি ছেড়ে গেছে (আমিও তাদের মধ্যে আছি), এই বইটি তাদের জন্য একেবারে অবশ্যপাঠ্য। (৩) উর্বরতার পূজার সঙ্গে জড়িত শক্তিপূজার দিকটি বাদ দিয়ে শুধু শস্যপূজনের অংশটি কীভাবে বাংলায় মাতৃসাধনার প্রত্যক্ষ ও আনুষঙ্গিক পূজার আকার নিয়েছে— তাই নিয়ে বইটি অত্যন্ত মনোজ্ঞ আলোচনা করেছে। (৪) লেখক নিজের ভ্রমণ-জনিত অভিজ্ঞতা ও উপলিব্ধির রসে সিঞ্চিত করে বইটিকে নিছক প্রবন্ধসাহিত্যের চেয়ে একটু অন্য আকার দিতে চেয়েছেন। সুধী পাঠক জানবেন, একদা বাংলায় এমনই নানা ভ্রমণের সূত্রে প্রাবন্ধিকদের লেখায় উঠে আসত কিংবদন্তি, পুরাণ আর বিস্মৃত ইতিহাস। সেই স্মৃতি ফিরে এল বইয়ের ওই অধ্যায়গুলো পড়তে গিয়ে। আশায় রইলাম যে বইয়ের তথ্য ও তত্ত্বগত অসম্পূর্ণতাগুলো পরে সম্পাদকীয় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে দূর করা হবে। বাংলায় লৌকিক দেবদেবীর মধ্যে মাতৃসাধনার যে দিকটি লক্ষিত হয়— যেমনটি করেছিলেন কৌশিক দত্ত তাঁর 'রঙ্কিনী: দেবী, মিথ, মানবী'-তে— তেমনটি পাওয়ার দাবিও জানালাম।
লকডাউন চলাকালীন আমাদের অবস্থা বুঝতে গেলে কমলাকান্তের কথা মেনে বলতে হয়~ "আপনাতে আপনি থেকো মন তুমি যেও না কো কারো ঘরে, যা চাবি তা বসে পাবি শুধু খোঁজো নিজ অন্তঃপুরে।" কিন্তু এই বন্দিদশা ঘুচলে আলোচ্য বইটি হস্তগত করুন এবং অবশ্যই পড়ুন— এটুকুই বলার।