ধ্রুব এষ। জন্ম ১৯৬৭। সুনামগঞ্জের উকিলপাড়ায়। বাবা শ্রী ভূপতি এষ। মা শ্রীমতী লীলা এষ। দেশের অপরিহার্য প্রচ্ছদশিল্পী। রঙে, রেখায় কত কিছু যে আঁকেন! গত তিন দশক ধরে বাংলাদেশের প্রচ্ছদ শিল্পের একচ্ছত্র অধিপতি।
এ যাবৎ প্রায় বিশ হাজার প্রচ্ছদ এঁকেছেন। প্রচ্ছদের পাশাপাশি লেখালেখিও করেন। সব ধরনের লেখাতেই সিদ্ধহস্ত। কী ছোটদের কী বড়দের—সব বয়সি পাঠক তাঁর লেখায় আকৃষ্ট হন সমানভাবে।
তাঁর লেখায় দেখা-না-দেখা জীবন আর মানুষের এক বিচিত্র সম্মিলন ঘটে যেখানে খুঁজে পাওয়া যায় পাওয়াকে, না-পাওয়াকে। জীবনের বহুবর্ণিল বাস্তবতাকে নতুন মোড়কে উপস্থাপন করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন এই লেখক।
প্রচ্ছদশিল্পী ধ্রুব এষের সাথে পরিচয় সেই স্কুল জীবনে। হুমায়ূন আহমেদের বেশিরভাগ বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠায় তার নামখানা চোখে ভাসত৷ একটা বয়স পেরোনোর পর জানতে পারলাম প্রচ্ছদশিল্পী একজন লেখকও বটে। তারও অনেক পরে কলেজে ভর্তি হয়ে যখন হাতে একটা এনড্রয়েড ফোন পেলাম, তার ব্যাপারে রিসার্চ করলাম। ধীরে ধীরে জানলাম, ভদ্রলোকের মতো সহজসরল, মাটির মানুষ এদেশে খুব কম সংখ্যকই আছেন। অবশ্য জন্মও তো সুনামগঞ্জ, হাওর অঞ্চলে। মাটির ঘ্রাণ যেখানে প্রকট। বিশ হাজারের অধিক বইয়ের একজন প্রচ্ছদশিল্পী ব্যবহার করেন না কোনো স্মার্টফোন, তার নেই কোনো ফেসবুক একাউন্ট। ক'মাস আগের কথা। ধ্রুব এষ প্রধানমন্ত্রীর হাতে বাংলা একাডেমি পুরস্কার গ্রহণ করলেন। পুরস্কার গ্রহণকালীন সময়ের ছবিতে দেখা যায় ভদ্রলোক কোট-টাইয়ের বদলে একটা রংচটা প্যান্ট আর খুবই সাধারণ একটা টি-শার্ট পরে আছেন। পায়ে অতি সাধারণ একজোড়া চামড়ার জুতো। তার এই ব্যাপারগুলো আমার খুব বেশি ভাল্লাগে।
অনেকদিন ধরেই তার লেখা পড়ার সাধ। শেষবার সিলেট বাতিঘরে যখন গেলাম, এই বইটা কিনেছিলাম। তা হবে মাস ছয়েক আগের কথা। পড়ার ইচ্ছে হয়নি এতদিন। আজকে হলো, পড়ে ফেললাম এক বসায়। আমি সাধারণত ভৌতিক গল্প পছন্দ করি না। কেনার দিন প্রচ্ছদের গায়ে 'রহস্য কাহিনি' লেখা দেখে ব্যাকফ্ল্যাপ পড়েছিলাম। সেখানে দুটো গল্পের পাঁচটে লাইন হাইলাইট করা হয়েছে। ওই লাইনগুলো বেশ ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছিল। সূচিতে ছয়টি গল্পের নামেও চোখ বুলিয়েছিলাম। চারটে নাম পছন্দ হলো। বাকি দুটোতে ধরতে পেরেছিলাম ভূতুড়ে কিছু হবে, তাই ভালো কিছুর আশা করিনি। কিন্তু সবগুলোতেই যে ভূত বাবাজি/মাতাজি উঁকি দিবেন তা তখন বুঝিনি। একজন চিত্রশিল্পী-লেখকের লেখা পড়ছিলাম বলেই হয়তো প্রতিটি গল্পে চারুকলা, রং-তুলি, পেলেট, ব্রাশ, স্প্যাচুলা, আর্ট, ক্যানভাস, পেইন্টিং, পোরট্রেট, পাবলো পিকাসো ইত্যাদি বারবার উঠে আসছিল। ব্যাপারটা এক-দুটো গল্পে হলে ঠিক ছিল। কিন্তু প্রতিটি গল্পেই চিত্রশিল্প আর ভূত চলে আসার ব্যাপারটায় বিরক্ত হয়েছি। প্রতিটি গল্পের সেটিং প্রায় একই ধরনের। তাই দুটো গল্প পড়ে শেষ করার পর নতুন গল্প শুরু করার সাথে সাথেই কোন চরিত্রটা ভূত হবে সেটা আন্দাজ করে নিতে পারছিলাম এবং পড়ার আগ্রহ হারাচ্ছিলাম। গল্পগুলোর স্থান, কালে কোনো পরিবর্তন নেই। প্রতিটি ঘটনা একই জায়গায় ঘুরপাক খেয়েছে। সবগুলো গল্পের আবেশ প্রায় একই রকমের। প্রতিটি গল্পেই একটি চরিত্র থেকেও যেন নেই। এই কারণগুলোর উপস্থিতির কারণে অভিনব উপস্থাপনা আর লেখার ধরনে নিজস্বতার ছায়া থাকা সত্ত্বেও গল্পগুলো অসাধারণ কিছু হয়ে ওঠতে পারল না। বরং ছোট্ট একটা পরিবর্তনে গল্পগুলোর চেহারা হয়ে ওঠতে পারত অনন্য সুন্দর। ভূত চরিত্রটাকে ভূত না বানিয়ে বাস্তব চরিত্রে রাখতে পারলেও গল্পগুলো অন্যরকম হতো৷ এসব কিছু ছাপিয়ে দুটো ব্যাপার না বললেই নয়। প্রথম গল্প 'রাজার দেউড়ির আরটিশ ও পাখি'র প্রেক্ষাপটটা অসাধারণ। এই গল্পে ভূত এন্ট্রি নেওয়ার আগে পর্যন্ত গল্পটাও অসাধারণ এগিয়েছে। আর দ্বিতীয় ব্যাপার হলো, 'রেইনকোট' গল্পটাকে 'রহস্য কাহিনি' জনরার অন্তর্গত ধরা যায় এবং সবচেয়ে ছোট এই গল্পটাই এই বইয়ের সেরা গল্প। এবং এখানেই বইয়ের নামকরণে সার্থকতা।
সবশেষে বলব, বইটা কিশোর উপযোগী। অবশ্য আমি এখন ওই বয়সি হলেও আমার কাছে এই বই খুব বেশি ভালো লাগত এমনটা আমি মনে করি না। চিত্রশিল্পী ধ্রুব এষ, যার ব্যক্তিগত জীবনকে আমি আদর্শ মনে করি, সেই ধ্রুব এষ যখন লেখক তখন আমি সত্যিকার অর্থেই হতাশ। যদিও লেখালেখি, সাহিত্য ও শিল্পচর্চায় তার জ্ঞান অনেক উঁচুতে। সেই তুলনায় আমি অতি ক্ষুদ্র একজন! কেউ তার লেখা কোনো ভালো বই পড়ে থাকলে অনুগ্রহপূর্বক নাম জানাবেন। আমি তার ভালো একটা বই পড়ার আশায় থাকব।
রেইনকোট বইটিতে মোট ৬টি ছোট গল্প রয়েছে। সবগুলো গল্পই অতিপ্রাকৃত জনরার। আমার পড়া ধ্রুব এষের লেখা প্রথম কোন বই।
রাজার দেওড়ির আরটিশ ও পাখিঃ গল্পটা রাজার দেওড়ি গলিতে অবস্থিত এক আর্ট হাউসকে ঘিরে। গল্পের নায়ক সাইফুল। সে একজন আর্টিস্ট, আসলে ওস্তাদের অ্যাসিস্টেন্ট। তার প্রিয় নায়িকা শাপনূর (শাবনূর)। শাবনূরের কোন বইই তার মিস নাই। হঠাৎ এক রাতে এক মেয়ে আর্ট হাউসে উপস্থিত, যার ছবি কিনা সাইফুল এক ছবির (সিনেমার) ব্যানারে আঁকেছে। কিন্তু তা কি করে হয়???
যে জিনিসটা ভালো লেগেছে তা হলো, ছোটছোট ছড়া গুলি- যেমন সার কইছেন, সারের কথা, সাক্ষী আছে বিদ্যাপাতা। ওস্তাদের কথা তেঁতুল গাছের পাতা।
রেইনকোটঃ রোদেলা এক দিনে এক লোক সবুজ রঙের রেইনকোর্ট পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে তনিমার পুরানো দিনের কথা মনে পড়ে গেল।
কারা কারাঃ রাত তিনটেই মুসা কবীরের বাসায় এক বন্ধু এসে উপস্থিত। এসেই শুরু করল ভূত আছে কি নেই সেই নিয়ে তর্ক। সেই বন্ধু কি পারবে মুসাকে ভূতে বিশ্বাস করাতে?
সবুজ দরজাঃ রেজা ইশতিয়াক অনেককাল আগের সবুজ রঙের এক দরজা দেখে মুগ্ধ। পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে কিনেছে সে। আসল দরজা নয়, পেইনটিং। রিয়েলিস্টিক পেইনটিং। নাকি দরজাটা আসলেই আসল??
ভুতুড়ে ঘটনাঃ মাহতাবউদ্দিন—পত্রিকা অফিসে কর্মকত, যাকে কিনা ঘন্টাখানেক আগেই চাকরি থেকে ছাটাই করা হয়েছে। সেই দুঃখে তিনি পার্কে গেলেন একটু ঘুড়াঘুড়ি করতে। সেখানে তার পরিচয় হয় এক লেখকের। ভূতের গল্প লেখা এক অভিমানী লেখক।
ছোট্ট মায়াবিনীঃ ছোট্ট এক মায়াবিনী মেয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে নতুন ভাড়াটিয়া হয়ে এসেছে। কিন্তু মেয়ের সাথে বাবা-মায়ের আচরণ বড়ই অদ্ভুত। সেই বাড়িতেই সাথে এক আর্টিস্ট। ছোট্ট মায়াবিনী ও আর্টিস্টের মধ্যে খুব সহজেই একটা ভাব হয়ে গেল। দুজনে মিলে তারা মেঘেদের নাম দেয়, ছবি আঁকে, আর কত কি। ছোট্ট মায়াবিনীকে ঘিরে রয়েছে মায়াবি এক রহস্য। কি সে রহস্য??
প্রথম প্রথম ভালো লাগছিল না। কিন্তু পরে গিয়ে মনে হলো, আরে এই রকম অতিপ্রাকৃত ছোট গল্প তো অনেক দিন পড়া হয়নি। অনেক আগে…কত আগে? মনে নেই, সম্ভবত রহস্যপত্রিকায় এই ধরণের অতিপ্রাকৃত গল্প পড়তাম। অনেকের কাছে গল্পের সিকুয়েন্সগুলো খাপছাড়া মনে হতে পারে। কিন্তু এই খাপছাড়া ভাবটাই গল্পগুলোকে আরো অতিপ্রাকৃত করে তুলেছে। অনেকটা স্বপ্নের মত—স্বপ্নের যেমন কোন সিকুয়েন্স থাকেনা, সেইই রকম। লেখকের লেখা সাবলীল, কোন ধরণের বাধা-বিপত্তি ছাড়াই পড়ে ফেলা যাবে বইটা।
লেখকের লেখা অন্য অতিপ্রাকৃত ���ল্প বা উপন্যাস পড়ার ইচ্ছা রইল।