What do you think?
Rate this book


302 pages, Hardcover
Published January 1, 2018
আমি চাই ফিরে যেতে সেই গাঁয়
বাঁধানো বটের ছায়
সেই নদীটির হাওয়া ঝিরঝির
মনের গভীরে পড়ে থাকা যত
স্মৃতি-বিস্মৃতি কখনো কি ভোলা যায়
এই বইটা নিয়ে কিছু বলার আগে একটা ছোট্ট ঘটনা শেয়ার করি।
দুই বছর আগে যখন ইউকে যাচ্ছিলাম, তখন নিজের জন্য একটা ছোট ব্যাগে ১০-১৫টা খুব প্রিয় বই গুছিয়ে রেখেছিলাম। এই বইটাও ছিল তাতে। কিন্তু ঠিক কী কারণে যেন (মনে পড়ে না আর) সেই ব্যাগটা নিয়ে যাওয়া হয়নি। আর গিয়েও যেন সব ভুলে গেলাম—রুমের এক কোণায় পড়ে থাকলো বইভরা ব্যাগটা।
তারপর বছর ঘুরে গেল। গত বছরের নভেম্বর নাগাদ এক আত্মীয় ইউকে আসবেন শুনে আম্মুকে ফোন দিয়ে বললাম, “এই বইটা আর কয়েকটা বই উনাকে দিয়ে পাঠিয়ে দিও।” কিন্তু কী আশ্চর্য! সব বইই পেল, শুধু এইটাকেই খুঁজে পেল না। ভাবলাম, হারিয়ে গেছে। কারও পছন্দ হয়েছে হয়তো, নিয়ে গেছে, মনে মনে আমার কজন কাজিনের নামও ধরে নিয়েছিলাম... কয়েক মাস আগে দেশে এসে বই গুছাতে গিয়ে দেখি—ব্যাগের ভেতরেই আছে! হাসি পেল। বুকের মধ্যে একধরনের ছোট্ট আনন্দ অনুভব করলাম।
অতঃপুর অন্তপুরে মূলত সামরান হুদার নিজের গ্রাম্য জীবনের ছায়াচিত্র। একটা সময়ের ভেতর আবদ্ধ নারীদের পর্দার আড়ালে থাকা গল্প, শৈশবের অলিগলি, পুকুরঘাট আর রান্নাঘরের গন্ধ।
বইটা পড়তে পড়তে বারবার মনে হচ্ছিল, “আরে! এ তো আমারই ছোটবেলা!”
যদি আগেই না জানতাম যে গল্পগুলো সিলেটের কোনো গ্রামের, তাহলে চোখ বুজে বলতাম—এ তো কুমিল্লার কোনো গ্রামের কথা, আমারই পরিচিত উঠোন। যখন পড়ছিলাম যে লেখক ছোটবেলায় কিভাবে বায়না ধরতো নতুন শাড়ি পরে নামাজ পড়ার, আমার একদম নিজের একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল—
তখন বয়স বড়জোর ৭-৮ হবে। আব্বু আমার আর ভাইয়ের জন্য একজন টিচার রেখেছিলেন। মাগরিবের পর পরই পড়া শুরু হতো। আমি একদিন বায়না ধরলাম দাদুর সাথে নামাজ পড়বো। তখন নামাজ মানেই যার সাথে পড়ছি, সে যা করছে, একদম হুবহু নকল করা। দাদু মাগরিব শেষ করে অন্য আরেকটা নামাজ শুরু করলেন। আমিও সঙ্গে সঙ্গে শুরু করলাম, আর এদিকে পড়ার সময় পার হয়ে যাচ্ছে, তবু আমার নামাজ ফুরায় না। শেষে টিচার আম্মুকে ডেকে বললো, “এতক্ষণ ধরে তো ৫/৭ রাকাত নামাজ শেষ হয়ে যাওয়ার কথা, মেয়ে কোথায়?” আম্মু এসে দেখলো আমি এখনও দাদুর রুমে নামাজে ডুবে আছি! তারপর আম্মু এসে টেনে নিয়ে গেল আমাকে। :P
এই বই পড়তে পড়তে আরও অনেক ছোট ছোট স্মৃতি মাথায় ঘুরতে থাকে—আম্মু পিঠা বানাচ্ছে, আমি পাশে বসে আছি আর সবসময় আমাকেই প্রথমে দেওয়া হতো কারণ আমি ছিলাম বাড়ির বড় মেয়ে আর ভীষণ আদরের। আজকাল দুধ চিতই, ভাপা পিঠা, পোয়া পিঠা—সবই ফেসবুকে অর্ডার করলেই পাওয়া যায়, কিন্তু আম্মুর হাতের পিঠার স্বাদের সঙ্গে কীসে তুলনা চলে?!
সামরান হুদার মতো চাচা-চাচি, কাকা-কাকি, ভাইবোন এমন সম্পর্কের ভেতর বড় হইনি, কারণ আব্বু ছিলেন দাদার একমাত্র ছেলে। তবু আমার শৈশবটা যেন ঠিক সেরকমই ছিল—পুকুরভরা মাছ, গাছভর্তি আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, তাল, নারকেল, জলপাই—কী ছিল না! ধানের মৌসুমে মেশিনের শব্দে বিরক্ত হলেও, আতপ চালের পিঠা আর হাঁস ভুনার স্বাদ ছিল অতুলনীয়!
যখন বইতে শিমের বিচি ভাজার গল্প এল, ঠিক তখনই আম্মু কুমড়োর জন্য শিমের বিচি ভাজছিলেন। সেই গন্ধ, সেই মুহূর্ত কী আশ্চর্যভাবে মিলে গেল!
আরও অবাক হলাম—সামরান হুদার দাদিও যেমন আলাদা রকম পান খেতেন, আমার দাদুও ঠিক সেরকম! আমাদের দাদু (মানে দাদি, আমরা “দাদু” বলেই ডাকি) শুকনো সুপারি ছুঁতেন না। দাদুর জন্য কাঁচা সুপারি—বড় বড় দেখতে, ভেতরটা সাদা, হালকা মিষ্টি স্বাদ—আর যদি কষ হয়, তাহলে চলবে না। এই একরোখা খুঁতখুঁতে শর্তে সুপারি আনাতে হতো। দেখলাম বইতে ঢেঁকির কথাও উঠেছে। পড়েই মনে হলো, আমাদের বাড়িতেও তো একটা পুরোনো ঢেঁকি আছে, যেটা দাদু তাঁর বাবার বাড়ি থেকে এনেছিলেন। এখন আর কেউ ওটা ব্যবহার করে না, কিন্তু আমি ছোটবেলায় ওটার ওপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কত মজা করতাম!
মেয়েদের পালা গান, ময়মনসিংহ গীতিকা—সবই উঠে এসেছে বইয়ের পাতায় পাতায়। একটা গান তো আমার খুব প্রিয়:
“হাস মারলাম কইতর মারলাম বাইচ্যা মারলাম টিয়া,
ভালা কইরা রাইন্দো বাইঙ্গন কালাজিরা দিয়া গো
কালাজিরা দিয়া”
“হলুদ বনে বনে—
নাক-ছাবিটি হারিয়ে গেছে
সুখ নেইকো মনে।”
“আসলে জীবন মানেই শৈশব; জীবনভর মানুষ এই একটা ঐশ্বর্যই ভাঙিয়ে খায়, আর কোনো পুঁজিপাট্টা নেই তার।”