আজ থেকে দুশো বছর আগে এ-দেশের ছাত্রছাত্রীদের কি ইতিহাস পড়তে হত? যদি তা আদৌ পাঠ্যবিষয়ের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে, তাহলে তাতে কী থাকত? এখনকার বইপত্রে আমরা যা পড়ে থাকি— তার প্রায় কিছুই তখন পাঠ্যসূচিতে থাকা সম্ভব ছিল না। সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতা সম্বন্ধে কেউ ভাবতেও পারতেন না। বৈদিক সংস্কৃতির ধারণা সীমাবদ্ধ ছিল বেদমন্ত্রের মধ্যেই। পাটলিপুত্র কোথায়— লোকে জানত না। অশোকের নামও জানা ছিল না কারও, ব্রাহ্মী লিপি পড়ার তো প্রশ্নই ছিল না। স্তূপ থেকে মন্দির, ভাস্কর্য থেকে স্থাপত্যের কূটকৌশল— এককথায় বললে, একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের শাসনে নির্মিত জিনিস ছাড়া বাকি প্রায় সঅঅব হারিয়ে গেছিল বিস্মৃতি ও অজ্ঞতার অন্ধকারে। কেন? উত্তর হিসেবে প্রায় আটশো বছর ধরে ভারতবর্ষের উত্তর, পূর্ব, মধ্য ও পশ্চিমে শাসনের নামে যথেচ্ছ লুণ্ঠন ও বহ্নুৎসব চালানো শ্রেণিটিকে চিহ্নিত করলে অনেকের সমস্যা হয়। তাঁরা দাবি করেন, শঙ্খ ঘোষ বাবরি মসজিদ ভাঙার পরিপ্রেক্ষিতে 'দুর্যোধন' কবিতায় যা লিখেছিলেন, সেই "আমার কী এসে যায়, বাঁচে কি বাঁচে না ইতিহাস"— এটিই আসলে এ-দেশের লক্ষ কোটি মানুষের স্বাভাবিক চিন্তন। আমি এই বিবাদে জড়াব না। শুধু লিখব, সেই শ্রেণিটির হাত থেকে শাসনভার যারা কেড়ে নিয়েছিল, সেই নতুন লুঠেরাদের ভিড়ে কিছু সত্যিকারের অনুসন্ধিৎসু, পরিশ্রমী এবং জ্ঞানতাপসও ছিলেন। তাঁরা না থাকলে আমাদের প্রাক-ইসলামিক অতীত সম্পূর্ণ অন্ধকারে থেকে যেত! কী করেছিলেন তাঁরা? আলোচ্য বইয়ের 'প্রাক্-কথন' অংশের পরে থাকা পঞ্চাশটি প্রবন্ধে উঠে এসেছে বিস্মৃতির অন্ধকার থেকে ভারতবর্ষের আক্ষরিক অর্থে স্বর্ণিম অতীতের উদ্ধার হওয়ার রোমাঞ্চকর উপাখ্যানমালা। সেই পঞ্চাশটি প্রবন্ধের নাম দিতে গেলে ব্যাপারটা অত্যন্ত ক্লান্তিকর হয়ে পড়বে। আমি শুধু সেই আবিষ্কারগুলোর মধ্যে কয়েকটির কথা লিখছি। তার থেকেই বোঝা যাবে, এই ভাগ্যান্বেষী, দুঃসাহসী, অনেকক্ষেত্রে ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বের সম্বন্ধে কিছুই না জানা ও প্রশিক্ষণবিহীন মানুষেরা না থাকলে আমাদের ইতিহাস বইয়ে কী-কী থাকত না~ ১] সম্রাট অশোক ও তাঁর কীর্তিকলাপ; ২] পাটলিপুত্র, রাজগির-সহ মৌর্য ও তার আগের-পরের যুগের ইতিহাস; ৩] অজন্তা; ৪] ব্রাহ্মী লিপি পড়ে জানা সবকিছু; ৫] বুদ্ধের ঐতিহাসিক পরিচয় (জানেন কি, যে শাক্যসিংহ-কে ভারতে আক্রমণকারী এক মিশরীয়, তথা স্তূপগুলোকে পিরামিড ভেবে তাদের নীচে ধনরত্নের খোঁজ চালানো হয়েছিল একসময়?); ৬] বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস এবং কপিলাবস্তুর অবস্থান; ৭] মধ্যভারতের প্রাগৈতিহাসিক শিল্পকর্ম; ৮] কোনারক; ৯] বাঘ গুহার শিল্পকীর্তি; ১০] কালিবাঙ্গান, হরপ্পা, মহেঞ্জোদাড়ো! কিন্তু এই বই শুধু নীরস আবিষ্কারের কথা বলে না। সরস ও সহজ ভাষায় লেখক আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন সেইসব কাণ্ডারীদের, যাঁদের হাত ধরে ঘটেছে ইতিহাসের এই উজ্জ্বল উদ্ধার। এঁদের মধ্যে আছেন~ ১) উইলিয়াম জোন্স; ২) জেমস প্রিন্সেপ; ৩) রাজেন্দ্রলাল মিত্র; ৪) আলেকজান্ডার কানিংহাম; ৫) ব্রায়ান হজসন ৬) জোসেফ বেগলার; ৭) জেমস ফার্গুসন; ৮) ফ্যানি পার্কস; ৯) জন মার্শাল; ১০) দয়ারাম সাহনী ও রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। যে-সব ঘটনাক্রম, উত্থান, পতন, ভাগ্য ও দুর্ভাগ্যের মধ্য দিয়ে এই চরিত্রেরা ভারতের অতীতকে মাটি খুঁড়ে তুলে এনেছিলেন— সেগুলো রহস্যকাহিনির চেয়ে কোনো অংশে কম রোমাঞ্চকর নয়। লেখক অজস্র ছবি, গ্রন্থপঞ্জি ও নির্দেশিকা দিয়ে বইটিকে সমৃদ্ধতর করে তুলেছেন। সামগ্রিক মুদ্রণসৌকর্য ও রুচিশীল প্রচ্ছদ লেখাগুলোর প্রতি সুবিচার করেছে— এও স্বীকার্য। যদি ভারতের ইতিহাস নিয়ে আগ্রহী হন, যদি বিস্মৃত অতীতের পুনর্নিমাণের সেই পর্যায়গুলো নিয়ে এমন কিছু জানতে চান যা ইতিহাস বইয়ে লেখা হয় না— তাহলে এই বইটি অবশ্যই পড়ুন।
যতই আমরা সাহেবদের নিন্দা করি না কেন, তাঁরা না এলে কিন্তু ভারতবর্ষে প্রত্নতত্ত্বের চর্চাই হতো না।
জেমস প্রিন্সেপ ব্রাহ্মীলিপির পাঠোদ্ধার না করে দিলে মহামতি অশোকের নাম কেউ জানত না। ১৮১৯-খ্রিস্টাব্দে বাঘ শিকারে বেরিয়ে ব্রিটিশ আর্মির ক্যাপ্টেন জন স্মিথ ঘন জঙ্গলের মধ্যে হঠাৎ খুঁজে পেলেন অজন্তার অপরূপ গুহা! জার্মান পণ্ডিত আর্থার শোপেনহাউয়ারের মতো পণ্ডিত না এলে বিশ্বব্যাপী বৌদ্ধতত্ত্বের চর্চাও হতো কিনা সন্দেহ।
কিন্তু তবু প্রত্নতত্ত্বের গল্প কেউ করে না, চালু নয় ব্যাপক।
কে বলল, নয়?
এই তো তরুণ ব্যবহারজীবী প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত বর্তমান বইটিতে অজন্তা-ইলোরা থেকে বুদ্ধগয়া-ভারাওদ-জেতবন থেকে হরপ্পার গল্প শুনিয়েছেন---আর কী মনোজ্ঞ ভঙ্গিতে! ওঁর এই নিবন্ধগুলি কলকাতার এক প্রথম শ্রেণীর দৈনিকের রবিবারের সংখ্যায় নিয়মিত বেরোত, গোগ্রাসে গিলত পাঠক। এখন এই নূতন প্রকাশনালয়টিও চমৎকার উপস্থাপন করেছে বর্তমান সংকলনটি।
পঞ্চাশখানি রচনা রয়েছে সংকলনটিতে। ইচ্ছে করছে পুরো লিস্টিটা দিই। কিন্তু ততটা দরকার না হলেও কয়েকটি শিরোনাম তো পড়াই যেতে পারেঃ
• ব্রিংকালাট্টি [ভীম-কা-লাঠি]
• ধরিত্রী মাতার আঁচিল
• হাতির পেটে বর্ণমালা
• কোথায় কপিলাবস্তু
• রাখালদাসের দোষ নেই ইত্যাদি ইত্যাদি
একটা থেকে পড়িঃ
১৯০৯-এ অজন্তা দেখতে গিয়েছেন সস্ত্রীক জগদীশ বোস, ভগিনী নিবেদিতা প্রমুখ। নন্দলাল বসু-অসিত হালদার তখন ছিলেন সেখানে ছবি কপি করার কাজে নিয়োজিত। খাওয়াদাওয়ার বড্ড কষ্ট হতো সেখানে শিল্পীদের। কলকাতায় ফিরে তাই লেডি অবলা বসু ডাক-পার্সেলে আলু পাঠাতেন ওঁদের। প্রায় চল্লিশ মাইল দূরের জলগাঁও পোষ্টাপিস থেকে, অবিশ্যি, সে সব ছাড়িয়ে আনাতে হতো তাঁদের।
আরেকটি নিবন্ধ শুরু হচ্ছে এইভাবেঃ
গৌতম বুদ্ধ তাঁর জীবদ্দশায় একবার কিছুদিনের জন্য স্বর্গে গিয়েছিলেন…তাঁর স্বর্গগতা মা মায়াদেবীকে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত করতে। সেখান থেকে এক অনুপম সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসেন এই ধরাধামের সংকাশ্য নগরীতে, যার কথা ফাহিয়েন ও হিউয়েন সাং দুজনেই লিখে গেছেন।
কোথায় এই নগরী?
পড়তে হবে যে, বাবু, বইখানি।
সব কিছু বলে দিলে যে গ্রন্থ-সমালোচকের ফাইন হয়ে যাবে!
*** তবে বড় সুখপাঠ্য স্টাইলখানি লেখকের। আর ভারতীয় প্রত্নতত্ত্বচর্চার এমন এমন স্থান ও বিষয়গুলির উত্থাপন করেছেন যে পাঠক ধরলে ছাড়তে পারছে না লেখাগুলি।
যেমন ধরুন না কেন ‘তিব্বতী সূত্র’ নিবন্ধখানি, যেখানে পৃষ্ঠা-চারেকের মধ্যে বৌদ্ধশাস্ত্রচর্চায় নিবেদিতপ্রাণ হাঙ্গেরীয় আলেক্সান্দার শোমা ও ইংরেজ প্রকৃতিবিজ্ঞানী ব্রায়ান হজসনের গল্প করেছেন। শোমা-কে জাপান ‘দ্বিতীয় বোধিসত্ত্ব’-এর মর্যাদা দিয়ে থাকে, আর হজসন-কে ফ্রান্স দিয়েছিল তার সর্বোচ্চ সম্মান ‘লিজিয়ন অব অনার’!
প্রত্নতত্ত্বের কাহিনি পড়তে বসে প্রাসঙ্গিক ইতিহাসটুকুও পড়তে পাওয়া চমৎকার উপরি পাওনা বটে, যদিও এখানে শোমা-র ‘গুরু’ ভেটারিনারিয়ান উইলিয়ম মুরক্রফটকে আদতে একজন ‘স্পাই’ কেন বলা হলো সেটা বুঝিনি।
আরেকটা প্রসঙ্গ ঃ ‘দ্বীপভূমির মহাবংশ’ নিবন্ধে সম্রাট অশোককে বারবার ‘দেবনামপিয়’ বলা হয়েছে। ওটি ‘দেবানাংপিয়’ হবে। এখানে দেবতাদের প্রিয়, অর্থাৎ বহুবচন ব্যবহৃত ।
গ্রন্থ-শীর্ষনামে ‘আশ্চর্য ক��হিনি’ লেখা হয়েছে! আশ্চর্যই বটে, ঘুমিয়ে থাকা ভাষাহীন পাথর যে এত এত কথা বলতে পারে তা প্রত্নতত্ত্বের জ্ঞানসাগরে ডুব না দিলে কি বোঝা যায়?