বিকেল কিনে রাখি একটি কবিতার বই। ব্যক্তিমানসের অন্তদ্বন্দ,নাগরিক জীবন, দ্রোহ, সমাজ এবং রাস্ট্রের নানান অসঙ্গতি, এমন বিষয়াবলীকে তীর্যক অভিব্যক্তিতে অথচ সহজ করে বলা বলা হয়েছে বিকেল কিনে রাখি কবিতার বইতে। কবিতাগুলো আমাদের রহস্যলোকের অজ্ঞাত দরজা খুলে দিয়ে স্বপ্ন এবং সৌন্দর্যের উপলব্ধিতে পৌছে দেবে। এ ছাড়াও প্রেম, বিরহ বেদনা না পাওয়ার হাহাকারও নান্দনিক এবং শৈল্পিক শব্দমালার বুনন গভীর আকুতি নিয়ে পাঠকের উপলব্ধিতে পৌছানোর প্রয়াস পেয়েছে যা পাঠককে অন্যরকম মাধুর্যলোকে উত্তীর্ণ করবে নিঃসন্দেহে।
প্রসেনজিৎ রায় এর জন্ম ১৫ অক্টোবর ১৯৯৩ বরিশালের বানারিপাড়ায়। তবে বেগে ওঠাটা পিরোজপুর জেলার স্বরুপকাঠিতে। পিতা প্রেমলাল রায় ও মাতা গৌরী রাণী রায়ের দুই পুত্রের মধ্যে বড় সন্তান। তিনি বরিশালের বিএম কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
২০১৩ সাল থেকে নিয়মিত অনলাইনে লিখালিখি শুরু করেন তিনি। কবিতার পাশাপাশি গল্প ও লিখেছেন তিনি। বেশ কিছু যৌথ কাব্য সংকলন ও গল্প সংকলনে লিখা প্রকাশিত হয়েছে।
তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যের মধ্যে আছে ক্যানভাসের কাব্য, মেঘক্রান্তি, সময়ের ছবিঘর, কবিতার খাম, নিঃসর্গ, প্রতিসরন উল্লেখযোগ্য।
বহুদিন কবিতা পড়া হয়না দেখে পড়ছিলাম এই বই। কবিতাগুলোর অর্থ অনেক গভীর। কিন্তু রিপিটেশন অফ লাইন অনেক বেশি ছিল। হ্যাঁ, রিপিটেশন এক ধরনের কবিতার অলঙ্কার। কিন্তু এই বইয়ে কবির প্রায় প্রতিটা কবিতার মধ্যেই রিপিটেশন ছিল। কিছু কবিতার মাঝে থাকলে পড়তে অন্যরকম ভাল লাগে। কিন্তু প্রায় কবিতার মাঝে থাকলে নিতান্তই একঘেয়ে লাগে আমার কাছে। তাছাড়াও কবির লেখার জনরা এক রকম লেগেছে। কিছু কিছু কবিতার প্লট, বলার ধরন একই। শুধু শব্দচয়ন আলাদা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে শব্দগুলোও একই ছিল। মোট কথা, উপভোগ করতে পারিনি।
বিকেল কিনে রাখি একটি কবিতার বই। ব্যক্তিমানসের অন্তদ্বন্দ,নাগরিক জীবন, দ্রোহ, সমাজ এবং রাস্ট্রের নানান অসঙ্গতি, এমন বিষয়াবলীকে তীর্যক অভিব্যক্তিতে অথচ সহজ করে বলা হয়েছে বিকেল কিনে রাখি কবিতার বইতে। কবিতাগুলো আমাদের রহস্যলোকের অজ্ঞাত দরজা খুলে দিয়ে স্বপ্ন এবং সৌন্দর্যের উপলব্ধিতে পৌছে দেবে। এ ছাড়াও প্রেম, বিরহ বেদনা না পাওয়ার হাহাকারও নান্দনিক এবং শৈল্পিক শব্দমালার বুনন গভীর আকুতি নিয়ে পাঠকের উপলব্ধিতে পৌছানোর প্রয়াস পেয়েছে যা পাঠককে অন্যরকম মাধুর্যলোকে উত্তীর্ণ করবে নিঃসন্দেহে।
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ আমার কাছে কবিতার রিভিউ হলো কবির দু'লাইন এ বিদ্রোহ, এক জাতির বিপ্লব, প্রেমিকের কাছে প্রেমিকার আজন্ম মায়া, ব্যার্থ মানুষের দীর্ঘশ্বাস। কবিরা কয়েক লাইনে ফুটিয়ে তুলে একটা পুরো জীবন বা একটা পুরো দেশের অসংগতি। বিকেল কিনে রাখি কবি প্রসেনজিৎ রায় এর ৬৪ টি একক কবিতার সংকলন। কবিতা গুলো পড়ে মিশ্র এক আবেশের মধ্যে ছিলাম, যেমন ছুঁয়ে গেছে জেলখানার সেই কয়েদির স্বপ্ন, তেমনি চোখের সামনে ভেসে উঠেছে পোষ্টমাষ্টার নিতেনের ফাঁস দেয়া লাশ৷ কসাইজ্ঞান এ ছিলো এক জ্বালাময়ি কবির শব্দে গড়া ধারালো চাপাতি। তুলে ধরেছেন কাজল না পরা মেয়ের শর্ত সাপেক্ষে বৈষ্ণবী হওয়ার অভিলাষীতার কথন। কবি বুঝিয়েছেন প্রকৃতি ই প্রেমিকা,প্রেমিকাই প্রকৃতি। জাগিয়েছেন ক্ষুব্ধতা নরপিশাচ সুবাস এর বিরুদ্ধে। গর্বে বুক ফুলে গেছে ইস্টেশনমাস্টার জলদীশ পোদ্দার এর জন্য। বেশীরভাগ কবিতাই হৃদয় ছুঁয়ে গেছে, উপলব্ধি করেছি বেশকিছু দর্শন। রুনু,রেণু,রিনু এই নাম গুলোর প্রতি কবির দুর্বলতা দেখা গিয়েছে। ভালোলাগার কবিতা গুলোর পাশাপাশি অল্প কিছু কবিতা এমন ও ছিল যেগুলো আপ টু দ্য মার্ক মনে হয়নি, কয়েকটা মাথার উপর দিয়ে গিয়েছে বলতে গেলে। "ভালো থাকিস সুরঞ্জিত" কবিতাটার সম্ভবত নামে ভুল আছে, কবিতার নামে সুরঞ্জিত হলেও ভেতরের গল্প "সুরঞ্জিতা" কে নিয়ে। সতীর্থের বইগুলোর প্রচ্ছদ বরাবরই সুন্দর, তবে অন্যতম প্রিয় প্রচ্ছদগুলোর মধ্যে এটি একটি, তাদের কিছু বইতে ইলাস্ট্রেশন এর উপস্তিতি দেখা যায়, ঠিক তেমনি এই বইটিতেও বেশকিছু সুন্দর ইলাস্ট্রেশন পরিলক্ষিত হয়েছে। কবিতা ত আবেগ,বিদ্রোহ,বিপ্লব, ভালোবাসা,সামাজিক বার্তার বহিঃপ্রকাশ, বিকেল কিনে রাখি আমার কাছে একটা ঘোর এর মত লেগেছে, কিছু কবিতা কয়েকবার করে পড়েছি৷ পছন্দের তেমন কবিতা গুলোর দুই এক লাইন তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।
১. "সতর্কীকরণ" ভাবনার ভ্রণ ফুড়ে পােয়াতি হচ্ছে.. ঋতুবতী ডায়েরির একেকটি কুমারী পৃষ্ঠা! কামিনী-ডাল ছুঁয়ে উড়ে আসা বাতাসেরা ফিস করে বলে যায়- সাবধান কবি!" "নিরাপত্তাহীন জোছনা-সঙ্গমে জন্ম নিতে পারে আরেকটি কালজয়ী অশ্লীল কবিতা।"
৪. "মঞ্চনাটক" আজকে যখন স্বয়ং গণতন্ত্র এসে উলঙ্গ দাঁড়িয়ে পড়ে ভরাট রাস্তায়, আমি কিঞ্চিৎও ধিক্কার দেই না জানাে! রিনুবৌদিই আমাকে শিখিয়ে গেছে সেদিন, নারী কখনাে সেচ্ছায় বেশ্যা হয় না; আমরাই তাকে বেশ্যা বানাই!
৫. "জবাব" আপনার আমার ভীষণ তাে মিল! গাধার বেলায় কীসের অমিল? তবে কি দাদা চকচকে বেশ গাধাকে দেয় মানুষ-অবেশ?”
৬. "বিকেল কিনে রাখি" আমিও কারও চোখে দিনশেষে ডুব দিয়ে খুঁজে নেই মৃত্যুর স্বাদ! শহুরে কংক্রিট বেয়ে বেড়ে ওঠা অর্কিডে আমারও ইচ্ছে হয় গুঁজে দেই তৃতীয়াংশ প্রেম। আমি বিকেলকে বেঁধে রাখি- সাবালিকা রমণীর নাবালিকা ঠোঁটে, বস্তুত যে আমার নয়।
৭. "কালোত্তীর্ণের আদ্যোপান্ত" আমার সদ্যজাত কবিতার জন্য একজন ব্রোথেল ফেরত প্রেমিকা চাই, কবিতার প্রথম বস্ত্রদানে চাই বুকখােলা রমণীর সদিচ্ছায় ছুড়ে ফেলা ব্লাউজ।
৮. "শান্তিচুক্তি" শান্তির মন্ত্রণালয়টা ঈশ্বর আর রাজনীতিবিদ দেখেন! কবি আর আমজনতা রাস্তার মােড়ে মােড়ে এখনও হাতরে বেড়ান হুইস্কি, আর নিরেট বাংলা মদ।
৯. "কসাইজ্ঞান" কিছুক্ষণ আগেই এই পথে চলে গেছে গণতন্ত্রের পবিত্র কফিন। অতএব, আজকাল বেশ্যার ঠোঁটে স্বতন্ত্রতা খুঁজি না আমি।
১০. "কথোপকথন-৯" : ভালােবাসেন তােমাকে? - হুম্মম্ম। আটতলা বাড়ি; ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। নিত্যই আড্ডা দেন অভিজাত বারগুলােয়। মদ্যপ্য ফিরে এসে আমার শরীর-বুকে খুঁজে নেন বেশ্যার ভাগ। পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ার পরে ওনার মুষ্টি থেকে নিত্যই ছাড়িয়ে নেই একমুঠো চুল। সযত্নে তুলে রাখি তােমার স্পর্শমাখা নীলরঙা ডায়েরিতে। আমি ভালাে আছি, এই বেশ ভালাে আছি। আমাকে ভালােবাসেন, কোটি গুন বেশি।
১১. "রাষ্ট্রসংঘের কাছে বিনীত প্রার্থনা" ইউজড ন্যাপকিন থেকে এবার দৃষ্টি সরান সম্মানিত রাষ্ট্রসংঘ; এর চে' চলুন, আমরা গণতন্ত্রকে ঢেলে সাজাই। কবিতাকে কেন্দ্র করে তৈরি হােক বৈশ্বিক রাষ্ট্রতন্ত্র।
১২. "প্রেম বিষয়ক প্রলাপ" যেসব রমণীরা রাত হলে সাজে, তাদেরকে বলে দিও- আধখােলা অন্তর্বাসে তারা যেন গুজে রাখে বনলতা সেন।
১৩. "ফিরিয়ে দিও না" আমাকে ফিরিয়ে দিলে, শুনেছি গন্ধ বিলাবে না বলে প্রতিজ্ঞা করেছে ভােরের শিউলিতল, শ প্রেমিকের আর্তনাদে এ শহরে নেমে আসবে স্থায়ী অমাবস্যাতিথি।
১৪. "কথন" বুকের ভাঁজপত্র খুলে যারা আমাকে ছুঁয়ে দিতে চায়, সুচতুরভাবে তাদেরকে ফিরিয়ে দিয়ে বলি শর্ত সাপেক্ষে আমি একদিন বৈষ্ণবী হবো; আমাকে ছিড়ে খাবে শান্ত দিঘিতে ভাসা শ্বেতাঙ্গ রাজহাঁস।
১৫. "স্মারকলিপি হে মহামান্য রাষ্ট্রপ্রধান, এবার পাল্টে ফেলুন সম্পূর্ণ সংবিধান। রাষ্ট্রীয় শাসন হােক কবিতাতান্ত্রিক।
'বিকেল কিনে রাখি' বইটি ৬৪ টি কবিতার সংকলন। কবিতাগুলো প্রেম, বিষাদ, সমসাময়িক প্রেক্ষাপট, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেশি লেখা হয়েছে। সব কবিতা ভালো লাগে নি তবে কিছু কবিতা বেশ ভালো লেগেছে যেমন 'আমি ও তুমি', 'কেউ কেউ কথা রাখে', 'বিকেল কিনে রাখি', 'জেলখানার চিঠি', 'শান্তিচুক্তি', 'লুন্ঠন', 'জগদীশ পোদ্দার', 'দেয়ালিকা' উল্লেখযোগ্য। বইটিতে বেশ কিছু জায়গায় বানান ভুল রয়েছে। যা পড়ার মাঝে তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে না। কবিতাপ্রেমীদের বইটি পড়ে দেখার অনুরোধ রইলো।
প্রসেনজিৎ রায় এর বেশ কিছু শক্তিশালী কবিতার সংকলন নিয়ে এই বই। কবি'র কয়েকবছরের ভাবনার যে আস্ফালন করেছেন কবিতা ওগুলো থেকে বাছাই করা হয়েছে এই বইয়ের জন্য। সমকালীন স্বাদ একটু কম পাওয়া গেলেও নিঃসন্দেহে পাঠক অন্তরে নাড়া পাবেন।