কেউ যদি বিজ্ঞান নিয়ে একটা বই লিখে আর বইয়ের নাম দেয় ‘ভূতের বাচ্চা আইনস্টাইন’! কেউ যদি দর্শন নিয়ে বই লিখে আর নাম দেয় ‘হনুমানের বাচ্চা সক্রেটিস’! অবশ্যই সেটা এক্সেপ্টেবল না। কারণ, নামগুলো স্ব স্ব ক্ষেত্রে একেকটি ব্র্যান্ড হয়ে গেছে। কোনো পণ্ডিত যদি রাজনীতি নিয়ে বই লিখে বইয়ের নাম দিয়ে দেয় …র বাচ্চা জিয়া, তাহলে ভাঙ্গা কোমর নিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও বিএনপির লোকজন রাস্থায় বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করবে। আর কোনো কারণে এবং অকারণেই ‘…র বাচ্চা শেখ মুজিব’ নাম দিলে তো আর হয়েছেই। লেখকের চৌদ্দগোষ্ঠীর খবর হয়ে যাবে। নামে কিছুই যায় আসে না আবার অনেক কিছুই যায় আসে। তাই, যে যুক্তিতে ভূতের বাচ্চা আইনস্টাইন/সক্রেটিস/জিয়া/মুজিব বলা অমার্জনীয় ধৃষ্টতা হবে, সেই যুক্তিতে; বরং তারচে’ও শক্তিশালী যুক্তিতে ‘ভূতের বাচ্চা সোলায়মান’ বলাটাও অমার্জনীয় ধৃষ্টতার শামিল… ‘পাগলের মাথা খারাপ’ বইটি এই প্রেক্ষাপটেই রচিত
■ ছোট্ট একটি শব্দ "নাম",যা একটি বস্তু বা ব্যক্তির পরিচয় বহন করে থাকে। এককথায় বলা যেতে পারে পরিচয়ের পাসওয়ার্ড। আবার সেই নামটিই যখন মানুষের মনে জায়গা করে নিয়ে থাকে তখন সেই নামটি যদি কেউ আবার বিকৃতভাবে ব্যবহার করে থাকে তাহলে অনেক সময়ই মানুষের অনুভূতিতে আঘাত লাগাটাই স্বাভাবিক। সুতরাং নামের ক্ষেত্রে কিছু যায় আসে বললেও অনেক ক্ষেত্রেই অনেক কিছুই যায় আসে। তেমনই আমাদের দেশের এক প্রখ্যাত বিজ্ঞানবাদী সেক্যুলার লেখক ড.জাফর ইকবাল। নবী সোলায়মান (আ.) কে কটাক্ষ করে লিখেছেন " ভূতের বাচ্চা সোলায়মান " বইটি। জাফর ইকবাল স্যারের বিতর্কিত বইয়ের নামের আপত্তি থেকেই রিভার্স করে লেখা বিশিষ্ট ইসলামি ব্লগার "রশীদ জামিল"-র বক্ষমান গ্রন্থটি।
■ লেখক রশীদ জামীল এই প্রজন্মের একজন শক্তিমান লেখক। দেশ-বিদেশের পত্রিকা-জার্নালে,ব্লগে লিখেছেন তিন শতাধিক প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও কলাম। তার লিখার একটা চমৎকার গুণ হলো তিনি সহজেই পাঠককে তার বইয়ের প্রতি আকর্ষণ লাগাতে পারেন। প্রায় ৪০ টিরও বেশি পাঠকপ্রিয় বইয়ের রচয়িতা তিনি। ২০০৮ সালে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ তরুণ কলামিস্ট হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে স্বর্ণপদক লাভ করেন এই ইসলামি ব্লগার।ইসলামিস্টদের মধ্যে সর্বপ্রথম ব্লগিং জগতে সবচেয়ে জনপ্রিয় একজন লেখক তিনি।
■ বইটি বেশ অনেকগুলো বিষয়ের লেখার সমষ্টি। তবে মূল বিষয় জাফর ইকবাল স্যার জাতীয় মানুষদের নিয়ে লেখাটা এগিয়েছে। যেখানে উঠে এসেছে বঞ্চিত স্বাধীনতা,আই অ্যাম জিপিএ ফাইভ সহ আরো চমকপ্রদ অনেক বিষয়ের মজার বিশ্লেষণ।
• যেহেতু জাফর ইকবাল স্যারকে উদ্দেশ্য করেই বইটি লেখা তাই প্রথমেই বেশ কিছু রম্য জাতীয় তাত্ত্বিক আলোচনা আনা হয়েছে। এছাড়াও এই আলোচ্য অংশে স্থান পেয়েছে শ্রদ্ধেয় লেখক রশীদ জামীল ভাইয়ের সাথে জাফর ইকবাল স্যারের প্রথম মোলাকাতের ২ পৃষ্ঠা ধরে বর্ণনা। তাছাড়াও আলোচিত হয়েছে জাফর ইকবাল স্যার কি সত্যিই নাস্তিক ? এছাড়াও নাস্তিকতার সংজ্ঞা, নাস্তিকতার খাঁটি-ভেজাল। কারণ বঙ্গীয় নাস্তিকদের কাজই হলো ধর্মের বিরোধীতা করা আর স্পষ্ট করে বলতে গেলে ইসলাম ধর্মেরই বিরোধীতা করা। কিন্তু যারা প্রকৃত নাস্তিক তারা কিন্তু ধর্মের বিরোধীতা করে থাকে না, বরং সম্মান করে।
• দ্বিতীয় যে বিষয়টি বইটিতে আলোচনা করা হয়েছে নাম, নামের প্রভাব, নাম এবং অসাম্প্রদায়িকতা এই টপিকে। এই অংশে মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী সাহেবের অসাধারণ একটি ঘটনা উল্লেখিত হয়েছে। হযরত সোলায়মান (আ.) একজন জগদ্বিখ্যাত নবী সুতরাং তাঁর নাম বিকৃতভাবে ব্যবহার করে মানুষের অনুভূতিতে আঘাত করাটা কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের ব্যক্তির পরিচয় হতে পারে না।এটাই উল্লেখ করে দেওয়া হয়েছে বইটিতে।
• তৃতীয় যে বিষয়ে মূলত আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হয়েছে তা হলো নবীসম্রাট হযরত সোলায়মান (আ.) কে নিয়ে। সোলায়মান (আ.) এর অনুসারী শুধু মানবজাতিই ছিল না বরং জিনজাতিও তাঁর অনুসারী ছিল। এই অংশে আল্লাহর নবী সোলায়মান (আ.) কে নিয়ে কুরআনের আলোকে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে এবং সর্বশেষে হযরত সোলায়মান (আ.) এর জীবন ও মরণ থেকে কিছু শিক্ষা আমাদের জন্য তুলে ধরা হয়েছে। মোদ্দাকথা অধ্যায়টিতে সোলায়মান (আ.)-র মহান জীবন সম্পর্কে এক টুকরো আলোচনা সন্নিবেশিত হয়েছে।
• বইটিতে চতুর্থ যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে আমাদের বর্তমান কথিত সুশীল সমাজের সুশীলগিরি নিয়ে। কীভাবে এই কথিত সুশীলসমাজ; সমাজ প্রগতিশীল দেখাতে গিয়ে অতি প্রগতিবাজী দেখিয়ে সমাজে নষ্টামি, নোংরামি, বেহায়াপনা করে বেড়াচ্ছে,তাছাড়া তারা কীভাবে মুক্তচিন্তার নামে এক বিকৃত চিন্তাধারা তরুণদের মাঝে ঢুকিয়ে দিচ্ছে তাইই দেখানো হয়েছে এই অংশটিতে।
• পঞ্চমত সমসাময়িক বিষয় তথা আমাদের শিক্ষাব্যবসস্থা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে বইটিতে। কিছু তথাকথিত শাহবাগী সুশীল আছে যারা শুধু সেক্যুলার স্কুল-কলেজের শিক্ষার অনেক গান গাইবে কিন্তু যেই মাদরাসা শিক্ষা সামনে আসবে তখন সেঔ শিক্ষাকে সেকেলে, গোঁড়া ইত্যাদি নামে অভিহিত করবে। কিন্তু স্কুল-কলেজের শিক্ষার ভুল-ত্রুটিগুলো তাদের চোখে কোনোভাবেই পড়বে না। তাছাড়াও বাংলাদেশে ধর্মনিরেপেক্ষতার নামে যে বিষ পান করাচ্ছে এই তথাকথিত সুশীলরা তার কিছু বর্ণনা খুব ভালো করেই সন্নিবেশিত করা হয়েছে।
• ষষ্ঠ যে বিষয়টি আলোচনায় এসেছে গুলশানের জিম্মি ঘটনাকে কেন্দ্র করে লেখক তার ভাবনাকে কীভাবে তিনটি সূত্র ধরে এগিয়েছেন তা নিয়ে-এখানে হোতা কারা ছিলো তাদের মূল উদ্দেশ্য কি ছিলো ?ঘটনার প্রকৃত চিত্র কি?এখন বাংলাদেশের করণীয় কি?এভাবে কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হয়েছে অধ্যায়টিতে। বিস্তারিত বই পরলেই জানতে পারবেন ইন শা আল্লাহ। তাছাড়া এরপরে ❛সময়ের ওপাশে কারা❜ এই টপিককে নয়টি ক্যাটাগড়িতে ভাগ করা হয়েছে। জঙ্গিবাদ দমনে জনগনের করণীয় সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে। এবং ❛ভন্ডবাদ নিপাত যাক❜ টপিক টিকে ৬ টি ধাপে আলোচনা করা হয়েছে।
■ সর্বশেষের দিকের ❛আত্মবিস্মৃতি❜ টপিকে ওলামায়ে কেরামের দায়িত্ব, তাদের বিভিন্ন সময়ে করণীয় কী সে সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। তাছাড়া যারা বর্তমানে এই তথাকথিত সুশীলগিরি করে ফেতনা ছড়াচ্ছেন আলেমদের উচিত তাদের কাছে হেদায়াতের বাণী নিয়ে যাওয়া কারণ আলেমরা হলেন নায়েবে নবী। এই বিষয়টির দিকেই আলোচনার এই অংশে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাছাড়াও এই অংশে লেখকের একটি পুরোনো লিখা সংযোজন আছে; যা ৭ টি ধাপে আলোচিত। এবং শেষাংশে ❛কি পড়ব কেন পড়ব❜ টপিকটিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
■ বইটি কারা পড়বেন এবং কেন পড়বেন....???বইটি মূলত জেনারেল লাইনের স্টুডেন্ট থেকে শুরু করে মাদরসা লাইনসহ সকল বয়সী পাঠকের জন্যেই উপযোগী। তাছাড়াও সমসাময়িক বিষয় উল্লেখিত থাকায় যেকোনো মানুষই বইটি পড়তে পারেন। বইটি পড়ার সময় বোরিং ফিল কখনোই যে হবে না, এব্যাপারে পাঠক নিশ্চিত থাকতে পারেন। বইটি পড়ে যেমন জ্ঞানার্জন করতে পারবেন, তেমনি শিক্ষা নিতে পারবেন মজার ছলে। মাঝে মধ্যে খুবই মজা পাবেন বইটির হাস্যরসাত্মক বিভিন্ন কথাগুলো পড়ে। সুশীলদের যে পরিমাণ বাঁশ দেওয়া হয়েছে তা পড়ে খুব কম মানুষই হাসি বিহীন থাকতে পারবে। ব্যক্তিগতভাবে জীবনের পড়া অন্যতম শ্রেষ্ঠ বই।
বইটি মূলত মুহম্মদ জাফর ইকবালের 'ভূতের বাচ্চা সোলায়মান'-এর নামকরণ নিয়ে লেখা। রশীদ জামিল বিভিন্ন আঙ্গিকে বেশ সরলভাবেই বুঝিয়েছেন যে এমন নামকরণ করা আদৌ উচিত হয়নি। বুঝলাম। কিন্তু, কয়েকটি বিষয়ে তিনি এমন অদ্ভুত, অযৌক্তিক যুক্তি বা প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন যা নেহাত অসারতামূলক।
তাছাড়া, বইটিতে আরো নানান বিষয়ে অল্প-বিস্তর আলোচনা করা হয়েছে; সেগুলো অবশ্য চলনসই। সর্বোপরি, বইটি খুব বেশি ভালোও লাগবে না আবার খারাপও লাগবে না।