জন্ম ২০ জনুয়ারি ১৯৬৫, নাটোরে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্নাতক। স্নাতকোত্তর ডিগ্রী স্বাস্থ্য অর্থনীতিতে। সমকালীন মূলধারার বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁর অপরিহার্যতা ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত। অনবরত বাঁকবদল তাঁর সাহিত্যিকতার প্রধান বৈশিষ্ট। বিষয় ও আঙ্গিকে, মাধ্যম ও প্রকরণে তাঁর স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত অবস্থান সকল মহলেই স্বীকৃত। পেয়েছেন বাংলা একাডেমিসহ দেশের প্রধান প্রায় সকল সাহিত্য পুরস্কার।
সত্যি বলতে, জাকির তালুকদারের গল্পের মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে কথা না বলে একটি বইয়ের রিভিউ দেয়াটা অবিচার করা হবে। জাকির তালুকদারের গল্পের সঙ্গে আমার পরিচয় থাকলেও তার কোন বই পড়া এই প্রথম। তাই আমার মনে হয়, তার অন্যান্য বই পড়ে তবেই কোন একটি বইকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গভাবে আলোচনা করা যায়।
তাও কয়েকটি কথা বলার লোভ সামলাতে পারছি না। কন্যা ও জলকন্যা নামের গল্পটিকেই আমার এই বইটির সবচেয়ে দুর্দান্ত গল্প বলে মনে হয়েছে। এটি যদিওবা গ্রাম্য সমাজে যুগ যুগ ধরে চলে আসা নিপীড়নের উপর নির্মিত, কিন্তু গল্পের মাঝামাঝি জায়গায় ব্যবহার করা কন্যা এবং জলকন্যার মধ্যকার যোগাযোগ গল্পটিকে অন্য একটি মাত্রায় নিয়ে গেছে। এছাড়াও এই গল্পটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো- ডিটেলিং। প্রত্যেকটি ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র বিষয়কে এত বিস্তারিত ভাবে দেখানো হয়েছে যে, ক্রমেই গল্পটির ভেতরে পাঠককে পরিচিত করে তোলা হয়েছে। মেদহীন এসব বর্ণনা পাঠককে একপ্রকার দর্শকে রূপান্তরিত করা হয়েছে। যেটি গল্পকে শক্তিশালী করার একটি অন্যতম কারণ।
শুধু একটি গল্প নিয়ে এভাবে অনেক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা যায়। এখানে থাকা প্রত্যেকটি গল্পই সেরকম। পেন্ডুলাম পাবলিশার্স বইটিকে তাদের ঢঙ্গে নতুন করে পেপারব্যাকে প্রকাশিত করেছে। আশা করি যে কোন রুচিশীল পাঠকের কাছে এই বই সুখপাঠ্য হবে।
************************** **********
Zakir Talukdar's water nymph
Honestly, it would be unfair to give a book review without talking about the basic features of Zakir Talukdar's story. Although I am familiar with the story of Zakir Talukder, this is the first time I have read any of his books. However, I think it would not be right to review the book without reading any of his other books.
I still can't resist the urge to say a few words. The story of 'Kanya O Jalakanya' (Girl and water nymph) seems to be the greatest in this book. Although it is built on the age-old persecution in rural society, the communication between the daughter and the mermaid used in the middle of the story has taken the story to another level. Also, the most important part of this story is- Detailing. Every little detail is shown in such detail that the reader is gradually introduced to the inside of the story. These lean descriptions have transformed the reader into a kind of spectator. Which is one of the reasons to strengthen the story.
There are so many perspectives on just one story. Every story here is like that. Pendulum Publishers has republished the book in paperback in their style. I hope that this book will be a pleasant read for any conscious readers.
যারে তুমি খুঁজো আকাশে বাতাসে সে আছে তোমার ঠিক আশে-পাশে চোখ দিয়ে না খুঁজিয়া খুঁজো মন দিয়া আমি কে, তা তোমারে বলবে তোমার হিয়া। – জাকির তালুকদার
বাস্তবতা যখন তীব্র রূপ নিয়ে আসে তখন সেটাকে সহ্য করাও মুশকিল হয়ে পড়ে। কেননা, বাস্তবতা হচ্ছে অ্যাবসলিউট ট্রুথ বা পরম সত্য। আর পরম সত্যের মুখোমুখি হতে এখনো প্রস্তুত হয়নি মানবসত্ত্বার মন। মানব মন এতটাই নরম যে, পরম সত্যের কাছে কেবল নত স্বীকার নয়; বরং সত্ত্বাকেও সঁপে দিতে দ্বিধাবোধ করে না। সেইজন্যেই, নানাভাবে ঘুরিয়ে-পেচিয়ে, নানা আবরণে মোলায়েম করে পরম সত্যকে হাজির করা হয় জনসমক্ষে।
আর পরম সত্য যখন সবার সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন মানব মন নিজেকে বাঁচাতে অদ্ভুত এক জগতের আশ্রয় নেয়; যেটাকে পরাবাস্তব বলে। যেই দুনিয়ায় সবকিছু সহজ, সরল আর স্বাভাবিক। পরম সত্যের তীব্রতাও যেন সেখানে মোলায়েম হয়ে আশ্রয় নেয়। বাস্তবতা নিজেই নিজের কাছ থেকে মানবকে বাঁচাতে পরাবাস্তব এক জগত সৃষ্টি করেছে। নয়তো কঠিন বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে জীবন চালিয়ে নেয়া সম্ভব না।
সাহিত্যিকদের রচিত ছোট গল্প পাঠককে টেনে নিয়ে যায় সেইসব গল্পে। বাস্তবতার কঠিন দিকটাই তুলে ধরে লেখক পাঠকের চোখের সামনে। কিন্তু কেবল বাস্তবতার কঠিন দিকটাকে তুলে ধরা সংবাদবাহকের কাজ। আর সেই একই বাস্তবতার কঠিন দিকটাকে শিল্পে রূপান্তরিত করা একজন লেখকের কাজ, শিল্পীর কাজ। সর্বোপরি একজন গল্পকারের কাজ। তেমনভাবেই নিজস্ব ঢঙে গল্পকার জাকির তালুকদারের গল্পগ্রন্থ কন্যা ও জলকন্যা। পেন্ডুলাম পাবলিশার্সের ব্যানারে গল্পসংকলনটি প্রকাশ পেয়েছে অমর একুশে বইমেলা ২০২০ এ। প্রচ্ছদ শিল্পী ছিলেন রাজীব দত্ত। অলংকরণে মিথুন রশীদ।
প্রচ্ছদ ভালোই লেগেছে। উনার প্রচ্ছদে এক ধরণের আর্ট ‘ভাইব’ থাকে; দেখতে ভালোই লাগে। এই ক্ষেত্রেও তাই। তবে অলংকরণসহ পুরো পেপারব্যাক সংস্করণ নিয়েই বলতে হয়। বইয়ের ভেতরকার লেআউট নিয়ে কিছুটা দ্বিধা আর সংশয় কাজ করেছে। যেমন মূল লেখার ফন্ট টিকই ছিল; তবে লেখার নীচে বিশালাকারের পৃষ্ঠা সংখ্যা দেখতে বিরক্ত লাগে। বইয়ের চারপাশের মার্জিন অনেক কম মনে হয়েছে। এইজন্যই মূল লেখা, পাতার সংখ্যা আর গল্পের নাম অনেকটাই মিলেমিশে যায়।
মানুষ যেভাবে এখন বেঁচে আছে, সে তার চাইতে অনেক উন্নতভাবে বাঁচতে পারে। সেভাবে বাঁচার অধিকার তার আছে। সেই পরিমাণ উপকরণও প্রকৃতিতে আছে। কিন্তু উপকরণগুলো অল্প কিছু মানুষের অবৈধ দখলে। – জাকির তালুকদার
কন্যা ও জলকন্যা গল্পটাতে উঠে এসেছে চিরাচরিত গ্রামীণ সমাজের অন্তর্নিহিত কথা। নারীর কোনো নিজস্ব ঘর নেই; স্রোতসিনী নদীর মতোই নারীর বয়ে চলা আজীবন। কখনো এপাড় ভাঙ্গলে ওপাড়ে ঠায় হয়; আবার কখনো এর বিপরীত। অন্যথায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে নারী যেন তার প্রবাহ হারায়; আটকা পড়ে স্থির হাওড় বা বিলের পানিতে। যত দূরেই চলে যাক না কেন তাকে ফিরে আসতেই হয় নিজস্ব ঠিকানায় নিজের সন্ধানে। গল্পটা অতি চেনা। ব্যতিক্রম বলতে লেখকের লেখনশৈলী আর পরাবাস্তবতার স্বাদ। সেজন্যই চেনা গল্প সত্ত্বেও খারাপ লাগেনি পড়তে।
আজগর আলীর হিসাববিজ্ঞান গল্পটি সাজানো হয়েছে গ্রামীণ দৈন্যতার এক নিদারুণ করুণতাকে অবলম্বন করে। আজগর আলীর গল্প অহরহ পড়েছে পাঠক। এই গল্পে তেমন নতুনত্ব কিছু ছিল বলে মনে হয়নি। পরের গল্প মন্ত্র উপাখ্যানে লেখক ব্যতিক্রম এক গল্প বলার চেষ্টা করেছেন। কিয়দাংশে তিনি সফলও হয়েছেন বটে। কেননা, পাঠক মাত্রই ভিন্ন রুচি সম্পন্ন। তাই, আধো পরাবাস্তব মন্ত্র উপাখ্যান গল্পটা পাঠকভেদে ভালো-খারাপের মাত্রা নির্বাচন করে।
পরাণগপ্পি ও হাতঘড়িবৃত্তান্ত গল্পটাও অতি চেনা। তবে লেখক গল্পটাকে অনেক গভীর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন তার একটা স্পষ্ট ছাপ আছে গল্পে। ভবসিন্ধু বলেন গল্পটা আসলে প্রতিটা মানুষের প্রেম আর যুবক বয়সের প্রতিরূপ এক ভিন্ন চিত্র মাত্র। ভবসিন্ধুর মতো একজন বন্ধু জুটে যায়ই জীবন চলার পথে। যে জীবনকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে শেখায়। যে নিজে সাধারণ হয়ে অসাধারণ হয়ে উঠে ব্যক্তিবিশেষের কাছে। নিত্যদিনের মানুষ হয়েও কিংবদন্তীতে পরিণত হয় যারা। এমনই এক ভবসিন্ধুর কল্যাণে বদলে একদল যুবকের গল্প শুনিয়েছেন লেখক।
১৯৯২ গল্পটা এই বইয়ের শুরুর দিককার গল্পের তুলনায় অনেকটাই ভারী। ভারী এই অর্থে যে, গল্পটা আসলে রাজনৈতিক গভীর চিন্তাধারায় রচিত। যেই দেশে সমাজতন্ত্রের জন্ম হয়েছিল সেই দেশই পাশ ফিরিয়ে পুঁজিবাদকে বেছে নিয়েছিল। সেখানে কমিউনিস্ট পার্টি চালিয়ে নেয়া – প্রহেলিকা ছাড়া আর কি! তবুও কিছু মানুষ থাকে নিজের আদর্শকে অটুটভাবে আগলে রাখতে চায় নিজের রাজনৈতিক চিন্তাধারাতে। কিন্তু যুগ অনেক বদলে গেছে এই ধারণাটাই তারা বুঝতে পারে না। যখন বুঝে তখন আর ফেরার কোনো পথ থাকে। গল্পটা খারাপ লাগার মতো নয়। আর ভালো লাগলেও তা লেখকের গল্প বলার ছন্দে আর বৈচিত্র্যময় বর্ণনাভঙ্গির জন্যে।
অনেক যোগ্য মানুষ অনেক সময় যে কাজ পারে না, হঠাৎ কোনো অকর্মা ধাঁ করে সেটা করে ফেলে। – জাকির তালুকদার
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তি হতে চলেছে। কিন্তু সবচাইতে অবহেলায় রয়েছে স্বাধীনতা এনে দ���য়া সেই মুক্তিযোদ্ধারাই। দেশের জন্য ত্যাগ করার বিনিময়ে পেয়েছে কেবল তাচ্ছিল্যতা। এমনকি তাদের মৃত্যুতেও পর্যাপ্ত সম্মান প্রদর্শন করতে পারেনি রাষ্ট্র এবং সরকার ব্যবস্থা। এমনই এক গল্পের ফাঁদে ফেলে লেখক পাঠককে বাস্তব সত্যের কাছাকাছি এনে দাঁড় করায়। যেই সত্যটা আসলে উপলব্ধি করার; ভাষায় প্রকাশের নহে। বইয়ের শেষ গল্প দিনযাপন কিংবা মৃতসুন্দরীর গল্প। ছোটগল্পের একটা তকমা আছে – শেষ হইয়্যাও হইলো না শেষ। এই গল্পটা দিয়ে লেখক যেন সেই তকমাকে পরিপূর্ণতা দিয়েছেন। বলতে গেলে গল্পগ্রন্থটারই পরিপূর্ণতা দিয়েছেন। গল্পটা পড়ে অবাক হবে না এমন পাঠক হাতে গোণা কয়েকজনকেই খুঁজে পাওয়া যাবে হয়তো।
জাকির তালুকদারের লেখনী অতিশয় সুন্দর আর গোছানো। সাহিত্যের ঢঙে আঞ্চলিকতার ছোঁয়ায় নিজস্ব বৈচিত্র্যতার মিশ্রণ পাওয়া যায় তাঁর লেখায়। একদিকে পড়ে যেমন আনন্দ লাগে; আবার কিছু ক্ষেত্রে দুর্বোধ্যও ঠেকে কিছু জায়গায়। তবে প্রাঞ্জলতা এবং সাবলীলতায় পূর্ণ এই বর্ণনাভঙ্গি একবার আয়ত্তে চলে এলে, অনায়াসে গিলে নেয়া যায় লেখকের সব গল্প।
লেখক পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দেয় বিধায় পাঠকের কাছে গল্পের বিশেষ কিছু জায়গা বিরক্তির উদ্রেক ঘটাতে পারে। আবার লেখক যদি বিবরণটাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যেতে চাইতো, তাতেও খানিকটা প্রশ্ন রয়েই যেত। তাই পাঠককে ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষায় রইতে হবে গল্পের গভীরে ডুব দিতে। কিন্তু তাই বলে এমন নয় যে, পাঠক প্রতিবারই ডিফেন্সিভ উত্তর নিয়ে সন্তুষ্ট রবে। কেননা, লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি আর পাঠকের মননশীলতার মধ্যে ঢের ফারাক থাকাটাই বাঞ্ছনীয়।
প্রতিটা গল্পই যে পাঠকের ভালো লাগতেই হবে – এমন না। আবার পড়ে সবকটাই খারাপ লাগবে – এমনটা ভাবারও অবকাশ দেননি স্বয়ং লেখক। তবে হ্যাঁ লেখকের নিজস্ব বৈচিত্র্যতা ছিল গল্প বলার ঢঙে। যেটা কমবেশি সকল পাঠকের কাছেই ভালো লাগবে। যদি ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণ বা অভিমত দেই, তাহলে বলতে হয় ৮টা গল্পের মধ্যে ৪টা গল্প ভালো লেগেছে। যেগুলো হচ্ছে – কন্যা ও জলকন্যা, ১৯৯২, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া এবং দিনযাপন কিংবা মৃতসুন্দরীর গল্প।
ছোট গল্পের একটা সংকলন, আটটা গল্পের ভেতর পাঁচটা গল্প ভালো লাগছে। বাস্তবতাকে হুবহু তুলে ধরলে টা হয় সংবাদ আর লেখকের কাজ সেই বাস্তবতাকে শিল্পে রূপ দেওয়া। সেই শিল্প আরামদায়ক আর উপভোগের উপযোগী না হলেও তা শিল্প। তবে জাকির তালুকদার বাস্তবের সেই ঘটনা আর আর পরাবাস্তব মিশিয়ে এক আরামদায়ক আর উপভোগ্য শিল্প রচনা করেছেন।