মানবতার মহাকাব্য: রাজা ভট্টাচার্যের ভারতবর্ষ — এক আত্মিক আবর্তে প্রবেশ
"Where the mind is without fear and the head is held high... into that heaven of freedom, my Father, let my country awake." — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
এই বই ইতিহাসের খুঁটিনাটি তথ্যের আর্কাইভ নয়, কোনো প্রথাগত রাজনীতি চর্চার দলিল নয়। 'ভারতবর্ষ' আসলে একটি অন্তর্জগতে যাত্রা, এক অন্তঃসারশূন্য সময় থেকে অন্তরসারবোধে উত্তরণের অভিজ্ঞতা। আর সেই যাত্রাপথে সঙ্গী হন আমরা, পাঠকেরা। রাজা ভট্টাচার্য রচিত এই ৯৮ পর্বের অনুপম গ্রন্থ একেকটি অধ্যায়ে যেন একেকটি বীজ রোপণ করে—মানবতা, সহানুভূতি, ঐতিহ্য আর আশার।
প্রতিটি পর্ব একটি ধ্যান। যেন মনের মাঝে কেউ মৃদু স্বরে বলে:
এই যে ভারতবর্ষ—মধুময়, কোমল, সৌম্য; এই সেই দেশ যার ইতিহাস যত না রাজাদের, তার চেয়ে বেশি মানুষের। পর্বের পর পর্বে লেখক যেন বলছেন: “তোমার ভারতকে নতুন চোখে দেখো। দেখো, কীভাবে ইতিহাস আর অনুভব মিশে এক অনন্ত নদী হয়ে বয়ে যায়।”
রাজা ভট্টাচার্যর ভাষা কখনো শ্লোকের মতো গম্ভীর, কখনো জলরঙের মতো হালকা। তিনি লেখেন:
"আর আমি ভাবছিলাম, শিশু তো শুধু একজোড়া মায়াময় চোখ আর একটা সিঁদুরের টিপ-কেই 'মা' বলে জানে। মাকে সম্পূর্ণ দেখতে হলে মায়ের কোল থেকে নামতে হয়।"
এ যেন এক অলীক বোধ—যেখানে দেশকে ভালোবাসার জন্য কিছুটা দূরত্ব দরকার, কিছুটা যন্ত্রণা, কিছুটা পরিণতি।
এই বইতে ভারত মানে শুধু ভৌগোলিক সীমানা নয়। ভারত মানে সততা, সহিষ্ণুতা, সৌজন্য, বন্ধুত্ব—এক এক রাজ্য হয়ে এই মূল্যবোধের মানচিত্র এঁকেছেন লেখক। আর সেই মানচিত্রে হেঁটে হেঁটে আমরা যেন নিজেদের খুঁজে পাই। যে কোনো একটি অধ্যায় পড়ে আপনি থমকে যাবেন। যেমন এই লাইনটি:
"সমকাল এসে নিয়ে গেল সনাতনকে" — এমন একটা বাক্যে শুধু সময় নয়, চেতনারও একটা প্রবাহ ধরা পড়ে।
আমরা যারা এই দ্রুত সময়ের রাজনীতির কুয়াশায় দিক হারাই, এই বই যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
“ধর্মো রক্ষতি রক্ষিতঃ” — যে ধর্মকে রক্ষা করো, সেই ধর্মই তোমায় রক্ষা করবে।
এই ভারতবর্ষ কোনো আত্মগর্বে গা ভাসানো দেশপ্রেম নয়। এটি এক নম্রতা মিশ্রিত শক্তির আখ্যান, যেখানে লেখক বিশ্বাস রাখেন এই মাটির প্রতি, এই মানুষের প্রতি, সেই ভবিষ্যতের প্রতি যা আজও জন্ম নিতে পারে কোন মাঠের ধারে, কোন অভাবী ঘরের শিশুর ভেতরে।
প্রতিটি পর্ব—একটি অনুভূতির গীতিকা
এই বইয়ের কাঠামো নিজেই এক অভিনব স্থাপত্য। বাঁদিকের পাতায় স্থিরচিত্র, ডানদিকে একটি ছোট লেখা—যেন একটা জীবন, একেকটা নিঃশ্বাসের মতো করে লেখা। কোনো বিশাল থিসিস নেই, নেই ড্রামাটিক ক্লাইম্যাক্স—আছে শুধু সত্তার পাথর ঘষে তৈরি করা রত্নমালা।
"My India is not just geography, it is an emotion. My country is not just land, it is memory." — Anonymous
এই বইয়ের প্রতিটি শেষ বাক্য যেন প্রতিধ্বনি হয়ে থাকে পাঠকের মনে। কখনো সে এক মৃদু আশ্বাস—“তুমি একা নও।” কখনো সে এক প্রশ্ন—“এতদিন কোথায় ছিলে?” আবার কখনো সেই চুপ করে বসে থাকা—যেটা বই শেষ হলে আর কোনো শব্দ থাকেনা, শুধু অনুভব।
এই বই এক শুদ্ধিকরণের স্নান। হ্যাঁ, এই বই শুধুমাত্র পড়া যায় না—ধারণ করতে হয়। এই বই পড়ার পর মনে হয়,
“হে ভারত, হে মাতৃভূমি, তব প্রেমে হৃদয় আমার সমর্পিত।”
রাজা ভট্টাচার্যের ভারতবর্ষ হল সেই কুয়াশা সরিয়ে সত্য দেখার আয়না। যেখানে আশার পাশে হতাশা, ধর্মের পাশে অধর্ম, প্রেমের পাশে বিদ্বেষ—সবই আছে, কিন্তু আলোর উপরই আলোকপাত করা হয়েছে। যেন কবি জীবনানন্দের সেই উচ্চারণ ফিরে আসে:
“এই ভারতবর্ষে তেমনি একদিন হবে, মানুষ মানুষের জন্য হইবে প্রভাতে।”
রাজা ভট্টাচার্যের ভারতবর্ষ শুধু এক গ্রন্থ নয়, এক দিশারি। এই বই বলে না “তুমি ভারতবাসী”, এই বই বলে—“তুমি ভারতবর্ষ নিজেই”। এই বই পড়ার পর আমরা আর কেউ "সাধারণ পাঠক" থাকি না। আমরা হয়ে উঠি কিছুটা ইতিহাস, কিছুটা উত্তরাধিকার।
ছোট ছোট পর্ব, নিপুণ ভাষা, আর গভীরতায় ভরা প্রতিটি লেখা যেন এক একটি ধ্যানমগ্ন অধ্যায়। কোনো বৃহৎ থিসিস নয়, বরং দেশকে ভালোবাসার এক মৃদু, নিরন্তর অথচ অক্লান্ত উচ্চারণ। লেখকের কলমে অখণ্ড ভারতবর্ষ আমাদের মানচিত্র নয়, একটি মানসভূমি—যেখানে রাজ্যগুলোকে লেখা আছে স্নেহ, মায়া, সততা, বন্ধুত্ব, আত্মসম্মান, সৌজন্য আর বিশ্বাস দিয়ে।
এই বই আসলে দেশকে মা রূপে উপলব্ধি করার এক প্রচেষ্টা। এক আশ্চর্য মুহূর্তে লেখক লেখেন—
"শিশু তো শুধু একজোড়া মায়াময় চোখ আর একটা সিঁদুরের টিপ-কেই 'মা' বলে জানে। মাকে সম্পূর্ণ দেখতে হলে মায়ের কোল থেকে নামতে হয়।"
এই ‘নামা’ মানে দেশ থেকে সরে গিয়ে, দূর থেকে তাকিয়ে সেই ভালোবাসার গভীরতাকে উপলব্ধি করা। কেমন করে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে, ধর্মে, ভাষায় জন্মানো মানুষেরা যুগে যুগে আমাদের দিশা দেখিয়েছে—সেই বর্ণনাগুলোতে ধরা পড়ে সময়ের এক আশ্চর্য চলচ্ছবি। নেপালের কুশীনগর থেকে নবদ্বীপ, মুসলিম জোলার ঘর থেকে ব্রাহ্মণ বীরসিংহ—এই দেশ বারবার আলো পেয়েছে নানা দিক থেকে, নানা রূপে।
বইটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক? এর অলৌকিক সাদাসিধে সৌন্দর্য। বাঁদিকে ছবি, ডানদিকে একটি ছোট গল্প বা ভাবনার পর্ব—কোনোটা নিঃসৃত বেদনা থেকে, কোনোটা হাস্যরসে মোড়া, তো কোনোটা অতল আশাবাদে গাঁথা। প্রতিটি পর্ব নিজস্ব এক সূক্ষ্ম দার্শনিকতা বহন করে। আর পর্বশেষে যে লাইনটি থাকে—তা যেন পাঠকের আত্মার পর্দায় শেষ ছোঁয়া, এক মৃদু অথচ টেকসই স্পর্শ।
রাজনৈতিক বিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িক বিভাজন, সামাজিক অস্থিরতা—এই সবকিছুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে এই বই যেন এক মানসিক আশ্রয়, এক হৃদয়গ্রাহী আশ্রম। “য ধারয়তি স ধর্মঃ”—এই মন্ত্রে বিশ্বাস রেখে লেখক পাঠককে শেখান, প্রকৃত ভারতবর্ষ সেই, যেখানে মানবিকতা ধর্মের ওপরে, বিবেচনা রাজনীতির ওপরে, এবং আত্মশুদ্ধি বাহ্যিক শক্তির চেয়ে বেশি জরুরি।
তাই এই বইয়ের রিভিউ লেখা—সে একপ্রকার বাতুলতা। যাকে বলে ভাষা হারানো বিস্ময়। এই বই নিছক পড়ে ফেলা যায় না, এই বই অনুভব করা যায়। একটু একটু করে, গভীরে ডুবে, নিজের ভেতরের একটা অন্য মানুষকে চেনা যায় এই বইয়ের পাতায় পাতায়।
আর যখন শেষ হয়ে যায় সেই ৯৮টি পর্ব… একটা টয়ট্রেন থেমে যাওয়ার মতো অনুভূতি হয়। আনন্দে ভাসা মনটা হঠাৎ করে নেমে আসে বাস্তবে। “আরও পড়তে ইচ্ছে করছে”—এই দুঃখটাই বুঝিয়ে দেয়, বইটি পাঠককে ঠিক কতটা ছুঁয়ে গেছে।
শেষ কথা:
এই বই “হীরক দেশের রাজা”-র নয়—এটি “হৃদয়ের দেশ ভারতবর্ষ”-এর এক প্রকৃত রাজপুরুষের মহাযজ্ঞ। তাঁর কলম কেবল ইতিহাসের ধুলোমলিন খোলস ছাড়িয়ে গেছে না—সে আঁকেছে এক হৃদয়ের মানচিত্র, যেখানে দেশ মানে শুধু ভূখণ্ড নয়, মানে অনুভব, মানে আত্মীয়তা, মানে অন্তরঙ্গতা। রাজা ভট্টাচার্যের ভারতবর্ষ কোনো সাধারণ পাঠ্য নয়—এ এক সাধনা, এক অভ্যন্তরীণ অন্বেষণ।
এই বই পড়ার জন্য নয়, ধারণ করার জন্য। এটি শুধু জ্ঞানের নয়—ভালোবাসার পাঠ।
নিজেকে ভালোবাসার, নিজের দেশকে বুঝে ভালোবাসার সাহস শেখায় এই বই।
এটি হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের, ভারতবর্ষের সঙ্গে ভারতবাসীর নতুন করে চেনা—নতুন করে জোড়া লাগানোর এক আশ্চর্য প্রয়াস।
কি অপূর্ব অসাধারণ উপন্যাস। টুকরো টুকরো ঘটনা জুড়ে গাঁথা এক সুবৃহৎ মালা যেন। যার মধ্যেই ফুটে উঠেছে আমাদের দেশ ভারতবর্ষ। "বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য" এই শব্দ গুচ্ছের অনবদ্য উদাহরণ এই বই। এর চরিত্ররা সবাই বাস্তব, আমাদের আশেপাশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। লেখকের তীক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ও গভীর অনুধাবন ক্ষমতা তাঁদের পৃথকভাবে পেশ করে পাঠকের কাছে। এখানেই একজন প্রকৃত সাহিত্যিক ও সাধারণ পাঠকের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়ে যায়। আমরাও জীবনের বিভিন্ন সময়ে এই ধরণের বহু ছোট বড় ঘটনার সাক্ষী হই, কিন্তু তাকে/ তাদেরকে লিপিবদ্ধ করার ক্ষমতা আমাদের থাকেনা। এখানেই এই বই ও লেখক রাজাবাবু স্যারের সার্থকতা। এই বই মন কেমন করা বই, এই বই মন খারাপের বই, এই বই হাসি ও কান্নার বই, এই বই ভালোলাগার ও ভালবাসার বই, এই বই গভীরভাবে মানুষকে চেনার ও জানার বই, এই বই অনুভবের ও উপলব্ধির বই, এই বই নিজেকে আরও একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করানোর বই। ধন্যবাদ স্যার খণ্ডচিত্রে নিজের দেশকে চেনানোর জন্য, যা আমরা হয়ত আগে কখনও চেনার চেষ্টাও করিনি। শুভেচ্ছা ও শুভকামনা।
A modern day's journal consolidating the things that make a country incredible. Filled with short experiences with a heartstrings shaped like morals of those stories - Bharotborshow is a triumph, a true winner of freeflowing literature.
#ভারতবর্ষ লেখক ~ রাজা ভট্টাচার্য প্রকাশক ~ বুক ফার্ম
লেখকের ফেসবুক পেজের টুকরো টুকরো লেখার সংকলন এই বই। পাঠকদের ভূয়সী প্রশংসা আর রিভিউ দেখে এই বই কিনলাম, কিন্তু মনে হল লেখকের "চলাচল" আর "প্রিন্স দ্বারকানাথ"-এর আগে এই বই পড়লে হয়তো আরও বেশি ভালো লাগত।
বইয়ের কোয়ালিটি আর ডিজাইন খুব ইউনিক। এক একটা পাতা যেন নর্মাল পেপারব্যাক বইয়ের কভার। বাঁদিকের পাতায় স্থিরচিত্র, আর ডানদিকের পাতায় একটা করে পর্ব যেগুলো সেই পাতাতেই শেষ। ভারতবর্ষকে এক অন্যরূপে চিনতে পারেন এই বই পড়লে। ছোট ছোট ঘটনা পড়ার পর দু মিনিট চুপ করে ভাবতে ইচ্ছে করে। আমার দেশের সবকিছুই খারাপ - এই ধারনা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলে এই বই অবশ্যই পড়বেন। লেখকের লেখনী নিয়ে কিছুই বলার নেই, অসাধারণ।
অদ্ভুত সুন্দর একটা অভিজ্ঞতা। লেখক খুব যত্ন করে , আন্তরিক ভাবে গল্পগুলি কে সাজিয়েছেন বা বলা ভালো উপলব্ধি করেছেন।আমাদের দেশের একটা অন্যরকম ইতিবাচক চিত্র এই বইতে আপনারা পাবেন। লেখনী নিয়ে বলার মতন ধৃষ্টতা আমার নেই,.অত্যন্ত সুখপাঠ্য বই। গল্প গুলো পড়ে আপনার মনে হবে যেন আপনার সামনে ঘটনাটা ঘটছে। আপনার ভাবনা বা চেতনা কে নাড়া দিতে বাধ্য। গল্পগুলো পড়ে আপনি ভাববেন যে আপনি ওই জায়গায় থাকলে কি করতেন। শেষে বলি বই টা কিনে পড়ে ফেলুন ,ঠকবেন না।