মিনহাজুল আবেদীন নান্নু, আকরাম খান, আমিনুল ইসলাম বুলবুল, হাবিবুল বাশার, মোহাম্মদ রফিক, খালেদ মাসুদ পাইলট, মোহাম্মদ আশরাফুল, মাশরাফি বিন মুর্তজা, মুশফিকুর রহিম, সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল। ওঁরা এগারোজন বাংলাদেশের ক্রিকেটের একেকটি আলোচিত অধ্যায়। অনেক কীর্তির নায়কও। মাঠের ২২ গজে তাঁদের সেসব কীর্তিগাথা গড়ে দিয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ইতিহাসও। সেসব হয়তো অনেকেরই জানা। কিন্তু সেসব কীর্তির আগে-পরেও তো লুকিয়ে কত গল্প! আর দশজনের মতো তাঁদেরকেও ছুঁয়ে যাওয়া অভিমান-দুঃখ-বঞ্চনার অনুভূতির সঙ্গেই-বা কতটুকু পরিচয় শুধুই মাঠের দর্শকের! লেখক তাঁর প্রায় তিন দশকের সাংবাদিকতা জীবনে মাঠে ও মাঠের বাইরে খুব কাছ থেকে দেখেছেন এই এগারোজনকে। কখনো সঙ্গী হয়েছেন তাঁদের আনন্দের। কখনো-বা সাক্ষী তাঁদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণের। সেই অন্তরঙ্গ মুহূর্তগুলোই জীবন্ত হয়ে উঠেছে লেখকের সাবলীল বর্ণনায়। উন্মোচিত হয়েছে অনেক অজানা অধ্যায়ও। চেনা তারকারাই দেখা দিয়েছেন নতুন আলোয়।
উৎপল শুভ্রের জন্ম ২৫ পৌষ ১৩৭৩, নেত্রকোনায় মামাবাড়িতে। পুরকৌশলে স্নাতক ক্রীড়া-সাংবাদিকতায় এসেছিলেন নিছকই শখে। সেই শখই পেশা হয়ে গেছে দুই যুগেরও বেশি। শুধু একটা জিনিস একদমই বদলায়নি। শুরুর সেই মুগ্ধতার চোখেই এখনো আবিষ্ট খেলার নেশায়। সাহিত্যের নিবিষ্ট পাঠক, লেখাতেও তার ছাপ খুঁজে পান পাঠকেরা। এক শ ছুঁইছুঁই টেস্ট ম্যাচ ছাড়াও কাভার করেছেন ক্রিকেট ও ফুটবল বিশ্বকাপ এবং অলিম্পিক গেমসের মতো বড় আসর। অসংখ্য লেখা প্রকাশিত হয়েছে বিদেশের নামী পত্রিকা ও ওয়েবসাইটে। প্রথম আলোর ক্রীড়া সম্পাদক পদে কাজ করছেন দীর্ঘদিন। ১৯৯৮ সাল থেকে ‘ক্রিকেটের বাইবেল’ বলে পরিচিত উইজডেন ক্রিকেটার্স অ্যালম্যানাক-এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি।
প্রায় চার বছর ধরে একটা ক্রিকেট ম্যাচও আমি পুরোটা দেখিনি। একটা সময় দেখতাম। শুধু দেখতাম না, বাংলাদেশের স্কোরকার্ড গুলো ডায়েরিতে লিখে রাখতাম, পেপার থেকে সাকিব-তামিম-মুশফিক-মাহমুদুল্লাহ-মাশরাফি দের ছবি কেটে ভাতের আঠা দিয়ে দেওয়ালে লাগিয়ে রাখতাম। ইশশ.. কি সুন্দরই না ছিলো সেই দিনগুলো। একটা ম্যাচ জিতলেই যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়ে যেতাম। সত্যি তখন ক্রিকেট এক আবেগের নামই ছিলো। বিভিন্ন কারনে ক্রিকেটের সাথে সম্পর্ক আগের মতো না থাকলেও ক্রিকেট আমার কাছে নির্মল সুন্দর কিছু সময়ের প্রতিশব্দ! . সময়টা তখন ২০১১-১২। আমার ভাইয়ের ঘরে দেখতাম সাকিব আল হাসানের একটা পোষ্টার এবং সেই পোষ্টারে ফুলের মালা। তাছাড়া আরো বিভিন্ন পোষ্টার, ফিক্সারে ঢেকে থাকত ঘরের দেওয়াল। তাতে অবশ্য আমার অবদানও ছিল বেশ খানিকটা। আমাদের বাসায় তখন কোন টিভি ছিল না। আমার ভাই সহ তার আরো কিছু বন্ধুবান্ধব মিলে পাশের বাসা থেকে শুরু করে বেশ অনেকটা দূরের চায়ের দোকানে যেত খেলা দেখতে। . সেইসব স্মৃতির প্রতি একটু খানি সন্মান দেখানোর জন্য পড়ছিলাম ঊৎপল শুভ’র এগারো। বাংলাদেশ ক্রিকেটের ১১ জন লেজেন্ড কে নিয়ে এই বই।মিনহাজুল আবেদীন, আমিনুল ইসলাম, আকরাম খান, হাবিবুল বাশার, মোহাম্মাদ রফিক, খালেদ মাসুদ, মোহাম্মাদ আশ্রাফুল, মাশরাফি বিন মুর্তজা, মুশফিকুর রহিম,সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, এই ১১ জনকেই বেছে নিয়েছেন লেখক।নব্বই দশকের ম্যাচগুলো কথা পড়ার সময় লেখকের প্রবল আবেগ বেশ বুঝতে পারছিলাম। শুরুর দিকের কীর্তিগাথা গুলো নিয়ে বেশ গর্বও করেছেন লেখক। সাকিব তামিম দের উপাখ্যান তো আমার নিজের চোখে দেখা। লেখার সাথে নিজের অভিজ্ঞতা গুলোকে মিলিয়ে আবার আগের সেই অনুভূতে হাতড়ে বেড়াচ্ছিলাম। তবে আমার কাছে সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে ড্রেসিং রুম এবং মাঠের বাইরের টুকরো টুকরো গল্পগলো। পড়তে পড়তে স্বাদ পেয়েছি আগের সেই স্বর্নালী মূহুর্তগুলোর। আবার শিউরে উঠেছি বাংলাদেশ ক্রিকেটের অন্ধকার কানাগলির সন্ধান পেয়ে, সত্যিই কি সম্ভব? কিছুতেই তো বিশ্বাস হতে চায় না!! . আয়ারল্যান্ডের সাথে ওডিয়াই ম্যাচ হচ্ছে এখন, গত টি-টোয়েন্টি সিরিজে ইংল্যান্ড তো শ্বেত ধোলাই হয়েই ফিরে গেছে ।নিজের মধ্যে আবার যেন খুজে পাচ্ছি সেই আগের উন্মাদনা। শেষ করতে চাই সাকিবের সেই স্বপ্নটা দিয়েই, বিশ্বকাপের ফাইনালে সাকিব ম্যান অফ দ্যা ম্যাচ আর বিজয়ী দল বাংলাদেশ। কবে পূরণ হবে সেই স্বপ্ন? সাকিব বলেছিলেন ২০১৫, আট বছর পরে কি সেই স্বপ্ন পূরন হবে? আমার তো মনে হচ্ছে অবশ্যই হবে!!
আপনি যদি ক্রিকেট ভালবাসেন, আপনার এই বই ভালো লাগবে। আপনি যদি বই পড়তে ভালবাসেন, আপনার এই বই ভালো লাগবে। আর আপনি যদি দুটোই ভালবাসেন? তাহলেই হয়েছে! বই না, এ মুজতবা আলীর রসগোল্লা হয়ে উঠবে আপনার কাছে!!
গতকদিন (যখন এ বইটা পড়ি, ২০১৯) হল প্রবল জ্বর। এখন কিছুটা কম, মাথা তুলতে পারি, আর এ অবস্থায় এমন কোন বইই দরকার ছিল! দেশের সবচাইতে আলোচিত, সমালোচিত, জনপ্রিয় ১১ জন (ছবির চারজন ছাড়াও মিনহাজুল আবেদীন নান্নু, আমিনুল ইসলাম বুলবুল, আকরাম খান, হাবিবুল বাশার সুমন, মোহাম্মদ রফিক, খালেদ মাসুদ পাইলট, মোহাম্মদ আশরাফুল) ক্রিকেটারদের নিয়ে কাইন্ড অফ লেখকের স্মৃতি রোমন্থন । তবে ৩০ বছরেরও বেশি ক্রিকেটের সাথে যুক্ত থাকায় এত এত সব পেছনের কাহিনী, ঝুটঝামেলা, আনন্দ বেদনা, হাসি কান্নার গল্প উঠে এসেছে যে দেশের ক্রিকেট এবং বই পড়তে ভালবাসে এমন যে কারো জন্য এটা যে অবশ্যপাঠ্য রসগোল্লা! আর উৎপল শুভ্রের লেখনীর কারণে তা হয়েছে আরও অনেক বেশি উপভোগ্য।
বইয়ে যে ১১ জনকে ঠাই দেয়া হয়েছে লেখকের ভাষায় - "সেরা এগারো বলছি না, প্রিয় এগারোও নয়। তাহলে মাহমুদুল্লাহ অবশ্যই থাকতেন।" - "এই বই যত না ওই এগারোজনের, তারচেয়ে বেশি আমার। তাদের নিয়েই লেখা কিন্তু তাতে আমি নৈর্ব্যক্তিক বিশ্লেষক হতে চাইনি। তাদের নিজ নিজ আলোতেই আলোকিত হয়েছেন তারা।"
এই এগারোজনকে নিয়ে বিভিন্ন ঘটনা, বিভিন্ন কাহিনী নিজের প্রাঞ্জল ভাষায় বর্ণনা করে গিয়েছেন শুভ্রদা। আপনি হয়ত কোনটার সাথে একমত হবেন, কোনটার সাথে দ্বিমত, কোনটা হয়ত আপনাকে জোগাবে হাসির খোরাক আর কোনটা ঝোলাবে আপনার চোয়াল বাট ওয়ান থিং ইজ ফর সিউর, বইটা আপনার ভালো লাগবেই!
শ্রদ্ধেয় ক্রীড়া সাংবাদিক জালাল আহমেদ চৌধুরী আমার ফেসবুকের ফ্রেন্ডলিস্টে আছেন। এই বই নিয়ে আমার ওয়ালে করা এক পোস্টে উনি আমাকে অবাক করে দিয়ে কমেন্ট করেন। তার সেই মন্তব্যের সূত্র ধরেই বলতে হয়, এই বইয়ের লেখাগুলো আপনার ক্লান্তি দূর করবে, যেমন করেছিল সেসময় ৭-৮দিন ধরে টাইফয়েডের সাথে যুদ্ধ করতে থাকা আমার!
বাংলাদেশের এগারো ক্রিকেটার নিয়ে সুন্দর একটা বই।যারা ক্রিকেটের খোঁজ খবর রাখেন তাদের কাছে অমৃতের মত একটা বই।বিভিন্ন অজানা জিনিস জানতে পারবেন এগারো জনের।লেখার স্টাইল টাও অনবদ্য।
'আমাদের ১১ জনের ভালো-মন্দ মিলিয়ে এই বই বাংলাদেশের ক্রিকেটের এক প্রামাণ্য দলিল। বাংলাদেশের ক্রিকেটের গত প্রায় তিন দশককে এক মলাটে আনতে এর চেয়ে বেশি কিছু বোধ হয় দরকার পড়ে না। বাংলাদেশের ক্রিকেটকে জানতে হলে বইটি না পড়ে উপায় নেই। '
আমার মতে সেরা অলরাউন্ডার এর মতই বইটির সেরা রিভিউদাতা ও সাকিব আল হাসান।
নান্নু, বুলবুল, আকরাম, বাশার, রফিক, মাসুদ, বিশেষত আশরাফুল এর অংশটুকু মাসখানেক আগে পড়ে এত ভাল লেগেছিল, ঠিক করেছিলাম বিশেষ কোনো দিনে বাকি অংশ পড়ে শেষ করব।
আজ ঈদ এর দিনে মাশরাফি, মুশফিক, সাকিব, তামিম এর অংশটুকু পড়ে শেষ করলাম।
আমি একটি বাক্যেও খুজে পাইনি যেখানে অতিশয়োক্তি করা হয়েছে বলে মনে হয়েছে,যেটা বাংলাদেশে জনপ্রিয় কিছু ক্রিকেট বিষয়ক বই পড়ে মনে হয়েছিল।
নির্দ্বিধায় বলা যায় 'এগারো' এখন অব্দি বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে লেখা সেরা বই। এবং এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে সাকিব আল হাসান যেমন আপনার ভাষায়, 'হি ইজ নট ইয়োর টিপিকাল...ইয়ার ওল্ড বাংলাদেশি বয়', আপনিও তেমনি ক্রিড়া সাংবাদিকতায়, 'উৎপল শুভ্র ইজ নট ইয়োর টিপিকাল... ইয়ার ওল্ড বাংলাদেশি স্পোর্টস জার্নালিস্ট'!