উনিশশ একাত্তর সালে এদেশের হিন্দু জনগোষ্ঠী বিশেষভাবে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল। গণহত্যার মুখে শরণার্থী হিসেবে যে লক্ষ লক্ষ মানুষ ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন, তাদের বড় অংশটিই ছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী। দেশের মাঝে যারা আটকা পড়েছিলেন, বা থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন, তাদেরও হত্যা, ধর্ষণ, আঘাত, লুটতরাজ এবং বন্দিত্বসহ নানা রকম নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। একাত্তরে হিন্দু জনগোষ্ঠীকে যে নরক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে, তার একটা প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র পাঠকদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে হিন্দু জনগোষ্ঠীর একাত্তর গ্রন্থে।
পাকিস্তানের কাছে হিন্দু জনগোষ্ঠী ছিল ‘ভারতীয়’। তাই হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর আক্রমণের ধরন এবং মাত্রার তীব্রতার পেছনে কাজ করেছিল পাকিস্তানকে নিরাপদ করার বাসনা। একাত্তর সালে হিন্দু জনগোষ্ঠী কেন বিশেষভাবে হানাদার বাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হলো, তার সংক্ষিপ্ত একটি রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পটভূমি আফসান চৌধুরী তার ভূমিকাতে প্রদান করেছেন।
শরণার্থী শিবিরে দিন কাটানো, ধর্ষণের শিকার কিংবা প্রিয়জনকে নিহত হতে দেখা, ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালন করতে না পারা হিন্দু জনগোষ্ঠীর একাত্তর-এর এই বিবরণ পুরোটাই কেবল নৃশংসতা আর নিষ্ঠুরতার শিকার হবার বিবরণ নয়। এখানে আছে হিন্দু-মুসলমান সহৃদয়তার, ঝুঁকি নিয়ে প্রতিবেশীকে রক্ষার অজস্র সাক্ষ্য, আছে প্রতিরোধ এবং সহমর্মিতার গল্পও।
হিন্দুদের একাত্তর মূলত মাঠ পর্যায়ের গবেষণার ফল। নির্যাতিত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে এই স্মৃতিগুলোকে বর্তমান গ্রন্থে ধরে রাখা হয়েছে। এছাড়া অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে অন্যত্র প্রকাশিত কিছু রচনা।
গ্রাম ও শহরে একাত্তরের চিত্র আরও পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বুঝতে আফসান চৌধুরীর দীর্ঘ জীবনের গবেষণার আর একটি অর্জন হিন্দু জনগোষ্ঠীর একাত্তর; এর আগে ইউপিএল প্রকাশ করেছে তার গ্রামের একাত্তর (ঢাকা: ইউপিএল, ২০১৯)। একাত্তর সালের গ্রাম ও শহরের নানা পেশা ও শ্রেণির হিন্দু জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতার এই বিবরণ মুক্তিযুদ্ধের চিত্রটিকে আরেকটু সম্পূর্ণরূপে উপলদ্ধি করতে পাঠককে সহায়তা করবে।
Afsan Chowdhury is a Bangladeshi liberation war researcher, columnist and journalist. He received Bangla Academy Award in the year 2018 for his contribution to the liberation war literature.
Chowdhury was born on 16 February 1952 in Dhaka. After completing his higher education from the Department of History in Dhaka University, he started his career in journalism. During his career as a journalist, he served as an editor for Dhaka Courier, contributed to The Daily Star and also produced a number of BBC World Service series. He was also one of the founder Promoter of United News of Bangladesh, one of the country's leading news agencies. He is a teacher of BRAC University and runs the Diversity Studies Cluster there.
৩.৫/৫ ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানিদের ঢাকায় মধ্যরাতে সশস্ত্র আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু (শাঁখারীবাজার, জগন্নাথ হল ইত্যাদি)-র দিকে তাকালেই বোঝা যায় এদের অন্যতম টার্গেট ছিলো হিন্দু জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশের মুসলমানরা বিশুদ্ধ মুসলমান না, হিন্দুদের দ্বারা কলুষিত এবং হিন্দুরাষ্ট্র ভারতের চক্রান্তে পূর্ববঙ্গ পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চাইছে, "গণ্ডগোলের জন্য হিন্দুরাই দায়ী" -এমন একটা বয়ান জোরালোভাবে চালু করে এদেশে গণহত্যা ও আক্রমণের বৈধতা তৈরি করেছিলো পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। ফলত তাদের মূল আক্রোশে পড়েছিলো বাংলাদেশের সাধারণ নিরীহ হিন্দুরা। পুরো একাত্তর জুড়ে হিন্দুদের পলায়ন, শরণার্থী হওয়া, লুকিয়ে থাকা, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, তাদের ওপর হওয়া অত্যাচার, ধর্ষণ, জোর করে ধর্মান্তরিত করা তথা সার্বিক যাপিত জীবনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে বইতে। ভুক্তভোগী মানুষদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে বিভিন্ন ঘটনা আলোচিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অনেক বইয়ের সরল বয়ানের বাইরে আমরা জটিল ও ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ সময়ের চিত্র পাই এ বইতে। সাধারণ মানুষের অসাম্প্রদায়িক অবস্থান ও নিরন্তর প্রচেষ্টা সে সময় অসহায় মানুষদের বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা দিয়েছে। বিচ্ছিন্ন কিছু চিত্র - কোনো রাজাকারের মা লুকিয়ে বাঁচতে সাহায্য করেছে কাউকে , ক্যাম্পে ধরে নিয়ে গেলে ঘুষ দিয়ে ছাড়ানোর জন্য দেনদরবার চালানোর জন্য গেছে ভাই, রাজাকার হলে এলাকার মানুষ তার সাথে ঘেন্নায় কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে ইত্যাদি। প্রায় দুই যুগের মাঠ গবেষণার ফসল, সে হিসেবে বইটা আরেকটু গোছালো হতে পারতো, যদিও এটা নিতান্ত ব্যক্তিগত অভিমত।