এই বইটির কিছু বৈশিষ্ট আছে যা অনেক সীরাত গ্রন্থে পাওয়া যায়না। সীরাত গ্রন্থ গুলো সাধারণত সরাসরি আমাদের নবীর জন্ম দিয়ে শুরু হয়না । শুরু হয়না তৎকালীন বিশ্ব পরিস্থিতি, আরবের ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতি, আব্দুল মুত্তালিব / হস্তী বাহিনী ইত্যাদির বর্ণনা দিয়ে। সীরাত গ্রন্থের এই অংশ টুকু বেশ ক্লান্তিকর হয়, কারণ নবীজির জন্ম ও জীবনের প্রতিই বেশি আগ্রহ থাকে । লেখক এই বইয়ের প্রায় ২০% মানে ১০০ পৃষ্টার মতো এই বিষয়েই বরাদ্দ করেছেন, অথচ এই অংশ মোটেই ক্লান্তিকর হয়নি। উনি আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিসসালামের জন্মের আগের পৃথিবী ও পটভূমি খুব সুন্দর ও বিস্তারিত ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যাতে আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিসসালামের জীবনীর প্রকৃত সমাদর করতে পারি। হিজরতের বর্ণনার সময় উনি ইয়াসরিব, আওস ও খাজরাজ গোত্রের ইতিহাস বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। এরপর পারস্য/রোম/মিশর/আবিসিনিয়া ইত্যাদির শাসকদের কাছে চিঠি পাঠানোর ঘটনা বর্ণনা করার সময় উনি ঐসব রাজত্বেরও বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। এই বর্ণনা গুলি সীরাত কে বোঝার জন্য খুবই সহজ করেছে । মনে রাখতে হবে বইয়ের লেখক একজন আলিম ও এবং একজন ঐতিহাসিক ও বটে ।
নবী করীম (সা.)-এর সম্পর্কে সহজবোধ্য, নাতিদীর্ঘ এবং পরিপূর্ণভাবে জানার জন্য এই সীরাত গ্ৰন্থটি অতুলনীয়। পুরো বইটিই অনেক বেশি তথ্যসমৃদ্ধ; আর তথ্য-সমাবেশ এত সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো যে– এর স্বকীয়তা আলাদা করেই চোখে পড়ে। বইয়ের শুরুটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও আগ্ৰহব্যঞ্জক করে লেখা হয়েছে। পরিপূর্ণ ইসলাম অবতীর্ণের পূর্বে পৃথিবীর সকল স্থানে কোন কোন ধর্ম বিরাজ করছিল, কেন জাহিলী যুগে মনুষ্যত্বের বিলুপ্তি ঘটছিল, কীভাবে লোকেরা অন্ধকার থেকে ঘোর অন্ধকার নিমজ্জিত হচ্ছিল– এ সকল অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় বর্ণিত।
অতঃপর জাতির আলোকবর্তিকা হয়ে আমাদের রাসূলে পাক (দ.) এর জন্ম থেকে তাঁর জীবনের সমস্ত বিষয় সংক্ষেপে বলে যাওয়া হয়েছে। তবে সংক্ষিপ্ত হলেও নবীজির তেষট্টি বছরের ঘটনাবহুল জীবন বিশদভাবে উঠে এসেছে। বিশেষত ইসলামী দাওয়াতের পন্থা এবং পত্রাবলী, বদর যুদ্ধ থেকে তাবুক যুদ্ধ পর্যন্ত, বিদায় হজ, ওফাত, ওফাত পরবর্তী সাহাবায়ে কিরামদের (রা.) প্রতিক্রিয়া– এই বিবরণগুলো হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।
▪️▪️▪️
সীরাত হলো এমন এক পূর্ণাঙ্গ গ্ৰন্থ, যেটি আল-কুরআনের পর রাসূল (সা.) সম্পর্কে জানার জন্য সর্বোৎকৃষ্ট গ্ৰন্থ। আর সেক্ষেত্রে তুলনামূলক সহজ রচনায় 'নবীয়ে রহমত (স.)' অনন্য। আল্লাহ সকল মুসলিমকেই জীবনে অন্তত একবার সীরাত পাঠ এবং তা উপলব্ধি করার তাওফীক দান করুন।
আলহামদুলিল্লাহ এই নিয়ে তিনটি সীরাত শেষ হল। সীরাত জানার আগ্রহ দিনকে দিন বেড়েই চলছে। খুব আগ্রহ নিয়ে সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী র. এর নবীয়ে রহমত ﷺ পড়া শুরু করি। নবীয়ে রহমত ﷺ সীরাত অন্যান্য সীরাত থেকে ব্যতিক্রম ধর্মীয় ছিল। ... সাইয়েদ নদভী সাহেব প্রথমেই নবী ﷺ এর জন্মের মুহূর্তে গোটা বিশ্বের পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন। কি পরিবেশে আল্লাহ্ পাক তাঁর প্রিয় হাবীবকে দুনিয়াতে পাঠালেন, তা বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। অন্ধকার যুগের বর্ণনা এনে দেখিয়েছেন তখনকার যুগের বিভিন্ন ধর্মের লোকেরা কেমন আকিদায় বিশ্বাসী ছিলেন। প্রাচ্যে, পাশ্চাত্য, ভারতবর্ষে কি রকম ধর্মের অন্ধকার অবস্থা ছিল তা সংক্ষেপে এনেছেন। এক্ষেত্রে অনেক ঐতিহাসিক ও প্রাচ্যবিদদের উদ্বৃতি দেয়া হয়েছে।এরপর জাযিরাতুল আরবে নবীর আবির্ভাবে বিভিন্ন কারণ উল্লেখ করা হয়েছে, যে কারণে আল্লাহ্ নবী ﷺ আরবে পাঠালেন। আরবের ইতিহাস, ভাষা ও সেখানকার লোকদের মাঝে যে বৈশিষ্ট্য ছিল, যা পরবর্তিতে নবুয়তের দ্যুতি ছড়াতে কাজে লেগেছে তা উল্লেখ করেছেন। এরপর নবী ﷺ এর আবির্ভাবের পূর্বে মক্কার অবস্থান, নবী ﷺ এর বংশের সাথে ইব্রাহীম(আ) এর বংশের যোগসূত্র দেখানো হয়েছে। আবরাহা বাদশার মক্কা আক্রমণ ও অলৌকিক পরাজয় ছিল বিরাট এক ঘটনার বিবরণ এসেছে।
এরপর নবী ﷺ এর জন্ম থেকে নবুয়ত লাভ করা পর্যন্ত ঘটনাগুলো পর্যায়ক্রমে সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে। এরপরই সেই শুভোক্ষণ যখন আল্লাহ্ পাক নবী ﷺ কে নবুয়ত দ্বারা সম্মানিত করলেন। এরপর প্রাথমিক অবস্থায় দাওয়াত এবং সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারীদের ঘটনা উল্লেখ হয়েছে।
দাওয়াত যখন ছড়াতে শুরু করলো কুরাঈশ ইসলাম বিরোধীদেরও আবির্ভাব হতে থাকলো। দিনকে দিন বিরোধীরা নবী ﷺ ও সাহাবীদের উপর অত্যাচার ও নিপীড়ন বাড়াতে থাকলো। একমসয় হিজরতের মহা ইবাদত শুরু হয়ে গেল। এখানে দাওয়াতের ক্ষেত্রে নবী ﷺ ও তাঁর সাহাবীদের ত্যাগ অত্যন্ত হৃদয় বিদারক ছিল।
প্রথমে লেখক মদীনার ভৌগলিক অবস্থা, সেখানকার পরিবেশ ও মানুষের বৈশিষ্ট্যগুলোকে নবুয়তের সংরক্ষণের জন্য সঠিক অবস্থানের কারণ দেখানো হয়েছে। মদীনায় হিজরতের পর পুরো পরিবেশই পাল্টে গেল। নতুন রাষ্ট্র গঠনে ও ইসলামের প্রচার, প্রসারে নবী ﷺ পূর্ণ মনোনিবেশ করলেন। এরই ধারায় একে একে সব যুদ্ধ সংগঠিত হয়, যেমন- বদর যুদ্ধ, উহুদ যুদ্ধ, খন্দকের যুদ্ধ ইত্যাদি। প্রত্যেক যুদ্ধ মুসলমানদের তাদের করণীয়গুলোকে যেন দেখিয়ে দেয়। অসংখ্য শিক্ষণীয় ব্যাপার ও ইসলামের জন্য সাহাবীদের ভালবাসার অগণিত ঘটনা ফুটে উঠেছে।
এরপর একসময় হুদাইবিয়ার সন্ধি এবং এর ফল উঠে এসেছে। এসময় নবী ﷺ কতই না সাহসিকতার সাথে দুনিয়ার তৎকালীন সম্রাটদের কাছল ইসলামের দাওয়াত পৌছেছেন তার বর্ণনা ও প্রেরিত চিঠিগুলো সংক্ষেপে দেয়া হয়েছে। এরপর খায়বরে ইহুদীদের পরাজয়, তাদের ষড়যন্ত্রের সত্যতা ইহুদী পন্ডিতদের লেখা থেকেই দলিল দেয়া হয়েছে।
এরপর সেই কাঙ্খিত বিজয় যার প্রতিশ্রুতি আল্লাহ্ পাক নবী ﷺ কে দিয়েছিলেন, সেই মক্কা বিজয় হয়। ইসলাম তাঁর অবস্থানকে বিশ্বের দরবারে মেলে ধরে। এরপর হুনায়ন, তায়েফ ও তাবুক যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর বিদায় হজ্জ পালন হয় এবং নবুয়তের হক আদায় সম্পূর্ণতার ঘোষনা হয়।
এরপরই নবী ﷺ এর ইন্তেকাল হয়। শেষে নবী ﷺ এর স্ত্রী-সন্তানদের সংক্ষেপে বর্ণনা আসে, নবীর আখলাক ও শামায়েল তথা নবী ﷺ এর জীবনের প্রভাব আমাদের জীবনে কিভাবে পরে বা কি শিক্ষা নিয়ে এসেছে, সেসব বৈশিষ্ট্য আনা হয়েছে।
সবশেষে লেখকের এই সীরাত রচনায় সহায়ক গ্রন্থ সমূহের বিশাল তালিকা দেয়া হয়েছে।
যথেষ্ট গবেষণা ও পরিশ্রমের ফসল এই গ্রন্থখানা। অজস্র তথ্যে বিপুল এক সমাহার হয়েছে। তবে অনেক জায়গাতে ঘটনাসমূহ খুব সংক্ষেপে বলে যাওয়া হয়েছে। প্রাচ্যবিদদের আপত্তির অনেক জায়গার জবাব দেয়া হয়েছে। সীরাতের অন্যান্য গ্রন্থ থাকলেও সাইয়েদ নদভী সাহেবের গ্রন্থের স্বকীয়তা বজায় আছেই এটাতে। গবেষণার দিককে বাস্তব সম্মত ও বিভিন্ন দিক থেকে তুলে ধরা হয়েছে। লেখক যেভাবে কোন ঘটনার পিছনে আল্লাহ্ পাকের হিকমতের ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা আসলেই ভাবিয়ে তোলে, যে মহান রাব্বুল আলামীন কত জ্ঞানের অধিকারী ও কিভাবে তিনি তাঁর কাজের আঞ্জাম দিয়ে থাকেন। পাঠকের অবশ্যই চিন্তার জগতে নতুন দরজা খুলবে এই গ্রন্থ অধ্যয়নে। ... প্রকাশক মাকতাবাতুল হেরা। পৃষ্ঠা প্রায় ৫২০। অনুবাদ করেন আবু সাঈদ ওমর রহ.।