আমিই বিখ্যাত গালিব, আর কিছু জিজ্ঞাসার প্রয়োজন নেই
মির্জা গালিবের সমগ্র কাব্য থেকে বাছাই করা কবিতার সংকলন। প্রায় সাড়ে পাঁচশত উর্দু, সেই সঙ্গে প্রতিনিধিত্বশীল ফারসি কবিতা আছে। উর্দু ও ফারসি ভাষা থেকে অনূদিত।
Mirza Ghalib (Urdu: مرزا غالب) born Mirza Asadullah Beg Khan (Urdu/Persian: مرزا اسد اللہ بیگ خان) was a classical Urdu and Persian poet from India during British colonial rule. He used as his pen-name Ghalib (Urdu/Persian: غالب, ġhālib means dominant) and Asad (Urdu/Persian: اسد, Asad means lion. His honour title was Dabir-ul-Mulk, Najm-ud-Daula.
During his lifetime the Mughals were eclipsed and finally deposed by the British following the defeat of the Indian Revolt of 1857, events that he wrote of. Most notably, he wrote several ghazals during his life, which have since been interpreted and sung in many different ways by different people. In South Asia, he is considered to be one of the most popular and influential poets of the Urdu language. Ghalib today remains popular not only in India and Pakistan but also amongst diaspora communities around the world.
Mirza Ghalib is also known as the last great poet of the Mughal Era.
‘আসমা সে আতে হুয়ে পুছতে হ্যায় হর বালা কে গালিব কা ঘর হ্যায় কিধার’
নিজের জীবনকে কৌতুক ভরা চোখে দেখতে পারা চাট্টিখানি কথা নয়। তাও যেমন তেমন লোক নয় সে, নামজাদা উর্দু কবি। যিনি উর্দু কবিতাকে সংস্কৃতির মান দিয়েছেন। নিয়ে গিয়েছেন অন্য এক উচ্চতায়। পুরো উর্দু কাব্যে তার মতো এত সুন্দর ঈর্ষা আর কেউ করতে পারে নি। চলতি কাব্যসংকলনে মাত্র ২৩৫ টি গজল থাকা সত্ত্বেও তিনিই উর্দু কাব্যের অধীশ্বর। তার কবিতার কৃতিত্ব যাচাই করতে স্পর্ধা দেখাতে নেই। কারণ মির্জা গালিব স্বয়ং নিজেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী।
‘মির্জা গালিবের গজল’ বইটি মূলত উর্দু ও ফারসি থেকে ভাষান্তর। জাভেদ হুসেনকে পুরোপুরি ভরসা করা যায় বইয়ের বিষয়বস্তু পাঠোদ্ধার করতে। সংক্ষিপ্ত ভূমিকা ছাড়া বইয়ে উর্দু এবং ফারসি গজল আলদা ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রতিটা গজলের যদি মর্মার্থ বিশ্লেষণ করা হতো, দারুণ হতো!
কবিতা টানা পড়ে শেষ করা কোন কাজের কথা না। অনেক বার অনেক কবিতা পড়েও রসাস্বাদন ঠিকমতো হয়না। তবুও সারা সকাল গালিব পড়ার কারণ অস্থির মনটাকে শান্ত করা। সে উদ্দেশ্য অনেকটাই সফল।
মনটন একদমই ভাল নাই। ভাল কথা মুখে বা মাথায় আসতেছেও না। জাভেদ হুসেন প্রিয় মানুষ। কিন্তু প্রিয় হইলেই মিঠা মিঠা কথাই খালি বলতে হবে এমন কোন চাপ নাই। খালি আপাতত বলে রাখি, গালিবের এমন কলকাত্তাই বাংলা অনুবাদ, খোদ কোলকাতাতেও হয়তো সম্ভব না। কিন্তু ঢাকাতে সম্ভব হচ্ছে। ঢাকাতে হয়তো আরও অনেকে আছেন যারা জাভেদ হুসেনের চেয়েও অনেক অনেক ভাল কলকাত্তাই বাংলা জানেন, ব্যবহার করেন, মানেন। কোলকাতার বাংলাকে খারাপ বা নিচু সাব্যস্ত করার জন্য 'কলকাত্তাই' বলছি না বরং ভাষার ধাঁচের, ভাষা চরিত্রের কথা বলছি মাত্র।
প্রথমেই বলে রাখা ভালো, আমি উর্দু/ফারসি বুঝি না(বইয়ে মূলত গালিবের উর্দু গজলগুলোকেই রাখা হয়েছে। তবে আলাদা একটি অংশে অল্প কিছু ফারসি গজলও রয়েছে) কাজেই অনুবাদ কতোটুকু সুষ্ঠু/যথার্থ হয়েছে তা নিয়ে বলতে পারবো না। তবে উর্দু শের/পঙক্তির আলাদা একটা মেজাজ আছে- আমার মনে হয় তার অনেকটুকুই পেয়েছি। আবারো বলে নিই, উর্দু ভাষা জানেন এমন কারোর আশার পারদ আরো চড়া থাকতেই পারে ফলে আশাভঙ্গেরও সমূহ কারণ থাকা অমূলক নয়।
এই বইকে কালেক্টিবল(collectible) বলা যায়। অনেকে পিডিএফ বা আরেকজন থেকে নিয়ে পড়তে চাইতে পারেন তবে আমার মনে হয় যেহেতু এক বসাতে পুরোটুকু গলাধঃকরণ করা গেলেও পুরোপুরি তার জারণ সম্ভব হবে না কাজেই রয়েসয়ে কিংবা অনেকদিন পর গালিবের বলা "ক্ষতের নিদান পেতে" চাইলে এক কপি কিনেই রাখতে পারেন।
অনুবাদক জাভেদ হুসেন আমার পছন্দের মানুষ। উর্দু, মার্ক্সিস্ট রাজনীতি ইত্যাদি নিয়ে তাঁর বিভিন্ন লেকচার ইউটিউবে শুনতে পাওয়া যায়; আমি সেসবের মুগ্ধ শ্রোতা- ক্যামন যেনো কবির মতো কথা বলেন, কবির মতো ভাবেন/ভাবতে চান। তাই বই কেনার সময় ধরে নিয়েছিলাম এখানেও তার সুরত কিছুটা ধরা পড়বে। হতাশ হই নি।
চমৎকার অনুবাদ, গালিবের গজল মাতৃভাষায় পড়ার পর তার হাহাকার গুলো নিজের ভিতরেও অনুভব করছি, হয়ত এ হাহাকার আমাদের মাঝে সবসময়েই ছিল, গালিব সেগুলোকে বের করে নিয়ে এসেছে।
“তুমি চলে গেছ, আমি কেমন আছি জানতে চেয়ো না, বরং দেখো—আমাকে ছেড়ে তোমার সামনে কত রঙ ঘটে।”
এই এক লাইনেই লুকিয়ে আছে মির্জা গালিবের সমস্ত প্রেম-বেদনার রস। তাঁর গজল পড়তে গিয়ে মনে হয়, হৃদয়ের প্রতিটি কোণ থেকে কেউ ফিসফিসিয়ে বলছে— প্রেম মানেই সুখ নয়, প্রেম মানেই কখনো শূন্য, কখনো ভাঙন, আবার কখনো অনন্ত আকুলতা।
এই বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টাতে উল্টাতে বারবার আমার মনে হয়েছে— গালিব যেন আমারই মনের গোপন কথাগুলো লিখে গেছেন। “হৃদয়ের হাল জানি না, তবে এটুকু বুঝি— তাকে বারবার খুঁজি, বারবার তুমি তাকে পাও।”
প্রেমিকের এ কেমন ভাগ্য! যাকে চাও, সে-ই কি না তোমার নাগালের বাইরে থেকে আরেকজনের ভুবনে আলো হয়ে থাকে।
গালিবের প্রেম ভয়হীন— “ভয় কিসের? আমি জামিন, তুমি এদিকে দেখো, দৃষ্টিতে নিহত করলে তার শাস্তি হয় না কোনো।” কিন্তু সেই প্রেম আবার নিজেই শেকল, যেখানে বন্দী হয়ে হৃদয় মুক্তি চাইতে চাইতে আরো গভীর অন্ধকারে তলিয়ে যায়।
কোথাও তিনি নিঃসঙ্গতার রূপকে মেনে নেন— “আমি তোমায় ভালোবাসি না! আচ্ছা নিঃসঙ্গতাই ভালো, আমার নিঃসঙ্গতা তোমার সুনাম আনে!”
কোথাও আবার প্রেমকে দেখান আত্মার উন্মাদনা হিসেবে— “যে প্রেম সর্বনাশ আনে, তাকে ছাড়া জীবনের ঔজ্জ্বল্য কোথায়!”
উর্দু গজলে যেমন আছে চোখভেজা আকুলতা— “তোমাকে দেখার কী অনন্ত তৃষ্ণা, এসে অনন্ত তা-ই দেখে যাও, আমার চোখের পলকের মালা থেকে ঝরে পড়ছে মুক্তো—দেখে যাও।” তেমনি ফারসি গজলে আছে এক অন্য রকম আহ্বান— “মিলন আর বিচ্ছেদের আনন্দ আলাদা রকম, শতবার ছেড়ে যেয়ো, সহস্রবার ফিরে এসো।”
বইটির প্রতিটি গজলই একেকটি প্রেমিক হৃদয়ের রক্তলেখা। কোথাও কান্না, কোথাও বিদ্রোহ, কোথাও আবার নীরব আত্মসমর্পণ।
পড়তে পড়তে আমার মনে হয়েছে— গালিবের কবিতা আসলে প্রেমের আয়না, যেখানে আমি নিজেকেই দেখি। কেননা এই আয়নায় শুধু প্রেম নয়, আছে অপেক্ষা, অপূর্ণতা আর অন্তহীন বেদনার সৌন্দর্য।
বলা হয় মোগল সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ দুটি দান — তাজমহল আর মির্জা গালিব। একজন কবি একা একটি ভাষার প্রতিনিধিত্ব করেছেন এমন এক বিরল উদাহরণ গালিব।উর্দু ও ফারসি ভাষায় কবিতা লিখেছেন। জীবদ্দশায় দুরূহ কবি বলে পরিচিত ছিলেন। যত সময় গেছে, তিনি তত উজ্জ্বল হয়ে উঠেছেন। গালিব��র কবিতার একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ইমেজের মধ্যে গতি প্রদান করা। যে ভাষার মধ্যে মহাকাব্য বা দীর্ঘ কাব্য লেখা হয়নি, সেই ভাষার কাব্যের গতিশীলতা পাওয়া যায় না।ফারসিতে মহাকাব্য আছে,দীর্ঘ কাব্য অতি সুলভ।উর্দুতে কারবালার ঘটনা নিয়ে দীর্ঘ কাব্য অতি জনপ্রিয়। এই দুই কাব্যের রেয়াজ উর্দু কাব্যে সবচাইতে সফলভাবে প্রয়োগ করে শ্রীবৃদ্ধি ঘটিয়েছেন মির্জা গালিব। রুমি, গালিব, মির, মনসুর হাল্লাল, ব্লজ পাসকেলের ভাবনাবলি এত সাবলীল ভাবে জাভেদ হুসেন ভাই অনুবাদ করেছেন যে মনেই হয় না ইরান,তুর্কি,পারস্য, আফগান,ফারসির কবিরা দূরের দেশের কেউ বরং মনে হয় এই বাংলার কবি।
'মির্জা গালিবের গজল' বইটিতে মির্জা গালিবের সমগ্র কাব্য থেকে বাছাই করা কবিতার সংকলন। প্রায় সাড়ে পাঁচশত উর্দু, সেই সঙ্গে প্রতিনিধিত্বশীল ফারসি কবিতা আছে। উর্দু ও ফারসি ভাষা থেকে অনূদিত হয়েচে 'প্রথমা প্রকাশনী' থেকে জাবেদ হুসেনের পরম যত্নে। সর্বশেষে গালিবের একটা চমৎকার লাইন বলি— 'গালিবে নামওয়ারম নাম ও নিশানম মাপরস' অর্থাৎ 'আমিই বিখ্যাত গালিব, আর কিছু জিজ্ঞাসার প্রয়োজন নেই।'
মির্জা গালিবের গজল, শায়েরী আকারে ছোট হলেও এর গভীরতা নির্ণয় কঠিন, প্রতিটি গজলের প্রেক্ষাপট আর ভাবার্থ আলাদা। এই বইটীর একটি অডিও সংস্করন পেলে খুব ভালো হতো কারন খালি হরফ দেখে উর্দু উচ্চারনগুলো সঠিকভাবে করা বেশ কঠিন-কিছু ক্ষেত্রে অসম্ভব। বইটির প্রতিটি গজল অনুভবের জন্য একটা বিশেষ অনুভবের প্রয়োজন পড়ে-এমন অনুভবের মনুষ্য আজকাল দুর্লভ। হয়তো এজন্যই শের-শায়েরী আর গজলের প্রসার আধুনিক হিন্দি গানের মতন হয় নি।