"ছোটোগল্প হচ্ছে প্রতীতি (Impression)-জাত একটি সংক্ষিপ্ত গদ্যকাহিনি যার একতম বক্তব্য কোনো ঘটনা বা কোনো পরিবেশ বা কোনো মানসিকতাকে অবলম্বন করে ঐক-সংকটের মধ্য দিয়ে সমগ্রতা লাভ করে।" (নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় রচিত 'সাহিত্যে ছোটোগল্প' থেকে উদ্ধৃত) কিংবদন্তি মাস্টারমশাই এই সংজ্ঞাটিতে অল্প কথায় অনেক কিছু বলে দিয়েছেন। তবে আমাদের মতো ব্যাকবেঞ্চারও বুঝতে পারে, মূলত তিনটি জিনিসের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপ করেছেন তিনি। সেগুলো হল: (ক) লেখাটির আকার সংক্ষিপ্ত হতে হবে; (খ) প্লটে যত রকমের অলি-গলিই আসুক না কেন, লেখনীতে যতই থাকুক উত্থান-পতনের অমসৃণ ভাব— গল্প চলবে মাত্র একটিই অভিমুখে; (গ) "একাঘ্নী বাণ"-এর মতো "পরিণামকে মর্মঘাতীরূপে বিদ্ধ করতে পারলেই তার কর্তব্য শেষ।" আলোচ্য ঝকঝকে বইটিতে স্থান পাওয়া একুশটি গল্প কি এই সংজ্ঞা অনুযায়ী উত্তীর্ণ হতে পেরেছে? আগে লিখি কী-কী গল্প আছে এই বইয়ে। ১. অযোধ্যাকাণ্ড ২. চরিতার্থ ৩. পদ ৪. বাঙ্ময় ৫. গঙ্গাবুড়ির গল্পসল্প ৬. কালচক্র ৭. তোমায় গান শোনাব... ৮. বিশ্বাস ৯. ভিক্ষা ১০. রান্নাবাটি ১১. রণ-রক্ত-সফলতা ১২. নারী ও হস্তিনী ১৩. ঘোড়া ১৪. আলোকথা ১৫. স্বাদ ১৬. সেতু ১৭. এক্সিস্টেনশিয়ালিজম বা ধুতির ইতিকথা ১৮. প্রাণের 'পরে ১৯. উড়ান ২০. শোক ২১. দ্রষ্টা ও স্রষ্টা এই লেখাগুলোর অধিকাংশই সেই বাঙালিদের নিয়ে যারা মধ্যবিত্ত, ডেইলি পাষণ্ডগিরি করে, ফেসবুকে গল্প পড়ে, খুব ছোটো-ছোটো চাওয়া-পাওয়া নিয়ে বাঁচে, অভিমান আর আক্রোশের মাঝে পেন্ডুলামের মতো দোলে আর ভাবে, "একবার যদি...!" তাদের গান, গল্প, কান্না আর বিশ্বাস খুব বিশ্বস্ততার সঙ্গে ধরা পড়েছে লেখাগুলোতে। মুশকিল হল, ফেসবুকে এমন লেখা আমরা অজস্র পড়ি। তাই সুলিখিত, পরিমিত, গঠনগতভাবে সমসত্ত্ব— এই তিন বিচারে আর পাঁচটা লেখার চেয়ে ঢের এগিয়ে থাকলেও এই গল্পগুলোকে ঠিক মর্মভেদী বলে মনে হয়নি। বরং ভিন্ন আঙ্গিকে হলেও 'শান্ত' এইরকম গল্পের চরিত্রদের নিয়ে আরও দাপুটে আখ্যান বলেছে আমাদের। কয়েকটি গল্প গড়ে উঠেছে চোখের কোণা দিয়ে দেখা আর ভুলে যাওয়া শ্রেণির মানুষজনকে নিয়ে। 'ভারতবর্ষ'-তে পড়া লেখাগুলোর মতো করেই এই গল্পগুলোর অভিঘাত অনেক বেশি গভীর হয়েছে। তবে তিনটি গল্প রয়ে গেল আমার মনে, চেতনায়, হয়তো আরও গভীরে। শোভন হয়েও গল্প কতটা নির্মম হতে পারে— এ-কথা তো আমরা নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ছোটোগল্প পড়ে বারবার বুঝেছি৷ মনে হল, যেন তাঁর উদ্দেশেই প্রণামী দিলেন আরেক মাস্টারমশাই তাঁর এই তিনটি গল্পে। কোন তিনটি গল্প? সেটা আপনাদেরই বুঝে নিতে হবে বইটা পড়ে। হয়তো আপনার বাছাই আলাদা হবে। হয়তো গোটা বইটা নিয়েই আপনার মূল্যায়ন হবে এক্কেবারে আলাদা। গল্পকথায় তো তেমনটাই হয়, তাই না?
গল্পকথা কল্প না : কথার শরীরে ক্ষত আর কল্পনার কারুকাজ
कथा संनादति हृदयं यया संनादति विश्वं तद्विश्वेन संनादति। — কালিদাস, কাব্যপ্রকাশ ("যে কাহিনি হৃদয়কে স্পন্দিত করে, সেই কাহিনিই বিশ্বে প্রতিধ্বনি তোলে।")
ছোটোগল্পের সংজ্ঞা নিয়ে যুগে যুগে আলোচনা হয়েছে, হবেও—এ এক অনন্ত কথোপকথন, যা সাহিত্যতত্ত্বের পরিসরে কখনও আবেগ, কখনও যুক্তি, কখনও গদ্যশিল্পের অভ্যন্তরীণ সংগীতের কথা তোলে। কিন্তু যত ব্যাখ্যা, যত বিশ্লেষণই আসুক না কেন, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের সংজ্ঞার মতো এত সংক্ষিপ্ত, এত গভীর, এত নির্মমভাবে নির্ভুল সংজ্ঞা আর দ্বিতীয়টি নেই।
তাঁর মতে, ছোটোগল্প হতে হবে সংক্ষিপ্ত, একনিষ্ঠ, এবং তার পরিণাম হতে হবে এমন যেন একটি ‘একাঘ্নী বাণ’—যা পাঠকের চৈতন্যে সোজা গিয়ে বিদ্ধ হয়। যেন একটি মুহূর্তের আলোড়নেই তৈরি হয় শিল্পের সম্পূর্ণতা।
এ যেন Edgar Allan Poe-র সেই অমোঘ দর্শনের প্রতিধ্বনি:
“A short story must have a single mood and every sentence must build towards it.”
Poe যেমন বলেছিলেন, গল্প যেন একটিমাত্র আবেগ তৈরি করে এবং প্রতিটি বাক্য যেন তার জন্যই কাজ করে—তেমনি গঙ্গোপাধ্যায়-তত্ত্বও ছোটোগল্পকে দেখতে চেয়েছেন ‘একনিষ্ঠ আঘাত’ হিসেবে, যেখানে সংক্ষিপ্ততার ভেতরেই নিহিত থাকে গভীর বিস্ফোরণ।
আসলে, ছোটোগল্প তার প্রকৃত অর্থে কখনও ঘটনার বিবরণ নয়; বরং তা একটি অনুরণনের মাধ্যম। একটি নিঃশব্দে ধরা পড়া প্রতীতি, যা পাঠকের ভেতরে ঢেউ তোলে। যেন Virginia Woolf-এর উক্তি মতো:
“It is not the thing itself but the thing as perceived, imagined, remembered, that makes the story.”
এই আলোকে দেখা যায়—ছোটোগল্পের পরিণতি কখনওই সরল থট-রেজোলিউশন নয়। বরং পাঠ শেষে পাঠকের ভেতর একটা ‘অতিথি অনুরণন’ থেকে যায়, এক ধরনের অসমাপ্ত পরিপূর্ণতা, যা পাঠকের ভাবনাকে না থেমে, বরং চলমান রাখে। ঠিক যেমন কবিতায় হয়, তেমনি।
T.S. Eliot-এর কথাও এখানে স্মরণীয়:
“Genuine poetry can communicate before it is understood.” ছোটোগল্পও অনেকটা তাই—সব ব্যাখ্যা শেষ হবার আগেই তা পাঠকের অনুভবে প্রবেশ করে।
এই পরিপ্রেক্ষিতেই নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘একাঘ্নী বাণ’ উপমাটি এক দুর্দান্ত শিল্পতাত্ত্বিক সংজ্ঞা—এটি কেবল একটি রচনার কাঠামোগত ব্যাখ্যা নয়, বরং একটি নৈতিক, দার্শনিক অবস্থানও বটে। গল্প যেন শুধুই কাহিনি নয়—একটি নির্ভুলভাবে ছোড়া অস্ত্র, যা পাঠকের অভ্যন্তরে কাঁপন তোলে।
এই সংজ্ঞার আলোকে রাজা ভট্টাচার্যের গল্পকথা কল্প না পাঠ করলেই পরিস্কার বোঝা যায়—এ কেবল গল্পের সংকলন নয়, বরং ছোটোগল্প নামক এক স্বয়ংসম্পূর্ণ, স্বাতন্ত্র্যবাহী শিল্পরূপের এক নিরবিচার, সংহত, ও সজ্ঞান অন্বেষণ। এটি কোনও চটুল, চটকদার কল্পলোকের বিলাস নয়; নয় বয়ানবাহুল্যে ভারাক্রান্ত পোস্টমডার্ন প্যারোডি। বরং এটি এক অন্তর্মুখী, ধ্যানমগ্ন যাত্রাপথ—নিত্যদিনের বাস্তবতার দেহে স্বপ্ন ও স্মৃতির রক্তসঞ্চার ঘটিয়ে, পাঠককে নিয়ে যায় শব্দের সেই সূক্ষ্ম কুঠুরিতে, যেখানে প্রতিটি অনুভব যেন একেকটি শুঁড়িপথের মতো খোলা থাকে।
এই সংকলনে অন্তর্ভুক্ত একুশটি গল্প—অযোধ্যাকাণ্ড, নারী ও হস্তিনী, এক্সিস্টেনশিয়ালিজম বা ধুতির ইতিকথা, দ্রষ্টা ও স্রষ্টা প্রভৃতি—নামেই যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে লেখকের ভাষা-চিন্তা ও রচনাশৈলীর আত্মবিশ্বাস, বিষয়-বিস্তারের ব্যাপ্তি, আর বর্ণনার অন্তর্গত তত্ত্বশাসিত মনোভঙ্গি। প্রতিটি গল্পই যেন একটি সংক্ষিপ্ত জীবনচিত্র—‘microfictional’ প্রতিচ্ছবি—যেখানে মধ্যবিত্ত জীবনের নিস্তরঙ্গ ক্লান্তি, শ্রান্ত চাওয়া-পাওয়া, ক্ষয়ে যাওয়া বিশ্বাস আর তবু অলীক আশাবাদের ঝিলিক মিলেমিশে তৈরি করে এক অলংকারহীন অথচ অলৌকিক পাঠ-অভিজ্ঞতা।
এই গ্রন্থের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো এর গাঁথুনির সূক্ষ্মতা—the weaving of myth, memory, and modernity—যা গল্পগুলিকে কেবল বিষয়ের দিক থেকে নয়, অভিজ্ঞতার স্তরেও বহুস্তরীয় করে তোলে। কোথাও পুরাণের প্রগাঢ় ধ্বনি, কোথাও নাগরিক ক্লান্তির কর্কশ হুইসেল, আবার কোথাও ভাষার আত্মগ্লানিমাখা ভার এসে নেমে বসে চরিত্রের শিরায়-শিরায়। লেখকের কলম যেন একদিকে দার্শনিক, অন্যদিকে নিকষ সত্যভাষী—এখানে কল্পনা নয়, বরং ‘সত্যের ভাষাগত প্রতিরূপ’ হয়ে ওঠে গল্পের অনিবার্য ভঙ্গিমা।
এই গল্পগুলি পড়া মানে কেবল কাহিনি জানা নয়—বরং এমন এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়া, যা আমাদের ব্যক্তিজীবনে থাকে অথচ নামহীন, স্পর্শহীন, শব্দহীন হয়ে—নিস্তব্ধ কোনও কোণে জমে থাকে। "We tell ourselves stories in order to live,"—জোয়ান ডিডিয়নের এই উপলব্ধির মতো, এই বইয়ের গল্পগুলোও যেন পাঠ���ের ভেতরের 'অবিচারিত জীবন'কে ভাষা দেয়।
এক অর্থে, এই গ্রন্থ এক ধরনের literature of the quietly lived life—যেখানে মহত্ত্ব নেই, কিন্তু আছে মর্ম। যেখানে নায়ক নে��, কিন্তু আছে নৈঃশব্দ্যের প্রতিরোধ। এখানে ছোটো ছোটো আকাঙ্ক্ষা, প্রায়-উচ্চারণহীন ক্লান্তি, সংক্ষিপ্ত স্বপ্নভঙ্গ আর অস্ফুট আশাভঙ্গের সঙ্কেতই গল্পের প্রকৃত শরীর। প্রতিটি গল্প যেন জলের ওপর জ্বলে-ওঠা কুয়াশার মত—স্বল্পস্থায়ী, কিন্তু অসীম অর্থবাহী।
এ যেন বাংলা ছোটোগল্পের স্থির, প্রায় স্থবির, প্রায়শই অব্যক্ত শরীরে এক ধীরস্থির কিন্তু অদ্ভুতরকম শ্বাসধারণযোগ্য সিনেম্যাটিক প্যানিং। যেন ক্যামেরা চলছে, শব্দহীন এক ট্র্যাকিং শটে, যেখানে প্রতিটি দৃশ্য ক্ষণস্থায়ী, স্বল্পদৈর্ঘ্য, কিন্তু তবু এমন নিখুঁতভাবে আলোয় ভিজে থাকে যে পাঠক তাকিয়ে থাকতে বাধ্য হয়—ঠিক যতক্ষণ না সেই মুহূর্ত পাঠকের মনে ছাপ ফেলে।
এই গল্পগুলো যেন একেকটি স্মৃতিকথাস্নাত, সংক্ষিপ্ত প্রেমপত্র—না বলা ভালোবাসার, না দেখা দীর্ঘশ্বাসের, না শোনা কথার দিকে লেখা। লরি মুর একবার বলেছিলেন,
“A short story is a love affair: a spark, a flame, and then ashes—but sweet, scented ashes you carry around forever.” এই উক্তির ছায়াতেই রাজা ভট্টাচার্যের গল্পগুলো নিজেদের জায়গা করে নেয়—একটি চিঠির মতো, যা কোনও নির্দিষ্ট ঠিকানায় না গিয়েও পাঠকের হৃদয়ের দরজায় চুপিচুপি রেখে যায় তার শব্দসংকেত।
এবং তারপর শুরু হয় দীর্ঘ নীরব কড়ানাড়া—গল্প পড়া শেষ হলেও পাঠকের ভেতর যেন কোনও দ্যুতি, কোনও ক্লান্ত আলো বারবার এসে বলে, “আমি কি ফুরোলাম?” কিংবা “তুমি কি পড়ে ফেলেছ, নাকি হারিয়ে ফেলেছ আমাকে?”
এই গল্পগুলি পড়ার অভিজ্ঞতা ঠিক যেন fade-in/fade-out দৃশ্যের মতো—কিছুই জোর করে বলতে চায় না, কিন্তু সবটুকুই অনুভব করিয়ে যায়। গল্প শেষ হয়, কিন্তু পাঠকের ভেতরে এক অনুচ্চারিত সংলাপ চালু থাকে।
এই গল্পগুলির মর্মস্থলে অবস্থান করছেন সেই চিরপরিচিত, অথচ নিত্য অবহেলিত নাগরিক—মধ্যবিত্ত বাঙালি। তার জীবন যেন মফস্বলের ছেঁড়া রেলটিকিটের মতো—ব্যবহার হয়েছে, মূল্য চুকিয়েছে, কিন্তু এখনও কোথাও পৌঁছয়নি। সে স্বপ্ন দেখে, কিন্তু সিঁড়ির ঠিকানায় পৌঁছতে পারে না; পাণ্ডিত্যপূর্ণ ফেসবুক স্ট্যাটাস লেখে, অথচ নিজের ছেলের সঙ্গে একটি অন্তরঙ্গ কথোপকথনের শুরুতেও জড়তা বোধ করে। সে বাজারে গিয়ে মাছ দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, চোখে লেগে থাকে পুরনো রান্নার গন্ধ, আর মনে মনে ভাবে, “এই যদি আমার শেষ সুযোগ হত...!”
এই চরিত্রদের জীবনে নেই কোনও মুখর নাটকীয়তা, নেই বাহ্যিক ট্র্যাজেডির দাপট। নাটকের কোলাহলকে ছাড়িয়ে, এগুলো নিতান্তই 'মানুষের' গল্প—অত্যন্ত নিরীহ অথচ গভীরভাবে মানবিক। এখানে আছে ছেঁড়া চিঠির ভিতর আটকে থাকা অব্যক্ত ভালবাসা; আছে শুকিয়ে যাওয়া অভিমানের মৃত পাঁজর; আছে এক অদৃশ্য, অথচ দৃঢ় পিছুটান, যা জীবনের প্রতিটি বাঁকে চুপচাপ লেগে থাকে।
এই গল্পগুলো যেন রেমন্ড ক্যারভারের নীতিমালায় রচিত—
“It’s possible, in a poem or short story, to write about common things and objects using common but precise language, and to endow those things – a chair, a window curtain, a fork, a stone, a woman’s earring – with immense, even startling power.”
রাজার এই গল্পগুলিও ঠিক তেমন—গরিমাহীন, জৌলুসহীন, অথচ তীব্রভাবে সত্য। এগুলো জীবনের সেইসব মুহূর্ত, যেগুলো হয়তো দিনের শেষে আমাদের কিছু বলেও না বলা থেকে যায়। গল্পগুলো যেন বাস্তবের সেই নিঃশব্দ শ্লোক—যা চিৎকার করে না, কিন্তু গভীরে বাজে।
তবে এমন চরিত্র, এমন টোন তো আমরা আজকাল প্রায়ই দেখি—ফেসবুকের স্ট্যাটাসে, ইনস্টাগ্রামের ক্ষণিক গল্পে, কিংবা রাত জেগে লেখা আত্মপ্রকাশহীন হোয়াটসঅ্যাপ মনোলগে। প্রশ্ন জাগে, তাহলে এই বই আলাদা কী?
আলাদা তার craftsmanship—যেখানে প্রতিটি গল্পকে গড়ে তোলা হয়েছে পরিমিতির এক পরিশীলিত ব্যাকরণে। ‘পরিমিত’, ‘সুশৃঙ্খল’, ‘গঠনগতভাবে সমসত্ত্ব’—এই তিনটি শব্দেই ফুটে ওঠে রাজা ভট্টাচার্যের সাহিত্যশিল্পের নির্যাস। এই লেখাগুলি কেবল কাগজে লেখা বাক্য নয়, এগুলো তীব্র ও মননশীল সাহিত্যসাধনার ফল, যেখানে প্রতিটি শব্দ এক একটি ইট, এবং প্রতিটি ইট নিজের ওজনে দাঁড়িয়ে থাকে, এক টলমল স্থাপত্যের মতো।
এই গল্পগুলিতে নেই কোনও বাহুল্যক্লিষ্ট কাব্যিকতা, নেই তথ্যে-ঠাসা বিশ্লেষণাত্মক ভার। যা আছে, তা হল এক অনিবার্য ভারসাম্য—যা পাঠককে চুপচাপ টেনে নিয়ে যায় গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে, এবং সেখানেই তাকে আটকে রাখে। যেন ভাষার নিজস্ব শ্বাসপ্রশ্বাস আছে, আর গল্প তার ছায়ায় অনুপ্রবেশ করে।
প্রেমচাঁদ বলেছিলেন:
“A short story is a sharp arrow that pierces the heart and sets the mind ablaze.” রাজার গল্পগুলো ঠিক সে রকমই—সাবধানে প্রস্তুত করা, লক্ষ্যে নিখুঁতভাবে ছোড়া একেকটি তির, যার অভিঘাত দীর্ঘস্থায়ী ও নিঃশব্দে ধ্বংসাত্মক।
তবে হ্যাঁ, স্বীকার করতেই হয়—সমস্ত গল্প সমান তীব্র নয়। কিছু কিছু গল্পে সেই 'একাঘ্নী বাণ'-এর অভিঘাত কিছুটা হালকা—যেন তির ঠিক লক্ষ্য ছুঁয়েছে, কিন্তু তার ধ্বনি একটু দেরিতে আসে। মনে পড়ে যায় ‘শান্ত’ বা ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকায় প্রকাশিত কিছু দুর্ধর্ষ গল্প—যেগুলো ছিল আরও নির্দয়, আরও বর্ণময়, এবং আরও গভীরভাবে প্রোথিত।
তবু, গল্পকথা কল্প না–র মধ্যে তিনটি গল্প এমন আছে—যাদের নাম উল্লেখ করব না, কারণ পাঠকের নিজস্ব আবিষ্কারের আনন্দই সাহিত্যের সবচেয়ে গোপন ঐন্দ্রজালিকতা—যেগুলো নিছক কারিগরির নিদর্শন নয়, বরং নির্মমতা, সৌন্দর্য, ও নৈঃশব্দ্যের অসামান্য সাযুজ্যে তৈরি এক অন্তর্মুখী বিস্ফোরণ। এই গল্পগুলো যেন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ছোটোগল্পতত্ত্বের প্রতি এক নিঃশব্দ প্রণিপাত।
এখানেই ফিরে আসে কালিদাসের সেই timeless শ্লোক: “कथा संनादति हृदयं यया संनादति विश्वं तद्विश्वेन संनादति।” —যে গল্প হৃদয়কে স্পন্দিত করে, সেই গল্পই বিশ্বজুড়ে প্রতিধ্বনি তোলে।
এই গ্রন্থের নির্জন ভাষা, সংবেদী চরিত্র, এবং সংহত কাঠামোর মেলবন্ধন যেন গড়ে তোলে সেই নিঃশব্দ প্রতিধ্বনি—যা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সীমা অতিক্রম করে সামষ্টিক মানবিক সত্যের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
শেষে যা বলার থাকে:
গল্পকথা কল্প না নিছক গল্পের সংকলন নয়। এটি কোনও রূপকথার উড়ন্ত কার্পেটে চড়ে যাওয়া নয়, বরং জীবনের সবচেয়ে নির্জন, সবচেয়ে অপ্রকাশিত, সবচেয়ে নিরুপম সত্যের মুখোমুখি হওয়া। এই বই কল্পনার ফেনায় ভাসে না; বরং বাস্তবতার নিষ্কম্প কক্ষ থেকে উঠে আসে শব্দের তীব্র, অনমনীয় প্রতিচ্ছবি—যা মাঝে মাঝে চোখে জল আনে, আবার কখনও গলায় তুলে দেয় একটা কাঁটা।
এই বই পড়ে আপনি হয়তো বলবেন, “এই তো আমার কথা!” কিংবা ভেতরে গুনগুন করবেন, “এই তো আমার মুখোশ—যেটা আমি প্রতিদিন পরে থাকি, অথচ কোনও দিন ভালো করে দেখিনি।” যেটাই বলুন না কেন, এই বই আপনাকে বিদ্ধ করবেই—সোজা হৃদয়ের পাঁজর পেরিয়ে চৈতন্যে।
এবং এখানেই ছোটোগল্পের ধর্ম পূর্ণ হয়— না entertain করার জন্য, না inform করার জন্য, বরং সেই ক্ষণিক আহত চেতনার জন্য, যা পাঠককে বদলে দেয় চুপিচুপি।
শেষে দাঁড়িয়ে মনে পড়ে যায় নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই আদিম সংজ্ঞা—
ছোটোগল্প যেন 'একাঘ্নী বাণ'—
একবার ছোড়া মানেই নিঃশব্দে, নিঃশর্তে, এবং নিঃসন্দেহে বিদ্ধ করতে হবে।
গল্পকথা কল্প না সেই একাঘ্নী বাণেরই একটি সম্ভার— একটি ধীর, কিন্তু নিশ্চিত বিস্ফোরণ।