ফেসবুকে নানা গ্রুপে এবং নিজের পেজে লেখালেখি করে নিজস্ব পাঠকবৃত্ত তৈরি করতে পেরেছেন তরুণ লেখক রণদীপ ওরফে রণ। বিভা পাবলিকেশনের আনুকূল্যে এইবছর বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে তাঁর প্রথম একক সংকলন— ষড়ভুজ। কী আছে এই বইয়ে? একটি নাতিদীর্ঘ অথচ কৌতূহলোদ্দীপক 'ভূমিকা'-র পর এসেছে নিম্নলিখিত লেখাগুলো~ ১. প্রতিসাম্য: কাল্পনিক এক পৃথিবীর পটভূমিতে ঘটতে থাকা ক্ষমতার লড়াই তথা বিপ্লব নিয়ে লেখা এই ফ্যান্টাসিটি এই বইয়ের সেরা লেখা। পাশাপাশি, সবচেয়ে বেশি অপ্রাপ্তির জন্মও দিয়েছে এই লেখাটিই। এমন চমৎকার ওয়ার্ল্ড-বিল্ডিং এবং কলমের সূক্ষ্ম আচরণে ত্রিমাত্রিক চরিত্রদের নির্মাণ করেও লেখাটিকে বড়ো দ্রুত শেষ করে ফেলা হয়েছে। অথচ লেখকের বর্ণনা থেকেই স্পষ্ট হয়েছিল, যে রাজ্য বা রেজিমে এই ঘটনা ঘটছে, তার অতীতে লুকিয়ে আছে আরও বহু রহস্য— যেগুলোর সঙ্গে বর্তমানের ঘটনাক্রমের সম্পর্ক থাকা স্বাভাবিক। ভবিষ্যতে লেখক এই কাহিনির মধ্যে বীজাকারে জায়মান সম্ভাবনাগুলো নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস রচনা করবেন— এই আশায় রইলাম। ২. রক্তসংবাদ: এক সিরিয়াল কিলারের হত্যালীলা নিয়ে বিষাদ ও রক্তে কালো আখ্যান এটি। এক্ষেত্রেও তদন্তের ব্যাপারটা উপেক্ষা করে মননের দিকটায় জোর দিতে গিয়ে গল্পটাকে ঈষৎ ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে বলেই আমার মনে হয়েছে। ৩. মায়ারণ্য: গল্প হিসেবে সাধারণ, কিন্তু বর্ণনার গুণে এটি 'মউলির রাত'-এর মতো উপভোগ্য ও শিহরণ-জাগানিয়া হয়ে উঠেছে। ৪. মায়ামুদ্রা: নিটোল, অমোঘ এই ভয়ের গল্পটা পড়তে-পড়তে এক-আধবার পেছনে তাকাতে বাধ্য হয়েছি আমি। ৫. আলেয়া: "মরণ রে, তুঁহুঁ মম শ্যাম সমান"— এই ভাবনারই নিয়তিলাঞ্ছিত গল্পরূপ এটি। ৬. ইসপা: দুর্ধর্ষ গল্প! শেষ মোচড়টা আমাকেও চমকে দিয়েছিল। বেশ কিছু বানান ভুল ছন্দপতন ঘটিয়েছে। পরবর্তী মুদ্রণের আগে প্রকাশক যদি সেগুলো দেখে নিতে পারেন, তাহলে বইটি আরও ভালো হয়ে উঠবে। এই সময়ের বাংলা স্পেকুলেটিভ ফিকশনের অনুরাগী হলে এই বইটি আপনার পছন্দ হবে বলেই আমার বিশ্বাস।
সম্প্রতি পড়ে শেষ করলাম রণদীপ নন্দীর ষড়ভূজ। বইয়ের নাম শুনেই বুঝতে পারছেন বইতে সব মিলিয়ে ছটা গল্প রয়েছে। প্রায় সব কটাই অলৌকিক বলা চলে শুধু প্রথমটা ছেড়ে। প্রথমটা কিছুটা স্পেকুলেটিভ ফিকশন বলা যায়। গল্পগুলির নাম হল-'প্রতিসাম্য', 'রক্ত সংবাদ','মায়ারণ্য', 'মায়ামুদ্রা','আলেয়া' ও 'ইসপা'। গল্পগুলো মোটের উপরে বেশ ভালো। পড়া শুরু করলে একটা টানে পড়ে যেতে হয় শেষ না হওয়া অবধি। আমার ব্যক্তিগতভাবে মায়ামুদ্রা গল্পটি বেশ বেশ ভালো লেগেছে। শেষেরদিকে একটা জীবনবোধের কথাও উঠে আসে এই অলৌকিক গল্পের প্রেক্ষাপটে। মায়ারণ্য ও রক্তসংবাদের প্লট একটু ক্লিশে হলেও উপস্থাপনার জন্য পাঠকের আগ্রহ ধরে রাখে। এই ধরণের গল্পের প্লট যেহেতু বেশ কমন তাই এধরণের গল্পগুলোর সবথেকে শক্তিশালী অংশ হল লেখকের উপস্থাপনা আর সেটা লেখক খুব সুন্দরভাবে করেছেন। আলেয়া গল্পটা বেশ মায়াবী। মোটের উপরে গল্পটার প্লট খুব ছোট্ট, কিন্তু অসাধারণ উপস্থাপনায় এই গল্পটা বইটিকে একটা অন্যমাত্রা দিয়েছে। অলৌকিক এই গল্প শেষের পরে ভয় লাগে না, যেটা পড়ে থাকে সেটা একরাশ মনখারাপ আর স্তব্ধতা। যদি শুধু লেখার হিসেবে বিচার করতে হয় তাহলে এই গল্পটাকে আমি এই সংকলনে সব থেকে সেরা বলবো। এবার আসি এই বইয়ের প্রথম ও সব থেকে বড় গল্পে- 'প্রতিসাম্য'। এই বইয়ে প্লটের দিক থেকে সব থেকে যদি ভালো বলতে হয় সেটা এই গল্পটা। প্রায় 45 পাতার একটা মাঝারি সাইজের গল্প। কিন্তু সব থেকে বেশি আশাহত হয়েছি এই গল্পটা পড়েই। মানে কেন? লেখকের কিসের এত তাড়া বুঝলাম না। মোটামুটি একটা উপন্যাস বা উপন্যাসিকা প্লটকে কেন একটা মাঝারি সাইজের গল্পে চেপে চুপে ঢোকানোর চেষ্টা করলেন জানি না। গল্পটা হলিউড সিনেমার মতো সিনওয়াইজ বিভাজন করে লিখতে গিয়ে পুরো মাঠে মারা গেছে। গল্পের মধ্যেও একাধিক জায়গায় লেখক নিজেই সম্ভবনা তৈরি করেছেন ভাল কিছুর, অথচ সেগুলোর ধারে কাছে দিয়েও ঘেঁষলেন না শেষের দিকে। বাকি গল্পগুলোর তুলনায় এই গল্পটায় যে পরিমাণ অবহেলা চোখে পড়ে সেটা দেখে আমি অন্তত বিরক্তই হয়েছি। দুঃখিত। কিন্তু এই গল্পটা আরও অনেক অনেক ভালো হতে পারত একটু সময় নিয়ে বিল্ড আপ করলে। বইয়ের মুখবন্ধে লেখক বলেছেন-' অতঃপর বুঝলাম প্রেমের গল্প আমার কাপের চা নয়, তবে সেই ছেলেবেলা থেকেই অতিপ্রাকৃত আর রহস্য টানে চুম্বকের মতো।' আমি যেহেতু রণদীপের এর আগে লেখা উনিশ কুড়ি অনলাইন ম্যাগাজিনে পড়েছি তাই আমার অন্তত লেখকের উপরোক্ত বক্তব্য সমর্থনযোগ্য মনের হয়নি। লেখকের উপস্থাপনাটা বেশ ভালো। লেখক অতিপ্রাকৃত লিখুন , আমার কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু তাঁর হাতে যে জীবনবোধ, মানুষের অনুভূতিকে শব্দে প্রকাশ করার অসাধারণ ক্ষমতা আছে সেটা সবার থাকে না। সেটা যদি লেখক অগ্রাহ্য করেন তাতে তাঁরই ক্ষতি। বইয়ের প্রচ্ছদ, পাতা ও বাঁধাই বেশ ভালো।কিন্তু মুদ্রণ বেশ কিছু পাতায় হালকা হয়েছে, আবার কিছু পাতায় কেমন যেন ঘষটে গেছে। এগুলো বোধহয় একটু খেয়াল করার দরকার আছে। একটা গল্পের বই পাঠক পড়ার জন্য কেনে, ছবি থাকলে আগ্রহ বাড়িয়ে দেয় সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই ছবি যদি বেশ বালখিল্যময় হয়, তাহলে কিন্তু অনাগ্রহের কারণও হয়ে ওঠে। ছবিগুলো যত না খারাপ তার থেকেও বেশি খারাপ লাগছে মুদ্রণের ত্রুটির জন্য। প্রত্যেকটা ছবির লাইনগুলোর অমসৃণ পিক্সেল পয়েন্টগুলো খুব খারাপ দেখতে লাগছে। এই সমস্যাটা বিভার বেশ কিছু অন্য বইয়েও খেয়াল করেছি। এই সমস্যা ঠিক না করলে ছবিগুলো আদতে মনে হয় জোর করে রাখার জন্য রাখা।