আরাকানের রোহিঙ্গা উদ্বাস্ত্ত সমস্যার মতো প্রতিবেশী আসামের পরিস্থিতিও বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতিহাসে দীর্ঘ সময় বাংলা ও আসাম এক প্রদেশ হিসেবে থাকলেও চার দশক ধরে আসামে বাংলাদেশ সম্পর্কে বিরূপ ধারণা প্রচার করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, আসামে লাখ লাখ ‘বাংলাদেশি’ অনুপ্রবেশ করেছে। আর তাতে সেখানকার জনমিতি পাল্টে যাচ্ছে। সৃষ্টি হচ্ছে নিরাপত্তা-হুমকির। এভাবে দশকের পর দশক সযত্ন প্রচেষ্টায় অসমিয়া ও সর্বভারতীয় রাজনৈতিক সাহিত্যে ‘বাংলাদেশি অভিবাসন’-এর যে তত্ত্ব বা কাহিনি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাঁর সত্যাসত্য খতিয়ে দেখেছেন লেখক তাঁর এই গ্রন্েথ। বাংলা ও আসামের ইতিহাসচর্চা ও পরিচয়ের রাজনীতির সীমাবদ্ধতা তুলে ধরতে গিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদীর ঐতিহাসিক ভূমিকার ওপরও আলোকপাত করা হয়েছে। রাজ্য হিসেবে দরিদ্র হলেও কেন উন্নয়ন প্রশ্নটি আজও আসামের রাজনীতির প্রধান বিষয় হয়ে ওঠেনি, প্রতিবেশী হলেও কেন আসাম-বাংলাদেশ সম্পর্ক বিকশিত হতে পারেনি, প্রসঙ্গক্রমে সেসব বিষয়ও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। সাম্প্রতিক কালে আসামে ‘নাগরিক পঞ্জি’ তৈরির প্রক্রিয়ার আইনি পর্যালোচনার পাশাপাশি এর মাধ্যমে কীভাবে ভাষাগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মানবাধিকারের লঙ্ঘন ঘটছে, তার সরেজমিন চিত্র উঠে এসেছে লেখকের অনুসন্ধানে। আসামে ‘বিদেশি খেদাও’ আন্দোলনের প্রকৃত কারণ, পটভূমি এবং তার রাজনৈতিক অর্থনীতি সম্পর্কে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো একটি গবেষণাধর্মী গ্রন্থ প্রকাশিত হলো।
আলতাফ পারভেজের জন্ম ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬। দর্শনশাস্ত্রে প্রথম স্থান অধিকার করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর অধ্যয়ন শেষ করেন। ছাত্রত্ব ও ছাত্র রাজনীতির পর সাংবাদিকতার মাধ্যমে পেশাগত জীবন শুরু। পরে গবেষণা ও শিক্ষকতায় সংশ্লিষ্টতা। প্রকাশিত গ্রন্থ ছয়টি। যার মধ্যে আছে—‘কারাজীবন, কারাব্যবস্থা, কারা বিদ্রোহ : অনুসন্ধান ও পর্যালোচনা’, ‘অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ, কর্নের তাহের ও জাসদ রাজনীতি’, ‘বাংলাদেশের নারীর ভূ-সম্পদের লড়াই’, 'মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী ইতিহাসের পুনর্পাঠ'।
মিঞা অসমিয়া এনআরসি অাসামে জাতিবাদী বিদ্বেষ ও বাংলাদেশ লেখক : আলতাফ পারভেজ( Altaf Parvez) পৃষ্ঠা সংখ্যা :২১০ প্রথমা প্রকাশন মুদ্রিত মূল্য :৪০০ টাকা
প্রথমে লেখক সম্পর্কে বলছি, আলতাফ পারভেজ পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।তিনি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি বিষয়ক গবেষক। প্রতিনিয়ত পত্রিকায় এসব বিষয়ে তাঁর কলাম ছাপা হচ্ছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রচিন্তা, প্রতিচিন্তা প্রভৃতি জার্নালে তিনি লিখে থাকেন। রাষ্ট্র, রাজনীতি, ইতিহাস এসব বিষয়ে তাঁর অনেক গুলো গ্রন্থ বেরিয়েছে।লেখকের লেখার সাথে পরিচয় কয়েক বছর আগে। ওঁনার লেখা বার্মা: জাতিগত সংঘাতের সাত দশক, কাশ্মীর ও আজাদীর লড়াই বই দুটো পড়েছিলাম। তারপর থেকে তাঁর লেখা নিয়মিত পড়ি...
আসাম নিয়ে এই বইটা পড়ার আগে আসাম সম্পর্কে আমার জানার পরিধি ছিলো খুব অল্প। ২০১৯ সালে ১৯ লাখ বাংলা ভাষাভাষীকে নাগরিক তালিকা থেকে বাদ দেয় ভারত সরকার। সে সময়ে এনআরসি নিয়ে বেশ আলোচনা হয়।যার ভেতর বাহির উঠে আসে এ গ্রন্থে। আসামের সাথে বাংলার সম্পর্ক অনেক আগ থেকেই। ছিলো অখন্ড রাজ্য। বাংলা প্রেসিডেন্সির সময় আসাম বাংলার সাথে যুক্ত ছিলো। তারপর প্রশাসনিক সুবিধার্থে ভাগ হয় আসাম। ক্রমে ক্রমে আসামের মানচিত্র খন্ডিত হয়। বইটির শুরুতে লেখক আসামের ভৌগলিক পরিবর্তনশীলতা ও সেখানখান বিভিন্ন অঞ্চল নিয়ে ধারণা দিয়েছেন।
আসাম ভারতের খুব গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য, কেননা আসামের অংশ দিয়েই ভারতের সেভেন সিস্টার্স ভুক্ত রাজ্য গুলোতে যোগযোগ স্থাপিত। আসামের সাথে আমাদের ভৌগলিক, প্রাকৃতিক ও ভাষার দিক দিয়ে সম্পর্ক বিদ্যমান। আমাদের ব্রক্ষ্মপুত্র নদ আসাম দিয়েই বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এই নদী দুই দেশের আলাদা জনপদের প্রাণ।
ধর্মীয় ও ভাষাগত বৈচিত্র্যে আসামকে এক জাদুঘর বলা যায়। নানা ভাষাভাষী ও ধর্মের মানুষ সেখানে বাস করে। ভারত সরকারের জরিপ অনুযায়ী ১১৫ টি জাতিগোষ্ঠী ও ৪৫ ধরণের ভাষা সেখানে প্রচলিত।
আসামের উল্লেখ্যযোগ্য একটা অংশ মুসলিম। কাশ্মীরের পর আসামেই মুসলমানের বাস বেশি। বেশিরভাগের ভাষাই বাংলা। ভারতের হিন্দুত্ববাদী আরএসএস-বিজেপি পরিবারের হীন রাজনীতির শিকার এই মুসলমানরা। তাদেরকে বলা হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারী। আর বিদেশী খেদাও আন্দোলনের নামে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের ভাষাগত ও ধর্মীয় ও নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।
বইয়ের নামে মিঞা শব্দটি আছে।মিঞা শব্দটি দ্বারা মূলত বিদেশী বুঝায়। আর বিদেশী বলতে গেলে তাদের বাংলাদেশি বলা হচ্ছে। এই মিঞা শব্দটি জাতিঘৃণা ও পরোক্ষভাবে বাংলাদেশকে ঘৃণা জানানো হচ্ছে। অথচ আসামে মধ্যযুগ থেকে মুসলমানদের বাস। আসাম বাংলা থেকে আলাদা হবার পর মুসলিম অধ্যুষিত অনেক জেলা আসামের অংশ হয়। আসামের এনআরসির মূল টার্গেট মুসলমানরা। এনআরসিতে বাংলাভাষীদের বিদেশী বলে নাগরিক অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। এনআরসিতে বাদ পড়া হিন্দুদের নাগরিত্ব দেবার প্রতিশ্রুতি থাকলেও মুসলিমদের ক্ষেত্রে তা হচ্ছে না। আদৌতে ভারত নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বললেও আসামে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করছে। এনআরসিতে মুসলিমদের বাদ দিয়ে তাদের নাগরিক অধিকার কেড়ে নিয়ে রাষ্ট্রহীন করা হচ্ছে। আত্মপক্ষ সমর্থন এর সুযোগ ও দেয়া হচ্ছে না। আসামের সংখ্যালঘু বাংলা ভাষাভাষীদের বড় অংশ দরিদ্র কৃষক। নাগরিক তালিকা থেকে বাদ দিয়ে তাদের নানা কাজে শ্রমিক হিসেবে ব্যবহারের চিন্তা চলছে। যার পেছনে আছে রাজনৈতিক এজেন্ডা।
আসামের সহিংসতা আর মুসলিম নির্যাতনের বড় দৃষ্টান্ত নেলি গণহত্যা। ১৯৮৩ সালের গণহত্যা ১৪ টি গ্রামের ৫ হাজার মুসলমানকে হত্যা করা হয়। তাদের রক্তে লাল হয় কপিলি নদী। এটি ১৯৭৯ সাল থেকে 'বাংলাদেশি খেদাও ' আন্দোলনের সশস্ত্র অভিপ্রকাশ। আসু ও এজিপিকে দিয়ে আরএসএস এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে।যার বিচার আদৌ হয়নি।
বর্তমানে বিজেপি আসামে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ঢুকিয়ে সেখানে তাদের অবস্থান দৃঢ় করেছে। ২০১১ সালের বিধান সভায় তাদের আসন যেখানে ৫ সেখানে ২০১৬ তে ৬০ এ দাড়ায়। হিন্দুত্ববাদ ও জাতিবিদ্বেষ এর নামে রাজনীতিতে তারা আসামে সফল...
আসামে এনআরসি আর বাংলাদেশের নামে অপপ্রচার আমাদের সম্পর্কে নেতিবাচক ইমেজ তৈরী করছে। একদিকে রোহিঙ্গা সমস্যা অপরদিকে আসামে মুসলমানদের বাংলাদেশী বলে চালিয়ে দেওয়া, ভূ-রাজনৈতিক সমস্যার চিত্র ও ভবিষ্যত শঙ্কার কথা লেখক সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন।
বইটিতে মোট আটটি অধ্যায় আছে। এই আটটি অধ্যায়ে পর্যায়ক্রমে পুরো ঘটনার পটভূতি, বিস্তার, এই ঘৃণা অপবাদের সত্য-মিথ্যা লেখক নির্ণয় করার চেষ্টা করেছেন।দেখানো হয়েছে আসামের অনাগ্রসরতার কারণ ও তাদের খনিজ সম্পদ পাচারের দৃশ্য। প্রতিটি অধ্যায়ের শেষে লেখক রেফারেন্স দিয়েছেন যা ব্যাপারে তথ্যের ভিত্তি দিচ্ছে।
সবমিলিয়ে আসামের প্রাকৃতির সৌন্দর্যের বিপরীতে এক ভীত ইতিহাস জানা হলো ।শান্ত জনপদ কিভাবে সংঘাতপূর্ণ হলো, মুসলমান ও বাংলাভাষা কিভাবে প্রতিপক্ষ হলো।বইটি পড়ে অনেক সমৃদ্ধ হলাম।এ শ্রমসাধ্য কাজের জন্য প্রিয় লেখকের ভালোবাসা অভিবাদন জানাচ্ছি। শ্রীলংকা তামিল ইলম লেখকের আরেকটি বই পড়ার ইচ্ছে আছে।
অগোছালো রিভিউতে এত তথ্য এত ঘটনা সুন্দরভাবে তুলে আনতে পারিনি। আসাম নিয়ে পাঠকের জানার পিপাসা থাকলে এ বইটি আপনার অবশ্যপাঠ্য হতে পারে।