মার্কসীয় দর্শনের দৃষ্টিকোণ থেকে মানব সমাজের বিকাশ, পুঁজিবাদী সমাজের উদ্ভব আর পুঁজিবাদী সমাজকে ধ্বংস করে সমাজতান্ত্রিক সমাজের উত্থানের সরল রূপরেখা এই বইতে দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বস্তুবাদ সম্পর্কেও সহজ ভাষায় আলোচনা রয়েছে।
গ্রন্থটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে। বইয়ের চতুর্থ সংস্করণ ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে চাহিদা থাকলেও দীর্ঘ সময় পুনর্মুদ্রিত হয়নি। ২০০৩ সালে পঞ্চম সংস্করণে কিছু পরিবর্তন আনা হয়। দীর্ঘ বিরতির পর ২০১৮ সালে প্রকাশিত তরফদার প্রকাশনীর এই সংস্করণটিতে তেমন কোন পরিবর্তন আনা হয়নি।
Haider Akbar Khan Rono was a Bangladeshi politician, theorist and writer. He was a member of the Presidium of the Communist Party of Bangladesh. He published 25 books and many booklets. He received the Bangla Academy Literary Award (2021).
সহজভাষায় মার্কসবাদের মতো জটিল বিষয়কে বিভিন্ন উদাহরণের মাধ্যমে বুঝিয়েছেন বামপন্থী রাজনীতিবিদ হায়দার আকবর খান রণো।
প্রচলিত পাঠ্যপুস্তকে ইতিহাসের ক্রমবিকাশ এবং ব্যাখা দেওয়া হয়েছে রাজা,রাজড়ার দৃষ্টিকোণ থেকে। তার বাইরে গিয়ে ইতিহাসের ব্যাখা দিয়েছেন মার্কস এবং তাঁর সুহৃদ এঙ্গেলস। তাঁরা সমাজের বিবর্তন লক্ষ করেছেন অনেকটা এভাবে-
১. আদিম সাম্যবাদ ২. দাস সমাজ ৩. সামন্ত সমাজ - এই সমাজ পুঁজিবাদ বিকাশের পথ তৈরি করে। ৪. শোষণবাদী ধনতান্ত্রিক সমাজ এবং বুর্জোয়া পুঁজিবাদী সমাজের পতন ঘটিয়ে আবির্ভাব ঘটবে ৫. শ্রমিকের একনায়কতন্ত্রের। যাকে সাম্যবাদী সমাজ বলা হচ্ছে।
মার্কস হেগেলের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের ভাববাদকে কীভাবে বাদ দিয়েছেন, ফয়েরবাখকে কতটা গ্রহণ করে উপস্থাপন করেছেন ঐতিহাসিক দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ তারই বৃত্তান্ত লিখেছেন রণো।
দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ বনাম যান্ত্রিক ও আধিবিদ্যক বস্তুবাদের পার্থক্য এবং ভুল -শুদ্ধ বিচারও ভালো লেগেছে।
রণো নিজে প্রবলভাবে বামপন্থায় বিশ্বাস করেন। তাই একচেটিয়াভাবে এই মতাদর্শকে সমর্থনও করেছেন তা ভালো লাগেনি।
মার্কসবাদ নিয়ে এলিমেন্টারি ধারণা পেতে পড়ুন সহজ ভাষায় লেখা 'মার্কসবাদের প্রথম পাঠ'।
আদতে মার্কসবাদই সার্বিক সামাজিক বিজ্ঞান। কারণ, এর গঠনতন্ত্রের নীতিই বিশ্বজনীন। অর্থনৈতিক মুক্তি কোনো মৌলিক মুক্তি নয়, এর সাথে পুঁজিবাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সম্পর্ক। পুঁজিবাদ টিকে থাকে আমাদের বাজেটে পুঁজিওয়ালাদেরই প্রিভিলেইজ দেয়ার কারণে, পুঁজিবাদ বেঁচে খায় আমাদেরই শোষণ করা শোষক নেতাবর্গ। আমাদের অর্থ তারা লুটে রাখবে আবার বহিরাষ্ট্রীয় ব্যাংকে। আবার বহিঃরাষ্ট্রের ব্যাংকই আমাদের ঋণ দিবে সুদের উপর! নিজের অর্থ নিজেই খেটে লাভ দিব পুঁজিপতিকে! পুঁজির স্রষ্টা হয়েও মালিক হতে পারলাম না। পৃথিবীর ৬ জনের সম্পদ যদি ৯৪ জনের চেয়ে বেশি হয় তবে— হয় আদমশুমারি অর্থহীন নয় সম্পদের সৃষ্টি, বণ্টন ব্যর্থ। শিক্ষা কেন পেশাকে লক্ষ্য রেখে 'কার্যক্রম' হয়ে উঠবে এই বিষয়টা কি যথেষ্ঠ যৌক্তিক? কার্যক্রম কি আমাদের সকলের পেশার সাফল্য দিতে পারছে? পুঁজিবাদের আগ্রাসনের সাথে কি আমাদের এতটা গ্লানিকর সমাজপরিস্থির মধ্য দিয়ে যাওয়ার সম্পর্ক নেই? অবশ্যই আছে। প্রয়োজন বিপ্লবের। বিপ্লব মানেই দাঙ্গা নয়, গোলমাল, রক্তপাত, আন্দোলন, মিছিলই বিপ্লবের অর্থে দাঁড়ায় না। বিপ্লবে চাই পরিবর্তন, পরিস্থিতি নয় সামগ্রিক অবস্থা ও বৈষম্যের উন্নয়ন— কোনোভাবেই আংশিক বা মেরুকরণ করা উন্নয়ন নয়। ভূমি মালিকানা বা ভূমি সাম্রাজ্যবাদের দিন অস্তমিত হতে চলেছে, সামনের পৃথিবীটা দক্ষতা, মানবসম্পদের। যে মানুষ দক্ষ সেই সম্পদ, যে জাতির মানবসম্পদ বিশাল কিন্তু একই সাথে পারস্পরিক ব্যাক্তিমানবসম্পদে পার্থক্য নেই পৃথিবী তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। কালকের পৃথিবীটা তাদের। চাই অন্তঃশক্তির পরিবর্তন— পড়তে হবে, জানতে হবে, তথ্যের জন্য তৈরী করতে হবে অবাধ পরিবেশ।
বই- মার্কসবাদের প্রথম পাঠ লেখক- হায়দার আকবর খান রনো
কীভাবে সমাজকাঠামো এবং উৎপাদন ব্যবস্থা একে অপরের সাথে অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িত? শ্রেণীবিভাগ, শ্রেনীবৈষম্য, শ্রেণীসংগ্রাম প্রভৃতির উৎপত্তি কোত্থেকে? বিপ্লব কিভাবে সংঘটিত হয়? রাষ্ট্রব্যবস্থা কিভাবে জন্ম নিল? এসকল প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে মার্ক্সিজম বা মার্কসবাদ! আর এই বইটি খুবই সহজ ভাষায়, সাবলীল ভঙ্গিতে মার্ক্সিজম বা মার্কসবাদ কি তা আমাদেরকে বুঝতে সাহায্য করেছে।
মার্কসবাদ এক ধরনের মতবাদ, দর্শণ এবং বিজ্ঞান যা কিনা কিভাবে উৎপাদন ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে সমাজব্যবস্থা পরিবর্তিত হয়, কিভাবে সমাজ ক্রমবিকাশের ধারা আদিম সাম্যবাদ ব্যবস্থা থেকে আজকের পুঁজিবাদী/সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় উপনীত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে শ্রেনীহীন, রাষ্ট্রবিহীন সাম্যবাদী সমাজে রুপ নিবে তার বৈজ্ঞানিক এবং ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা প্রদান করে। কিভাবে দাস,দাসপ্রভু; ভূমিদাস,সামন্তপ্রভু; বুর্জোয়া শ্রেনী, প্রলেতারিয়েত বা সর্বহারা শ্রেনীবিভাগগুলো তৈরি হয়েছিলো, পরবর্তীতে এই শ্রেণীবিভাগ, শ্রেণীশোষণে কিভাবে ভূমিকা রেখেছে কিভাবে শোষক এবং শোষিতের রুপ ধারণ করেছে, কিভাবে শ্রেণীসংগ্রাম বিপ্লবে রুপ নিয়েছে, সর্বপরি উৎপাদন শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যকার দ্বন্দের ফলে উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তন কিভাবে হয়, গোটা সমাজব্যবস্থার পরিবর্তনের পিছনে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কারণসমূহ কি কি সেসব মার্কস আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন।
মার্কসীয় দর্শন- দ্বন্দমূলক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ সম্পর্কেও সুস্পষ্ট ধারণা দেয় বইটি। বস্তুবাদকে পুঁজি করে অলীক কল্পনা বা বিশ্বাসকে ভিত্তিহীন ধরে এই দর্শন আগায়।
মার্কসবাদ কেন পড়বো, কেন জানতে হবে মার্কসবাদ? মার্কসবাদ হলো উৎপাদনব্যবস্থার ইতিহাস, শ্রেনীসংগ্রামের ইতিহাস। সমাজবিকাশের জন্য, শ্রেনীবৈষম্য দূরীকরণের জন্য, আজকের সমাজব্যবস্থার ইতিহাস জানার জন্য মার্কসবাদের বিকল্প নেই!
অনেকদিন যাবৎ মার্কসবাদের উপর ভাল একটা বইয়ের খোজ করছিলাম, খুজতে খুজতে অনেকদিন পর এই বইটি পেলাম- যারা মার্ক্সিজম পাঠের ক্ষেত্রে একদমই নবীন (বিগিনার) তাদের জন্য বইটি ভীষণ উপকারে আসবে আশা করি! কারণ বইটিতে লেখক খুবই সহজ-সুন্দর-সাবলীল ভাবে মার্কসবাদ ব্যাখ্যা করেছেন।
পূর্ববর্তী জ্ঞান ছাড়া প্রাথমিক ভাবে মার্ক্সবাদ এর দর্শন বুঝার জন্য উপযোগী বই।লেখক যিনি একজন কমিউনিস্ট ও পরিপূর্ণ মার্ক্সবাদী চিন্তক নিজে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সামনের সারির নেতা ছিলেন ও মার্ক্সের দর্শন প্রয়োগ করে দেখেছেন তাই পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় এই বই থেকে।
তিনি ঐতিহাসিক বস্তুবাদ আগে ব্যাখ্যা না করে সেটা প্রয়োগ করে দেখান যে কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডারিক এনগেলস এর চিন্তায় সভ্যতা ও অর্থনীতি কিভাবে গঠিত। তিনি সভ্যতার শুরু থেকে সমাজের শ্রেণী,উৎপাদন শক্তি ও ব্যবস্থা এবং এর মধ্যে সম্পর্ক আর এগুলো কিভাবে একে অপরকে প্রভাবিত করে আজকের সভ্যতায় এসেছে তা ব্যাখ্যা করেন এবং তিনি একজন কমিউনিস্ট হিসেবে সমাজতান্ত্রিক সমাজ ও সাম্যবাদী সমাজের সহজাত ভবিষ্যৎবাণী করেন কারণ সহ। এরপর তিনি একে একে মার্ক্সের বস্তুবাদী দর্শন ও ঐতিহাসিক এবং দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ ব্যাখ্যা করেন। যেহেতু তিনি আগে ইতিহাসের পাতায় তা প্রয়োগ করে এসেছেন তাই এই তত্ত্বকথা বুঝতে বেগ পেতে হয়না যে পদ্ধতি টা বেশ কার্যকর মনে হয়েছে আমার কাছে। তিনি এরপর শ্রেণী,রাষ্ট্র,বিপ্লব ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করে কার্ল মার্ক্স ও এংগেলসের সংক্ষিপ্ত জীবনীর বৃত্তান্ত দেন।
বই টা প্রাথমিক ভাবে জানার জন্য বেশ উপযোগী বটে কিন্তু অনিরপেক্ষ ও পক্ষপাতদুষ্ট। য��টা নিয়ে আমার সমস্যা হত না কারণ প্রথমত এইরকম বই একটি আদর্শ নিয়ে লেখা যেটা নিরপেক্ষ অবস্থায় পাওয়া আদৌ সম্ভব নয় হয়ত আর নিরপেক্ষ যে হতেই ���বে এমন ও নয়। কিন্তু একজন সদ্য আরম্ভকারী হিসেবে বিষয়টি বিরক্তিকর ও তার যে এই মতবাদের প্রতি আকর্ষিত করার প্রচেষ্টা তা ব্যর্থ হয় কিছুটা।তদুপরি তিনি এই কারণে বেশ একপেশে কথা বলে ফেলেন। সুতরাং আমার মতে বইটি আরো নিরপেক্ষ ধরণের হলে আরো সুখপাঠ্য হতে পারতো।
রাষ্ট্র হলো জনগনের শোষণযন্ত্র। ঠিক আছে, মানছি। কারণ, যেদিন থেকে শ্রেণী শোষণের উদ্ভব সেদিন থেকেই রাষ্ট্রের উৎপত্তি। "একটা সময় রাষ্ট্র ছিলোনা, আবার একদিন আসবে যখন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব থাকবে না" — কী প্রেডিকশন করে বললেন আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে বুঝে আসে নাই। কিন্তু "রাষ্ট্র" না থাকলে, আর রাষ্ট্রের "সরকার" না থাকলে জনগণের কী বেহাল দশা হয় তা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাহাত্তর, এবং চব্বিশ গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়টাতে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি, পাচ্ছি। অন্তত বাঙালিদের ক্ষেত্রে এই রাষ্ট্রযন্ত্র বাদ দেয়ার অপশন টা ভ্যালিড নয় (আমার মতে)। রাষ্ট্র যদি শুরু থেকে না থাকতো সেটা হয়তো আরেক রকম হতো। কিন্তু একটা জনগোষ্ঠী যখন শতাব্দী ধরে নানান প্রভুদের উপসনায় অভ্যস্ত, তখন হুট করে তাদের প্রভু সরিয়ে নিলে তারা যে কতটা বিশৃঙ্খল হয়ে পড়বে তা অননুমেয়। বাঙলাদেশে যে কেনো সমাজতন্ত্রের ফিল্ড নাই, এটা তার অন্যতম একটা কারন।
সমাজতন্ত্রের মূল "দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ" বা পরিবর্তনশীলতার কনসেপ্ট-টি ভালো লেগেছে। মার্কসবাদ যে ধর্মগ্রন্থ নয়, তাকে যে কেউ অবস্থা সাপেক্ষে পরিবর্তন (মানে আপডেট) করতে পারে তা মার্ক্স নিজেই বলে গেছেন। এর মূল জিস্ট-টাকে ঠিক রেখে যেকোনো সিচুয়েশনাল এডাপ্টেশন সম্ভব।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের পথিকৃৎ হায়দার আকবর খান রনো "মার্ক্সবাদের প্রথম পাঠ" লিখেছেন অনেকটা একাডেমিক ধাঁচে। পড়তে কোনোই অসুবিধা হয়নি, না বুঝতে। মার্কসবাদের মত এতো কঠিন একটা বিষয়কে এতটা সহজ করে বলতে হয়তো শুধু তিনিই পারেন। একদম প্রস্তর যুগের সমাজ থেকে আজকের সমাজ ব্যবস্থা, এসবকিছু সম্পর্কে ধারাবাহিকভাবে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছেন। আর শেষে মার্ক্স ও এঙ্গেলস এর সংক্ষিপ্ত পরিচয় বা ইতিহাস যতটুকু টেনেছেন সেটা বইটার এক অন্যতম আকর্ষণ ছিলো। কেউ যদি মার্কসবাদ সম্পর্কে জানতে চায়, সে যেন এই বইটা দিয়েই শুরু করে।