Jump to ratings and reviews
Rate this book

মাল্যবান: মূলানুগ পাঠ

Rate this book
মাল্যবান: মূলানুগ পাঠ। বেঙ্গল সংস্করণে এই উপন্যাসটি মূল পাণ্ডুলিপি অনুসারে সম্পাদনা করেছেন ভূমেন্দ্র গুহ। এবং বইটির শেষে প্রায় অর্ধেক বইজুড়ে উপন্যাসে উল্লিখত প্রসঙ্গগুলোকে বিস্তৃতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন তিনি। যার কারণে উপন্যাসটি হয়ে উঠেছে ভিন্নমাত্রাসঞ্চারী।বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন শিল্পী রফিকুন নবী।

অনেক মনে করেন ‘মাল্যবান’ জীবনানন্দ দাশের লেখা প্রথম উপন্যাস, কথা সত্য নয়। এটা হয়তো প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস। এই উপন্যাসের রচনাকাল ১৯৪৮ সালে। এটি প্রথম প্রকাশ হয় ১৯৭০ সালে।

‘মাল্যবান’ উপন্যাস একটি দাম্পত্য জীবনের আখ্যান। এখানে প্রকৃত অর্থেই জীবনানন্দ আধুনিক হতে পেরেছেন। ব্যক্তি মানুষের অসহায়ত্ব, জীবন নিয়ে খেলা, আপস করার কৌশলকে দেখে তা থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছেন। তাঁর চেষ্টার প্রতিনিধিত্ব করে তাঁর রচিত ’মাল্যবান’ চরিত্রটি। আড়াইশো টাকা মাইনে পাওয়া মাল্যবানের আর্থিক সামর্থ্য কম; কিন্তু মাল্যবান তার স্ত্রী উৎপলা ও সন্তান মনুকে সুখে রাখতে চায়। কিন্তু আধুনিকা উৎপলা চায় জৌলুস। তাই মাল্যবান ছিটকে পড়ে। উৎপলা বাড়ির ওপরের ঘরে ভালো কক্ষে আরামে থাকে। সেখানে মাল্যবানের স্থান হয় না। মাল্যবানকে জীবন কাটাতে হয় বাড়ির নিচের তলার কক্ষে ইঁদুরের সঙ্গে। উৎপলার কাছে আনন্দ করা, পার্টি করা, সিনেমা দেখা, পার্কে ঘুরে বেড়ানোই জীবনের নাম। দামি শাড়ি পরার মধ্যেই সে শান্তি পেতে চায়। মাল্যবান উৎপলার এ দাবি মেটাতে পারে না। এক সময় উৎপলা মাল্যবানের সামনেই গ্রহণ করে সমরেশকে। নিত্য অভাবে রোগাক্রান্ত কল্যাণী হেমের সঙ্গে সুখী নয়। তবু সে আপস করেছে ভাগ্যের সঙ্গে, জীবনকে বয়ে বেড়িয়েছে। পরবর্তী সময়ে মাল্যবান উপন্যাসে জীবনানন্দ যেন সে দায় এড়াতে চাইছেন। যেন কল্যাণীর যন্ত্রণাকে উপলব্ধি করেই উৎপলা-সমরেশ আখ্যানের সূচনা।

জীবনানন্দের উপন্যাসে সংঘাত আছে, আছে গভীর জীবনবোধ। এ সংঘাত সমাজের সঙ্গে নয়, ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির নিজের অস্তিত্বের। তাই মাল্যবান, উৎপলা, হেম, কল্যাণী সবার বেদনাই আলাদা, অস্তিত্বের যন্ত্রণাও আলাদা। তারা পরস্পর বিপরীত মেরুতে অবস্থান করেছে। জীবনকে, দাম্পত্য জীবনকে তিনি এক উৎকট রূপে প্রত্যক্ষ করেছেন। কখনো মনে হয়েছে হয়তো প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিজীবন এমনই আবার পরক্ষণেই এ নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হয়েছেন। যে সংকট নিজে অনুভব করেছেন সেটা এতটা খোলামেলা প্রকাশ হোক তা হয়তো চাননি জীবনানন্দ দাশ। এখানে জীবনের গভীরতা আছে। আধুনিক মানুষের অস্তিত্বের সংকট আছে।

পরিশেষে বলা যায়, যেহেতু ভূমেন্দ্র গুহ সম্পাদিত ‘মাল্যবান’ উপন্যাসের এই সংস্করণটি মূল পাণ্ডুলিপি অনুসারে মূলানুগ পাঠের মধ্য দিয়ে গ্রন্থিত হয়েছে সেহেতু এটিকে আমরা সর্বশেষ নির্ভুল গ্রন্থ বলতে পারি।

192 pages, Hardcover

First published September 1, 1970

1 person is currently reading
2 people want to read

About the author

Bhumendra Guha

10 books2 followers
Dr. BN Guha Roy Chowdhury alias Bhumendra Guha, was known as the researcher who enriched Bangla literature by bringing works of eminent poet Jibanananda Das to public view.

Born on August 2, 1933, Guha himself was a poet and a literary critic and had published 10 poetry collections.

Guha, a cardiac surgeon by profession, edited the manuscript of Jibanananda's works “Kobitar Kotha”, “Ruposhi Bangla”, “Bela Obela Kalbela” and fiction “Mallyaban” and deciphered about 1,500 poems by Jibanananda.

The Jibananda Das Academy in Bangladesh yesterday expressed deep shock at the death of this litterateur.

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
1 (33%)
4 stars
0 (0%)
3 stars
1 (33%)
2 stars
0 (0%)
1 star
1 (33%)
Displaying 1 - 2 of 2 reviews
Profile Image for Shamsudduha Tauhid.
57 reviews5 followers
June 15, 2023
মাল্যবান।
কলেজ স্ট্রিট এর একটা ভাড়াটে বাড়িতে থাকে।
সাথে স্ত্রী উৎপলা ( ডাক নাম পলা) আর তাদের একমাত্র কন্যা ছোট্ট ‘মনু’।
বাড়িতে ছুটা ঝি-ঠাকুর এসে কাজ করে দিয়ে যায়।
দ্বিতীয় তলার ঘরে এক বিছানায় থাকে মনু আর উৎপলা। নিচের ঘরে থাকে মাল্যবান।

❝ওপরের বাকি ঘরটি মাল্যবানদের; স্ত্রী উৎপলা ঘরটিকে গুছিয়ে এমন সুন্দর ক'রে রেখেছে যে, দেখলে ভালো লাগে৷ ধব-ধবে দেয়ালে গোটা-কয়েক ছবি টানানো; একটা ব্রোমাইড এনলার্জমেন্ট: প্রৌঢ়ের, উৎপলার বাবার হয়তো, তার মা'র একটা অয়েলপেইন্টিং, মাল্যবানের শ্বশুর-পরিবারের আরও কয়েকটি লোকের ফোটোগ্রাফ - কয়েকটা হাতে-আঁকা ছবি (কে এঁকেছে?) -.....❞

‘মাল্যবান’ উপন্যাসের এমন শুরু মাল্যবান আর স্ত্রী উৎপলার দাম্পত্য জীবনের দূরত্ব টা অনুমান করায়। উৎপলার বাবার হয়তো.. ❝হয়তো❞? মাল্যবানের বিয়ের সময়ে হয়তো উৎপলার বাবা বেঁচে ছিলেন না, কিন্তু এই ছবির সাথে উৎপলা কখনো পরিচয় করিয়ে দেয়নি। আর বাকি স্বজনদের ছবি ❝কে এঁকেছে❞, তা নিয়েও হয়তো মাল্যবানের সাথে উৎপলা গল্প করেননি। কার দোষ, কে কেন বলেনি, এখনই বিচারে যাচ্ছি না। কিন্তু এটুকু তো স্পষ্ট যে, তাদের মধ্যে দূরত্ব ছিল।
এরপরে আগাই।
উৎপলা গাইতে ভালোবাসে। এস্রাজ, অর্গান, সেতার বাজাতে ভালোবাসে। খুব যে ভালো গায়, তা হয়তো নয়। ❝গান-টান মাল্যবান কিছুই জানে না, কিন্তু অনেক ক্ষণ পর্যন্ত খুব সহিষ্ণু ভাবে স্ত্রীর ষড়জ ঋষভ গান্ধার-টান্ধার সহ্য ক'রে যাওয়াই তার অভ্যাস, না হলে তা হয়ে উঠবে দুষ্ট সরস্বতী, তখন আর রক্ষা থাকবে না।❞
মাল্যবান তার স্ত্রীকে ভয় পান যদি তার গানের গলা নিয়ে স্বকীয় মন্তব্য করেন, তখন তার স্ত্রী রুদ্রমূর্তি ধারণ করবে। মাল্যবান কি অযথাই অভিযোগ করে যাচ্ছে? তার অভিযোগ কি বড্ড একপেশে?
এখন অব্দি আমরা আসিনি উৎপলার অংশে। ততক্ষণ অপেক্ষা করি আমরা।
❝ওপরের ঘরটায় পলা আর মনু শোয়। এক তলার ঘরে মাল্যবানের বিছানা, বৈঠক, সমস্ত।..
নিজে ইচ্ছে ক'রে স্ত্রীর কাছ থেকে এ-রকম ভাবে বিচ্ছিন্ন হয়নি সে। দোতলার ঐ একটা ঘরেই পলার ভালো ক'রে কুলিয়ে ওঠে না তেমন : কাজেই, সে স্বামীকে নিচের ঘরে গিয়ে শোবার ব্যবস্থা করতে বলেছে৷ অথচ দোতলার ঘরটা এক-তলার ঘরের চেয়ে ঢের বড়ো- আলো বাতাস রৌদ্র নীল আকাশের আনাচ কানাচ কিনারা, মূল- আকাশেরও বড়ো নীলিমায় বেশ মুখোমুখি প্রকৃতির সঙ্গে,মানুষের সঙ্গে।...❞

সারাদিন পরে যখন মাল্যবান বিছানায় গা এলিয়ে দেয়, এরপরে মনে পড়ে তার আজ জন্মদিন ছিল। বিয়াল্লিশ বছরে পা দিয়েছে সে। নির্ঘুম রাতে তার ঘরে দু'টো বেড়াল, নর ও মাদি, শীত রাতে কপট ঝগড়ার আড়ালে লুটোপুটি করে। স্মৃতি হাতড়ে খুঁজে বেড়ায় বাংলাদেশের পাড়াগাঁয়ের স্মৃতি। এই শহরে পনেরোটা বছর কেটে গেল, এই শহরই তার আস্তানা। একটা কাচপোকা, মৌমাছি, শামকল, মৌচুষকি জোনাকির কথা মনেও পড়ে না তার, আকাশের নক্ষত্রগুঁড়িগুলোর দিকে ফিরেও তাকায় না সে। মাঝরাতে ভেসে আসে কারো ফিটন গাড়ির আওয়াজ। পোলিটিকসে বাঙালিদের ভরাডুবি, বিপ্লব এসব ভেবে বিছানায় এ কাত-ও কাত করে সাড়ে তিনটে বাজল। ঘুম আসে না মাল্যবানের৷ এই শীতের মাঝরাতে তার স্ত্রী, কন্যা ঘুমিয়ে না জেগে দেখতে সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় আসে।
‘কিন্তু নেটের মশারি তুলতেই ব্যাপারটা হল অন্যরকম। উৎপলা জেগে উঠে প্রথম খুব খানিকটা ভয় খেলে; তারপর বিছানার ওপর উঠে ব'সে তার সমস্ত সুন্দর মুখের বিপর্যয়ে - মুহুর্তেই সে -ভাবটা কাটিয়ে উঠে- মরা নদীর বালির চেয়েও বেশি বিরসতায় বললে, ❝তুমি!❞’
উৎপলা তাকে ‘রাত দুপুরে ন্যাকরা করতে আসা গায়েন’, ‘ঢঙের বলির-কুমড়ো’ ইত্যাদি অভিদায় সম্বোধন করে৷ মাল্যবানের জন্মদিনের কথা মনে রাখা এর মধ্যে তো বলাই বাহুল্য।

মাল্যবানকে দোতলার ঘরে চান করতে দেয় না উৎপলা। ‘অফিসে যাবার সময় সাত-তাড়াতাড়ি চান ক'রে তুমি জল ময়লা করে ফেল- তুমি, বাপু, নিচের চৌবাচ্চায়ই নাইবে -’
‘কিন্তু যে দিন অফিস নেই?’
'হ্যাঁ, সেদিনও। ’

প্রায়ই নিচের তলার ঝিরা উঁকিঝুঁকি মেরে তার চান করা দেখে। ‘এক একটা বৌ ওপরের রেলিঙে ভর দিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আমার চান করা দেখে: যেন শিবলিঙ্গের কাক-স্নান হচ্ছে। ’

মাল্যবান আর উৎপলার সাথে তাদের কন্যা মনুর সম্পর্ক কেমন ছিল?

‘মাল্যবান সন্ধ্যার সময়ে মাঝে মাঝে ছাদে আসে; একটা চেয়ারে এসে অনেকক্ষণ চুপ ক'রে ব'সে থাকে৷ মাঝে মাঝে মনুকে ডেকে ইতিহাস ভূগোল পৃথিবীর কথা ধর্মের কথা, মনুষ্যত্ব, মানুষের জীবনের মানে - প্রথম মানে- মাঝারি মানে - বিশেষ করে অন্তিম অর্থ - সম্পর্কে অনেক জিনিস একে-একে শেখাতে যায় সে। মেয়েটির সে-সব খুব ভালো লাগে না- মেয়েটিকেও ভালো লাগে না মাল্যবানের; কিন্তু অনেক সময়েই মেয়েটি খুব নিরিবিলি শোনে; ভাসা ভাসা চোখ তুলে কী ভাবে, কেউ কি তা বলতে পারে।
উৎপলা বলে: মেয়েটা একেবারে বাপের গোঁ পেয়েছে।’

নিজের কন্যা হওয়া স্বত্বেও যে তার অপছন্দের জায়গাটাও অকপটে স্বীকার করে মাল্যবান।
মাল্যবান কখনো কখনো বড্ড রুথলেস হয়ে ওঠে।
‘এই স্ত্রীলোকটি মিষ্টি হোক, বিষ হোক, ঠান্ডা হোক, আমার জীবনের রাখা-ঢাকা সবুজ বনে আতার ক্ষীরের মতো কথাগুলো শুনতে আসবে- সে পাখিও নয়৷ ওর চেহারা যদি কালো, খারাপ হত, তা হলে তো চামারের মেয়েরও অযোগ্য হত।’
উৎপলার মেজদা আর বৌদি আসবেন ওদের বাড়িতে। খরচের একটা ব্যাপার চলে আসে। মাল্যবানের আড়াইশো টাকার বেতনে তাদের জন্য বড় বাড়ি ভাড়া নিলে পঞ্চাশ টাকাই চলে যাবে। এই আগাম খরচ সামাল দেওয়ার জন্য উৎপলা মাল্যবানের বিয়েতে পাওয়া সোনার ঘড়িটা বিক্রি করে দিতে বলে।
‘বাবা তিনশো টাকা দিয়ে তোমাকে ওটা কিনে দিয়েছিলেন। সেই বাপের কন্যে আমি তোমাকে বিক্রি করতে বলছি আমার ভাইয়ের সুবিধার জন্য। এ না ক'রে এ-ঘড়ি দিয়ে কাচপোকা টিপ পরবে তুমি!'

মাল্যবান নাস্তা না সেরে টেবিল থেকে উঠে পড়ে৷ কিন্তু অফিস থেকে ফিরে যখন খাবার টেবিলে বসে, ‘দেখি ভাতের থালাটা’ , উৎপলা আরেক প্রস্থ অপমান না করে পারে না। ‘আহাম্মক হবার বাকিও রাখনি কিছু- ’

‘মাল্যবানের ইচ্ছে হচ্ছিল এ-বারও উঠে যায় সে। কিন্তু তাতে কারু শিক্ষা হবে না। তার সামনে বসে তার কন্যা মনুকে চাটি মারে উৎপলা, তাতেও মাল্যাবন কিছু বলতে পারে না৷
মাল্যবান ভাবছিল: উচিত ছিল তার একা থাকা, খবরের-কাগজ পড়তে, অফিসে যেত, গোলদিঘিতে বেড়াত, সভা-সমিতিতে সামনের বেঞ্চে গিয়ে বসত, বেশি ক'রে যেত থিওজফির সভায়, ফ্রীম্যাসনও হত, রাত জেগে ডিটেকটিভ উপন্যাসের থেকে কলকাতা ইউনিভার্সিটির মিনিট, নানা রকম কমিশনের রিপোর্ট ব্লু-বুক: হাতের কাছে যা কিছু আসত, তা-ই পড়ত, ভাবত, উপলব্ধি করত- কেমন চমৎকার হত জীবন তা হলে।’

স্ত্রী উৎপলা মাল্যবানের সাথে মানিয়ে নিতে পারে না। ‘একজন বেশ্যার সঙ্গেও যদি সমান ভাগে তোমার সম্পর্কে আমার দায়িত্ব ভাগ ক'রে নিতে পারতাম, তা হলে এতটা দম আটকে আসত না আমার-’

মাল্যবানের জীবনে একটি মাত্র সন্তান, আর এখন বিশেষ প্রেমও হয় না উৎপলার সাথে, উৎপলার যে অনাগ্রহ তাতে। বড়দা আর বোঠান এর খবর পায় তারা। বোঠানের ছাপ্পান্ন বছর বয়সে সন্তান সম্ভবা। আর এতে উৎপলা বেশ খুশি। আর তাদের উপহার পাঠাতে মরিয়া হয়ে ওঠে উৎপলা। কিন্তু তার সাথে স্বামীর যে দূরত্ব আছে, তা মনে করে মাল্যবান ভাবে: ‘আমার প্রতি সে যতখানি বিমুখ, অন্য কোনও পুরুষমানুষের জন্যে ঠিক ততখানি আগ্রহ তার থাকতে তো পারত; তা হলে কী হত? বেশ ঝরঝরে নদীর পাশে তরতাজা সবুজে সবুজে ফন-ফন ক'রে উছলে উঠতে পানের বন তা হলে, উৎপলার ধানের বন নীল-কালো সাপ-শিষের মতো রোদে বাতাসে- হাওয়া-বৃষ্টির নিঝোর ফসলানির ভেতর।’

তবুও তাদের মাঝে প্রেম হয়। শবদাহ- আর মাটিতে পোঁতা লাশ নিয়ে গল্প করতে করতে এক নেক্রোফিলিয়ার প্রসঙ্গ আসতে শরীর প্রেমে জেগে ওঠে দু'জনেই। তাদের প্রেম-রমন পরস্পরের ভালোবাসার শৃঙ্গারে জাগে না।

মাল্যবানকে দেখেছি এক থাকার বাসনায় মগ্ন হতে। কিন্তু মাল্যবানের ডিলেমা দেখি এখানে-
‘মাল্যবান যা-ই মনে করুক না কেন, স্ত্রী-সন্তানের পাট উঠিয়ে দিয়ে একা একা আইবুড়ো থেকে জীবন কাটানো খুব শক্ত হত তার পক্ষে। গোলদিঘিতে ঘুরে বারো-চোদ্দো বছর সে অনেক হাওয়াই ফসল ফলিয়ে গেছে; সমাজ-সেবা, দেশ-স্বাধীনতার জন্যে চেষ্টা, বিপ্লবের তাড়না-তেজ, নির্বৈপ্লবিক মনের চারণা, উনিশ শতকের নিশায়মান সমুদ্র-তীর:... নিজের জীবনটাকে অনেক সময়েই অসার ও নিষ্ফল মনে হয়েছে তার। কিন্তু তবুও এই পাকা চাকরিটুকু, স্ত্রী ও মেয়ে, কলেজ স্ট্রিটের ঘর তিনখানা: এর চেয়ে অন্য কোনও সাফল্যের উত্তমর্ণতা তার জীবনে কোনও দিন ঘ'টে উঠত কি?’

প্রায়শই দেখা যায় অফিসের কোনো সহকর্মীর স্ত্রী অসুস্থ বা মারা গেলে মাল্যবান ছুটে যেয়ে উৎপলা কেমন আছে দেখতে যায়! এমনকি রাত-দুপুরে নীচের তলার ঘরে নির্ঘুম মাল্যবানের যখন মনে হতো, উৎপলা কেমন আছে দেখে আসি, তৎক্ষনাৎ ছুটে যেয়ে দোতলার ঘরে যেয়ে দেখে আসত৷

এক রাতে মাল্যবানের ঘরের জানালা দিয়ে কে যেন এক বেড়াল ছানা ছুঁড়ে দেয়, আর সে বেড়াল ছানা সারা রাত ক্রমাগত কাঁদে৷ মাল্যবান ভাবে, এর বাপ-মা গত ঋতুর কৃতকর্মের দায়িত্ব থেকে খালাস, কই, জীবন তো তাদের শাস্তি দিচ্ছে না, কিন্তু মানুষের জীবন! মাল্যবান সংসারের দায়িত্ব টেনেও ভালোবাসার দেখা পায়ন না৷ বেড়ালের এই প্রশ্রয় মূলক জীবনকে মুহুর্তের জন্য ঈর্ষা করে ওঠে। কিন্তু বেড়ালের চিৎকার শুনে সে আর স্থির থাকতে পারে না। তাই, দেয়ালে আছাড় মেরে ফেলে বেড়াল ছানাকে।
বেড়াল ছানা খুনের পরে মাল্যবান খেতে পারে না। চুলে তেল ওঠে না। কিন্তু তার এ সাময়িক পরিবর্তন চোখে পড়ে না উৎপলার। মাল্যবানকে জিজ্ঞেস করার কেউ থাকে না।

স্ত্রীর মেজদা মেজবৌদি, ওদের ঘরে কাজে আসলে কয়েক মাসের জন্য মাল্যবান কে থাকতে হয় মেসে, মাল্যবান নিজের মেয়ের জন্য রাত দুপুরে ঔষধ দিয়ে যান বাড়িতে, তখন মাল্যবানের মনে হয়, এ ভালোবাসা নয়, কাম নয়, এ তো করুণা করছে সবাইকে,,, নিজেকে অতিমানবের মতো মনে হয়, পরক্ষণেই নিজে লজ্জা পায় অহঙ্কার বোধ আসছে দেখে,
কিন্তু কিছুদিন থেকে তার স্ত্রীর ঘরে অন্য এক পুরুষ অমরেশ আসে তার স্ত্রীর কাছে গান শুনতে,, গল্প করতে৷ ঘন্টার পর ঘন্টা থাকে, অফিসে যেয়েও মাল্যবান তাদের সম্পর্ক নিয়ে দুশ্চিন্তা করে, উৎপলা আর অমরেশের মেলা মেশা শালীন স্বাভাবিক কিনা, তখন, মাল্যবান নিজের মেয়ের কথা ভুলে যেয়ে বলেন, ❝দয়া জিনিসটাকে চুতিয়া বলে মনে হয়।❞

অমরেশ, সন্ধায় সাইকেল নিয়ে আসে, রাত এগারোটা বারোটা অব্দি থাকে। কখনো দোতলার ঘরে থেমে যায় গান বাজনা, বিরাজ করে অখন্ড নীরবতা৷ মাঝে মধ্যে অন্ধকার হয়ে যায় দোতলার ঘর। আজকাল মনুকে থাকতে হয় মাল্যবানের ঘরে৷
মাল্যবান সব দেখে কিন্তু কিছু বলে না।

এক রাতে সাইকেল নিয়ে বের হওয়ার সময় নীচের তলার অন্ধকার ঘরে অমরেশ মাল্যবান কে দেখে জিজ্ঞেস করে, 'ঘুমান নি চাঁদ মোহন বাবু?’

মাল্যাবন জিজ্ঞেস করে, 'শীতের রাত বারোটা, আর স্ত্রীর কাছে কী দরকার ছিল আপনার?’
অমরেশ উত্তর দেয়,' কথা বলতে বলতে রাত তো হবেই'।
উৎপলার পূর্ব পরিচিত বন্ধু ছিল না অমরেশ। পরিচয় সূত্র জানতে চাইলে অমররেশের উত্তর-
'চাঁদ মোহন -দা, চিনি তো পিঁপড়ের গন্ধ পায় না, পিঁপড়েকেই খুঁজে নিতে হয়.।'

অন্ধকার ঘরে দুইজন পুরুষ মুখোমুখি - একজন শিশ্নোদরপরায়ণ আরেক জন সূক্ষ্ম রুচিবোধের মানুষ, যে মানুষ পাখি ভালোবাসা, ভালোবাসে সবুজ পাড়াগাঁ। তাদের সিগারেটের ধোঁয়া একে অপরকে কেটে চলে।

মাল্যবান দোতলার ঘরে রাতের খাবার খেতে এলে দেখে উৎপলার ঢিলেঢালা শাড়ি পরনে। উৎপলাও খেয়াল করল, মাল্যবান এসব খেয়াল করেছে।
মাল্যবান অমরেশকে নিয়ে প্রশ্ন জিগ্যেস করলে উৎপলা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নানা কথা বলে, মাল্যবান বলে, এতদিন এসবে হাত বাড়াই নি। উৎপলা উত্তর দেয়, ‘আজ হাত বাড়াচ্ছ কেন?'

মাল্যবান কথা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে খাবার টেবিলে ঘুমিয়ে পড়ে। উৎপলাও এতটুকু প্রয়োজন মনে করল না তাকে জাগিয়ে দেওয়ার।

পাঠ অনুভূতি:

জীবনানন্দ দাশ জানতেন উপন্যাস কী জিনিস! পশ্চিমা উপন্যাস নিয়ে খোঁজ খবরও রাখতেন। ফ্রয়েড, ইয়ুং সম্পর্কে জানতেন৷ মাল্যবানে অস্বীকার করেছেন ফ্রয়েডকে। এক কথায় ফ্রয়েডকে অস্বীকার করে মডার্নিজম কে অতিক্রম করে পোস্ট মডার্নিজম এ লিখেছেন তাঁর উপন্যাস। তিনি এই উপন্যাস লিখেছিলেন আগামী দিনের জন্য। পত্রিকার সম্পাদকদের জিজ্ঞেস করতেন, উপন্যাস ছাপানোর বিষয়। সঞ্জয় ভট্টাচার্যকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ছদ্মনামে উপন্যাস ছাপানো যাবে কিনা। এরপর আর কথা আগায়নি।
ট্রাঙ্কবন্দি হয়ে রইল কত বছর!
১৯৪৮ সালে জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন মাল্যবান। আর ১৯৭০ সালে তাঁর ছোট ভাই অশোকানন্দের তত্বাবধান প্রকাশিত হয় মাল্যবান উপন্যাস। এই মাল্যবান উপন্যাস না ছাপাতে লাবণ্য দাশ নাকি অনেক চেষ্টা করেছিলেন৷
মাল্যবান উপন্যাসটি পড়ে অসোয়াস্তি আসে। আপনি পড়ে আর আগের মানুষ থাকতে পারবেন না। হৃদয় ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে।
পড়তে পড়তে বার বার মনে হবে এ তো জীবনানন্দ তাঁর নিজের জীবনের কথাই বলেছেন। জীবনানন্দ দাশ বিয়ের দশ বছর পরে ডায়েরিতে লিখেছিলেন, our marriage is a scrap।
তবুও জীবনানন্দ মাল্যবানের মতোই পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল ছিলেন।
রামায়ণে বর্ণিত ‘মাল্যবান’ পর্বত ছিল ধৈর্যের প্রতীক। এখানেও মাল্যবান পর্বতপ্রমাণ ধৈর্য নিয়ে সংসারে ছিলেন। কখনো কখনো তার চিতে-বাঘ হৃদয় গর্জে ওঠে।
‘মাল্যবান’ উপন্যাসে জীবনানন্দ দাশ সংসারের প্রেমবর্জিত, কাম আকাঙ্ক্ষিত এক পুরুষ, জীবন সংসারের নগ্নরূপ চিত্রিত করেছেন।
Displaying 1 - 2 of 2 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.