সীরাতের গ্রন্থ সাধারণত দুই ধরণের হয়। প্রথম হচ্ছে সেই সকল গ্রন্থ যেখানে ব্যক্তি মুহাম্মদের (সা:) জীবনীকে তার জীবনের বিভিন্ন ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা তথ্যসূত্র সহকারে বর্ণনা করা হয় (যেমন আর রাহিকুল মাখতুম)। এই ধরণের গ্রন্থের মান যাচাই করা হয় তথ্যসূত্রের নির্ভরযোগ্যতার উপরে। যার নির্ভরযোগ্যতা যত বেশি এবং যে যত বেশি বিস্তারিত তার স্থান তত উপরে। কিছু কিছু এই ধরণের গ্রন্থে ঘটনা বর্ণনার পাশাপাশি সেখান থেকে শিক্ষণীয় বিষয়গুলোও উল্লেখ থাকে (যেমন মুহাম্মদ আল গাজালী রচিত ফিকহুস সীরাত)। এই বিষয়টি গ্রন্থে ভিন্ন মাত্রা আনে। সাথে সাথে অবশ্যই সমালোচনার মাত্রাও বাড়ে। কারণ একই ঘটনা থেকে কেউ যে শিক্ষা নেয়, অন্যরা সেই শিক্ষা গ্রহণ নাও করতে পারেন। দ্বিতীয় আরেক ধরণের সীরাহ পাওয়া যায় যেখানে নবী, নবুওয়ত, রাসূল, রিসালাত ইত্যাদি তাত্ত্বিক আলোচনার মাত্রা বেশি থাকে। ঘটনার চেয়ে ঘটনার বিশ্লেষণ অধিক এবং কোন কোন ক্ষেত্রে সেই আলোচনা জীবনের বাস্তব কর্মক্ষেত্র ছাড়িয়ে একাডেমিক আলোচনা পর্যালোচনায় রূপ নেয়। এই ধরণের একটি সীরাত হচ্ছে সীরাতে সরওয়ারে আলম এবং মাওলানা আবুল কালাম আযাদ (রহ:) রচিত রাসূলে রহমত (সা:)। কিন্তু মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ (সা:) একটি ব্যতিক্রমধর্মী সীরাত। এটিকে মুহাম্মদ (সা:) এর কোন প্রচলিত জীবনী নয়, বরং আদর্শ হিসেবে ইসলাম কীভাবে আরবের মুশরিকদের পৌত্তলিকতা আর মদীনার মুনাফিকদের প্রবঞ্চনার সাথে ২৩ বছরের কঠোর সংগ্রামের মাধ্যমে বিজয়ী হয়েছিল তার বিবরণ। আর যেহেতু এই পরিবর্তনের কেন্দ্রীয় ব্যক্তি ছিলেন মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ (সা:), তাই অবধারিতভাবেই এই বর্ণনায় রাসূলের জীবনীর অধিকাংশ অংশ চলে এসেছে। এই সীরাতটির এই ধারার সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে লেখক আপনাকে পাঠক হিসেবে মক্কার সেই কঠিন দিনগুলোয় রাসূল (সা:) ও তার সেই সাহাবীদের একেবারে পাশে নিয়ে উপস্থিত করাবেন। মদীনার মুনাফিকদের অব্যাহত ষড়যন্ত্রকে আপনি একেবারে দিব্যচোখে দেখতে পাবেন। ব্যক্তি মুহাম্মদের (সা:) চরিত্র আপনার কাছে একেবারে জীবন্ত হয়ে ধরা দেবে। আপনি হৃদয় থেকে শ্রদ্ধা আর ভালবাসায় অন্তর থেকেই বুঝতে পারবেন কেন যুগে যুগে এই মানুষটিকে নিয়ে অজস্র নাতে রাসূল রচিত হয়েছে। অনন্য বৈশিষ্ট্য: যে দিকটি এই সীরাতকে অন্যান্য সকল সীরাত থেকে আলাদা করেছে তা হচ্ছে এর বর্ণনাধারার জীবন্তরূপ। মনোযোগ দিয়ে পড়লে এই বইটি আপনাকে রাসূল (সা:) এর জীবনকে আপনার কল্পনায় একেবারে বাস্তব হিসেবে উপস্থাপন করবে। সবচেয়ে ভাল লেগেছে: বইটিতে মোট ৬টি অধ্যায় আর ৩টি পরিশিষ্ট আছে। সত্যিকার অর্থে প্রতিটি অধ্যায়ই এত ভাল লেগেছে যে তাদের মধ্যে প্রথমকে বেছে নেওয়া কঠিন। তারপরে বলতে গেলে বলতে হয় প্রথম অধ্যায়টির কথা। এটি মূলত সীরাত সম্পর্কে লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি। গ্রন্থের শুরুতেই লেখক পাঠক হিসেবে সীরাত সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করাবেন। অত:পর ২য় অধ্যায় থেকে আপনাকে সীরাতের সেই সুমহান বর্ণনায় নিয়ে যাবেন যেখানে আপনি আপনার কল্পনায় জীবন্ত মুহাম্মদ (সা:) ও তাকে অনুসরণকারী এই উম্মাতের শ্রেষ্ঠ মানুষদেরকে দেখতে পাবেন। দেখতে পাবেন কীভাবে আল্লাহ রব্বুল আলামিন ইসলাম নামক এই আদর্শ আর ব্যক্তি মুহাম্মদ (সা:) এর ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে আরবের সেই অন্ধকার যুগের ডাকাত সর্দার আবু যর গিফারী (রা:) আর উমারের (রা:) মত কঠিন হৃদয়ের ব্যক্তিদের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সোনালী মানুষে পরিণত করেন। সীমাবদ্ধতা: পাঠক হিসেবে যেটা সীমাবদ্ধতা মনে হয়েছে সেটি হচ্ছে, এই গ্রন্থটিতে লেখক একের পর এক ঘটনা উল্লেখ করেছেন এবং বইয়ের শেষে তথ্যসূত্র হিসেবে ৩৩টি বইয়ের নাম উল্লেখ করেছেন। কিন্তু কোন বর্ণনাটির সূত্র কোনটি সেটি উল্লেখ করেননি। অর্থাৎ ঘটনাগুলোর রেফারেন্স যথাযথ স্থানে উল্লেখ হয়নি। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি কোন দূর্বল বর্ণনা পাইনি, তারপরেও বলতে হয়, ঘটনাগুলোর যথাযথ রেফারেন্স থাকলে বইটির সৌন্দর্য আরো বাড়ত। সব মিলিয়ে, যারা আশ্চর্য হয় কীভাবে মাত্র ২৩ বছরে একটি আদর্শ আর একজন ব্যক্তি অন্ধকার জাহেলী আরবের মরুচারী মানুষগুলোকে ভিতর থেকে বদলে দিল, কীভাবেই বা গত ১৪শত বছর যাবত কোটি কোটি মানুষের কাছে সেই আদর্শ এত জনপ্রিয়, কেনইবা ইতিহাসের একমাত্র ব্যক্তি হিসেব মুহাম্মদ (সা:) কে আজো কোটি কোটি মানুষ প্রতিটি পদে অনুসরণ করতে চায়, তাদের প্রশ্ন আর কৌতুহলের একটি চমৎকার জবাব হবে এই বইটি। মূল বইয়ের নাম: মুহসিনে ইনসানিয়াত মূল ভাষা: উর্দূ অনূদিত নাম: মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ (সা:) লেখক: নঈম সিদ্দিকী অনুবাদ: আকরাম ফারুক প্রকাশনায়: শতাব্দী প্রকাশনী মূল বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৫৭২ সম্পাদনা: শায়খ আব্দুস শহীদ নাসিম