What do you think?


দারিদ্র্যের অর্থনীতি : অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ
দারিদ্র্য নিয়ে সুসংবাদ রয়েছে, আবার দুঃসংবাদও রয়েছে। সুসংবাদ হলো ১৯৯০ সালে বিশ্বে ৫৫.১ শতাংশ মানুষ সহনীয় দারিদ্র্যরেখার নিচে ছিল; ২০১৫ সালে এই হার ২৬.৩ শতাংশে নেমে আসে। দুঃসংবাদ হলো ২০১৫ সালে পৃথিবীতে ১৯৩.৪ কোটি দরিদ্র ছিল। ১৯০০ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল ১৬৫ কোটি; ১৮০০ সালে ছিল ১০০ কোটি। সম্পূর্ণ দারিদ্র্য নিরসন এখনো অনেক দূরে। যাঁরা আশাবাদী, তাঁদের প্রত্যাশা হলো বিশ্ব থেকে দারিদ্র্য নিমূর্ল হয়ে যাবে; দারিদ্রে্যর নিদর্শন শুধু বেঁচে থাকবে জাদুঘরে। যাঁরা আশাবাদী নন, তাঁরা মনে করেন যে শুধু বর্তমান অর্জনের ভিত্তিতে দারিদ্র্য নিরসনের চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা যাবে না। দারিদ্র্য নিরসনকে অতীতের প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে এবং ভবিষ্যতের দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখতে হবে। তাই এই বইয়ে দারিদ্রে্যর পরিমাপ ও সংজ্ঞা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। দারিদ্রে্যর সংজ্ঞার পরিবর্তনও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যারা ক্ষুধার্ত শুধু তারাই দরিদ্র নয়, আজকে যারা বেকার, তারাও গরিব। ধনবৈষম্যের ত্রিভুজের সর্বনিম্ন ৪০ শতাংশ মানুষও দরিদ্র। বইটি লেখা হয়েছে সাধারণ পাঠকের জন্য, দারিদ্র্য নিরসনের জন্য যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের জন্য এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে দারিদ্র্য নিয়ে যাঁরা পড়ছেন, তাঁদের জন্য। ড. ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংক ও ক্ষুদ্রঋণ, ফজলে হাসান আবেদের বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক, আখতার হামিদ খানের কুমিল্লা মডেল এবং দারিদ্র্য নিরসনে ইসলামী ব্যাংকের ভূমিকার মতো বিতর্কিত বিষয়গুলো বক্তানিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করা হয়েছে।
- GenresEconomics
447 pages, Hardcover
Published February 1, 2020
About the author
Akbar Ali Khan
17 books126 followersAkbar Ali Khan (Bengali: আকবর আলি খান) was a Bangladeshi economist and educationist who served as a bureaucrat until 2001. He was the SDO of Habiganj during the Bangladesh Liberation War, when he decided to join the war. Later he served as an official of the Mujibnagar Government. After the independence he joined back the civil serviceand reached to the highest post of Cabinet Secretary and also worked as a university teacher. His book Porarthoporotar Orthoniti (Economics of Other-minding) has been a popular book on economics à la Galbraith.
Ratings & Reviews
Friends & Following
Create a free account to discover what your friends think of this book!
Community Reviews
Displaying 1 - 6 of 6 reviews
June 13, 2020
সর্বগ্রাসী দারিদ্র্য এবং তা থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে বিশ্বে হরদম আলোচনা চলছে। আকবর আলি খানও এই আলোচনায় শরিক হলেন। কেন তিনি দারিদ্র্য নিয়ে এই বইটি লিখলেন তার উত্তর লেখক নিজেই দিয়েছেন,
' দীর্ঘ ৫২ বছর ধরে দারিদ্র্য নিয়ে পড়াশোনা করেছি, কোথাও নিরীক্ষা করেছি, কোথাও সরাসরি কাজ করেছি। এসব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই আমি এই বই লিখেছি। '
সুজলা, সুফলা, শস্য, শ্যামলা এক বাংলার কথা আমরা শুনি। ইংরেজ আসার আগে, পাকিস্তান হওয়ার পূর্বে আমাদের গোলাভরা ধান ছিল, গোয়ালভর্তি গরু ছিল এবং তিনবেলা ভরপেট খাবার ছিল - এমনই এক সোনার বাংলার কথা প্রায়শই এদেশ সম্পর্কে বলা হয়। এমনকি সত্তর সালে একটি রাজনৈতিক দলের স্লোগান ছিল 'সোনার বাংলা শ্মশান কেন '। কিন্তু আকবর আলি খান বাংলার প্রাচুর্য নিয়ে এই মিথগুলোকে ভেঙে দিয়েছেন। সুলতানি এবং মোঘল আমলে বাংলার প্রাচুর্য নিয়ে যেসব তথ্যসূত্র দেওয়া হয় তার বড় একটি অংশ বিদেশি পর্যটকদের স্মৃতিকথা এবং বাদশাহের পোষা ইতিহাসলেখকদের গ্রন্থ। এসকল তথ্যসূত্রে বাংলার মানুষের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার প্রতিফলন হয়নি৷ যেমন, শায়েস্তা খানের আমলে এক টাকায় আটমণ চাল পাওয়া যেতো। এই তথ্যের দুইটি তাৎপর্য আছে। প্রথমত, এদেশে জিনিসপত্র খুব সস্তা ছিল। দ্বিতীয়ত, এখানকার জনগণ এতো গরিব ছিল যে, তাদের চাল কেনার মতো পয়সাও থাকতো না৷ তাই টাকা এতো মহার্ঘ হয়ে উঠেছিল। আমাদের ঐতিহাসিক এবং গল্প-কাহিনিকারেরা শুধু সস্তার বয়ানটি গ্রহণ করেন। অর্থনীতির সূত্রকে নির্দ্বিধায় অগ্রাহ্য করে বাংলাকে প্রাচুর্যের মিথ বিনির্মাণে উৎসাহী হয়ে ওঠেন।
এদেশের প্রাচুর্যের মিথ তৈরির অন্যতম হাতিয়ার বিদেশি পর্যটকগণ৷ যেমন, ইবনে বতুতার সফরনামায় বাংলায় সস্তা দামে পণ্য, পোশাক এবং দাসী ক্রয়ের বিবরণ রয়েছে৷ এই বর্ণনাকে আক্ষরিকঅর্থে ধরে এদেশের পণ্ডিতমহল সোনার বাংলার সোনালি অতীতের কথা ভেবে অশ্রুপাত করে। কিন্তু তারা ভুলে যায়,
' বিদেশি পর্যটকেরা এ দেশে স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রায় আয় করত। অথচ এ দেশের মানুষেরা কড়িতে আয় করত। তারা ব্যয়ও করত কড়িতে৷ স্বর্ণ বা রৌপ্যমুদ্রায় যারা আয় করত, তাদের কাছে বাংলায় পণ্যের দাম অত্যন্ত সস্তা মনে হতো। '
কারা দরিদ্র, কে দারিদ্র্যসীমার নিচে কিংবা ধনী লোক কাদেরকে বলা যায় তা নিয়ে বিস্তর হাঙ্গামা হুজ্জত। খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, ২১২০ কিলোক্যালরির কম খাদ্য গ্রহণকারী দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের দাবি ২২৬০ ক্যালরির কম পেলে তারা হতদরিদ্র। অর্থাৎ খাদ্য গ্রহণের ভিত্তিতে দারিদ্র্যসীমা নির্ধারণে বির্তক বিদ্যমান।
আবার ক্রয়ক্ষমতার বিবেচনায় দৈনিক ১ ডলার ৯০ সেন্ট ব্যয় করার সামর্থ্য আছে এমন ব্যক্তিকে হতদরিদ্র এবং ৩ ডলার ১০ সেন্টকে সহনীয় দারিদ্র্যসীমা বলে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। আকবর আলি খানের মতে, এই ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনা করলে পৃথিবীর অনেক দেশই গরিব দেশের কাতারে চলে যাবে। অথচ এই দেশগুলি হয়তো ক্যালরি গ্রহণের হিসেবে ভালো অবস্থানে ছিল। অর্থাৎ ধনী-নির্ধন নির্ধারণ করাও সহজ কাজ নয়।
ইদানীং জিডিপি, মাথাপিছু আয় ইত্যাদির ভিত্তিতে উন্নত-অনুন্নত নির্ধারণ নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। অনেকের কাছেই এগুলোর চাইতে জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচক বেশি গুরুত্ব পায়। আকবর আলি খান খুব সুন্দরভাবে মানব উন্নয়ন সূচকের সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
১৯৭৩-৭৪ সালে সরকারি হিসেবে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল প্রায় ৪৩ শতাংশ। বর্তমানে তা ২১ ভাগে নেমে এসেছে। এটি নিঃসন্দেহে বড় সাফল্য এবং সাধুবাদের যোগ্য। কিন্তু কথা হলো এই সাফল্যকে যত বড় বলে প্রচার করা হয়, এটি প্রকৃত অর্থেই তত খুশি হওয়ার মতো অর্জন কি না তা নিয়ে ভাবার অবকাশ রয়েছে। কেননা দারিদ্র্যের হার হ্রাস জাতীয় পর্যায়ে যত বড় সংখ্যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের হিসেবে তা কত বড় এ নিয়ে আকবর আলি খানের সন্দেহ আছে। এই দ্বিধার নিকেষ করতেই প্রতিবেশী দেশগুলোর দারিদ্র্য বিমোচনের হারের সঙ্গে তুলনা করে দেখেছেন। যা পেয়েছেন তার একটি ছোট্ট অংশ,
' ভুটান, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপে হতদরিদ্রের হার বাংলাদেশের চেয়ে কম। শুধু ভারত ও নেপালে হতদরিদ্রের হার বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। '
এই হলো বিশ্বের রোল মডেলের অবস্থা!
দারিদ্র্য বিমোচনে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং ভৌত অবকাঠামো খাতের অবদান অত্যাধিক৷ কিন্তু এদেশে এই তিনটি খাতের কোনোটিতে সুষম বরাদ্দ দেওয়া হয় না। অবশ্য বিশাল আকারের বাজেট দেখে অনেকেই লেখকের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। তাদের সন্দেহ নিরসনের জন্য উন্নত এবং উন্নয়নকামী প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো তাদের জিডিপির কত শতাংশ শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং ভৌত অবকাঠামোর ব্যয় করে তার একটি তালিকা উপস্থাপন করেছেন। পড়লে বুঝবেন হস্তীসদৃশ মানে যেমন হস্তী নয়, তেমনি বেশি অঙ্কের বরাদ্দ মানেই পর্যাপ্ত বরাদ্দ নয়।
দারিদ্র্য বিমোচনে বেসরকারি সংস্থা যেমন, ব্রাক এবং গ্রামীণ ব্যাংকের ভূমিকা নিয়ে চমৎকার আলোচনা করেছেন৷ এনজিও এবং ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে যেসব ভালো ভালো কথা বাজারে প্রচলিত সে সবের বাইরেও অনেক কৃতিত্ব এনজিওগুলোর আছে। এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই৷ কিন্তু সমালোচকরা যেসব যুক্তিতে ক্ষুদ্র ঋণ এবং এনজিওগুলোর বিরোধিতা করেন তা ধর্তব্য আনেন নি আকবর আলি খান। বরং এনজিও এবং ক্ষুদ্র ঋণের সাফল্য নিয়ে অতিকথন করেছেন লেখক। ক্ষুদ্র ঋণ এবং এনজিও নিয়ে লেখকের অবস্থান ছিল একদম পক্ষপাতপুষ্ট। যেন কোনো এনজিওকর্মীর বক্তৃতা শুনছি! উল্লেখ্য, অবসর নেওয়ার পর ব্রাকের অধীনে কাজ করেছেন আকবর আলি খান।
হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম এবং শিখ ধর্মে সুদ নিয়ে কঠোরতা নেই। ইহুদি, খিষ্টান ধর্মে প্রথমে সুদ নিষিদ্ধ থাকলেও পরে তা বৈধ হয়ে গেছে। উদাহরণ দিয়ে বলি, পঞ্চদশ শতকের আগে গির্জা সুদকে নিষিদ্ধ মনে করতো। সুদখোরদের গোরস্থানে কবর দেওয়ার বিরোধিতাও করা হয়েছে। কিন্তু রেঁনেসার পর গির্জাই সুদের ব্যবসা করেছে! ইসলামে সুদ হারাম নাকি চড়া সুদ হারাম তা নিয়ে মতভেদ আছে। তবে বেশির ভাগ আলেম যেকোনোপ্রকার সুদ হারাম মনে করেন৷ সুদ ছাড়া ব্যাংকব্যবসা গড়ে ওঠার কথা নয়। তবু ইসলামি ব্যাংকিং নামে একটি টার্ম আমরা দেখি এবং ইসলামি ব্যাংকও গড়ে উঠেছে। যারা দাবি করে কোরান,সুন্নাহ মেনে, তারা হালাল ব্যবসা করছেন। আকবর আলি খান দেখিয়েছেন ইসলামি ব্যাংকিং বলে কিছু নেই৷ যে সাত ধরনের বিনিয়োগের ব্যবস্থা রয়েছে তাতে করজে হাসানা ব্যতীত সবগুলোর ভিত্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সুদ। মজার বিষয় হলো করজে হাসানা সাধারণত ব্যাংকগুলো দেয় না। মোটকথা, সুদমুক্ত ব্যাংকিংয়ের অস্তিত্ব কেতাবাদিতে থাকতে পারে। কিন্তু বাস্তবে তা সম্ভব নয়। তাই ইসলামি ব্যাংকিংয়ের নামে এদেশে যা চলছে তার সঙ্গে ইসলামের কোনো সংশ্রব নেই।
'দারিদ্র্যের অর্থনীতি' কাজের বই। কাজের বইয়ের ধর্ম হলো সেগুলো রস-কষহীন হয়ে থাকে। পড়ে কোনো আনন্দ পাওয়া যায় না। তবে সুফল আছে। আকবর আলি খানের স্বভাবসুলভ উইটধর্মী লেখনী এই বইতে পাবেন না। ডাটার পাহাড়ে চাপা পড়ার একটি সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এতবেশি তথ্য-উপাত্ত বইটিকে সাধারণ পাঠকের নাগালের বাইরে নিয়ে যাবে। দেবে পুরোদস্তুর একাডেমিক গ্রন্থের স্বীকৃতি। 'পরার্থপরতার অর্থনীতি'র আকবর আলি খান এখানে অনুপস্থিত। নিরপেক্ষতার নিশান ডক্টর খানকে এই বইতে মিস করবেন। তাই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি এ অনুযোগ থাকলো। অবশ্য দারিদ্র্য বিমোচন নিয়ে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনের অনেক খবরই পাবেন, দেশের প্রথাগত উন্নয়নের বুলিকে বাস্তবতার নিরিখে দেখার একটি দৃষ্টিকোণ আকবর আলি খান আপনাকে দেবে।
' দীর্ঘ ৫২ বছর ধরে দারিদ্র্য নিয়ে পড়াশোনা করেছি, কোথাও নিরীক্ষা করেছি, কোথাও সরাসরি কাজ করেছি। এসব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই আমি এই বই লিখেছি। '
সুজলা, সুফলা, শস্য, শ্যামলা এক বাংলার কথা আমরা শুনি। ইংরেজ আসার আগে, পাকিস্তান হওয়ার পূর্বে আমাদের গোলাভরা ধান ছিল, গোয়ালভর্তি গরু ছিল এবং তিনবেলা ভরপেট খাবার ছিল - এমনই এক সোনার বাংলার কথা প্রায়শই এদেশ সম্পর্কে বলা হয়। এমনকি সত্তর সালে একটি রাজনৈতিক দলের স্লোগান ছিল 'সোনার বাংলা শ্মশান কেন '। কিন্তু আকবর আলি খান বাংলার প্রাচুর্য নিয়ে এই মিথগুলোকে ভেঙে দিয়েছেন। সুলতানি এবং মোঘল আমলে বাংলার প্রাচুর্য নিয়ে যেসব তথ্যসূত্র দেওয়া হয় তার বড় একটি অংশ বিদেশি পর্যটকদের স্মৃতিকথা এবং বাদশাহের পোষা ইতিহাসলেখকদের গ্রন্থ। এসকল তথ্যসূত্রে বাংলার মানুষের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার প্রতিফলন হয়নি৷ যেমন, শায়েস্তা খানের আমলে এক টাকায় আটমণ চাল পাওয়া যেতো। এই তথ্যের দুইটি তাৎপর্য আছে। প্রথমত, এদেশে জিনিসপত্র খুব সস্তা ছিল। দ্বিতীয়ত, এখানকার জনগণ এতো গরিব ছিল যে, তাদের চাল কেনার মতো পয়সাও থাকতো না৷ তাই টাকা এতো মহার্ঘ হয়ে উঠেছিল। আমাদের ঐতিহাসিক এবং গল্প-কাহিনিকারেরা শুধু সস্তার বয়ানটি গ্রহণ করেন। অর্থনীতির সূত্রকে নির্দ্বিধায় অগ্রাহ্য করে বাংলাকে প্রাচুর্যের মিথ বিনির্মাণে উৎসাহী হয়ে ওঠেন।
এদেশের প্রাচুর্যের মিথ তৈরির অন্যতম হাতিয়ার বিদেশি পর্যটকগণ৷ যেমন, ইবনে বতুতার সফরনামায় বাংলায় সস্তা দামে পণ্য, পোশাক এবং দাসী ক্রয়ের বিবরণ রয়েছে৷ এই বর্ণনাকে আক্ষরিকঅর্থে ধরে এদেশের পণ্ডিতমহল সোনার বাংলার সোনালি অতীতের কথা ভেবে অশ্রুপাত করে। কিন্তু তারা ভুলে যায়,
' বিদেশি পর্যটকেরা এ দেশে স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রায় আয় করত। অথচ এ দেশের মানুষেরা কড়িতে আয় করত। তারা ব্যয়ও করত কড়িতে৷ স্বর্ণ বা রৌপ্যমুদ্রায় যারা আয় করত, তাদের কাছে বাংলায় পণ্যের দাম অত্যন্ত সস্তা মনে হতো। '
কারা দরিদ্র, কে দারিদ্র্যসীমার নিচে কিংবা ধনী লোক কাদেরকে বলা যায় তা নিয়ে বিস্তর হাঙ্গামা হুজ্জত। খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, ২১২০ কিলোক্যালরির কম খাদ্য গ্রহণকারী দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের দাবি ২২৬০ ক্যালরির কম পেলে তারা হতদরিদ্র। অর্থাৎ খাদ্য গ্রহণের ভিত্তিতে দারিদ্র্যসীমা নির্ধারণে বির্তক বিদ্যমান।
আবার ক্রয়ক্ষমতার বিবেচনায় দৈনিক ১ ডলার ৯০ সেন্ট ব্যয় করার সামর্থ্য আছে এমন ব্যক্তিকে হতদরিদ্র এবং ৩ ডলার ১০ সেন্টকে সহনীয় দারিদ্র্যসীমা বলে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। আকবর আলি খানের মতে, এই ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনা করলে পৃথিবীর অনেক দেশই গরিব দেশের কাতারে চলে যাবে। অথচ এই দেশগুলি হয়তো ক্যালরি গ্রহণের হিসেবে ভালো অবস্থানে ছিল। অর্থাৎ ধনী-নির্ধন নির্ধারণ করাও সহজ কাজ নয়।
ইদানীং জিডিপি, মাথাপিছু আয় ইত্যাদির ভিত্তিতে উন্নত-অনুন্নত নির্ধারণ নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। অনেকের কাছেই এগুলোর চাইতে জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচক বেশি গুরুত্ব পায়। আকবর আলি খান খুব সুন্দরভাবে মানব উন্নয়ন সূচকের সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
১৯৭৩-৭৪ সালে সরকারি হিসেবে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল প্রায় ৪৩ শতাংশ। বর্তমানে তা ২১ ভাগে নেমে এসেছে। এটি নিঃসন্দেহে বড় সাফল্য এবং সাধুবাদের যোগ্য। কিন্তু কথা হলো এই সাফল্যকে যত বড় বলে প্রচার করা হয়, এটি প্রকৃত অর্থেই তত খুশি হওয়ার মতো অর্জন কি না তা নিয়ে ভাবার অবকাশ রয়েছে। কেননা দারিদ্র্যের হার হ্রাস জাতীয় পর্যায়ে যত বড় সংখ্যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের হিসেবে তা কত বড় এ নিয়ে আকবর আলি খানের সন্দেহ আছে। এই দ্বিধার নিকেষ করতেই প্রতিবেশী দেশগুলোর দারিদ্র্য বিমোচনের হারের সঙ্গে তুলনা করে দেখেছেন। যা পেয়েছেন তার একটি ছোট্ট অংশ,
' ভুটান, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপে হতদরিদ্রের হার বাংলাদেশের চেয়ে কম। শুধু ভারত ও নেপালে হতদরিদ্রের হার বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। '
এই হলো বিশ্বের রোল মডেলের অবস্থা!
দারিদ্র্য বিমোচনে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং ভৌত অবকাঠামো খাতের অবদান অত্যাধিক৷ কিন্তু এদেশে এই তিনটি খাতের কোনোটিতে সুষম বরাদ্দ দেওয়া হয় না। অবশ্য বিশাল আকারের বাজেট দেখে অনেকেই লেখকের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। তাদের সন্দেহ নিরসনের জন্য উন্নত এবং উন্নয়নকামী প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো তাদের জিডিপির কত শতাংশ শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং ভৌত অবকাঠামোর ব্যয় করে তার একটি তালিকা উপস্থাপন করেছেন। পড়লে বুঝবেন হস্তীসদৃশ মানে যেমন হস্তী নয়, তেমনি বেশি অঙ্কের বরাদ্দ মানেই পর্যাপ্ত বরাদ্দ নয়।
দারিদ্র্য বিমোচনে বেসরকারি সংস্থা যেমন, ব্রাক এবং গ্রামীণ ব্যাংকের ভূমিকা নিয়ে চমৎকার আলোচনা করেছেন৷ এনজিও এবং ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে যেসব ভালো ভালো কথা বাজারে প্রচলিত সে সবের বাইরেও অনেক কৃতিত্ব এনজিওগুলোর আছে। এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই৷ কিন্তু সমালোচকরা যেসব যুক্তিতে ক্ষুদ্র ঋণ এবং এনজিওগুলোর বিরোধিতা করেন তা ধর্তব্য আনেন নি আকবর আলি খান। বরং এনজিও এবং ক্ষুদ্র ঋণের সাফল্য নিয়ে অতিকথন করেছেন লেখক। ক্ষুদ্র ঋণ এবং এনজিও নিয়ে লেখকের অবস্থান ছিল একদম পক্ষপাতপুষ্ট। যেন কোনো এনজিওকর্মীর বক্তৃতা শুনছি! উল্লেখ্য, অবসর নেওয়ার পর ব্রাকের অধীনে কাজ করেছেন আকবর আলি খান।
হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম এবং শিখ ধর্মে সুদ নিয়ে কঠোরতা নেই। ইহুদি, খিষ্টান ধর্মে প্রথমে সুদ নিষিদ্ধ থাকলেও পরে তা বৈধ হয়ে গেছে। উদাহরণ দিয়ে বলি, পঞ্চদশ শতকের আগে গির্জা সুদকে নিষিদ্ধ মনে করতো। সুদখোরদের গোরস্থানে কবর দেওয়ার বিরোধিতাও করা হয়েছে। কিন্তু রেঁনেসার পর গির্জাই সুদের ব্যবসা করেছে! ইসলামে সুদ হারাম নাকি চড়া সুদ হারাম তা নিয়ে মতভেদ আছে। তবে বেশির ভাগ আলেম যেকোনোপ্রকার সুদ হারাম মনে করেন৷ সুদ ছাড়া ব্যাংকব্যবসা গড়ে ওঠার কথা নয়। তবু ইসলামি ব্যাংকিং নামে একটি টার্ম আমরা দেখি এবং ইসলামি ব্যাংকও গড়ে উঠেছে। যারা দাবি করে কোরান,সুন্নাহ মেনে, তারা হালাল ব্যবসা করছেন। আকবর আলি খান দেখিয়েছেন ইসলামি ব্যাংকিং বলে কিছু নেই৷ যে সাত ধরনের বিনিয়োগের ব্যবস্থা রয়েছে তাতে করজে হাসানা ব্যতীত সবগুলোর ভিত্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সুদ। মজার বিষয় হলো করজে হাসানা সাধারণত ব্যাংকগুলো দেয় না। মোটকথা, সুদমুক্ত ব্যাংকিংয়ের অস্তিত্ব কেতাবাদিতে থাকতে পারে। কিন্তু বাস্তবে তা সম্ভব নয়। তাই ইসলামি ব্যাংকিংয়ের নামে এদেশে যা চলছে তার সঙ্গে ইসলামের কোনো সংশ্রব নেই।
'দারিদ্র্যের অর্থনীতি' কাজের বই। কাজের বইয়ের ধর্ম হলো সেগুলো রস-কষহীন হয়ে থাকে। পড়ে কোনো আনন্দ পাওয়া যায় না। তবে সুফল আছে। আকবর আলি খানের স্বভাবসুলভ উইটধর্মী লেখনী এই বইতে পাবেন না। ডাটার পাহাড়ে চাপা পড়ার একটি সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এতবেশি তথ্য-উপাত্ত বইটিকে সাধারণ পাঠকের নাগালের বাইরে নিয়ে যাবে। দেবে পুরোদস্তুর একাডেমিক গ্রন্থের স্বীকৃতি। 'পরার্থপরতার অর্থনীতি'র আকবর আলি খান এখানে অনুপস্থিত। নিরপেক্ষতার নিশান ডক্টর খানকে এই বইতে মিস করবেন। তাই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি এ অনুযোগ থাকলো। অবশ্য দারিদ্র্য বিমোচন নিয়ে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনের অনেক খবরই পাবেন, দেশের প্রথাগত উন্নয়নের বুলিকে বাস্তবতার নিরিখে দেখার একটি দৃষ্টিকোণ আকবর আলি খান আপনাকে দেবে।
May 22, 2021
বেশ কষ্ট করতে হল শেষ করতে বইটা, অনেক তথ্য, উপাত্তে ভরপুর। কারও দারিদ্রতা নিয়ে ভাল আগ্রহ থাকলেই কেবল এই বই হাতে নেয়ার উপদেশ দিব, লেখকের পরার্থপরতার অর্থনীতি বইটার মত উপভোগ্য নয়।
June 24, 2023
শিল্প বিপ্লবের আগে বিশ্বের সকল অঞ্চলেই দারিদ্র্য ছিল সাধারণ একটা বিষয়। ম্যালথুসীয় ফাঁদে বন্দি ছিল সবাই। শিল্প বিপ্লবের পরে উৎপাদন বৃদ্ধি পেল নাটকীয়ভাবে আর তার কল্যাণে উপ-সাহারা আফ্রিকা আর দক্ষিণ এশিয়া বাদে পৃথিবীর বেশিরভাগ অঞ্চল থেকেই দারিদ্র্য মোটামুটি দূর হয়েছে। তবুও এখনো পৃথিবীর প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। দারিদ্র্য নিয়ে গবেষণাও বলতে গেলে প্রায় নতুন একটা বিষয়। ফলে গত শতাব্দীতেই দারিদ্র্যের সংজ্ঞা বারবার পরিবর্তন করা হয়েছে। এ নিয়ে তারাপদ রায় 'দারিদ্র্যরেখা' শিরোনামে বিদ্রুপাত্মক কবিতাও লিখেছেন।
লেখক অত্যন্ত গোছালোভাবে দারিদ্র্যের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন। সোনার বাংলা বলে যে মিথ প্রচলিত আছে বাংলাদেশে -যে বাংলাদেশে আগে গোলাভরা ধান ছিল, গোয়ালভরা গরু ছিল, কোন গরীব ছিল না- সেই মিথও লেখক ভেঙেছেন বইয়ের একটা অধ্যায়ে। ইসলামী ব্যাংকিং, ক্ষুদ্রঋণ, বার্ডের কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে।
দারিদ্র্য নিয়ে বাংলা ভাষায় বাংলাদেশে লেখা অসামান্য একটা বই।
লেখক অত্যন্ত গোছালোভাবে দারিদ্র্যের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন। সোনার বাংলা বলে যে মিথ প্রচলিত আছে বাংলাদেশে -যে বাংলাদেশে আগে গোলাভরা ধান ছিল, গোয়ালভরা গরু ছিল, কোন গরীব ছিল না- সেই মিথও লেখক ভেঙেছেন বইয়ের একটা অধ্যায়ে। ইসলামী ব্যাংকিং, ক্ষুদ্রঋণ, বার্ডের কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে।
দারিদ্র্য নিয়ে বাংলা ভাষায় বাংলাদেশে লেখা অসামান্য একটা বই।
March 27, 2026
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের পাশাপাশি বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিমোচনের যেসব সরকারি(কুমিল্লা পল্লী উন্নয়ন একাডেমি) ও বেসরকারি প্রচেষ্টা ( NGO, গ্রামীণ ব্যাংক, BRAC) নেওয়া হয়েছে তার একটা মূল্যায়ন এখানে করা হয়েছে। এরসাথে সুদের ঐতিহাসিক ভূমিকা এবং ইসলামি ব্যাংক ব্যবস্থার সাথে সুদের সম্পর্কের একটা সংক্ষিপ্ত আলোচনা রয়েছে যা আমার কাছে খুবই ভালো লেগেছে।
আমি অর্থনীতির সরাসরি ছাত্র নই। তারপরও অর্থনীতির মতো শুষ্ক বিষয়ে লেখকের প্রাজ্ঞল ভাষার ব্যবহারের কারণে বইটা উপভোগ করেছি।
আমি অর্থনীতির সরাসরি ছাত্র নই। তারপরও অর্থনীতির মতো শুষ্ক বিষয়ে লেখকের প্রাজ্ঞল ভাষার ব্যবহারের কারণে বইটা উপভোগ করেছি।
June 4, 2026
বইটি একটি আত্মসচেতনতা মূলক বই, বইটির শেষ লাইন এ গৌতম বুদ্ধের একটি কথা উল্লেখ করেছেন লেখক - No one save us but ourselves. আমাদের রক্ষা করতে হবে আমাদের নিজেদের। বইটিতে সুদ এর পক্ষে বিপক্ষে যুক্তি আছে, ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্পর্কে কিছু কথা আছে, ক্ষুদ্রঋণ এবং প্রাইভেট সেক্টরগুলি কীভাবে একটি দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে তার কথাও উল্লেখ আছে।
দারিদ্র্য এর সংজ্ঞা এবং সবাই দরিদ্র কিন্তু সবার দরিদ্র এর সংজ্ঞা এক না ইত্যাদি।
দারিদ্র্য এর সংজ্ঞা এবং সবাই দরিদ্র কিন্তু সবার দরিদ্র এর সংজ্ঞা এক না ইত্যাদি।
March 11, 2021
Modest introductory book on poverty and development economics. The book provided information on Akhtar Hameed Khan and Comilla model, Fazle Hasan Abed and BRAC, Muhammad Yunus, micro-credit and Grameen Bank, history of interest etc.
Displaying 1 - 6 of 6 reviews





