অলৌকিক-এ বিশ্বাস করেন? করা উচিত নয়, জানেন তো! অলৌকিক আবার কী? বিজ্ঞান-শাসিত এই পৃথিবীতে আমাদের প্রতিটি পল-অণুপল-বিপল নিয়ন্ত্রিত হয় ঘোর লৌকিক ব্যাপারস্যাপার দিয়ে। সেখানে বসে অলৌকিক নিয়ে ভাবা মানেই সময় নষ্ট— তাই তো? তাই কি? তাই যদি হয়, তাহলে গ্রাম-গঞ্জে ডাক্তারি করে বেড়ানো, খুউব সাধারণ মানুষের হাসিকান্নায় হিরেপান্না খুঁজে পাওয়া এক মানুষের লেখা পড়তে গিয়ে একইসঙ্গে বুকের মধ্যে একটা চাপ ধরা কষ্ট, অস্বস্তি, আর কখনও তীব্র ভয় হয় কেন? কী এমন লিখেছেন ফেসবুকের পরিচিত নাম, 'নিরীহাসুর' ডক্টর সব্যসাচী সেনগুপ্ত? 'অপচ্ছায়া' নামের এই সংকলনের দু'টি অংশ— 'আপাত ফিকশন' এবং 'নিছক গল্প নয়'। তার দ্বিতীয়টি নিয়ে আগে লিখি। কেন? কারণ এই অংশের লেখাগুলো যিনি রচনা করেছেন সেই মানুষটি ও তাঁর ভীষণ সৎ, ভীষণ অনাড়ম্বর, ভীষণ মায়াময় লেখনীর সঙ্গে আমরা পরিচিত। আপনাদেরও বলব, আগে এই পর্বটি পড়ে নিতে। 'নিছক গল্প নয়' অংশে আছে নিম্নলিখিত লেখাগুলো~ ১. ভৌত-১ (বাল্যের কাকজ্যোৎস্না) ২. ভৌত-২ (কৈশোরের পেতনির হাসি) ৩. ভৌত-৩ (যৌবনের সত্যি ভূত) ৪. ভৌত-৪ (ভূত নস্ট্যালজিয়া) ৫. ভৌত-৫ (পর্ব অন্তিম। ভুতুড়ে ফিলিম) ৬. একদা টেলিফোনে ৭. লাস্ট লোকালের লোকটা ৮. অমীমাংসিত ৯. সাড়ে চাট্টি ভূতের গপ্পো ১০. দুই বিদেহীর দাস্তান ১১. তিনটে ভূতের গল্প এবং ফেলুদা নামগুলো থেকে ব্যাপারটা বুঝবেন না। আসলে শৈশব, কৈশোর, যৌবন মন্থন করে পাওয়া একঝাঁক সত্যিকারের অভিজ্ঞতা ঠাঁই পেয়েছে এই অংশে। রসবোধ, সারল্য, আর মায়া— এই তিনটি উপাদান অসামান্য দক্ষতায় মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে এই 'গল্প হলেও গল্প নয়' আখ্যানমালায়। এরা কাল্পনিক নয়, কিন্তু রহস্যময় উপাদানে ভরপুর এই গল্পগুলো। 'রহস্যময়' পড়ে দয়া করে ভাববেন না, এর পাতায়-পাতায় গিজগিজ করছে রক্তচোষা বা আয়না-ভূত। বরং এতে আছে নির্জনতার অসহনীয় ভার, আছে হঠাৎ শোনা ক'টা টোকার শব্দ, আছে কুয়োতলায় স্নান করা এক বিষণ্ণ মানুষ। সব্যসাচী'র লেখায় কেন এই আপাত-সাধারণ খণ্ডদৃশ্যরা আমাদের চেতনার গভীরে কম্পন তোলে— সেটাই আসল রহস্য। এরপর আসি এই বইয়ের 'ডি-লা-গ্র্যান্ডি' অংশে, যার নাম 'আপাত ফিকশন'। মাত্র পাঁচটি গল্প আছে এই অংশে। তারা হল~ ১) দুর্গা ২) পশ্চাৎবর্তিনী ৩) লাল শাকের জঙ্গল ৪) অ-সুখ ৫) লছমি। এই গল্পগুলোকে নিয়ে আমি কিছু লিখতে অপারগ। সারাবছর নানা গ্রুপে আর পেজে, সেদ্ধ আর ভাজা অবস্থায় কত ভূতের বা ভয়ের গল্প যে আমি পড়ি তার ইয়ত্তা নেই। তবু, সেই বিপুল পরিমাণ পলির তলায় চাপা পড়ে যাওয়া আমাকেও অস্বস্তি আর আতঙ্কে প্রায় জমিয়ে দিয়েছে এই পাঁচটি গল্প। এদের মধ্যে একটি গল্পের কথা বিশেষভাবে বলব— অ-সুখ! এইরকম একটি গল্প লিখতে পারলেই মোটামুটি ভয়ের গল্প লেখায় অস্কার-টস্কার পাওয়ার অনুভূতি হয়। আশা করি, সব্যসাচী এখানেই থামবেন না। বরং ক্যাথরিন হেপবার্নের মতো তিনি আমাদের বারবার উঠে দাঁড়িয়ে জয়ধ্বনি তোলার সুযোগ করে দেবেন। সত্যি-সত্যি ভয় পেতে চাইলে, অলস মায়ায় নিজেকে মুড়ে ফেলতে চাইলে, কুয়াশা আর ভাঙা চাঁদের মধ্যে হারিয়ে যেতে চাইলে এই বইটি আপনাকে পড়তেই হবে!
বইয়ের ভূমিকাতেই লেখক জানিয়েছেন, আনকোরা ও অশ্রুতপূর্ব বই কিনে পড়ার আগে তাঁর বাবা তাকে ভূমিকাটা পড়ে নিতে বলতেন। 'অপচ্ছায়া' বইটার ভূমিকা পড়ার সুযোগ আমার হয়নি। সব্যসাচী সেনগুপ্তের লেখা অন্যান্য জনপ্রিয় বইগুলোও আগে পড়িনি। কিন্তু ভূতের বই বলেই কিনা কে জানে, আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় মোটেও ভুল করেনি।
গত কয়েক বছরের মধ্যে ভৌতিক ঘরানার যত বই পড়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে, নিঃসন্দেহে বলতে পারি, 'অপচ্ছায়া' তাদের মধ্যে সেরা। কিন্তু একটা ডিসক্লেইমার আগে থেকেই দিয়ে রাখলাম, দাঁত কপাটি লাগা ভূতের গল্প পড়ার ইচ্ছে হলে এড়িয়ে যেতে পারেন। এই বইয়ের লেখায় ভয় দেখানো ভূতের দেখা প্রায় মিলবে না বললেই চলে। তন্ত্র নেই, বৌদ্ধ অপদেবতা নেই, রহস্যময় পুঁথি নেই, গ্রাফিক হরর নেই, নিদেনপক্ষে একটা আস্ত প্রেতাত্মাও ভাল করে দেখা দেয় না।
তাহলে আছে কি?
হুমম! সেটা বোঝানো মুশকিল। লেখক বইটা দুইভাগে ভাগ করেছেন। প্রথম ভাগে নিরেট ফিকশন গল্প, দ্বিতীয় ভাগে ইন্দ্রিয়তীত অভিজ্ঞতার বর্ণনা। অস্পষ্ট, আবছা অনুভূতির কাহিনী। কিন্তু যেই জিনিসটা এই বইয়ের সম্পদ, সেটা হল- হিন্দিতে যাকে বলে 'মাহৌল'। সেটিং অথবা মেজাজ বলাই যায়, কিন্তু মাহৌল কথাটা এই বইয়ের ক্ষেত্রে একবারে খাপে খাপ।
সমস্ত বই জুড়ে অনবদ্য এই মাহৌল তৈরী করেছেন লেখক। ন্যারেটিভের সাবলীল গতিময়তা আর দুর্দান্ত ডিটেইলিং একদম ঘাড় ধরে বসিয়ে রাখে পাঠককে। একবারের জন্যেও মন উচাটন হয় না। ভাষার বাঁধুনি এমনই পোক্ত, টক-ঝাল-মিষ্টি এতটাই পরিমাণ মতন যে ভূতের গল্পে ভূত না এলেও পাঠক উশখুশ করে না। ভূতের কথা ভুলে ততক্ষণে সে মজে গিয়েছে গল্পের পাতায়। হয়ত ডাক্তারি ছাত্রদের হোস্টেল, অথবা মফস্বলের রোজনামচা, কিংবা শৈশবের কোন স্মৃতি। আমাদের অবচেতনে থাকা খুঁটিনাটি কথা, যেগুলো বড্ড আপন হলেও কলমে ধরা যায় না, সেই অনুপ্রাসকে এত সহজে তুলে ধরতে আমি খুব বেশী লেখককে দেখিনি। এই মায়াজাল এমন বিস্তার হয়েছে সমস্ত বই জুড়ে, যে লেখাগুলো ভৌতিক না রম্যরচনা, স্মৃতিচারণ না কলাম, সেইসব ভাববার আগেই আপনি তরতর করে গল্পের শেষে পৌঁছে যাবেন আর ওভারের শেষ ইয়র্কর বলে ক্লিন বোল্ড হবেন। একটু গাটা যে শিরশির করবে না, সেটা বলতে পারছি না। (আমার বেশ ভয় ভয় লাগল বাবা।)
সব গল্পই যে দশে দশ তা অবশ্য নয়। 'আপাত ফিকশন' বিভাগের পাঁচটি গল্প অনুভূতির নানা তারে বাঁধা। কিন্তু কলমের দক্ষতায় রসস্বাদনে ছেদ পড়ে না। 'নিছক গল্প নয়' বিভাগের রচনাগুলো আরো তীক্ষ্ণ, তাতে অবশ্য সন্দেহ নেই। (তার একটা কারণ, প্রতিটা গল্পই একাধারে ব্যক্তিগত এবং কোন না কোন ভাবে লেখকের স্মৃতির অনেকটা দখল করে রয়েছে।)
বইটার আরো একটি বিশেষত্ব হল লেখকের রেঞ্জ। বইয়ের প্রথম গল্প খাঁটি সাধু ভাষায় লেখা, কিন্তু বইয়ের শেষ লেখায় যেতে যেতে সমস্ত আর্কটা ধরা পড়বে। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিলাম।
১ -- "দুর্ভাবনায় ভ্রূকুঞ্চন ক্রমশ গভীরতর হইতেছিল শিবশঙ্করের। তাবিজ কবচ পুত্রেষ্টি যজ্ঞ চলিতেছিল মহামায়াপুরের জমিদারবাড়িতে। পালকি ছড়িয়া কাশীদেশের জ্যোতিষার্ণব, পদব্রজে, কামাখ্যাপীঠের তন্ত্রসিদ্ধ অথবা হিমালয়বাসী হঠযোগীর সশব্দ আগমন এক্ষণে এ স্থানের নিত্যনৈমিত্তিক দৃশ্য। আজিকে এই রক্তাম্বর সন্যাসীর আগমন তাই এই আটচালাটিতে ঔৎসুক্যের পরিবর্তে বক্রোক্তিই অনিয়াছিল অধিক।"
২- "মিনিট পাঁচেক বাদেই, ঠ্য়াকাস ঠ্য়াকাস শব্দে রুটির থালা, তড়কার প্লেট আর ন্যাতানো পেঁয়াজের বাটি নামিয়ে দিয়ে চলে যেত কর্মচারী। ঠকাঙ ঠোক্করে নামাত টাল খাওয়া এনামেলের খালি গেলাস। পড়পড়িয়ে জল ঢেলে দিয়ে যেত আকাশী রঙের জাগ থেকে। আর আমি পাঁচ আঙুলে রুটি ছিঁড়ে, তড়কায় মাখিয়ে, মুখে ঢুকিয়েই তড়িঘড়ি মচৎ কামড়াতাম পেঁয়াজ। ধাবার পেঁয়াজে কখনও কচাৎ শব্দ হয় না। এখানে পেঁয়াজ, হরবখত্ এট্টু এট্টু মিয়ানো।"
ক্লিশে রোমাঞ্চ আর শিহরণের ঊর্ধ্বে গিয়ে যদি অন্যরকম ভূতের গল্প পড়বেন খোঁজাখুঁজি করছেন, এই বইটা পড়ে দেখতে পারেন। মনে হয়, ঠকবেন না।
বছরদেড়েক আগে আমরা সাত বন্ধু গিয়েছিলাম সান্দাকফু ট্রেকে। পথে টুমলিঙে রাত্রিযাপনের ছোট কাঠের হোটেলে জমে উঠেছিল ভূতের গল্পের আসর - নিজের কিংবা বন্ধুদের কিংবা তস্য বন্ধুদের অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে। সব শেষে কে যেন বেশ বলে উঠেছিল, "ধর এই ঠিক এখনই লাইটটা বন্ধ হয়ে গেল"; হয়েছিলও তাই, পাহাড়ের ছোট্ট জনপদে পূর্ব-পরিকল্পিত পাওয়ার কাট যদিও সেটা।
অপচ্ছায়া বইয়ের বেশির ভাগ গল্পই ওই আড্ডার ছলে বলা, আর তাই গতানুগতিক ভূতের গল্পের বইয়ের থেকে অনেক বেশি রিলেটেবেল। লেখক তাঁর নিজের অভিজ্ঞতার সঞ্চয় থেকে বিনা কার্পণ্যে সাজিয়ে দিয়েছেন একের পর এক অলৌকিক ভীতিপ্রদ কিম্বা নেহাত যুক্তির জালে ধরা না দেওয়া ঘটনাবলী। 'এবং ইনকুইজিশন' পড়ার পরে অন্য যেকোনো ভয়ের বই পড়ার আগে ভাবতে বসতে হয় - ঐ লেভেলের হবে তো? কিন্তু, অপচ্ছায়া পুরোপুরি অন্য ধাঁচের একটি বই। পড়তে গিয়ে মনে হয় লেখক নিজেই হোস্টেলের আড্ডায় পাশে বসে কাউন্টারে সিগারেট খেতে খেতে বলে চলেছেন গল্প ('নিছক গল্প নয়' যেগুলো) - এক চিরাচরিত সিনিয়রের বেশে। গল্পের সত্যাসত্য যেখানে আদৌ বিচার্য নয়। এই গল্পগুলোতে পেয়েছি ধ্বণ্যাত্মক শব্দের প্রয়োগ, যা আমার মতে গল্পের বৈঠকি চালের সাথে খাপ খেয়ে গেছে; পেয়েছি ছেলেবেলার আমিকে - যে আমি মামাবাড়ির দোতলার অন্ধকার ঘরে ঢুকতে ভয় পেতো।
অবিশ্বাসের সাথেও যদি পড়তে চান, তাহলে তারানাথের 'কিশোরী' হয়ে পড়ে ফেলতেই পারেন বইটি।