হরিশংকর জলদাস শুধু কাহিনী লেখন না, সমাজকেও লেখেন। এতদিন জেলেদের নিয়ে লিখেছেন এবার লিখলেন বেশ্যাদের নিয়ে। ‘জলপুত্র’, ‘কৈবর্তকথা’, ‘দহনকাল’-এর পর এবার ‘কসবি’।
বৈদিক যুগ পেরিয়ে রামায়ণ-মহাভারত-পুরাণ যুগ অতিক্রম করে বারাঙ্গনাবৃত্তি আজও ভারতবর্ষে অব্যাহত। বাংলাদেশেও তার ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশের একটি বেশ্যাপল্লী—চট্টগ্রামের সাহেবপাড়া। তিনশ বছরের পুরনো এই সাহেবপাড়াকে পটভূমি করে হরিশংকর ‘কসবি’ উপন্যাসটি লিখেছেন।
বড় নিন্দার্হ অথচ বড় আকর্ষণীয় এই কসবিরা। দিবের আলোয় তাদের নিন্দায় মুখর, রাতের আঁধারে তাদের সান্নিধ্যে থরথর। সমাজমানুষেরা এই বৈপরীত্যময় চারিত্র্যকে লেখক ‘কসবি’-তে উপস্থাপন করেছেন।
গণিকাদের রক্ত-পুঁজময় পাওয়া-না-পাওয়ার জীবন ‘কসবি’-তে রূপায়িত। চম্পা, বনানী, মমতাজ, মার্গারেট, উমা প্রু, সুইটিরা শেষ পর্যন্ত গণিকাজীবন পেরিয়ে অধিকার-সচেতন নারীতে রূপান্তরিত কৈলাস জীবনের বিনিময়ে শ্রেণিসংগ্রামের ব্যাপারটি ওপাড়ার বেশ্যাদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়। মোহিনীমাসি আর কালু সর্দারের দ্বন্দ্বে জীবন দিতে হয় কৈলাসকে, দেবযানীকে। উপন্যাসের পরিণতিতে বেশ্যাপুত্র কৈলাস আর বেশ্যা দেবযানী সমার্থক হয় ওঠে।
হরিশংকরর জলদাসের ভাষা, ‘কসবি’-র প্রাণ। সংলাপ এখানে তির্যক, তিক্ত, বিষাদময়—আবার মাদকতাপূর্ণও। লেখকের ভাষার গুণে মাসি, দালাল, মান্তান, সর্দার, কাস্টমার আর কসবিরা জীবন্ত এই উপন্যাসে।
কাহিনী এবং সমাজ—দুটোকে একসঙ্গে জানতে চান যাঁরা, তাঁদের জন্যেই ‘কসবি’। ‘কসবি’ বেশ্যাদের জীবনিতিহাস। এই ইতিহাস—বড় ক্লেদাক্ত, বড় রিরংসা জাগানিয়া।
Harishankar is a promising Bangladeshi author. The most significant point to notice is that all the four novels produced from Harishankar's pen sketch the life of the downtrodden, some of whom are from among fisherfolks, some from among prostitutes and some others are the 'harijons' or 'methors'.
"সমাজের মুখোশ উন্মোচন" করে দেওয়ার মতো গালভরা ব্যাপার আছে বইটায়। সেই উন্মোচনের জন্য প্রচুর অতিনাটকীয়তা, প্রচুর বস্তাপচা সংলাপ ও ঘটনা, প্রচুর কান্নাকাটির ব্যবস্থা করেছেন হরিশংকর। পতিতালয় সম্পর্কে মানুষের যা যা ধারণা তার বাইরে যেয়ে কোনোকিছুই নতুন দেখাতে পারেননি তিনি। "প্রকৃত সত্য" দিয়ে পাঠককে তাক লাগিয়ে দিতে চেয়েছেন। সত্য কথা বলতে তিনি বইতে সব সত্য কথাই বলেছেন। তবে শুধু সত্য দিয়ে শিল্প বা জীবন কোনোটাই বাঁচানো যায় না।
সমাজের এমন এক শ্রেনীর মানুষের জীবনের গভীর থেকে গভীরতম অনুভূতি গুলো লেখক লিখেছেন যাদেরকে আমরা চিনি শুধু টাকার বিনিময়ে শরীর বেচাকেনার একটা মাধ্যম হিসাবে৷ তাদের সকাল গুলো কেমন, তাদের বিকাল গুলো কেমন আমরা জানিও না, কখনো জানার কথা কল্পনায় আসেনা। ❝ বেশ্যা ❞ শব্দখানা যেন শুধুই রাতের। কিন্তু তারা মানুষ। তারা আমাদের মতই, কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের থেকে অনেক বেশি স্বাভাবিক মানুষ। উপন্যাসে কোনো রংচঙয়ে কিছু নেই। শুধু মানুষের গল্প আছে এতে, কষ্ট আছে, অনুভূতি আছে।
(বইমেলাতেই কিনেছিলাম বইটা, সময়াভাবে তখন পড়া হয়নি। আজ এক বসায় পড়ে ফেললাম। ব্যতিক্রমী এক অনুভূতিতে ছেয়ে গেল মন, তাই ভাবলাম একটা রিভিউ লিখে ফেলি।)
~কাহিনি~ কসবি শব্দের অর্থ পতিতা বা দেহপসারিণী। এই বইয়ের কাহিনিও তাদেরকে ঘিরেই। পুরো গল্পই আবর্তিত হয়েছে চট্টগ্রামের সাহেবপাড়া নামের নিষিদ্ধপল্লীর জীবনযাত্রা এবং সেখানকার কিছু মানুষকে ঘিরে। কেন্দ্রীয় চরিত্র বলে ঠিক সেই অর্থে কেউ নেই, একেক সময় একেকটি চরিত্র ঘটনার ঘনঘটায় হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ। এতে পাওয়া যাবে কৃষ্ণা নামের এক হতদরিদ্র মেয়ের দেবযানী নামধারী শীর্ষ-পতিতা হয়ে ওঠার গল্প; কালু সর্দার ও মোহিনী মাসির মাঝে পতিতাপল্লীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ক্ষমতার লড়াই; কৈলাস নামের এক শিক্ষিত যুবকের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও পল্লীর মেয়েদের জীবন বদলে দেবার নীরব আন্দোলনের কাহিনি, ইত্যাদি। অসংখ্য চরিত্রের ছোটবড় নানা আখ্যান সুনিপুণভাবে তুলে ধরা হয়েছে বইয়ে, সেই সঙ্গে দেয়া হয়েছে একটি যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য সমাপ্তি, যা পাঠককে ভাবাতে বাধ্য করবে, নতুন চোখে দেখাবে সমাজের অবহেলিত ও ঘৃণিত একটি শ্রেণিকে।
~প্রতিক্রিয়া~ এক কথায় বলব, ভাল লেগেছে... খুবই ভাল লেগেছে। রিভিউ লিখছি, এটাই সম্ভবত তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। বলে রাখা ভাল, এটাই আমার পড়া হরিশংকর জলদাসের প্রথম বই। তিনি যে অত্যন্ত শক্তিশালী লেখক, তা অনেকদিন থেকেই জানি; আজ বই পড়ে তা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। আর দশজন লেখকের মত মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত নিয়ে কাহিনি রচনা করেন না তিনি, বিষয় হিসেবে বেছে নেন সমাজের নিচু স্তরের অবহেলিত শ্রেণিগুলোকে। ইতিপূর্বে প্রকাশিত রামগোলাম, জলপুত্র, মহীথর, ইত্যাদি উপন্যাসগুলো তাঁর শক্তিমান লেখনীর উজ্জ্বল উদাহরণ বলে জানি। তারপরেও বিষয়বৈচিত্র্যে কসবি যে অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ ছিল, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তাতে তিনি শুধু উৎরে যাননি, রীতিমত অসাধারণ সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি করেছেন। কেন্দ্রীয় কোনও চরিত্র ছাড়াই হাজারো ডালপালা মেলা কতগুলো কাহিনিকে এত চমৎকারভাবে সাজিয়ে-গুছিয়ে উপস্থাপন করেছেন যে, প্রশংসা না করে পারা যায় না। এই বই পড়ে নিষিদ্ধপল্লীর জীবনযাত্রা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাবেন পাঠক, খুলে যাবে তাঁদের চোখ। সমব্যথী হবেন অসহায় সে-সব মেয়েদের।
বইয়ের ভাষা অত্যন্ত ঝরঝরে, কোথাও আটকে যেতে হয় না। বেশিরভাগ সংলাপে আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার কাহিনিকে করেছে আরও প্রাণবন্ত। সম্ভবত এ-কারণেই কোথাও কোথাও পতিতা বা অন্যান্যদের কণ্ঠে শুদ্ধ ভাষা লক্ষ করে একটু হোঁচট খেতে হয়েছে। কয়েকটি চরিত্র শুরুতে সম্ভাবনা জাগালেও শেষ পর্যন্ত প্রস্ফুটিত হতে পারেনি, তবে তাতে কাহিনির খুব যে ক্ষতি হয়েছে তা নয়, তবে চরিত্রগুলো নিয়ে আরেকটু কাজ করলে বইটি আরও সমৃদ্ধ হতো। পতিতা বিষয়ক কাহিনি বলে এতে খিস্তিখেউর ও অশ্লীল ভাষার প্রয়োগ আছে প্রচুর পরিমাণে, তবে সেটা লেখনীর দক্ষতায় মানিয়ে গেছে পুরোপুরি। শারীরিক মিলন বিষয়ক কিছু বর্ণনাও আছে, ফলে এটি কোনও অবস্থাতেই অপ্রাপ্তবয়স্কদের পড়া উচিত হবে না। বইয়ের ভিতরে কোথাও এ-সংক্রান্ত সতর্কবাণী থাকা উচিত ছিল বলে মনে করি।
বইয়ে বানান বা মুদ্রণপ্রমাদ নেই বললেই চলে, সম্পাদনার মান একেবারে প্রথম শ্রেণির। গত কয়েক বছরে এমন নির্ভুল বই খুব কমই দেখেছি। ছাপা, বাঁধাই... সবই উন্নত মানের। সব্যসাচী হাজরার প্রচ্ছদটিও কাহিনির সঙ্গে মানানসই, অর্থবহ ও হৃদয়গ্রাহী। সব মিলিয়ে দুর্মূল্যের বাজারে ১৬৮ পৃষ্ঠার বইয়ে মুদ্রিত মূল্য ৩০০ টাকা বেশি বলা যাবে না মোটেই; তা ছাড়া মেলায় ২৫% কমিশনে আমি এই বই কিনেছি ২২৫ টাকায়। পরিশেষে বলব, ভিন্নধর্মী বইয়ের পাঠকদের জন্য এটি অবশ্যপাঠ্য।
কসবি শব্দটির অর্থ, বেশ্যা। গা ঘিন ঘিন করে উঠল? আমার মনে পড়ে,খুব ছোটবেলায়, একটা সাময়িকীতে কুমিল্লার কান্দির পাড় বেশ্যাপল্লী নিয়ে একটা লেখা পড়েছিলাম, সেদিন থেকে বেশ্যাদের সম্পর্কে একটা কোমল ধারণামিশ্রিত কৌতুহল হয়েছিল। তারপর থেকে বেশ্যা নিয়ে পড়ার চেষ্টা করেছি একটু আধটু যা পারি।
বেশ্যারা ভদ্রসমাজে স্থান পায় না। ভদ্রলোক সাহিত্যিকরাও খুব বেশি তাদের সম্পর্কে লিখেছেন বলে মনে হয় না। মানিক বন্দোপাধ্যায়ের লেখায় কিছুটা আছে তাদের রূঢ় জীবনের কথা।তাদের হতাশা,দেহের জ্বালা, অপমান, প্রেম পাবার তীব্র আকাঙ্ক্ষা, তাদের নিষ্ঠুর বাস্তব জীবনের গল্পগুলির ছোয়া বুলিয়ে হরিশংকর জলদাস লিখেছেন বইটি। চট্টগ্রামের সদরঘাট এলাকার স্ট্র্যান্ডপাড়ার বেশ্যাদের জীবনকাহিনীর একটা সাহিত্যরূপ।বেশ্যাদের জীবন এক ধাঁচের, বিনোদনহীন, কদর্য ভাষায় পরিপূর্ণ। নীচ মনমানসিকতা পূর্ণ।
তবে পূতিগন্ধময় জীবনেও হয়ত পবিত্রতার গঙ্গাজল বয়ে যায়। কেউই ইচ্ছা করে এই পথে আসে না। বেশ্যাবৃত্তি পৃথিবীর সবচেয়ে পুরানো পেশা,দেহের সবটুকু দিয়ে নিজেদের ক্ষুধা নিবারণের একটা জঘন্য সাইকেল। মাসিদের গালি,দরদাম, প্রতিদিন ৬-৭ জন রতিলোভী নষ্ট পুরুষের আদিম ইচ্ছা চরিতার্থ করার পরও বেশ্যাদের নিজস্ব একটা মন আছে,দেহ আছে, সেই দেহ আর মনের রাগ,দুঃখ,শোক সবই আছে।
আমি নিজে চিটাগাং থাকলাম ৬ বছর। এমন একটা বেশ্যাপাড়া যে আছে, সেটা জানলাম না। তবে যাই হোক,ভালবাসার চিটাগাং নিয়ে গল্প বলে কথা!
রম্ভা,মেনকা,তিলত্তমা, উর্বশীর হাত ধরে নেমে আসা এই পেশার বর্তমান প্রতিনিধিদের গল্প এই কসবি। আশ্চর্য এই যে, তোমাকে তিলোত্তমাসম সুন্দরী লাগছে বা উর্বশীর মত রূপ গুনের মেয়ে বলে মেয়েদের প্রশংসা করার সময় আমরা ভুলে যাই, যে আদতে তারা বেশ্যা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। তাদের সম্মান না করতে পারেন, অন্তত মানুষ হিসাবে তাদের মর্যাদা দিন।
বইপত্রে লেখা, পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো পেশা নাকি পতিতাবৃত্তি। সেই স্বর্গে মেনকা, রম্ভা উর্বর্শীদের দিয়ে শুরু... নানান ভাবে নানান রূপে পতিতাবৃত্তি এখনও চলছে, হয়তো চলবেও, পৃথিবী ধ্বংসের আগ পর্যন্ত।
সবচেয়ে আজব চরিত্র এরা। রাতের আঁধারে যাদের চাহিদা আকাশছোঁয়া, দিনের আলোতে অপাংক্তেয় সেই তারা-ই। ওদেরই বা দোষ কী? কেউ তো আর শখে শখে এই পেশায় আসে না। হরিশংকর জলদাস তার 'কসবি' নামক উপন্যাসটাতে কেবল দেখিয়েছেন.. মেয়েরা ঠিক কোন আনন্দে (!) পতিতাপল্লীতে এসে হাজির হয় আর ঠিক কতোটুকু সুখেই বা পার হয় তাদের দিবস-রজনী৷
গল্পের প্রেক্ষাপট চট্টগ্রামের সাহেবপাড়া, প্রায় তিন 'শ বছরের পুরনো এই পতিতাপল্লী। এলাকাটার বিস্তার ঠিক কবে, কখন থেকে, কীভাবে-সঠিক ইতিহাস এখন আর কারও জানা নেই৷ যতটুকু জানা যায় পূর্বে এক সময় জেলে পাড়া হিসেবে পরিচিত ছিল এলাকাটি। জেলেরা মাছ ধরতে চলে যেত সমুদ্রে আর জেলেদের বউ-ঝিদের কলতানে মুখরিত থাকত এলাকাটি৷ কালের বিবর্তনে হয়ে যায় বেশ্যাপাড়া। মেয়েদের ঘিরে আবর্তিত হতে থাকে সবকিছু৷ নতুন নতুন আসা মেয়েরা প্রথমে নিজেদের মানিয়ে নিতে না পারলেও একটা সময় মেনে নেয় নিয়তি, বলা ভালো মেনে নিতে বাধ্য হয়। তাদের অতীত বলে কিছু নেই, নেই ভবিষ্যৎও। শুধুই ক্লেদাক্ত বর্তমান।
এ গল্প গ্রামের মেয়ে কৃষ্ণা থেকে দেবযানীতে রূপান্তরের গল্প। এ গল্প অতি সাধারণ জেলের স্ত্রী'র মোহিনী মাসী হয়ে উঠার গল্প। এ গল্প কালু গুন্ডার, নিরীহ মন্দির পুরোহিতেরও। এখানে জীবন খুবই নির্মম, তবুও মানুষ স্বপ্ন দেখে। ঠিক যেমন দেখেছিল কৈলাস। শুধু কৈলাস নয়, তার সাথে সাথে স্বপ্ন দেখেছিল চিরকাল বঞ্চিত হয়ে থাকা চম্পা, বনানী, মমতাজ, উমা, মার্গারেট-এরাও। খুব বেশি কিছুর স্বপ্ন কিন্তু দেখেনি তারা, নিশ্চিত জীবন, গোছানো সংসার বা স্বামী-সন্তানের স্বপ্ন না কিন্তু! এরা চেয়েছিল তাদের মৌলিক অধিকার। ক্লেদময় জীবনের মাঝেও একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন। কিন্তু পাড়ার গুন্ডা বা মাসীরাই বা তা হতে দেবে কেন? শুরু হয় দ্বন্দ্ব।
হিংসা-প্রতিহিংসা, ক্ষমতার লড়াই, প্রতিশোধ, শ্রেনী সংগ্রাম আর বিচিত্র প্রেমের একটা নিষিদ্ধ জগৎ হরিশংকর জলদাসের উপন্যাস 'কসবি'।
আর জলদাসের বই নিয়ে বলার কিছু নেই, অসাধারণ বর্ণনাভঙ্গির ফলে বইয়ের চরিত্রগুলো হয়ে উঠে জীবন্ত। বইটা যেহেতু চট্টগ্রামের পটভূমিতে লেখা, কাজেই চরিত্ররা কথা বলেছে চট্টগ্রামের ভাষাতেই। তাই বলে যে পড়তে বা বুঝতে অসুবিধা হয়েছে-তা কিন্তু নয়। তবে মাঝেমাঝে এক আধটা জায়গায় শুদ্ধ ভাষা একটু চোখে পড়ে গেছে 🐸 এটা ছাড়া আপাতত আর কোন দোষ চোখে পড়েনি। উনার লেখা মোটামুটি বেশ কয়েকটা বই পড়া হয়েছে, দিন দিন উনার কঠিন ভক্তে পরিণত হয়ে যাচ্ছি ❤🔥
হরিশংকর জলদাসের লেখার সাথে আমার পরিচয় যখন তাঁর ‘জলপুত্র’ কোন এক ঈদসংখ্যা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ‘জলপুত্র’ পড়ে ভালো লেগেছিল। বইমেলাতে পরিচিত লেখকদের কল্যানে একদিন তাঁর সাথে কয়েক মিনিট কথাও হলো। সেটা তাঁর উত্থান কাল, তিনি তখন আপন ভুবনে বিভোর। আমার মন বললো, কিছু দিন তাঁর লেখা থেকে দূরে থাকতে হবে। আমি আমার মনের কথা শুনলাম। এর মধ্যে শুদ্ধস্বর থেকে ‘কসবি’ প্রকাশিত হলেও তা পড়া হয়নি, যদিও পরিচিত জনদের কাছে সেটা নিয়ে টুকটাক আলোচনা শুনেছি। এক সময় হরিশংকর জলদাসের লেখা কী করে যেন আমার নাগালে আর থাকলো না। অনেকগুলো বছর পরে ‘কসবি’ আমার হাতে এলো, ছোট উপন্যাস, দ্রুতই পড়া হয়ে গেলো।
বারাঙ্গনাদের জীবন নিয়ে বাংলা সাহিত্যে রচনা খুব কম নয়। এই মুহূর্তে আমার রিজিয়া রহমানের ‘রক্তের অক্ষর’, ইমদাদুল হক মিলনের ‘টোপ’ এবং আবুল খায়ের মুসলেহ্উদ্দিনের কিছু ছোট গল্পের কথা মনে পড়ছে। একজন নারী কী কী উপায়ে বারাঙ্গনাতে পরিণত হন তার অন্তত একটি উপায়ের চরম বাস্তব ও অসাধারণ বর্ণনা ‘টোপ’ উপন্যাসটিতে আছে। ‘রক্তের অক্ষর’-এ আছে বারাঙ্গনাপল্লীর ভেতরের নিখুঁত চিত্র। হরিশংকর জলদাস এই উপন্যাসে সেগুলোর সব করার চেষ্টা করেছেন সাথে বারাঙ্গনাপল্লী সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গণের মানুষের জীবনচিত্র আঁকতে। এই চেষ্টাটি করতে গিয়ে তিনি অনেকগুলো গল্প, অনেকগুলো চরিত্র আর বহুমাত্রিক ক্যানভাস নির্মাণ করেছেন। ছোট পরিসরে এত বড় কাজ করতে গিয়ে তিনি বিষয়টাকে, আমার দৃষ্টিতে, ঘেঁটে ফেলেছেন। এতে কিছু গল্প জোরজার করে শেষ করা হয়েছে, কিছু বিষয় আরোপিতভাবে এসেছে। গল্পের সংখ্যা বেশি বলে প্রত্যেকটা গল্প শেষ করার তাড়া ছিল, এতে বিশেষ কোন চরিত্র বিশেষ গুরুত্ব পায়নি। এই কারণে উপন্যাসটি যখন শেষ হয় তখনও পাঠকের মনে হবে না এটা এখানে শেষ হলো।
বারাঙ্গনাপল্লীর সাথে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট থাকে সমাজের ক্ষমতাকাঠামো ও কর্তৃত্বকাঠামো সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকটি গণের মানুষ। কী কারণে যেন এই উপন্যাসে বারাঙ্গানাপল্লীর ভৌগলিক চৌহদ্দীর বাইরের সেই গণগুলোর মানুষেরা ঔপন্যাসিকের বিবেচনার বাইরে রয়ে গেছে। ফলে কোন কোন পাঠকের কাছে মনে হতেই পারে এই আদিম ব্যবসায় বুঝি আর কারো সংশ্লিষ্টতা নেই। এটি চরম ভুল। লেখক কী বিবেচনায় তাদেরকে গল্পের বাইরে রাখলেন তা বুঝতে পারিনি।
হরিশংকর জলদাস চাইলে এই উপন্যাসটিকে নিয়ে আবারও কাজ করতে পারেন। ঔপনিবেশিক আমলে গোড়াপত্তন থেকে সাম্প্রতিককাল পর্যন্ত একটি বিশেষ বারাঙ্গনাপল্লীর বিকাশ তিনি আরও দীর্ঘ পরিসরে কালানুক্রমিকভাবে দেখাতে পারেন। তাঁর বর্ণিত প্রত্যেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রকে আরও বিকাশের সুযোগ দিতে পারেন। অহেতুক চাপিয়ে দেয়া বিষয়গুলো ছেঁটে ফেলতে পারেন। ভৌগলিক বর্ণনার অস্পষ্টতা দূর করতে পারেন। বারাঙ্গনাপল্লীগুলোর আসল মালিক, চালিকাশক্তি ও নিরাপত্তাদাতাদেরকে গোটা উপন্যাস থেকে যে একেবারে ‘নাই’ না করে দিয়েছেন সেটা না করে বরং তাদেরকে প্রবলভাবে উপস্থাপন করতে পারেন। এই কথাগুলো বললাম এইজন্য যে, আমি মনে করি হরিশংকর জলদাস সেটা করার সক্ষমতা ও যোগ্যতা রাখেন। তিনি হয়তো সেটা কখনোই করবেন না, তবু পাঠক হিসেবে আমার কাছে যা মনে হয়েছে সেটা প্রকাশ করলাম।
৩.৫ তারকা বইয়ের ভাষা বেশ অশ্লীল,অশালীন।কেন হবে না?যাদের নিয়ে লেখা,সমাজের যে স্তরকে নিয়ে লেখা তাদের মুখের ভাষাও তো তা-ই। আসলে তো তারা অশালীন নয়,এই যে যারা তাদের এই ঘিনঘিনে জীবনে টেনে এনেছে,সেই-সব মানুষ-ই মূলত অসভ্য,অশালীন।কসবি আসলে তারা-ই।
লেখকের লেখা আমার খুব ভালো লাগে,বেশিরভাগ সমায়-ই দেখি তিনি সমাজের বঞ্চিত,নিম্নস্তরের বাসিন্দাদের নিয়ে লেখেন।কসবি তে-ও তাই।চট্টগ্রামের সাহেবপাড়া নামক এক পতিতাপল্লীর অন্ধকারাচ্ছন্ন গল্প তিনি বলেছ���ন।আমাদের ভদ্দরলোকের সমাজের মতোই সেখানেও আছে হিংসে,ক্ষমতার লোভ,লড়াই,হানাহানি,খুনোখুনি।আবার অন্যায় অবিচার এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার মতো সাহসী মানুষ ও রয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে কসবি সমাজের একটি মোটামুটি পূর্ণ ছবি পাওয়া যায় বইটিতে।বেশ ভালো লেগেছে।
"কসবি" শব্দের অর্থ পতিতা, আর উপন্যাসটি ঘিরে রয়েছে সেই অন্ধকার জগতের বাস্তবচিত্র। সমাজের এক কোণায় যারা লুকিয়ে থাকে, তাদেরই গল্প তুলে ধরেছেন লেখক—অসহায়তা, সংগ্রাম, এবং সামান্য সুখের আশায় বেঁচে থাকার লড়াই।
এটি দেবযানীর গল্প, যে এক সরল গ্রাম্য মেয়ে থেকে হয়ে ওঠে এক বিখ্যাত কসবি। এটি পদ্মাবতীর গল্প, অতুলনীয় রূপের জন্য যার ভাগ্যে জুটেছিল নির্মম পরিণতি। আর এটি কৈলাশের গল্প, যে এই নিগৃহীত নারীদের জন্য চেয়েছিল ন্যায্য অধিকার—সাপ্তাহিক ছুটি, উপযুক্ত পারিশ্রমিক, আর স্বাভাবিক জীবনের স্বপ্ন।
কিন্তু কি সত্যিই তারা এই সামান্য দাবিগুলো আদায় করতে পারে? কৈলাশ কি পারবে অন্ধকারের গলিতে আলো পৌঁছে দিতে? নাকি সমাজের কঠিন বাস্তবতার সামনে স্বপ্নগুলো হারিয়ে যাবে?
হরিশংকর জলদাসের শক্তিশালী লেখনী আর সমাজের গভীরে প্রোথিত সত্য উন্মোচন করার সাহসী প্রচেষ্টার জন্য "কসবি" নিছক একটি উপন্যাস নয়, বরং এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
উপন্যাসের ভাষা :
হরিশংকর জলদাসের লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার বাস্তবধর্মী উপস্থাপন। সমাজের যে অংশকে আমরা হয় উপেক্ষা করি, নয়তো তীব্র ঘৃণা করি, সেই জায়গাটার প্রতি পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে বাধ্য করেন তিনি। তবে বেশ কিছু শব্দ অশ্লীল। সম্ভবত পরিবেশ এবং পরিস্থিতি বুঝানোর জন্য ব্যবহার করা হয়ছে। তাছাড়া ভাষা সহজ, কিন্তু গল্পের বুনন এতটাই শক্তিশালী যে পাঠক এই চরিত্রগুলোর কষ্ট, বঞ্চনা আর অসম্মান নিজের ভেতরে অনুভব করতে বাধ্য হয়।
এই নিয়ে হরিশংকর জলদাসের দুটো বই পড়া হলো। ‘কসবি’ এবং ‘রামগোলাম’। দুটো বই সমাজের দুটো অচ্ছুৎ গোষ্ঠীর জীবনালোকে লেখা। কসবি যেমন সমাজের পরিগ্রহা নারীদের নিয়ে লেখা, রামগোলাম-এ তেমনই আরেকটি নিগৃহীত অংশ, মেথর-সমাজের দুর্বিষহ জীবনের গল্প উঠে এসেছে। দুটো বইয়ের পট নির্বাচন বেশ অভিনব। সমাজের এই স্তরের মানুষের জীবনের নিষ্ঠুর বাস্তবতার দুঃখগাঁথার চেয়ে রঙরসে-ভরা ক্লেদাক্ত-বর্ণনা নিয়েই যেখানে বেশি মাতামাতি চলে, সেখানে এই দুটো বই বেশ আলাদা।
সবথেকে দুঃখের কথা হচ্ছে, সমাজের এই অংশের মানুষদের সাহিত্যেও কম নিষ্পেষণ সইতে হয় না। কেউ কেউ যৌনতার ফোঁড়ন কাটতে গুটিকয়েক রগরগে বর্ণনার প্রয়োজনে এসব পেশার চরিত্রদের গল্পে অহেতুক ঢুকিয়ে দেয়, তো আবার কেউ পাঠকের চোখ থেকে সস্তা সহানুভূতির অশ্রুপাত করাবে বলে ঠিক এমন কিছু 'এলিমেন্ট'কে গল্পে হতচ্ছাড়াভাবে জায়গা করিয়ে দেয়। দুদিক নিয়েই স্বল্প পরিসরের পাঠক হিসেবে আমি বেশ বীতশ্রদ্ধ। হরিশংকর বাবু এবেলায় খানিকটা নতুনত্বের স্বাদ দিয়েছেন অবশ্যই। তার লেখায় অন্যরকম শ্রদ্ধাবোধের প্রকাশ থাকে, রূঢ় বাস্তবতায় জর্জরিত মানুষগুলোর প্রতি। খেলো সহানুভূতি লাভের আশায় তার কলমে চরিত্ররা আসে না—সাদা কাগজের চকচকে শূণ্যতার দুঃখ ঘোচাতে কখনওবা আসে, আর নাহয় সমাজের ছুড়ে দেওয়া কালিমার সুদ ফেরত দিতে চরিত্ররা শুভ্র কাগজে নিজেদের মেলে ধরে। এসবে সাহসের দরকার হয়, শক্তির দরকার হয়। আমি চাইলেও বেশ্যাপল্লীতে গিয়ে কারো সাথে দুদণ্ড কথা বলে আসতে পারবো না, ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে শরীর মেলে ধরে পেটের ক্ষুধার চিন্তা করার মতো দোটানায় আমি থাকতে পারবো না—আমার জন্য সেসবই হবে অসম্ভবের কাছাকাছি কিছু, অন্তত আমার জন্য। এখানেই সমস্যা জানেন তো! এই মানুষগুলোর জীবন নিয়ে লেখা বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। যে যতটাই শ্রম দিক, মনন দিক, শেষ অবধি কোথাও একটা খটকা লাগে, ভাসা-ভাসা বলে মনে হয় সবকিছু। কেউই চরিত্রগুলোর অন্তঃপুরে নয়ন ডুবিয়ে অবগাহনের মত্ততায় হারাতে পারে না, পুরোপুরি অন্তত না। হরিশংকর জলদাসের এই বইখানাতেও আমার এমনই মনে হয়েছে। কিংবা হতে পারে আমার ব্যর্থতা। তবে এটুকু বলতে পারি, র তুলনায় রামগোলাম-এর গল্পছক বেশ পাকাপোক্ত ছিল।
সমাজ যখন কারুর ওপর হওয়া অন্যার এর শোধ নিতে পারে না তখন সেই অন্যায় এর বোঝা তার ওপরেই চাপিয়ে দিয়ে তাকে জনবিচ্ছিন্ন করে তোলে। কসবি মানে বেশ্যা। চট্টগ্রামের সাহেবপাড়ার পতিতালয় কে ঘিরে গড়ে উঠেছে কসবির গল্প। সাহেব পাড়ার উত্থান, পতিতাদের প্রাত্যহিক জীবন, সংঘাত আর অসহায় মেয়েদের আত্মসমর্পণ ফুটে উঠেছে কসবিতে।
কসবির সহজ বাংলা হলো বেশ্যা বা পতিতা। বইটি চট্টগ্রামের প্রায় তিনশো বছরের পুরোনো পতিতাপল্লি সাহেবপাড়ার পটভূমি ঘিরে লেখা। একসাথে কয়েকটা আপাতদৃষ্টিতে বিছিন্ন ঘটনা একই সমান্তরালে লেখা।
এক নারীর অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য পুরো পাড়াটা বেশ্যাপাড়া হিসেবে পরিচিতি পায়। কে যায় এই পাড়ায়? সমাজের চোখে যারা সভ্য মানুষ, তারাই রাতের আঁধারে এই জায়গায় ঢুঁ মারে। কাজ শেষে গা থেকে সব ময়লা ঝেড়ে আবারও ফুলবাবু সেজে সভ্য সমাজে ঘাপটি মেরে বসে থাকে। সেইসব নষ্ট পুরুষদের কাছে নারীরা শুধুই ভোগের বস্তু, দর-দাম করে যাদের সান্নিধ্য তারা পেতে চায়।
এই বইটা পড়তে যেয়ে একটা জিনিস মাথায় আসলো, সেটা হচ্ছে কেউই যেচে এই পেশায় আসতে চায় না। পরিস্থিতির শিকার হয়ে এখানে আসতে বাধ্য হয়। এসব জায়গা ঘিরে চলে নানারকম সন্ত্রাসবাদ-রাহাজানি। এখানে আছে কৃষ্ণা থেকে দেবযানী হয়ে ওঠা এক মেয়ের জীবনকাহিনী, আছে কালু সর্দার ও মোহিনী মাসির রেষারেষি, কৈলাশ নামের এক শিক্ষিত যুবকের কথা, যে কীনা এই পল্লীর বাচ্চাদের শিক্ষার আলোয় আনতে চায়।
লেখকের লেখনশৈলী নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ নেই, তবে গল্পের শেষটুকু আমার কাছে বেশ খাপছাড়া লেগেছে। আর আমার মনে হয় না এই বইয়ে নিষিদ্ধপল্লীর কোনো ডিটেইলড রূপ ফুটে উঠেছে। তবে হ্যাঁ, এই বই আপনাকে দেখিয়ে দিবে এখনো সমাজে উঁচু-নিচুর ভেদাভেদ আছে। উঁচু সমাজের মানুষ চায় না কসবিদের জীবনে অধিকার কিংবা নিজস্বতা বলতে কিছু থাকুক। সমাজের কাছে নোংরা এই মানুষগুলো যখন নিজেদের অধিকার সচেতন করতে চায় তখনই নিজেদের স্বার্থে সমাজ তাদের যেভাবে দাবিয়ে রাখে তা তুলে লেখক এখানে তুলে ধরেছেন। কসবির প্রতিটা চৌকাঠেই যেন একেকটা গল্প লুকিয়ে আছে৷
বইয়ের ভাষা বেশ ঝরঝরে, তবে লেখায় আঞ্চলিকতার প্রয়োগ করা হয়েছে এবং গল্পের প্রয়োজনেই এখানে প্রচুর পরিমাণে অশ্লীল ভাষার প্রয়োগ করা হয়েছে, ফলে পড়তে যেয়ে একটু হোঁচট খেতে পারেন।
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে এক বিকেল বেলায় ম্যাগ্রিজ নামের এক নাবিকের লোলুপ দৃষ্টি গিয়ে পড়ে জেলেপাড়ার রাইচরণের বউ জটিলার উপর। ব্লাউজহীন, অর্ধেক শরীর উদোম বাড়ির উঠান ঝাঁট দিতে থাকা জটিলাকে দেখে দীর্ঘদিনের সমুদ্রযাত্রায় নারীসঙ্গ বিবর্জিত ম্যাগ্রিজের কাম বাসনা জেগে ওঠে। ঝাপিয়ে পড়ে সে জটিলার উপর, ধর্ষণ করে তাকে। . আমাদের এই সমাজে ধর্ষকের থেকে ধর্ষিতাকেই দোষারোপ করা হয় সর্বদা। সেদিনও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। পাড়া-প্রতিবেশী মিলে রাইচরণের পরিবারকে একঘরে করে। নদীতে মাছ ধরার অধিকার হারিয়ে রাইচরণের পরিবার ধুঁকতে থাকে অভাবে । অভাব, সামাজিক নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে একদিন জটিলা ঠিক করে—সমাজ যখন তাদের কোনো সাহারা দিল না, উপরন্তু ভাত কেড়ে নিল, তাহলে আর সমাজ কেন? শরীর বিকানোর কাজই করবে সে, বেশ্যাই হবে। জেদ এবং অভাবে পড়ে শেষ পর্যন্ত বেশ্যাবৃত্তিতেই নামে জটিলা। জটিলার মাধ্যমে যে কাজের সূচনা হয়েছিলো তা আর থেমে যায়নি। ধীরে ধীরে এক পরিবার থেকে আরেক পরিবারে এই পেশা সংক্রমিত হয়। বহিরাগত সাহেবদের আনাগোনা বাড়তে থাকে চট্টগ্রামে বন্দর সংলগ্ন এই জেলেপাড়ায়। কখনো গায়ের জোরে কখনো অর্থের বিনিময়ে নিজেদের জৈবিক চাহিদা মেটাতো তারা। ধীরে ধীরে এক সময় ক্ষুদ্র সেই জেলেপাড়াটি রূপান্তরিত হয় বেশ��যাপল্লিতে; এই জেলেপাড়ার নাম হয় 'সাহেবপাড়া'। . হরিশংকর জলদাস “কসবি” উপন্যাসে চট্টগ্রাম শহরের প্রায় তিনশো বছরের পুরনাে এই সাহেবপাড়ার গল্পকে চিত্রিত করেছেন। 'কসবি' শব্দটি এসেছে আরবি 'কসব' শব্দ থেকে। যার অর্থ বারবণিতা, দেহপসারিণী, বারাঙ্গনা প্রভৃতি। বা প্রচলিত শব্দে বেশ্যা, পতিতা, দেহ ব্যবসায়ী। স্বর্গে মেনকা, রম্ভা, উর্বশীদের মাধ্যমে বেশ্যাবৃত্তির সূচনা হয়েছিলো। রামায়ণ মহাভারতীয় যুগেরও আগে শুরু হওয়া বেশ্যাবৃত্তি পৌরাণিক যুগ পেরিয়ে, মুঘল-পাঠান-ব্রিটিশ যুগ অতিক্রম করে আজ বর্তমান আধুনিক যুগেও সগৌরবে চলমান। পার্থক্য শুধু এই, স্বর্গ থেকে তাদের পতন হয়েছে এই জটিল মর্ত্যে। . সমাজের নিকট এই কসবিরা বড়ই নিন্দিত, ঘৃণিত। সমাজ তাদের দূরে ঠেলে দিয়েছে, তুলে দিয়েছে অবজ্ঞা, বঞ্চনার দেয়াল। আবার এই সমাজই টিকিয়ে রেখেছে তাদের। পুরুষের জৈবিক চাহিদা মেটাতেই তৈরী করা হয়েছে পতিতালয়। সমাজের সুশীল, ভদ্রলোকেরা দিনের বেলায় যাদের কথা বলে অবজ্ঞাভরে, রাতের আঁধারে মুখ লুকিয়ে তাদের সান্নিধ্যেই মেতে ওঠে আদিম তাড়নায়। ভদ্রসমাজের এই দ্বিচারিতা, বৈপরীত্যময় আচরণের দেখা পাওয়া যায় 'কসবি' উপন্যাসে। . 'কসবি' এই সাহেবপাড়ার, সাহেবপাড়ার বারাঙ্গনাদের কেন্দ্র করে চলমান মাসি-গুন্ডা-দালালদের মধ্যকার পারস্পরিক রাজনীতির গল্প। এই গল্পে ফুটে ওঠে নিষিদ্ধপল্লীর নিষ্ঠুর বাস্তবতার। 'কসবি' বিভিন্ন পরিস্থিতির শিকার হয়ে এখানে এসে পড়া কিছু মানুষের গল্প। গ্রামের সহজ-সরল মেয়ে কৃষ্ণার গল্প। যে প্রেমের ফাঁদে পড়ে বাড়ি থেকে পালায়, আর তার মাশুল দিতে হাজির হয় চট্টগ্রামের সাহেবপাড়ায়। নিজের শত অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে হয়ে ওঠে সাহেবপাড়ার সবচেয়ে দামি, সুন্দরী বেশ্যা 'দেবযানী'। যার দেখা পাওয়ার জন্য, একবার খদ্দের হওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকে চট্টগ্রামের সকল বয়সের কামুক পুরুষেরা। এই গল্প সামান্য জেলেনি মোহিনীবালা থেকে সাহেবপাড়ার দোর্দন্ডপ্রতাপ মাসি হয়ে ওঠা মোহিনী মাসিরও, যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সর্বদা সোচ্চার। তার মতো প্রতিবাদী, অধিকার সচেতন মাসি একশ বছরেও দু’চারজন জন্মে না বেশ্যাপাড়ায়। . গল্পটা স্বর্গের সেই রম্ভা, উর্বশী, বসন্তসেনা, কামমঞ্জরী, আম্রপালীর যারা আজ পৃথিবীর নানা বেশ্যাপল্লিতে মোহিনী, দেবযানী, মার্গারেট, জুলিয়েট নামে তাদের দেহগুলো তুলে দিচ্ছে মানুষ নামধারী কামান্ধ পশুদের হাতে। এটা তাদের সেই ক্লেদাক্ত জীবনের গল্প। যা একজন দক্ষ চিত্রশিল্পীর তুলির আঁচড়ে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলার ন্যায় লেখক শুনিয়েছেন আমাদের। যেখানে প্রকাশ পেয়েছে আমাদের এই আধুনিক, সুশীল সমাজের এক অন্ধকার অংশের, যেখানে রোদ নেই, যেখানে হাসে না ঝলমলে সূর্য। . মোহিনী, দেবযানী, পদ্মবতী, মার্গারেট, জুলিয়েট, ইলোরা, বনানীরাও তো মানুষ, তারাও একটু ভালোভাবে বাঁচতে চায়, নিজেদের মৌলিক অধিকার নিয়ে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় নিম্নশ্রেণীর মানুষের জন্য যে এসব স্বপ্ন দেখা বারণ। তারা যেন ঠিক এগুলো 'এফোর্ড' করতে পারবে না বা করতে দেওয়া হবে না। আহ সমাজ... . একটা কথা প্রচলিত আছে, আমাদের এই অঞ্চলের নিম্নবর্গের মানুষের জীবন বাংলাসাহিত্যে সেভাবে জায়গা করে নিতে পারেনি। এই অভিযোগ বলি কিংবা আক্ষেপ অনেকটাই বোধহয় দূর হয়েছে কথাসাহিত্যিক হরিশংকর জলদাসের মাধ্যমে। কৈবর্ত বা জেলেদের নিয়ে তিনি লিখেছেন জলপুত্র, দহনকালের মতো বই। মেথরদের নিয়ে লিখেছেন রামগোলাম। পতিতা, বারবণিতাদের নিয়ে লিখেছেন এই 'কসবি', যেখানে চিত্রিত হয়েছে তাদের ক্লেদময় জীবন। . ১৬৮ পৃষ্ঠার এই অন্ধকার উপাখ্যানে ডুবে যেতে পেরেছি হরিশংকর জলদাসের গদ্যশৈলীর কারণেই। সহজ-সাবলীল অথচ মোহময় তার লেখা। বইয়ের কাহিনি নিষিদ্ধপল্লীর ও সমাজের নিম্নশ্রেণীর মানুষদের হওয়ায় ভাষাগত বিষয়ে যে চ্যালেঞ্জ ছিল, লেখক তাতে দক্ষতার সাথেই উতরে গিয়েছেন। বইয়ের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী অধিকাংশ বর্ণনায় বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে যৌনতা, অশ্লীল শব্দের প্রয়োগ। এসব বর্ণনা পড়তে গিয়ে অনেকের কাছে অস্বস্তিকর ঠেকতে পারে। তবে এই গল্পের প্রয়োজনে, বাস্তবিকতা তুলে ধরতে এর প্রয়োজন ছিল বৈকি। . সমাজে শিক্ষা, আধুনিকতা বৃদ্ধির সাথে সাথে সমাজের নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষরা যুগে যুগে অসংখ্য কুপ্রথা ছুড়ে ফেলেছে আস্তাকুঁড়ে। কিন্তু পৃথিবীর আদিমতম পেশা দেহব্যবসাকে ছুড়ে ফেলেনি, বরং জিইয়ে রেখেছে সমাজেরই এক কোণে। তাই তো বর্তমান সময়ে এসেও জাকার্তার কালিজোড়া, সিঙ্গাপুরের গেলাঙ, টোকিওর কাবিকুচো, সিডনির কিংসক্রস থেকে শুরু করে আমাদের দেশেও এই বেশ্যাবৃত্তি চলছে সেই প্রাচীন কাল থেকে প্রবাহমান নদীর মতো। হরিশংকর জলদাসের 'কসবি' মর্ত্যের সেই মেনকা, রম্ভা, উর্বশীদেরই কথা বলে। 'কসবি' তাদের হৃদয়ের বেদনা, হাহাকারে ভারী দীর্ঘশ্বাসের এক না বলা আখ্যান। . ◑ বই পরিচিতি: ▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬ ➠ বই : কসবি ➠ লেখক : হরিশংকর জলদাস ➠ জনরা : সমকালীন উপন্যাস ➠ প্রকাশনী : অবসর প্রকাশনা সংস্থা ➠ পৃষ্ঠা সংখ্যা : ১৬৮ ➠ মুদ্রিত মূল্য : ৩৬০ টাকা
গত কয়েকবছরের মধ্যে সবচেয়ে ওভাররেটেড লেখক আমার মতে ইনি, হরিশংকর জলদাস। কসবি,কৈবর্তকথা থেকে জলপুত্র-- কোন উপন্যাসকেই আমার উপকূলীয় জনজীবন নিয়ে লিখে ফেলা ভুবনবিজয়ী কোন অমূল্য সাহিত্যকর্ম মনে হয়নি।
অতিনাটকীয়তায় ভরপুর কসবির সবকিছুই বলতে গেলে জানা। সময়ে সময়ে এগুলা অনেকেই জানে। তাই নতুনত্ব বলতে কিছু নেই। আর একটা মুভির কথা না বললেই নয়। গাঙ্গুবাই দেখলে কসবির উপখ্যানকে মনেই হবে যা আগে জানতাম তাই পড়ছি শ্লেষোক্তি নিয়ে।
লেখকের লেখনশৈলী দারুণ। কিন্তু লেখক চাইলেই slang ভাষাগুলো কম ব্যবহার করতে পারতেন আর বেশ্যাপল্লীর অতিরিক্ত বর্ণনা ভালো লাগে নি। চট্টগ্রামের কর্ণফুলি নদীর পাড়ে গড়ে উঠা সাহেব পাড়ার ইতিহাস ভালো ছিলো। যারা একটু ডার্ক সাইড ক্লাসিক আর পতিতা-দের নিয়ে আগ্রহ আছে তাদের ভালো লাগবে নিশ্চিত।
প্রথম 'শ পাতায় যে প্রতিশ্রুতি ছিল, পরের পাতার তাড়াহুড়োয় সবই জলে গেল। চরিত্রগুলো এক নোটের, গঠনবিন্যাস এলোমেলো, এবং উপন্যাসের বিস্তার অপর্যাপ্ত। অথচ আফসোস, বিষয়বস্তুটা কি চমৎকার-ই না ছিল!
একটা সম্ভাবনাময় উপন্যাসের মৃত্যু ধরে রাখা আছে এখানে।
বইটি বইমেলাতে হঠাৎ করেই চোখে পরে যায়। আমি প্রায় ২৪ দিন এর মত বই মেলাতে গিয়েছিলাম প্রতিবার বইটি হাতে নিয়ে দেখেছি। একটু খানি পড়ার পড় মনে হলো বইটি কিনতে হবে।
বইটি আমি ২৪ দিন মানে শেষ দিন গিয়ে কিনেছি। আজ এক বসায় পড়ে শেষ করলাম।
শেষ করার পর থেকেই ভাবছি। শুধু ভেবেই যাচ্ছি, কিভাবে লিখেছেন তিনি।
তিনি শুধু একটা গোত্রের জীবন চক্র বলেননি। লিখেছেন তার ইতিহাস ও তার পেছনের গল্প। উঠে এসেছে তাদের জীবনের সংগ্রাম আর কষ্টের কথা।
বইটির গভীরে যত গিয়েছি লেখার এবং কাহিনীর গড়ন আমাকে মুগ্ধ করেছে। প্রতিটি লাইন যেন লেখা হয়েছে দাড়িয়ে থেকে। যেন আপনার উপলব্ধি হবে আপনি ঘটনার স্থলেই রয়েছেন। আপনার সামনেই হচ্ছে।
এটা বললে ভুল হবে যে বইটি একদম শতভাগ ভাবে সফল। না তাও নয়, তবে লেখকের বর্ননা কল্পনাশক্তি আর লেখার দক্ষতায় আমি মুগ্ধ হয়েছি। তবে আমার কেন যেন মনে হয়েছে লেখক খুব কাছ থেকে বিষয় গুলো পরিলক্ষিত করেছেন।
তবে হ্যা বইটি সবার জন্য নয়। এটি একটি শুধু মাত্র প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য। তাও ২৫ বছরের উপরের পড়া উচিত।
কথায় বলে - পতিতা তারাই যারা দেহ বিক্রি করে; এমন ব্যক্তির কাছে - যে তার মূল্যবোধ বিক্রি করে এসেছে। বইটির পটভূমি একটি পতিতাপল্লী, বিশেষত চট্টগ্রামের সাহেবপাড়া। লেখকের পূর্বের মেছোপল্লী/জেলেপল্লী, মেথরপল্লী-নির্ভর উপন্যাসের পর স্বভাবতই আগ্রহী হয়েছিলাম একটু ভিন্ন পটভূমির উপন্যাস পড়ার জন্যে। কাহিনী এতোটা জোরদার মনে হয়নি। মাঝেমধ্যে বৃথাই টেনে বড় করার প্রয়াস চোখে পড়ে। কিন্তু একদম প্রথম লাইনে বলা প্রবাদের চিত্রায়নই পুরো উপন্যাস জুড়ে। চরিত্র শুধু পতিতারাই নন, বরং বেশ্যার দালাল-মাসী-খদ্দের-সর্দার-পুলিশ মিলিয়ে সমাজের অন্ধকার কোণার একটা পরিপূর্ণ চিত্র - যা শুধু এই সময়েরই উদ্ভুত নয়, বরং চলে এসেছে বৈদিক যুগ থেকে।
কসবি নিয়ে আমি বহুবার লেখার চেষ্টা করেও পারিনি। এখনো পারছিনা। এই বইটা একদমই অন্যরকম। জানিনা কেন আমি এটা পড়ে একদম অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম আর এতটা ভয় আমি কোনো বই পড়ে পাইনি। প্রস্টিটিউশন, যা সমাজে নিষিদ্ধ কিন্তু আবার সর্বজনগ্রাহ্য একটি "পেশা"। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের বিচরণে একইসঙ্গে মুখরিত এবং ঘৃণিত নিষিদ্ধপল্লীর "মেয়েদের" নিয়ে হরিশংকর শক্ত কলমে মেলে ধরতে চেয়েছেন কসবি জীবনের কঠিনতম বাস্তবতা।
বাংলাদেশের হরিশংকর জলদাসের লেখা এর আগে পড়িনি। হঠাৎই আলগোছে হাতে পেয়ে পড়া শুরু করেছিলাম। বিভিন্ন রিভিউ যথেষ্ট ভালো বললেও, সামাজিক উপন্যাস তেমন একটা পছন্দের তালিকাভুক্ত না হবার কারনে এই বই ধরা হয়নি। পৃষ্ঠাসংখ্যা বেশ কম দেখে, আর বেজায় শীতে একটু সময় কাটানো যাক মনে করে পড়া শুরু করি। দুটো কথা বলতে চাই নিজের প্রতিক্রিয়ায়... ১) এই বইটা বেশ ভালো, ২) এবার এনার কিছু বই পড়ে ফেলার সময় এসেছে...
সুন্দর প্লট, অসাধারণ পটভূমি গবেষণা। তবে অনেক জায়গাতে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ডিটেইলিং এর চেষ্টা মনে হয়েছে। বেশ্যাপাড়ার নোংরামিকে চোখের সামনে টেনে আনার এই অতিচেষ্টা সময়ে সময়ে রিপিটেটিভ মনে হয়েছে। একই ব্যক্তি একই কথোপকথনে কখনও আঞ্চলিক, কখনও শুদ্ধ বলছেন। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহারের যে চেষ্টা ছিল, সেটা চেষ্টাই রয়ে গেছে।
কসবি বই পড়ার আগে,সেটার অর্থ জানতে হবে। কসবি শব্দের অর্থ হচ্ছে গতিতা। এই কসবি বইটির গল্প এগিয়েছে চট্টগ্রামের সাহেব পাড়া নামক একটা পতিতালয় নিয়ে। এই বইয়ে লেখক পতিতাদের অবস্থা, পরিস্থিতি, তাদের জীবনের অদ্ভুত সব গল্প তুলে ধরেছেন। আমার মোটামুটি লেগেছে বইটা।
হরিশংকর আমার প্রিয় লেখকদের মধ্যে একজন। আমি এর আগে এনার লেখা "জলপুত্র, একলব্য, ছোট ছোট গল্প, দহনকাল,মৎস্যগন্ধা,কর্ণ" পড়েছি। এবার কসবি পড়লাম।
বইটা মূলত চট্টগ্রামের সাহেবপাড়ার বেশ্যা পল্লীর পরিস্থিতি নিয়ে লেখা। আমি কিছু রেডলাইট এরিয়ার সেক্স ওয়ার্কারদের, তাদের ছেলেমেয়েদের ইন্টারভিউ দেখেছি, এটা মূলত বাস্তবিক ঘটনায় গল্পে ফুটিয়ে তোলা। পৃথিবীর সব প্রান্তের শোষিত মানুষদের হাহাকার গুলো মূলত একই সূরে বাঁধা। এর আগে "সেই সময়" পড়েছিলাম। সেখানে কোলকাতার সোনাগাছি পতিতালয়ের কথা ছিল। গাঙ্গুবাঈ, হিরামান্ডি, কালাঙ্ক এ ও পতিতালয়ের পরিবেশ দেখেছি কিছুটা।
সব মিলিয়ে বেশ বইটা। তবে অবশ্যই এটা প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য। কিছু ভাষা এবং বর্ণনা আছে যেগুলো বেশ সংবেদনশীল।
পতিতাদের জীবনঘনিষ্ঠ বই পড়ার ইচ্ছা ছিলো, বইটা সে ইচ্ছে পূরণ করতে পেরেছে। বইটাকে খুবই বাস্তব করে তুলতে চেয়েছেন লেখক, তাই বোধহয় গালাগালি আর অশ্লীলতার কোনো সীমা রাখেন নি। এত বাস্তবতা তো চাইনি! আর শেষের মেলোড্রামা বইটাকে তৃতীয় শ্রেণীর কাতারে নিয়ে এসেছে।
কসবি অর্থ পতিতা। তিনশ বছরের পুরনো চট্টগ্রামের একটি পতিতালয় সাহেবপাড়া, যেটা আগে জেলে পাড়া ছিল। সেই ইংরেজ আমল থেকে কিভাবে জেলেপাড়া হয়ে উঠল ���াহেবপাড়া নামের বেশ্যালয়, কসবি বইটি সে গল্পই বলে৷ সেই সাথে বিভিন্ন বর্ণনায় ফুটে ওঠে পতিতাদের জীবনের যাপনের করুণ চিত্র। হাজার হাজার বছরের পুরনো একটা পেশা পতিতাবৃত্তি। অনেক দেশে এই পেশার মানুষ যথাযথ পেশাজীবির মর্যাদা পেলেও আমাদের সমাজে তারা শোষিত হয় বারবার৷ বেশিরভাগ কর্মীই দুর্ভাগ্যের ফেরে এই পেশায় আসে। তারপর মাসীদের অত্যাচার, ন্যায্য অর্থ না পাওয়া, ভাগ বসাতে আসা পাড়ার মাস্তান, অনিচ্ছাসত্ত্বেও বার বার দৈহিক মিলনে বাধ্য হওয়া এবং কখনোই কাজে বিরতি না পাওয়া এইসব মেয়েরা ভুলে যায় তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কথা। তাদের সন্তানরা লেখাপড়ার সুযোগ পায় না, বরঞ্চ তাদেরকেও বরণ করে নিতে হয় মায়ের ভাগ্য। এ যেন এক শেষ না হওয়া চলমান চক্র!
বইটির কিছু কিছু জায়গায় তীর্যক ভাষার ব্যবহার দেখে আমি অবাক হয়েছি। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে বরং আরো ভালোভাবে পতিতাদের জীবন কল্পনা করতে পেরেছিলাম।
কাহিনী সংক্ষেপ : কসবি বইটি শৈলেশ নামে এক জেলের কাহিনী দিয়ে শুরু৷ তারপর তার মেয়ে কৃষ্ণার মাধ্যমে ফুটে ওঠে সাহেবপাড়ার পতিতালয়ের কাহিনী। কাহিনী চলার সাথে সাথে পতিতাবৃত্তির ইতিহাস, সাহেবপাড়ার ইতিহাস, পদ্মাবতী, মঞ্জুমাসী, শৈলবালা, কালু সর্দার, মোহিনী, কৈলাশ, মগধেশ্বরী মন্দির - এইসব আসতে থাকে৷ আর তাদের ঘিরেই এগিয়ে যায় কসবি-দের গল্প৷ ফুটে ওঠে শ্রেণী সংগ্রাম, হিংসা, প্রতিশোধ, অত্যাচারী শাসক ও শোষিতদের কাহিনী।
ভাল লেগেছে... খুবই ভাল লেগেছে। লেখক অত্যন্ত শক্তিশালী একজন লেখক। আর দশজন লেখকের মত মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত নিয়ে কাহিনি রচনা করেন না তিনি, বিষয় হিসেবে বেছে নেন সমাজের নিচু স্তরের অবহেলিত শ্রেণিগুলোকে। বিষয়বৈচিত্র্যে কসবি বইটা যে অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ ছিল, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তাতে তিনি শুধু উৎরে যাননি, রীতিমত অসাধারণ সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি করেছেন। কেন্দ্রীয় কোনও চরিত্র ছাড়াই হাজারো ডালপালা মেলা কতগুলো কাহিনিকে এত চমৎকারভাবে সাজিয়ে-গুছিয়ে উপস্থাপন করেছেন যে, প্রশংসা না করে পারা যায় না। এই বই পড়ে নিষিদ্ধপল্লীর জীবনযাত্রা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাবেন পাঠক, খুলে যাবে তাঁদের চোখ। সমব্যথী হবেন অসহায় সে-সব মেয়েদের। চট্টগ্রামের সাহেবপাড়ার পতিতালয় কে ঘিরে গড়ে উঠেছে কসবির গল্প। সাহেব পাড়ার উত্থান, পতিতাদের প্রাত্যহিক জীবন, সংঘাত আর অসহায় মেয়েদের আত্মসমর্পণ ফুটে উঠেছে কসবিতে।
একটা উপন্যাস যতটা সাবলীল ও সহজবোধ্য হওয়া দরকার, লেখক ঠিক ততটাই দিয়ে সম্পূর্ণ উপন্যাসটাকে যথার্থা পূর্ণতা দান করেছেন।
মূলত বারবণিতা বা বেশ্যাদের জীবন-যাপন ও বেশ্যাপল্লিকে ঘিরেই এই উপন্যাস। যেখানে দেবযানী ও পদ্মাবতীর মত অসাধারণ রূপসীদের থেকে শুরু করে, দূষিত পরিবেশে সদিচ্ছয়া কৈলেশের মত বিজ্ঞেরও কথা উঠে আসছে। উপন্যাসে প্রথিতযশা লেখক হরিশংকর নিগূঢ়তার আশ্রয় না নিয়ে, খুব সোজাসাপ্টা ভাবে বেশ্যাপল্লির জীবন-যাপন, ধরণ, রাজনৈতিক কম বেশি সবই সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন, যা তিনি অন্য বইগুলাতে করেন না।
লেখকের অন্য বইগুলা তথ্য-জ্ঞানে সমৃদ্ধ ছিলো বিধায়, এখানেও একটা প্রত্যাশা কাজ করতেছিলো, কিন্তু ওই অনুযায়ী প্রত্যাশা পূর্ণ হয়নি বিধায়, 4 rating out of 5 এ .