সক্রেটিস সর্বজন-পরিচিত নাম। কিন্তু এ-মানুষটি সম্পর্কে জানা দুরূহ, কারণ তিনি লিখিতভাবে কিছু রেখে যাননি। এমনকি বিভিন্ন উৎস থেকে তাঁর যেসব ছবি পাওয়া যায়, সেগুলোরও অকাট্যতা নেই। আধুনিক মানুষের শিক্ষাগুরু সক্রেটিস এবং তাঁর চিন্তাভাবনা নিয়েই হাসান আজিজুল হকের এ-বই।
Hasan Azizul Huq (Bengali: হাসান আজিজুল হক) is a Bangladeshi writer, reputed for his short stories. He was born on 2 February, 1939 in Jabgraam in Burdwan district of West Bengal, India. However, later his parents moved to Fultala, near the city of Khulna, Bangladesh. He was a professor in the department of philosophy in Rajshahi University.
Huq is well known for his experiments with the language and introducing modern idioms in his writings. His use of language and symbolism has earned him critical acclaim. His stories explore the psychological depths of human beings as well as portray the lives of the peasants of Bangladesh.
He has received most of the major literary awards of Bangladesh including the Bangla Academy Award in 1970.
সক্রেটিসকে যখন মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, তখন তার বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনা হয়। i. তিনি এথেন্সের উপাস্য দেবতাদের মানেন না ii. তিনি নতুন দেবদেবী চালানোর চেষ্টা করছেন iii. এথেনীয় তরুণদের তিনি এইসব শিক্ষা দিয়ে বিপথগামী করে তুলেছেন
যারা এই অভিযোগ এনেছিলেন, তারা খুবই অখ্যাত ব্যক্তি এবং তারা যে ব্যক্তিগত আক্রোশের কারণে এমটা করেছিল সেটা ভাবার কোন কারণ নেই। বরং স্পষ্টভাবে বলা যেতে পারে, তাদের পিছনে ছিলো বিরাট একদল অজ্ঞাত অভিযোগকারী।
যে অভিযোগগুলি আদালতে পেশ করা হয়েছিল, সেগুলির বেশিরভাগ ছিল অতি তুচ্ছ এবং গুরুত্বহীন। আদালতের সামনে অভিযোগগুলি প্রমাণ করাও যায়নি। প্রমাণিত হলেও তাতে তৎকালের পরিপ্রেক্ষিতে সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ড হওয়ার কথা নয়, বড়জোর তার নির্বাসন বা কারাদণ্ড হতে পারতো। তার বেশি নয়।
তারপরেও, তৎকালীন এথেনীয় আইন অনুসারে সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সক্রেটিস দোষী বিবেচিত হন এবং অভিযোগকারী সক্রেটিস এর মৃত্যুদণ্ড দাবি করেন।
এথেনীয় আইন অনুসারে, সক্রেটিস পাল্টা শাস্তি প্রার্থনা করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। তার বক্তব্য হচ্ছে, তেমন করলে নিজের দোষ স্বীকার করা হয়। যেটা তিনি করেন নি।
সক্রেটিসকে হেমলক পান করানোর পর, মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তে তিনি তার শিষ্য ক্রিটো কে বলেছিলেন, ''ইসকিউলাপিয়াসের কাছে আমাদের একটি মোরগ মানত আছে, শোধ করে দিয়ো, অবহেলা করো না..."
সক্রেটিসকে নিয়ে জানার আগ্রহ নেই এমন পাঠক খুব কম। সক্রেটিসের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড নিয়ে অল্পবিস্তর সবার জানা থাকলেও তাঁর অতীত জীবন নিয়ে বেশিরভাগ মানুষের মধ্যেই একটা ধোয়াশা থেকেই যায়। তবে এই বইয়ে লেখক অল্পবিস্তর তাঁর সবটা জীবনের নানান দিক নিয়ে লিখেছেন। যদিও এমনিতে সক্রেটিসের নিজের কোনো লিখা নেই, তাঁকে যা জানা যায় সবটাই অন্যের লিখার উপর ভিত্তি করে। এই অবস্থায় এমন একটা বই সক্রেটিস নিয়ে জানার আগ্রহী পাঠকের জন্য অবশ্যপাঠ্য হয়ে দাঁড়ায়।
সাতাত্তর পৃষ্ঠার সীমাবদ্ধতায় সক্রেটিসকে জেনে ফেলা সম্ভব নয় অবশ্যই; তাছাড়া এখানে সক্রেটিসের দর্শনের বিস্তারিত আলাপেরও সুযোগ ছিলো না, সেজন্য পাঠককে প্লেটো পড়তেই হবে। তবে এই বই পড়ে পাঠকের আগ্রহটা তৈরি হবার সম্ভাবনা আছে। সক্রেটিস কেন চিরস্মর্তব্য, তার বেশ খানিকটা ধারণা পাওয়া যায়। আর লেখক সক্রেটিসের সময়কার এথেন্স ও হেলেনিক সভ্যতার বর্ণনা দিয়েছেন, প্রাসঙ্গিক প্রেক্ষাপট বুঝতে বেশ সাহায্য করে।
তিনটা স্টার দিচ্ছি দুই কারণে। প্রথমত, লেখায় প্রচুর পুনরাবৃত্তি; হাসান আজিজুল হকের ননফিকশনে সম্ভবত এই সাধারণ প্রবণতাটি রয়েছে। দুই-এক অনুচ্ছেদ বা পৃষ্ঠার পরে একই প্রসঙ্গ বা তথ্যের পুনরাবৃত্তি কিংবা একই জিনিসকে ঘুরিয়েফিরিয়ে বিভিন্নভাবে লেখা কিছুটা ক্লান্তিকর। দ্বিতীয়ত, কিছু কিছু ক্ষেত্রে অভিনব বিষয়বস্তুর অবতারণা করেও বিস্তারিত আলাপে যাননি; ধরেই নিয়েছেন যে, পাঠক এসব জানেন। বৈশিষ্ট্যটিকে লেখার সহজবোধ্যতা ও সার্বজনীনতার ক্ষেত্রে সম্ভবত একধরনের প্রতিবন্ধকতা বলা চলে।
অসাধারণ একটা বই। সক্রেটিস, সক্রেটিস এর সময়কার রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং তখনকার এথেন্সের মানুষের চিন্তা-চেতনা-মনন ইত্যাদি বুঝার জন্য একটি উপযুক্ত বই। বইটিতে সক্রেটিসের উপরই আলোকপাত করা হয়েছে কিন্তু সক্রেটিসকে ভালোভাবে বুঝানোর জন্য তখনকার সামাজিক আর রাজনৈতিক পরিস্থিতিরও একটি রেখাচিত্র তৈরি করেছেন লেখক।
'সক্রেটিস' নাম শুনলে যে পোর্ট্রে টা আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে, তা কতটুকু সঠিক ও যুক্তিসংগত_আমরা বেশিরভাগই জানি না। যাই হোক, এক চিলতে সক্রেটিসের সাথে এক চিলতে এথেন্সেদ রাজনীতি, সমাজ তথা ইতিহাস এবং এক চিমটি দর্শন মিলিয়ে মাত্র ৬৩ পৃষ্ঠার দারুণ এক বই।
আমার দর্শনের প্রথম পাঠ। খুব ছোট করে এক মহীরুহকে জানার প্রয়াস। স্থূল গ্রন্থের চাপায় পড়ে যাবার ইচ্ছা ছিল না। এ বই পাঠের আগ পর্যন্ত জানতাম হাসান আজিজুল হক বোধ হয় বাংলা পড়ান; পরে এত গভীর আর সরল আলোচনা পাঠের পর সন্দেহ জাগলে জেনে গেলাম তিনি দর্শন পড়ান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে।
লেখকের লিখাতে পুনরাবৃত্তি স্বভাব ছিলো। তবুও আমি রেটিং ৫ দিতে বাধ্য হচ্ছি। কেননা এত সুন্দর করে একটা জটিল বিষয়কে উপস্থাপন সত্যিই প্রশংসনীয়। বইটি খুব আনন্দের সাথেই পড়েছি। পড়ে দেখতে পারেন, ভালো লাগবে।
পৃথিবীর মানব সভ্যতার ইতিহাস বলুন কিংবা দর্শনের ইতিহাস বলুন, ধর্মনিরপেক্ষভাবে যে ব্যক্তিটি গভীরতম প্রভাব রেখে গেছেন তিনি সক্রেটিস। লেখক হাসান আজিজুল হক 'সক্রেটিস' বইটির শেষের দিকে এসে বলছেন,
'এতটুকু অতিশয়োক্তি না করে বলা যায়, পশ্চিমী সভ্যতার আজ যা কিছু শ্রদ্ধেয়-বুদ্ধির মুক্তি, সত্যের প্রতি অবিচলিত নিষ্ঠা, গভীর স্বদেশ প্রেম, মানবকল্যাণের আদর্শ, সুতীক্ষ্ণ, নির্মম, নির্মোহ আত্মবিশ্লেষণ, প্রবল জীবনতৃষ্ণা-এসবেরই একটা প্রধান উৎস হচ্ছে সক্রেটিসের দর্শন এবং সন্দেহ নেই সক্রেটিস নামের মানুষটি।'
আর এই পশ্চিমারা যখন প্রায় গোটা পৃথিবীকে নিজেদের ভেতর ভাগাভাগি করে কলোনিতে রুপান্তর করে তখন প্রাচীন গ্রীক দর্শনের উত্তরাধিকার এসব কলোনির জ্ঞানপিপাসু মানুষদের মাঝেও ছড়িয়ে পড়ে। সক্রেটিস পশ্চিম থেকে ছড়িয়ে পুরো পৃথিবীতে জ্ঞানের অপ্রতিদ্বন্দ্বী আইডল হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
অথচ লোকটি নিজের হাতেকলমে লিখে যান নি কিছুই। গেলেও সেগুলো কখনোই উদ্ধার করা যায় নি। মূলত সক্রেটিসের সমসাময়িক জেনোফন, অ্যারিস্টোফানিস ও প্লেটোর কলম থেকে আমরা সক্রেটিস সম্পর্কে জানতে পারি। তবে প্রথম দুজনের সক্রেটিস কিছুটা খন্ডিত, খাপছাড়া ও অসম্পূর্ণ। পূর্ণ ও বিকশিত সক্রেটিসকে আমরা পাই প্লেটো 'রিপাবলিক' গ্রন্থগুচ্ছে।
আড়াই হাজার বছর পূর্বে এথেন্স ও গ্রীকদেশে অনেক দার্শনিকরা দর্শনশাখাকে সমৃদ্ধ করলেও সক্রেটিস কেন তাদের থেকে অনন্য এই প্রশ্ন আমার অনেকদিনের। এই ব্যাপারে আমার একটা ভাসা ভাসা ধারণা থাকলেও হাসান আজিজুল হক সেই ধারণার একটা স্পষ্ট আকার দিয়েছেন ওনার বইটিতে। শুধু এটুকু বলি, নিজের অজ্ঞানত���কে উপলব্ধি করা ও স্বীকার করা যে জ্ঞানের একটি প্রাথমিক স্তর এমন মৌলিক চিন্তা সক্রেটিস আমাদের দিয়ে গেছেন। তবে লেখকই স্বয়ং স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিয়েছেন, রিপাবলিক বইটি গভীর মনোযোগ সহকারে পড়ার কোন বিকল্প নেই সক্রেটিসকে জানার ও বোঝার জন্য।
সক্রেটিস নাস্তিক ছিলেন না। আত্নার অমরত্ব ও জন্মান্তরবাদে বিশ্বাস করতেন। বিশ্বাসটি প্রাচীন বৈদিক ও বৌদ্ধ দর্শনের সাথে বিস্ময়জনকভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ। ওনার আত্মার অমরত্বে বিশ্বাস মৃত্যুর প্রতি ওনার প্রতিক্রিয়ার প্রধান ভিত্তি। যার প্রমাণ মেলে যেসব বিচারক মৃত্যুদন্ডের রায় দিয়েছিলে তাদের উদ্দেশ্যে সক্রেটিসের বক্তব্যে,
'যাঁরা মৃত্যুকে অশুভ বা মন্দ বলে তাঁরা ভুল করে। মৃত্যুর পরে যদি অফিযুস, মুসিউস, হিসয়েড আর হোমারের সঙ্গে আলাপ করতে পারা যায় তাহলে তার জন্যে মানুষ কি না দিকে পারে? এইটাই যদি সত্য হয় তা হলে আমি বারে বারে মরতে চাই। পরলোকে অন্তত প্রশ্ন করার অপরাধে মানুষকে হত্যা করা হয় না।... বিদায় নেবার সময় এসে গেছে, আসুন নিজের নিজের রাস্তায় চলি আমরা-আমি মরতে এবং আপনারা বাঁচতে। ঈশ্বর জানেন কোনটা বেশি ভালো।'
আজও পৃথিবী এই দ্বন্দ্বে দ্বিধাবিভক্ত যে সক্রেটিসের মৃত্যু একটি রাজনৈতিক হত্যা নাকি তার নৈতিক দর্শনের প্রতি গোঁড়া ও আপোষহীন মনোভাবের ফলশ্রুতিতে একরকম আত্মহত্যা। তবে প্লেটো তার 'ফিডো' রচনায় সক্রেটিসের মৃত্যুকে গ্রহণ করার চিত্র তুলে ধরেছেন সেটা আজও অভূতপূর্ব। লেখকের মত সেখান থেকে খানিকটা আমিও তুলে দেবার লোভ সংবরণ করতে পারছি না।
'যাই হোক, ক্রিটো, লোকটির (একাদশদের কর্মকর্তা) কথা মান্য করবো আমরা, তৈরি হয়ে থাকলে কেউ বিষ নিয়ে আসুক, না হলো বলো তৈরি করে আনতে।'
তখন ক্রিটো বললেন, 'কিন্তু সক্রেটিস, সূর্য তো পাহাড়ের মাথায় এখনো অস্ত যায়নি। তাছাড়া আমি জানি, পান করতে বলার পরেও অন্যেরা খেয়েছে অনেক দেরি করে। নিজেদের খুশিমতো পানভোজন করেছে, এমনকি কেউ কেউ তাদের আসক্তির সামগ্রী উপভোগ পর্যন্ত করেছে। এখনো সময় আছে, তাড়াহুড়ো করবেন না।'
এই কথায় সক্রেটিস বললেন, 'ক্রিটো, যাদের কথা বলছো তারা এসব করেছে সঙ্গত যুক্তিতেই, আমিও সঙ্গত যুক্তিতে ওরকম করবো না। কারণ আমি মনে করি খানিকটা দেরিতে বিষ খেয়ে আমি কিছুমাত্র লাভ করবো না, মাঝখান থেকে জীবনের প্রতি এত মায়ার জন্যে নিজের কাছে নিজেই হাস্যস্পদ হয়ে যাবো যখন জানি যে কোনো কিছুই শেষতক স্থায়ী হয় না। যাও, কথা শোনো, বাধা দিয়ো না।'