লেখকের চাকরিই এইরকমের। এক জায়গা থেকে আর এক জায়গা ঘুরে বেড়ানো। ব্যাঙ্কের হিসাব দেখে দেখে অডিট করা। কোথাও তিন-চার দিনেই কাজ হয়ে যায়, আবার কোথাও দিন কুড়িও লেগে যায়। এটা নির্ভর করে ব্যাঙ্কের হিসাবের জট কেমন পাকিয়েছে তার ওপর।
আগে ব্যাঙ্কের শাখা কেবল বড় বড় শহরেই থাকত। কিন্তু এখন চাষীদের সুবিধার জন্য আধা শহরে, গ্রামেও শাখা হচ্ছে। লেখককে বেশীর ভাগ সময় এই আধা শহরেই যেতে হত।
এই ধরনের কাজে একবার বিরামপুরে যেতে হয়েছিল। সকালে অফিসে গিয়ে শুনলেন বেলা তিনটার গাড়িতে রওনা হতে হবে। লেখকের বিছানা বাঁধাই থাকত। সুটকেস গুছিয়ে নিয়ে ট্রেনে চড়ে বসলেন। বিরামপুর স্টেশনে যখন নামলেন, সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। চারদিকে কেরোসিনের আলো জ্বলে উঠেছে। রাস্তায় লোকচলাচল বিশেষ নেই।
ব্যাঙ্ক থেকে একটি লোক নিতে এসেছিল। একতলা লাল রংয়ের বাড়ির সামনে পৌঁছালেন তাঁরা। সাথের লোকটি বলল, নামুন স্যার, এখানেই আপনার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। দু’খানা ঘর, মাঝখানে ছোট উঠান, ওপাশে রান্নাঘর। একজনের পক্ষে যথেষ্ট। রাত নটার মধ্যেই খাওয়া শেষ করে শোবার আয়োজন করলেন লেখক। কাজের লোকটা চলে গেছে। আবার কাল ভোর ছটায় আসবে।
শোবার মিনিট দশেকের মধ্যে পেটের যন্ত্রণা শুরু হলো। অসহ্য যন্ত্রণা! শরীর একেবারে কুঁকড়ে যায়। মনে হয় দমবন্ধ হয়ে যাবে।
এরকম লেখকের মাঝে মাঝে হয়। সেইজন্য সব সময় ওষুধ কাছে রাখেন। তন্নতন্ন করে খুঁজলেন। সর্বনাশ! ওষুধের শিশিটা ফেলে এসেছেন।
এখন উপায়! বিছানায় শুয়ে ছটফট করতে করতে হঠাৎ মনে পড়ে গেল, আসবার সময় কাছেই এক ডাক্তারখানা চোখে পড়েছিল। ডাক্তারখানার নামটা অদ্ভুত! আরামঘর। নীচে লেখা, চব্বিশ ঘণ্টা খোলা। যদিও ডাক্তারখানা বন্ধ ছিল তখন।
হাতঘড়িতে সময় দেখলেন নয়টা চল্লিশ। এত রাতে এই মফঃস্বল শহরে ডাক্তারখানা কি খোলা থাকবে? যাই হোক একবার চেষ্টা করে দেখতেই হবে। যন্ত্রণা ক্রমেই অসহ্য হয়ে উঠছে।
কোনো ক্রমে দু হাতে পেট চেপে প্রায় কুঁজো হয়ে এগিয়ে গেলেন। বরাত ভাল। আরামঘর খোলা। টিমটিমে আলো দেখা যাচ্ছে। ঢুকতেই দেখা হয়ে গেল। পরনে কালো রংয়ের সুট। কালো টাই। ময়লায় তেলচিটে অবস্থা। একমাথা পাকা চুল প্রায় কাঁধ পর্যন্ত নেমে এসেছে। তোবড়ানো মুখ। দুটি চোখ রক্তের মতন লাল।
কি চাই? রোগা চেহারা হ’লে হবে কি, বাজখাঁই গলার আওয়াজ। পেটের যন্ত্রণার কথা বললাম। ডাক্তার পিছনের কাচভাঙ্গা আলমারি থেকে একটা শিশি বের করে কাগজে ঢেলে আমাকে দিল, খেয়ে নিন।
তামাকের গুঁড়াের মতন কাল রং। বিশ্রী গন্ধ। ভয় হল, কেমন ডাক্তার জানি না, কি ওষুধ ঠিক নেই। খাওয়া কি ঠিক হবে? সন্দেহ হলে ফেলে দিন। খেতে হবে না। ডাক্তার গর্জন করে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে লেখক ওষুধটা গলায় ঢেলে দিলেন। কি আশ্চর্য, মিনিট পাঁচেকও গেল না। ব্যথাটা একেবারে সেরে গেল। জিজ্ঞাসা করলেন, আপনাকে কত দিতে হবে? আবার বোমা ফাটল।
কে মশাই আপনি, বিনোদ ডাক্তারকে পয়সা দিতে চাচ্ছেন? কত লাখ টাকার মালিক আপনি? জানেন না, আমি পয়সা নিয়ে চিকিৎসা করি না।
নিজের দোষ কাটাবার জন্য মৃদু কণ্ঠে লেখক বললেন, কিছু মনে করবেন না। আমি এখানে নতুন এসেছি। এসব জানা ছিল না। লেখক চলে গেলেন এবং দিন দুয়েক পর ব্যাঙ্কের হিসাব দেখতে দেখতে ম্যানেজার অনিলবাবুকে কথাটা বললেন। ছোট জায়গা হলে কি হবে মশাই, এখানকার ডাক্তার একেবারে ধন্বন্তরি।
কার কথা বলছেন? ওই যে আরামঘর-এর বিনোদডাক্তার। লেখকের উত্তর শুনে অনিলবাবু কিছুক্ষণ একদৃষ্টে দেখলেন, তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, বিনোদডাক্তারের সঙ্গে দেখা হল কোথায়?
বললাম, দিন দুয়েক আগে পেটে একটা ব্যথা হয়েছিল। এরকম আমার মাঝে মাঝে হয়। বিনোদ ডাক্তারের একটা বড়িতেই সেরে গেল। আশ্চর্য ওষুধ! অনিলবাবু আর কিছু বলল না, কিন্তু লক্ষ্য করলাম সারাটা দিন আমাকে যেন এড়িয়ে চলল।
ব্যাপারটা ঠিক বুঝলেন না লেখক। দিন কয়েক পর হঠাৎই খেয়াল হল লেখকের বিনোদ-ডাক্তারের সঙ্গে একবার দেখা করে আসা যাক। খাওয়া-দাওয়া শেষ। আরামঘর তো অনেক রাত অবধি খোলা থাকে। দরজায় তালা দিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। আরামঘরের কাছাকাছি যেতেই হাসির শব্দ কানে এলো। অনেক লোকের মিলিত কণ্ঠের হাসি।
কৌতূহল হলো লেখকের। দুটো আলমারির ফাঁক দিয়ে ভিতরে উঁকি দিলেন। পিঠের শিরদাঁড়া বেয়ে যেন বরফের স্রোত নেমে গেল। পা দুটো কেঁপে উঠল থরথর করে। একি দেখছেন তিনি...............!
// পাঠ প্রতিক্রিয়া:
মশাই এসব গল্পের কথা কী আর বলবো প্রতিক্রিয়াতে। ওহ্ এক কথায় দারুন। মানে কিছু কিছু গল্প থাকে পড়তে এত ভালো লাগে যে কখন ফুরিয়ে যায় টের পাওয়া যায় না।
হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়ের গল্পের প্লট মানানসই লেগেছে এবং লেখনীও চমৎকার। এবং পড়তে পড়তে নিজেকে বোধহয় আবিষ্কার করেছিলাম "আরামঘর" এর সামনে।
গল্পের আসলে সার্থকতা এখানেই যেটা পাঠকের মনে ধরবে এবং ভালো লাগবে। এবং সত্যিই বেশ ভালো লেগেছে গল্পটি।
পড়ার জন্য যদি এমন লেখনীর দুচারটা ভূতের গল্পের বই থাকে তো বৃষ্টিদিনে বা শীতকালের রাতটা ভালোই জমবে বলা যায়।
বইয়ের নামঃ "বিনোদ ডাক্তার" লেখকঃ হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায় ব্যক্তিগত রেটিংঃ ৫/৫
হরিনারায়ণবাবুর লেখা খুব বেশি পড়ার সৌভাগ্য হয়নি। এই ভূতের গল্পটির সাথে পরিচয় হয়েছিল সানডে সাসপেন্সের সৌজন্যে। গদ্য অতিশয় স্বাদু। তবে চমকে দেওয়ার মালমশলা একটু কম পেয়েছি। বিনোদ ডাক্তার একজন ভূত এবং তার কাছে বাকি ভূতেরা আসে চিকিৎসা করাতে সেটা খুব তাড়াতাড়ি পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার পর বাকি গল্প একটাই মাত্র সম্ভাব্য পরিণতির দিকে সম্ভাব্য পথেই এগিয়ে গেছে।
লেখকের 'ইরাবতী' পড়লাম, ভাল লেগেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান বার্মা দখল করে নেয়, সেখান থেকে ইংরেজ পালায়, ভারতীয়রাও পালায় অনেকে ধরা পড়ে, তাদের বাড়িঘর লুটপাট হয়ে যায়। লোকাল বার্মিজ তখন পাগল হয়ে উঠেছিল, বিদেশি মাত্রই মারো। কিন্তু উপন্যাসের নায়ক ভারতীয় হলেও সে ভাগ্যক্রমে হয়ে ওঠে বার্মিজদের নেতা, অস্ত্রাগারের রক্ষক। কিন্তু তাকেও তো সকল বার্মিজ চেনে না আর চেহারায় বিদেশি হওয়ায় তারও বার্মিজদের হাতে প্রাণ হারানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এইরকম টানাপোড়েন নিয়েই এই উপন্যাস।
বিনোদ ডাক্তার পড়েও আনন্দ পেলাম, এইসব গল্প শৈশবে বা কৈশোরে পড়তে পারলে অনেক লাভ হত।