“সালাত : নবীজির শেষ নির্দেশ” দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নবী (স)-কে কী পরিমাণ কষ্ট সহ্য করতে হয়েছিল, তা আমাদের সবারই জানা আছে। তাঁর ওপর অপবাদ দেওয়া হয়েছিল, আঘাত করা হয়েছিল তাঁর সম্মানে। তারা তাঁকে মিথ্যাবাদী, জাদুকর বলেছিল। সালাত আদায়ের সময় কাফিররা উটের নাড়িভুঁড়ি চাপিয়ে দিয়েছিল তাঁর পিঠে। তারা তাঁকে শ্বাসরুদ্ধ করতে চেয়েছিল কা’বার পাশে। একদিন যখন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কা’বার পাশে ছিলেন, উকবা তাঁর গলার পাশে চাদর জড়িয়ে তাঁকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যার চেষ্টা করেছিল। এত ত্যাগ, এত কষ্টের পর তিনি ইসলামের বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন—যাতে দুনিয়ায় আমরা সুন্দর জীবন নিয়ে বসবাস করতে পারি এবং পরে তাঁর সাথে মিলিত হতে পারি জান্নাতে। এই বার্তা পৌঁছে দেওয়ার কারণে তায়েফে তাঁর ওপর নিক্ষেপ করা হয়েছিল পাথর, এমনি জুতোও! এই দ্বীন পৌঁছে দেওয়ার জন্য নবী (স) এত কষ্ট করেছেন। আর এই দ্বীনের খুঁটি হলো সালাত।যখন সালাত বিনষ্টহবে তখনদ্বীনেরভিত্তিওদুর্বলহয়েপড়বে।দুঃখের বিষয় হলো, আজকের অনেক মুসলিমই সালাত আদায় করে না। একেবারেই সালাতের ব্যাপারে উদাসীন তারা। সালাতের গুরুত্ব, মহত্ত্ব ও তাৎপর্য নিয়ে খুব সুন্দর জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করেছেন শাইখ আহমাদ মূসা জিবরীল। তাঁর সেই লেকচারের বাংলা অনুবাদ নিয়ে আসছে নুসুস পাবলিকেশন—“সালাত : নবীজির শেষ নির্দেশ” এই নামে।
শায়খ আহমেদ মুসা জিবরীলের জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে। তার পিতা শায়খ মুসা জিবরীল রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন মদীনার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সেই সুবাদে আহমেদ মুসা জিবরীল শৈশবের বেশ কিছু সময় কাটান মদীনায় । সেখানেই ১১ বছর বয়সে তিনি হিফয সম্পন্ন করেন। হাইস্কুল পাশ করার আগেই তিনি বুখারী ও মুসলিম শরীফ মুখস্ত করেন। কৈশোরের বাকী সময়টুকু তিনি যুক্তরাষ্ট্রেই কাটান এবং সেখানেই ১৯৮৯ সালে হাইস্কুল থেকে পাশ করেন। পরবর্তিতে তিনি বুখারী ও মুসলিম শরিফের সনদ সমূহ মুখস্ত করেন আর এরপরে হাদিসের ৬টি কিতাব (কুতুব সিত্তাহ) মুখস্ত করেন। এরপর তিনিও তার বাবার পদাঙ্ক অনুসরন করে মদীনার ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শরীয়াহর উপর ডিগ্রী নেন।
আহমাদ মুসা জিবরীল শায়খ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল উসাইমীনের (রাহিমাহুল্লাহ) তত্ত্বাবধানে অনেকগুলো কিতাবের অধ্যায়ন সম্পন্ন করেন এবং তিনি তার কাছ থেকে অত্যন্ত বিরল তাযকিয়্যাও লাভ করেন।
শায়খ বাকর আবু যাইদের (রাহিমাহুল্লাহ) সাথে একান্ত ক্লাসে তিনি আল ইমাম ওয়াল মুজাদ্দিদ শায়খ মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল ওয়াহ্হাব (রাহিমাহুল্লাহ) ও শায়খ আল-ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যার (রাহিমাহুল্লাহ) কিছু বইও অধ্যায়ন করেন। তিনি শায়খ মুহাম্মাদ মুখতার আশ-শিনক্বিতীর অধীনে ৪ বছর পড়াশুনা করেন। আল্লামাহ হামুদ বিন উক্বলা আশ- শু’আইবীর অধীনেও তিনি অধ্যায়ন করেন এবং তাযকিয়্যাহ লাভ করেন।
তিনি তার পিতার সহপাঠি শায়খ ইহসান ইলাহি যহীরের অধীনেও পড়েছেন। শায়খ মুসা জিবরীল (শায়খ আহমেদ মুসা জিবরীলের পিতা) শায়খ ইহসানকে অ্যামেরিকায় আমন্ত্রন জানান। শায়খ ইহসান অ্যামেরিকায় কিশোর শায়খ আহমাদ মুসা জিবরীলের সাথে পরিচিত হবার পর চমৎকৃত হয়ে তার বাবাকে বলেন – ইন শা আল্লাহ আপনি একজন মুজাদ্দিদ গড়ে তুলেছেন! তিনি আরও বলেন – “এই ছেলেটি তো আমার বইগুলো সম্পর্কে আমার চেয়েও বেশি জানে!”
শায়খ আহমাদ মুসা জিবরীল “আর-রাহীকুল মাখতুম”- এর লেখক সাফিউর রাহমান আল-মুবারাকপুরির (রাহিমাহুল্লাহ) অধীনে দীর্ঘ ৫ বছর অধ্যায়ন করেন। এছাড়াও তিনি অধ্যায়ন করেন শায়খ মুক্ববিল, শায়খ আব্দুল্লাহ গ্বুনায়মান, শায়খ মুহাম্মাদ আইয়ুব এবং শায়খ আতিয়াহ আস-সালিমের অধীনে। এদের মধ্যে শায়খ আতিয়াহ আস-সালিম ছিলেন শায়খ আল-আল্লামাহ মুহাম্মাদ আল আমিন শানক্বীতির (রাহিমাহুল্লাহ) প্রধান ছাত্র, এবং তিনি শায়খ আশ-শানক্বিতির ইন্তেকালের পর তার প্রধান তাফসির গ্রন্থ আদওয়া উল বায়ানের কাজ শেষ করেন।
শায়খ আহমাদ মুসা জিবরীল শায়খ ইব্রাহিম আল হুসাইনের এর ছাত্র ছিলেন। শায়খ ইব্রাহিম ছিলেন শায়খ আব্দুল আযিয বিন আব্দুল্লাহ বিন বাযের (রাহিমাহুল্লাহ) অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহচর। শায়খ আব্দুল্লাহ আল-ক্বুদের (আল-লাজনাহ আদ দা-ইমাহ লিল বুহুতুল ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতাহ – Permanent Committee for Islamic Research and Issuing Fatwas– এর প্রথম দিকে সদস্য) সাথে শায়খ আহমাদ মুসা জিবরীল হাজ্জ করার সুযোগ লাভ করেন। এছাড়া তিনি দুই পবিত্র মাসজিদের রক্ষনাবেক্ষনের দায়িত্বে নিয়োজিত কমিটির প্রধান শায়খ সালিহ আল-হুসাইনের অধীনেও অধ্যায়নের সু্যোগ পান।
তিনি মহান মুহাদ্দিস শায়খ হামাদ আল-আনসারির রাহিমাহুল্লাহ অধীনে হাদীস অধ্যায়ন করেন এবং তার কাছ থেকে তাযকিয়্যাহ লাভ করেন। তিনি অধ্যায়ন করেন শায়খ আবু মালিক মুহাম্মাদ শাক্বরাহ-র অধীনে। শায়খ আবু মালিক ছিলেন শায়খ আল-আলবানির (রাহিমাহুল্লাহ) অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। শায়খ আল-আলবানি তাঁর ওয়াসিয়্যাহতে শায়খ আবু মালিককে তার জানাযার ইমামতি করার জন্য অনুরোধ করেন। . শায়খ আহমাদ মুসা জিবরীল শায়খ মুসা আল-ক্বারনিরও (রাবী আল-মাদ্বখালির জামাতা) ছাত্র। ক্বুরআনের ব্যাপারে শায়খ আহমাদ ইজাযাহ প্রাপ্ত হন শায়খ মুহাম্মাদ মা’বাদ ও অন্যান্যদের কাছ থেকে। শায়খ মুসা জিবরীল ও শায়খ আহমাদ মুসা জিবরীলের; ইলম থেকে উপকৃত হবার জন্য শায়খ বিন বায অ্যামেরিকায় থাকা সৌদি ছাত্রদের উৎসাহিত করেন। শায়খ আহমাদ মুসা জিবরীল শায়খ বিন বাযের কাছ থেকে তাযকিয়্যাহ অর্জন করেন (শায়খ বিন বাযের মৃত্যুর তিন মাস আগে)।
শায়খ আহমাদ মুসা জিবরীলের ব্যাপারে মন্তব্য করার সময়ে শায়খ বিন বায তাকে সম্বোধন করেন, একজন “শায়খ” হিসেবে এবং বলেন তিনি “(আলিমদের কাছে) পরিচিত” ও “উত্তম আক্বিদা পোষণ করেন।”
শায়খ আহমাদ মুসা জিবরীল নিজেকে শায়খ হামুদ বিন উক্বলা আশ-শু’আইবি রাহিমাহুল্লাহ, শায়খ আলি আল খুদাইর হাফিযাহুল্লাহ, শায়খ নাসির আল ফাহদ ফাকাল্লাহু আশরাহ, শায়খ সুলাইমান আল ‘উলওয়ানসহ ফাকাল্লাহু আশরাহ ঐসব আলিমদের সিলসিলার অনুসারী মনে করেন যারা বর্তমান সময়ে শায়খ আল-ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ, আল ইমাম ওয়াল মুজাদ্দিদ মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল ওয়াহ্হাব ও উলামায়ে নাজদের শিক্ষাকে সত্যিকারভাবে আকড়ে আছে, যারা প্রকৃত অর্থে উলামায়ে নাজদের উত্তরসূরী। তার সব শিক্ষকের মাঝে শায়খ আল আল্লামাহ শায়খ হামুদ বিন উক্বলা আশ-শু’আইবীকে রাহিমাহুল্লাহ তিনি তার প্রধান শায়খ মনে করেন, এবং শায়খ
বইটাতে সালাতের ফজিলত এবং না পড়লে কি শাস্তি পাবেন তা ভালভাবে বলা হয়েছে। এমন অনেকে আছে যারা সালাত আদায় করতে চাচ্ছেন, কিন্তু হচ্ছে না এবং একটা push পেলেই সালাতে নিয়মিত হবেন,,এমন মানুষদের জন্যে বেশ ভাল একটা বই। সুতরাং, একটা মানুষকে ভালভাবে নামাযের দিকে ধাবিত করতে পারে এই বই(সাথে নিজের চেষ্টা এবং ইচ্ছা থাকতে হবে)
আসলে আজকাল তো মানুষকে সুন্দর কথাতে হয় না, ভয় দেখাতে হয়/ঐ বিষয়ে শক্ত করে বলতে হয়। এই বইয়ে নামায পড়ার শাস্তি নিয়ে এমনভাবে বলেছে যে আপনি ভাবতে বাধ্য হবেন কি বিশাল পাপ যে আপনি করছেন!শুধু এক ওয়াক্ত সালাত বাদ দিলে যে শাস্তির বর্ণনা দিছে তার কথা বাদ ই দিলাম(লজ্জাতে মাথা নিচু হয়েছিল আমার)
সালাত কেন পড়ব? কেন সময় মতো পড়ব? কেন সালাত ছাড়া যাবে না? সালাতের তারগীব-তারহীব কী কী? মানুষ কেন সালাত আদায় করে না? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে এই বইয়ে। আমরা যারা এখনো সালাত পড়া শুরু করি নি বা পড়লেও পাঁচ ওয়াক্তে নিয়মিত নই অথবা যারা আলহামদুলিল্লাহ নিয়মিত পড়ছি সকলের জন্যই এই বই।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেদিন আল্লাহতা'লার কাছে চলে গেলেন, সেদিন শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত তিনি তাঁর উম্মাহর জন্য এই সালাতকেই ওসিয়ত করে গিয়েছিলেন। সালাতের গুরুত্ব অনুধাবনের জন্য এই একটি কারণই কি যথেষ্ট নয়?
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বই। সালাত একটি ফরজ ইবাদত। এতে কোনো ছাড় নেই। কাল কেয়ামতের দিন প্রথম যে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে আমাদের তা এই সালাত সংক্রান্ত। এখানে পাশ করতে পারলে তবেই আমাদের বাদবাকি পথ সহজ হবে অন্যথায় এখান থেকেই শুরু আমাদের বরবাদির। আল্লাহর কাছে পানাহ চাই।
বইটি যদিও মূলত যারা নিয়মত বা এক্কেবারে সালাত আদায় করেন না তাদেরকে উদ্দেশ্য করে লিখা তবুও এতে রয়েছে সব ধরনের সালাত আদায়কারীদের জন্যে বিশেষ বার্তা। যারা এমনিতেই নিয়মিত সালাত আদায় করেন তারা উদ্বুদ্ধ হবেন সালাতকে আরও সুন্দর করতে আর সালাতের দাওয়াতকে সবদিকে ছড়িয়ে দিতে যাতে একজন মুসলমানও বাদ না পড়ে।
আর যারা সালাত আদায়ে নিয়মিত না বা এক্কেবারে আদায় করেন না তারা এই বই পড়ার পরে আর নিজের অবস্থানে স্থীর থাকবেন না, একদম গা ঝাড়া দিয়ে উঠবেন ইন শা আল্লাহ। কেননা বইয়ের আবেদনটাই এতো শক্তিশালী আর আমাদের দ্বীনে সালাতের গুরুত্বটাও এতো বেশী।
সালাতকে গুরুত্ব মাধ্যমে যেভাবে আপনি হয়ে যেতে পারেন আল্লাহর একদম কাছের ও প্রিয় বান্দাদের একজন ঠিক একইভাবে সালাত অবহেলা করার দরুন আপনার অজান্তেই আপনি দ্বীনের গন্ডি থেকে বের হয়ে পরিনত হতে পারেন মুসলিম নামধারী এক কাফিরে। এতোটাই গুরুতর এই বিষয়টা।
বইয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে আল্লাহ উত্তম প্রতিদান দিন। আমাদের সকলকে সালাতের প্রতি মনোযোগী হওয়ার ও সালাতকে যথার্থ গুরুত্ব ও মর্যাদা দেওয়ার তৌফিক দান করুন। আমীন। সকল প্রশংসা এই বিশ্বজাহানের একক স্রষ্টা ও প্রতিপালক আল্লাহর।