প্রাচ্যে কোনো কোনো গঠনশৈলী হাজার বছর টিকে ছিল। পাশ্চাত্যে কোনো স্টাইলই বেশিদিন স্থায়িত্ব লাভ করেনি। মূলত এটিই পূর্ব-পশ্চিমের শিল্পকলার প্রধানতম পার্থক্য। কামাল আহমদ মাত্র ২শ ১৪ পাতার বইতে শিল্পকলার ইতিবৃত্তকে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। আলোচনা করেছেন শিল্পকলার প্রভাবশালী মতবাদগুলো নিয়ে। চমৎকার কিছু ক্ল্যাসিক চিত্রকর্মের সংযোজন বইটিকে বিশিষ্টতা দান করেছে।
শিল্পকলার ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করার আগে শিল্প কী এবং কোনটি শিল্প নয় তা নির্ধারণ করা জরুরি। শিল্প নিয়ে দিও ক্রাইসোসস্তোমের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য, " শিল্পসৃষ্টি কোনো বাঁধাধরা নিয়মের মধ্যে হয় না, সৃজন ব্যাপার হলো মনের মধ্যে যে ধারণা জন্মেছে তাকে বাস্তবরূপ দান করা। "
আলতামিরা, লাসকো গুহার চিত্রকর্মগুলোর ভিত্তি শিল্পবোধ ছিল বৈকি। তবে শিল্পচর্চার চাইতে প্রাত্যহিক জীবনকেন্দ্রিক বিশ্বাসের প্রাধান্য লক্ষণীয়। অর্থাৎ ধর্মবোধের বিষয়টি চলে এলো শিল্পচর্চার উৎপত্তিস্থলের সন্ধান করতে গিয়ে। কামাল আহমদের শিল্পকলার অতীত নিয়ে খোঁড়াখুঁড়ির একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ধর্মকেন্দ্রিক বিশ্বাসের সাথে শিল্পকলার উত্থানের পারস্পরিক সম্পর্ক। তাই দেখা যায় প্রাচীন সভ্যতাগুলিতে যেসব শিল্পকলার সন্ধান পাওয়া গেছে, সেসবে তৎকালীন ধর্মবিশ্বাস, ক্ষমতাসীন রাজবংশগুলো প্রতাপ বিস্তার করেছে।
প্রাচ্যের শিল্পকলা বলতে ভারতীয়, চৈনিক, পারসি এবং জাপানি শিল্পকলা নিয়ে সংক্ষেপিত আলোচনা রয়েছে।
ইসলামে চিত্রাঙ্কন নিয়ে নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে মুসলিম দেশগুলোতে চিত্রকর্মকে কঠিনভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। তবে সেখানে রাজপ্রাসাদ, সমাধিসৌধ এবং মসজিদে আলাদা শিল্পকলার চর্চা চোখে পড়ে।
পঞ্চদশ শতকের আগপর্যন্ত ইউরোপের শিল্পকলা ছিল খ্রিস্টধর্মকে ঘিরে। কিন্তু রেঁনেসা ধাক্কায় ইউরোপে শিল্পকলার চর্চা নবরূপে আবির্ভূত হয়। ধর্মের বাইরে গিয়ে চিন্তা করছে শেখে মানুষ। ফলে শিল্পকলায় নতুন ধরনের চিন্তা-চেতনা আসে। মূলত ইউরোপের চিত্রশিল্প, ভাস্কর্যশিল্প এবং স্থাপনার গঠনশৈলী নিয়েই আলোচনা করেছেন কামাল আহমদ।
শিল্পকলার ইতিহাসে প্রাচ্যের উল্লেখযোগ্য অবদান আছে কীনা তা নিয়ে এদেশের পণ্ডিতরাই সন্দেহমুক্ত নন। কামাল আহমদের বইটিও তাই পশ্চিমের শিল্পকলার প্রশংসাসূচক আলোচনাকে পুরো শিল্পকলার ইতিহাস বলে চালাতে চেয়েছেন। শিল্পকলা আরও স্পষ্ট করে বললে পশ্চিমের চিত্রশিল্প এবং গঠনশৈলী নিয়ে প্রাথমিক জ্ঞানের জন্য বইটি চলনসই। তবে কোনো বিশ্লেষণবিহীন পাশ্চাত্যের শিল্পচর্চাকে 'ক্লিনচেক' দেওয়া এই পুস্তক সার্বিক বিবেচনায় ন্যূনতম শুদ্ধ গ্রন্থ নয়। বড়জোর পাশ্চাত্য শিল্পমুগ্ধ এক ব্যক্তির সংক্ষেপিত আলোচনামাত্র!