ব্রেকফাস্টকে ডিনার বলা উচিত, এমন দাবি করে যে বই শুরু হয় তাতে পিলে চমকানো মজার মজার সব খাবার গল্প থাকবে তাতে আশ্চর্য কী? বইয়ের ডালে ভাতে পাতায় পাতায় রোজকার চপমুড়ি, রসগোল্লা, জিলিপির পাশে অনায়াসে জায়গা করে নিয়েছে কে এফ সি, ম্যাকডোনাল্ড, ডায়না স্টেক এমনকি ম্যাগিও। সব মিলিয়ে এতে আছে দেশি বিদেশি ১৫০ টির বেশি খাবারের চিত্তাকর্ষক ইতিহাস নিয়ে মজার গপ্পো! মেয়োনিজ আর লি পেরিনের সস মিশে গেছে সাড়ে বত্রিশ ভাজার সঙ্গে। একশো বছরের পুরোনো ডিমের অনুপান হিসেবে রয়েছে মার্টিনি- শেকেন, নট স্টার্ড। এককথায় খাওয়াদাওয়া আর তার ইতিহাস নিয়ে ক্রসওভারের হদ্দমুদ্দ। এ এমন গ্রন্থ যা আপনার চেনা খাবারকে নতুন চোখে দেখতে বাধ্য করবে। রেসিপি বুক নয়, শুকনো ‘খাদ্য ইতিহাস’ নয় ! বৈঠকি আড্ডার ছলে খাওয়া নিয়ে লেখা এমন মজার বই বাংলায় এই প্রথম।
জন্ম ১০ এপ্রিল, ১৯৮১, কলকাতা। স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং পি. এইচ. ডি. তে সেরা ছাত্রের স্বর্ণপদক প্রাপ্ত। নতুন প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া Bacillus sp. KM5 এর আবিষ্কারক। বর্তমানে ধান্য গবেষণা কেন্দ্র, চুঁচুড়ায় বৈজ্ঞানিক পদে কর্মরত এবং হাবড়া মৃত্তিকা পরীক্ষাগারের ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক। জার্মানী থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর লেখা গবেষণাগ্রন্থ Discovering Friendly Bacteria: A Quest (২০১২)। তাঁর কমিকস ইতিবৃত্ত (২০১৫), হোমসনামা' (২০১৮),মগজাস্ত্র (২০১৮), জেমস বন্ড জমজমাট (২০১৯), তোপসের নোটবুক (২০১৯), কুড়িয়ে বাড়িয়ে (২০১৯),নোলা (২০২০), সূর্যতামসী (২০২০), আঁধার আখ্যান (২০২০) ও নীবারসপ্তক (২০২১) এই সব দিনরাত্রি (২০২২), ধন্য কলকেতা সহর (২০২২), আবার আঁধার (২০২২), অগ্নিনিরয় (২০২২), হারানো দিনের গল্প (২০২৪), সিংহদমন (২০২৪), ডিটেকটিভ তারিণীচরণ (২০২৪), আরও একটি প্রবন্ধ সংকলন (২০২৫) সুধীজনের প্রশংসাধন্য। সরাসরি জার্মান থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন ঝাঁকড়া চুলো পিটার (২০২১)। বাংলাদেশের আফসার ব্রাদার্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে ম্যাসন সিরিজের বাংলাদেশ সংস্করণ (২০২২, ২৩), মৃত্যুস্বপ্ন (২০২৪), ডিটেকটিভ তারিণীচরণ (২০২৪) । সম্পাদিত গ্রন্থ সিদ্ধার্থ ঘোষ প্রবন্ধ সংগ্রহ (২০১৭, ২০১৮) ফুড কাহিনি (২০১৯), কলকাতার রাত্রি রহস্য (২০২০) সত্যজিৎ রায়ের জন্ম শতবর্ষে একাই একশো (২০২২), কলিকাতার ইতিবৃত্ত(২০২৩), বিদেশিদের চোখে বাংলা (২০২৪) এবং কলিকাতার নুকোচুরি (২০২৫)
বই শুরু হয়েছে মজার একটি তথ্য দিয়ে।ষোড়শ শতকের ইউরোপে সকাল এগারোটায় যে খাওয়াটা হতো তাকে বলতো "ডিনার।" এ শব্দের মূলে আছে disner বা desjeuner, যার অর্থ উপবাস ভঙ্গ করা বা ব্রেকফাস্ট! "নোলা"তে আছে খাবার নিয়ে অনেক অনেক মজার তথ্য আর খাবারের ইতিহাস। তবে বাঙালি বিয়ের ভোজ, মাছ, মাংস, সন্দেশের কথা পড়ে যে আনন্দ পেলাম( সাথে জিভের জল ফ্রি) সেটা ম্যাকডোনাল্ডস, কেএফসি আর হটডগের গল্প পড়ে কিছুটা হলেও ম্লান হয়ে গেলো। সে সব কথা বাদ। আমি ১৯০৬ সালের কলকাতার এই বিয়েবাড়ির মতো ভোজে যেতে চাই। খাবারের পদ মাত্র ৩৬টা!!! খাবারের নামগুলো দেওয়ার লোভ সামলাতে পারছি না -
খাবারের রেসিপি বা খাবারের ইতিহাস নিয়ে তো অনেক বই আছে কিন্তু খাবার নিয়ে আড্ডার ছলে লেখা বই কতগুলো আছে জানি না। বইটা পড়ার সময় বুদ হয়ে থাকতে হবে। বইটা ইচ্ছা করেই তারাতারি পড়ি নাই। ধীরে ধীরে সময় নিয়ে রসিয়ে রসিয়ে পড়েছি। এমন বই আরও কেন আসে না?
বাঙ্গালী জাতি যতই পেটরোগা হোক, মুঠো মুঠো এন্টাসিড ট্যাবলেট গিলেও রসনাবিলাসে কখনো পিছ পা হয় না। মতি নন্দীর 'কলাবতী'র গল্প বা তারাদাসের 'অলাতচক্র' পড়লেই আমাদের পেটে ছুঁচো ডন মারতে শুরু করে! মেঘ দেখলেই আমাদের খিচুড়ি খেতে মন চায়, তাও ইলিশ ভাজা আর কষা মাংস দিয়ে!
তবে যা কিছুকে আমরা খাঁটি বাঙ্গালী খাবার বলে জানি, তার কতকিছুই বাঙ্গালীর পাতে এসেছে বিদেশীদের হাত ধরে। আলু খাওয়া শিখলাম পর্তুগীজদের কাছে, মাংস রাঁধতে শেখালো মোগলরা। অবশ্য ইতালির পিজ্জাও যে ইতালিয়ানদের একচেটিয়া নয়, চীনের কালো চা'তে দুধ মেশানো শিখিয়েছে ইংরেজরা আর সস বানানোতে ইতালীকে টেক্কা দিলো ফরাসিরা - সেটাও তো বলতে হবে।
খাবারের সাথে জড়িয়ে গেছে কত কিংবদন্তি আর গল্পগাঁথাও। আইসক্রীম আবিষ্কারের গল্পটা তো সেই ছোট্টবেলা থেকেই শুনে আসছি। ঢাকাই বাখরখানি দেখলে এবার থেকে বাকের-খনির প্রেমের কথা মনে পড়বে। খাবার রচেছে ইতিহাস, নিয়ন্ত্রণ করেছে ভাষা থেকে রাজনীতি পর্যন্ত সবই।
আদিম যুগের মাংস পুড়িয়ে খাওয়া থেকে ১৬০ রকমের মশলা যোগে বানানো তুন্ডা কাবাব পর্যন্ত খাদ্য আর রসনাবিলাসের যে যাত্রা - সবটাই এসে জড়ো হয়েছে কৌশিক মজুমদারের কলমে। চপ-মুড়ি-খিচুড়ির সাথে পাল্লা দিয়েছে কেএফসি-ম্যাগি-হেইঞ্জ ক্যাচাপও।
সমসাময়িক ভারতীয় লেখকদের মধ্যে কৌশিক মজুমদার আমার অন্যতম প্রিয়। বিস্তর পড়াশোনার ফসল এই বইটিতে হাস্যরস, ইতিহাস আর বিস্ময়কর অজানা তথ্যের কোনো কমতি ছিল না। ঝরঝরে ভাষা আর হারিয়ে যাওয়া, স্মৃতির পাতা থেকে তুলে আনা ছবিগুলো বইটিকে তথ্যের ভারে বিস্বাদ হতে দেয়নি।
আর 'নোলা' সামলে কী হবে? খাবারের সরস গপ্পো উপভোগ করতে বসে পড়ুন তাহলে!
বই: নোলা - খাবারের সরস গপ্পো লেখক: কৌশিক মজুমদার প্রকাশনায়: বুকফার্ম প্রথম প্রকাশ: জুন ২০২০ ভারতীয় মূল্য: ২৫০ টাকা
আমি ‘ভোজনপটু’ নই, কিছুটা ‘ভোজনবিলাসী’ হলেও হতে পারি। দেখে শুনে, পছন্দ হলে তবেই খাই। তবে খাবার সম্পর্কিত বই, সিনেমা, টিভি শো-এসবে আমার সবসময়ই বিশাল আগ্রহ। মাঝখানে ঝোঁক উঠেছিলো খাবার নিয়ে লেখা বই কিনে ফেলবো সব! সেই ধাক্কায় পূর্ণিমা ঠাকুরের ঠাকুরবাড়ির রান্নাও কিনে ফেলেছিলাম! নোলা-ও সেসময়ই কেনা। পড়া আর হয়ে উঠছিলো না। ওই যে, পুরনো বইয়েরা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে যে আমি নতুন বই ঠেসেঠুসে তাকে সাজাচ্ছি!
যাক, বইয়ের কথায় ফিরি। বেশ সময় নিয়ে পড়েছি বইটা। এতো ইনফরমেশন, তাড়াহুড়ো করলে কি আর মাথায় থাকে? ইন্টারেস্টিং বই। লুচি থেকে কেএফসি, পোলাও থেকে ব্লাডি মেরি সবকিছুর ইতিহাস আছে এতে। লাঞ্চ বা ডিনার এলো কিভাবে, কিভাবে ছানা এলো, কে প্রথম ফুড মেন্যুর প্রচলন করেছিলো কলকাতায়, এসব কিছুই লেখক সুন্দর করে সাজিয়ে গুছিয়ে লিখেছেন। অনেক ঘাঁটাঘাঁটি করে বইটা লিখতে হয়েছে এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। বইটা নিঃসন্দেহে ইনফরমেটিভ, তবে কোন অজানা কারণে আমি লেখকের লেখা পড়ে আরাম পাই না! এর আগে ওনার তোপসের নোটবুক পড়েছি, সে ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। কি জানি কেন!
যাদের খাবার-দাবার নিয়ে জানবার আগ্রহ আছে, তাদের জন্য নিঃসন্দেহে এটা একটা চমৎকার বই। লেখার ফাঁকে ফাঁকে আগের দিনের পত্রিকায় ছাপা হওয়া বিজ্ঞাপন এবং নানা সময়ে খাবার নিয়ে আঁকা বেশকিছু ছবি জুড়ে দেওয়ার ব্যাপারটাও ভালো ছিল।
সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ, সামান্য ক্ষুধা নিয়েও এই বই পড়াটা প্রবল কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে যাবে। আর ভরাপেটেও যে খুব নিশ্চিন্তে পড়া যাবে তাও না। তবে সবচেয়ে প্রিয় দুই বিষয় খাওয়া আর পড়া যখন এক হয়, তখন এরকম কষ্ট তো নিখাদ আনন্দে মেনে নেয়াই যায়।
আমাকে খাদ্যরসিক বলা চলে না, কিন্তু ভাল রান্না পছন্দ করি। খাবার নিয়ে খুব বেশি এক্সপেরিমেন্টে যাই না, কিন্তু গন্ধ-বর্ণে আকৃষ্ট হয়ে শামুক-ঝিনুক-অক্টোপাস রান্নাও খেয়েছি। তবে খাওয়ার চেয়েও বেশি পছন্দ খাবার নিয়ে যে কোন লেখা পড়া। কৌশিক মজুমদারের বইটা সেজন্য আদর্শ। ঝরঝরে লেখা, তথ্যবহুল হলেও তথ্যের ভারে লেখার স্বাদ ক্ষুন্ন হয়নি। লেখকের 'হোমসনামা' পড়েও ভাল লেগেছিল, প্রচুর পড়াশোনা করেন সেটা স্পষ্ট। বিভিন্ন খাবারের ইতিহাস আর মীথ নিয়ে ঘাঁটাঘাটি করেছেন আর আমজনতার জন্য এমনভাবে লিখেছেন যে, রেসিপি না জানলেও খাবারটা বানিয়ে খেতে ইচ্ছা করবে। বইটা কিনে পয়সা উসুল হয়েছে, এবং মাঝে মহা বিরক্তিকর কয়েকটা বই পড়ে প্রায় ব্লকে পড়ে যাচ্ছিলাম, সেটাও কেটেছে।
চব্য, চষ্য, লেহ্য, পেয়--যতই উদরস্থ হোক, যতক্ষণ না মুখে পানটি পড়ছে ততক্ষণ বাঙালির মন খুশি হয় না। এই হচ্ছে ভোজন রসিক বাঙালি। শুধু বাঙালি নয়, খাবার মুলতঃ মান��ষকে এক জায়গায় এনে দেয়। সবাই মোটামুটি ভালো খাবার খেতে ভালোবাসে, তবে খিদা পেলে ভালো খাবার, খারাপ খাবার বা মোটামুটি খাবার তাতে কিছু যায় আসে না, খিদা মিটানোই তখন আসল কথা।
ব্রেকফাস্ট কাকে বলে? আমরা সকলেই জানি, সকালে যা খাই। ডিনার কি সকালে খায়? ব্রেকফাস্ট কে কি ডিনার বলা যায়? বা ডিনারকে কি ব্রেকফাস্ট বলা যায়? এমন সব উদ্ভট দাবি নিয়ে বইয়ের শুরু। তবে পাতায় পাতায় আছে, চা, কফি, ডাল ভাত, খিচুড়ি, প্রতিদিনের খাওয়া চপমুড়ি, রসগোল্লা, জিলাপি, ছানা, সন্দেশ, ইডলি, দোসা, স্যুপ, বাখরখানি, বিরিয়ানি, মাছ মাংস ব্লাডি, বিয়ার, পান সুপারি ইত্যাদি ইত্যাদি। এরই সাথে আছে রয়েছে --কে এফ সি, ম্যাকডোনাল্ড, ডায়না স্টেক আর ম্যাগি। সাথে মেয়োনিজ আর লি পেরিনের সসও। এছাড়া রয়েছে মার্টিনি- শেকেন, নট স্টার্ড।
এটা কোন রেসিপির বই নয় খাওয়া-দাওয়ার পুরনো ইতিহাস নিয়ে এই বই। একটা খাবার আমরা যে খাই তা প্রথম কোথায় কিভাবে শুরু হয় এবং আমাদের পাতে কিভাবে এসে পৌছালো তারই সুন্দর কাহিনি নিয়ে কৌশিক মজুমদার এর এই বই "নোলা"
খাবার দাবারের আদি ইতিহাস ও জন্ম কথা নিয়ে চমৎকার এক বই।
খাবার বা খাবারের পেছনের গল্প এমন চমকপ্রদ ভাবে লিখা বই এই প্রথম পড়লাম। বইটা পড়াকালীন সবটা সময়ই উপভোগ্য ছিল। খাদ্যরসিকদের মুখরোচক খাদ্য যে শুধু খাদ্য নয়, তার পেছনে যে অনেক সময় অনেক চমকপ্রদ গল্পও লুকিয়ে থাকে তার একটা অনবদ্য উদাহরণ এই বইটা। খাদ্যরসিক ছাড়াও অন্যান্য রুচিসম্পন্ন সব পাঠকের কাছেই এই বইটা চিত্তাকর্ষক মনে হবে।
এই লোকটা এতকিছু জানে কেমনে!!😐 বিস্তৃত গবেষণা করেছেন বোঝা যাচ্ছে, কিন্তু তথ্য পরিবেশনের সময়ে স্যাকরার মতো হিসেবী, হিসাব করে বসানো একেকটা দানা। রেকমেন্ডেড।
...মজা হল তুলসীদাস যখন 'রামচরিতমানস' লিখতে বসলেন তখন তিনি প্রাণে ধরে নিজের প্রিয় খাবারকে ত্যাগ করতে পারলেন না। ফলে সেখানে বনবাসী রাম 'রোটিকা' খাচ্ছেন এমন দৃশ্যও দেখতে পাই।...
কী, বেশ গল্প গল্প ঘ্রাণ আসছে তাই না? প্রথম যখন বাতিঘরে 'নোলা' বইটির বিজ্ঞাপন দেখি, আমার নিজেরই নোলা সকসক করে উঠেছিলো! প্রায় ৫০টি বই থেকে ক্রমাগত ছাঁটাইয়ের ফলে যখন কেনার তালিকাটি মাত্র খান পনেরোতে এসে ঠেকল, তার মধ্যেও তাই 'নোলা' না রেখে পারলাম ই না!
কৌশিক মজুমদার এর সাথে প্রথম পরিচয় 'তোপসের নোটবুক' এর মাধ্যমে। ওই বইয়েই তাঁর অনুসন্ধিৎসু মন আর সাবলীল লেখার পরিচয় পেয়েছিলাম। আর এই বইটি তো রীতিমতো মুগ্ধতার স্রোতে ভাসিয়ে দিচ্ছে আমায়!
রান্না আর খাবার ছাড়া না ভাবা যায় জীবন, না ভাবা যায় সভ্যতা! রান্না যে একটি শিল্প, এই কথাটিও তো সর্বজনবিদিতই। সারা পৃথিবীতেই ছড়িয়ে আছে রকমারি খাবারদাবার আর তাদের অভিনব রন্ধন প্রণালী। আর সেসবের পেছনের ইতিহাস এক করে অত্যন্ত সরস ভাষায় আমাদের সামনে পেশ করেছেন লেখক। যেমন সুস্বাদু বিষয়বস্ত, তেমনি জিভে জল আনা রচনারীতি আর হিউমার!
গল্পের পর গল্পের পর গল্প, যেন ননস্টপ ভূরিভোজ!( ফেলুদা থেকে মেরে দিলুম!🤣) এই খানাপিনার পেছনে যে কত আজব কাহিনী লুকিয়ে আছে তা কে জানত? যুদ্ধ বলুন, কাব্য বলুন, মধ্যযুগ মায় চর্যাপদ পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে খাবারের নাম আর রেসিপি। উৎকট পদ্ধতিতে শুরু হলেও কত রান্না যে পরে সেরা হয়েছে পরিবর্তনের মাধ্যমে! নুন মানে সল্ট থেকেই সোলজার আর স্যালারি এসেছে তাই বা কে জানত!
শুধু এ-ই না, বাংলা, ইংরেজি কত বাগধারা-প্রবাদে যে ছড়িয়ে আছে খাবারের কথা, আর তার পেছনের গল্প যে এমন চমকপ্রদ, ভাবিইনি কখনো! শষ্কুলী যে আসলে লুচি কিংবা পুচ্ছকা নামটিরই পরিবর্তিত রূপ যে হালের ফুচকা, তাও তো আমি জানতাম না!
আবার খাবারের নামে যেমন হয়েছে ছড়া-কবিতা,তেমনি হয়েছে ধাঁধাঁও। নিচে একটি বই থেকেই উদ্ধৃত করি, ' তিন অক্ষরে নাম তার সর্বলোকে খায় শেষের অক্ষর ছেড়ে দিলে মুখ চুলকায় মাঝের অক্ষর ছেড়ে দিলে বৃহৎ জন্তু হয় প্রথম অক্ষর ছেড়ে দিলে জেলখানায় যায়।'
খিচুড়ি, জিলিপি ভাবি নিজেদের আবিষ্কার অথচ সেগুলো এসেছে বিদেশ থেকে। আবার পাস্তা খাঁটি ইতালীয় হলেও পিজ্জা কিন্তু ইতালীয় খাবার নয়। এমনি আরো কত গল্প-হাসি-রস যে বইটির পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে বলে শেষ করা যাবে না!
বই খুললেই উৎসর্গটি নজর কেড়েছে! এছাড়াও খাবারের গল্পের সাথে সাথে জড়িয়ে আছে কতো কতো ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সামাজিক পরিবর্তনের ইশতেহার। রাজনীতিও আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। লেখক ভীষণ সহজভাবে বলে গেছেন একের পর এক সেসব গল্প। প্রতিটা বিষয়ের নামকরণ এককথায় অনবদ্য। ফাঁকে ফাঁকে তীক্ষ্ণ বুদ্ধির সাথে কৌতুকময় আবহাওয়া আমাকে প্রায় এক বসায় বইটি শেষ করতে বাধ্য করেছে।
এছাড়াও রেফারেন্স হিসেবে আরো নানান রান্না আর খাবারের বইয়ের কথা জানতে পেরেছি, যেটা উপরিপাওনা। আর শেষ পাতে ডেজার্টের মতো এডওয়ার্ড লিয়রের আজব রেসিপি পড়ে হাসতে হাসতে দমবন্ধ হওয়ার উপক্রম! ও, ভুলেই গেছি ছবির প্রশংসা করতে! বইয়ের ফাঁকে ফাঁকে কিছু দুর্লভ লাগসই ছবিও এঁটে দিয়েছেন লেখক, আবার সেগুলোর কিছু কিছু বর্ণনাও আছে শেষে।
সব মিলিয়ে বইটা একটা অনবদ্য স্বাদের জন্ম দিয়েছে। যারা ভোজনবিলাসী আমার মতোই, আবার একই সাথে ইতিহাস আর গল্পে গড়াগড়ি খেতে পছন্দ করেন তাদের জন্য 'নোলা' একটি অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থ!
শুরুতেই বলে নিচ্ছি, এই পোস্টটা মূলত বইয়ের মেইনস্ট্রীম রিভিউ না। সুতরাং যারা স্রেফ অল্প কথায় রিভিউ পড়তে চান তাদের জন্য এ পোস্টটা খানিকটা না বেশ বিরক্তিকর মনে হতে পারে। এখানে আমরা বরং খানিকটা ইতিহাস কপচাতে কপচাতে একটা বই নিয়ে জানবো। তবে এটুকু গ্যারান্টি দিতে পারি, বইটা আপনাকে এমনসব এক্সক্লুসিভ তথ্য জানাবে যে, আপনি অবাক না হয়ে পারবেন না। সুতরাং এই পোস্ট না পড়লেও বইটা অবশ্যই পড়তে পারেন।
কিছুদিন আগে ৩ বন্ধুর সাথে গিয়েছিলাম পাঁচ তারা হোটেল লা মেরিডিয়ান ঢাকাতে, ব্যুফে খেতে। দাঁড়ান, আগেই ভেবে নেবেন না আমার পূর্বপুরুষ জমিদার ছিলো কিনা। আজ্ঞে না, ছিলেন না। ৪ স্টার, ৫ স্টার হোটেলগুলোতে ঐ যে অফার দেয় না, ৪৯৯৯ টাকায় ব্যুফে এবং Buy 1 Get 3 Free, ওরকম একটা অফারে গিয়েছিলাম। এতে জনপ্রতি ১২৫০ টাকার মত পড়ে যেটার দাম রেগুলার ব্যুফের মতনই পড়ে।
তো ওখানে একটা পোলাও টাইপ জিনিস খাওয়া হলো এবং অবিশ্বাস্যভাবে, খেয়ে ভালোও লাগলো। তো আমি জিনিসটার নামটা ভালো করে খেয়াল করলাম। কিন্তু নামটা খটোমাটো এবং আরও একটা স্পেশাল কারণে নামটা মনে করতে পারছি না, তবে ওখানে পোলাও বানানটা ইংরেজীতে লেখা ছিলো Pulav (!)। অভিজাত সমাজে জিলিপি যেভাবে Jalebi হয়ে যায়, তেমনি এখানেই পোলাও মনে হয় Pulav হয়ে গেছে। তো কেমন দাম এ Pulav এর? দেখলাম 1:1 এর Pulav এর দাম ১৯৯৯ টাকা! স্রেফ ব্যুফেতে দিয়েছে ঠাসাতে পারছি; না হলে এর��ম জিনিস ফ্যামিলি নিয়ে খেতে আমার কয়েকদিনের মজুরি খরচ করা লাগতো। আপনাআপনি মুখ থেকে বের হয়ে আসলো, এ ভাই, এ বিরিয়ানির মাঝে কি স্বর্ণ দেয় নাকি বে?
পাঠক, বিরক্ত হচ্ছেন? ভাবছেন বই রিভিউ দিতে এসে ফুড রিভিউ দিচ্ছে কেন এ ব্যাটা? একটু অপেক্ষা করুন, সব খোলাসা করছি। তার আগে বলুন আপনাদের কি খাবারের দাম দেখে কখনো এরকম প্রশ্ন মনে জাগেনি? খাবারে স্বর্ণ মেশানো না-কি?
ঐসব খাবারে স্বর্ণ মেশানো না থাকলেও আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগে বাংলায় এক নবাব ছিলেন যার খাবারে কিনা আসলেই স্বর্ণ মেশানো হতো। তার নাম নবাব ওয়াজিদ আলী শাহ। অবাক হলেন? চলুন শোনা যাক বিস্তারিত।
১৮৫৬ সালে নবাব ওয়াজিদ আলী শাহকে অযোধ্যা থেকে কলকাতার মেটিয়াবুরুজে নির্বাসিত করা হয়। তিনি বঙ্গে আসার সময় তার বাবুর্চিকে সাথে নিয়ে আসেন। আর এই বাবুর্চির আর ওয়াজিদ আলীর মাধ্যমেই বাংলার হেঁশেলে পোলাও (আসলে এখনকার বিরিয়ানি) প্রবেশ করে। কলকাতাইয়া বিরিয়ানি নামে যে বিরিয়ানি চলে তার উদ্ভব এখান থেকেই। তো এই ওয়াজিদ আলীর বাবুর্চি ওয়াজিদ আলীর জন্য এক ধরণের স্পেশাল পোলাও/বিরিয়ানি রান্না করতেন যেটার মধ্যে হেন তেন মশলার সাথে দেয়া হতো একটি আশরফি (মুঘল আমল থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে এই সোনার মোহরের ব্যবহার শুরু হয়)। নিপুন পাচক আশরফিকে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় এমন দ্রবণে পরিণত করতেন যে পোলাওয়ের মাঝে তার চিহ্নও পাওয়া যেত না। আর এই এক্সক্লুসিভ খবর যে বইয়ের মাধ্যমে আমি জেনেছি সেই বইই আজকের আলোচ্য বিষয়। ‘সূর্যতামসী’, ‘নীবারসপ্তক’, ‘অগ্নিনিরয়’ এর মতো জমজমাট থ্রিলার লেখা লোকের হাত ধরে এসেছে খাবার নিয়ে নন-ফিকশন বই ‘নোলা’। ওনার ম্যাসন সিরিজের একটা বই পড়েই আমি বুঝতে পেরেছি, ইনি প্রচুর গবেষণা করে একটা লেখা লেখেন। সুতরাং ‘নোলা’ নিয়ে আমার এক্সপেক্টেশন ছিলো অনেকটা আকাশচুম্বী।
১৯৮ পৃষ্ঠার এ বইতে খাবার নিয়ে আদ্যোপান্ত এসেছে বললে ভুল হবে না। কীভাবে ব্রেকফাস্ট এলো, কীভাবে লাঞ্চ, কীভাবে ডিনার ইত্যাদি তথ্যের সাথে দেশ-বিদেশে বিখ্যাত খাবারগুলো কীভাবে গোড়াপত্তন হলো আর কীভাবেই বা বিখ্যাত হলো তা নিয়ে প্রায় সব লেখা আছে এ বইতে। আর সেই সাথে সাইডকিক হিসেবে এসেছে নানা তথ্য। শেক্সপিয়র থেকে নীলস বোর; কেউ বাদ যাননি। কারণ, খাবার সমস্ত মানুষকে এক জায়গায় নিয়ে আসে। ধনী হোক, দরিদ্র হোক, মাঝামাঝি হোক; ভালো খাবার খেতে সবাই ভালোবাসে। পছন্দের খাবারের গন্ধে নোলা (জিভ) লকলক করে না এমন কোন মানুষ নেই।
চমৎকার ভাষাশৈলীতে লেখা বইটা আপনাকে পড়ার স্মুথ এক্সপেরিয়েন্স তো দেবেই, সেই সাথে আপনি জানতে পারবেন নানান খাবারের নানান ইতিহাস। তার কিছু কিছু অংশ আমি এ পোস্টে তুলে ধরছি।
ইবনে সিনাকে সবাই কী হিসেবে চেনেন? এ প্রশ্নের উত্তরে ৯৯% মানুষ উত্তর দেবে, তিনি ছিলেন আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক। কেউ কেউ তাকে ফিলোসফার হিসেবেও বলবেন। কিন্তু আপনারা কি জানেন পোলাও এর রেসিপি ১ম এ লিপিবদ্ধ করেছিলেন এই ইবনে সিনা? অবশ্য এটাকেও আপনি চাইলে চিকিৎসা শাস্ত্রের অন্তর্চূক্তও করতে পারেন। শারীরিক রোগ শোকের জন্য নথিপত্র তো লিখে গেছেনই, মানসিক রোগমুক্তি হিসেবে পোলাও যে একটা ভালো ওষুধ (!) হতে পারে, এটা ভেবেই পোলাও এর রেসিপি যে লেখেন নাই, তা কীভাবে বলি?
আবার এই যে, পান করার সময় ‘টোস্ট’ করে, এটার সাথে পুড়ে যাওয়া রুটি টোস্ট এর সম্পর্ক কী? আদৌ কি সম্পর্ক আছে? জী, আছে। রোমনরা মদের গেলাসের তলায় একেবারে পুড়ে জ্বলে যাওয়া রুটির একটা টুকরা ফেলে দিতেন। তাদের ধারণা ছিলো, ঐ পোড়া রুটিটা মদের সাথে মিশে থাকা অপদব্র্য শুষে নিয়ে মদটাকে আরো বেশি মজাদার করে তুলতো, অ্যাক্টিভেটেড চারকোলের আদি সংস্করণ আর কি। ষোড়শ শতক অব্দি মদের গ্লাসে এই টোস্ট ফেলে পান করা হতো। আস্তে আস্তে টোস্টটা গ্লাস থেকে বাদ পড়ে গেল, কিন্তু শব্দটা রয়ে গেল।
আপনি কি জানতেন, কম্প্যানিয়ন বা সঙ্গীর ধারণাটা এসেছে রুটি থেকে? রুটির ল্যাটিন নাম panis আর com মানে একসঙ্গে। তাই যাদের সাথে একসাথে ভাগ করে রুটি খাওয়া হতো তাদেরকে বলা হতো কম্প্যানিয়ন বা সঙ্গী। জানতেন, শিক কাবাবের শিক এর সাথে যে লোহার রড সদৃশ জিনিসটার কোন সম্পৃক্ততা নেই? বরং এটা এসেছে আরবী শিওয়া থেকে (গ্রিল করা মাংসকে আরবীতে শিওয়া বলে)। এই শিওয়া থেকে স্থানের বিবর্তনে শিশ এবং ওখান থেকে শিক কাবাব নামকরণ হয়েছে। মালাইকারীতে মালাই শব্দটা আসলে দুধের মালাই থেকে আসেনি, এসেছে মালয় প্রদেশ থেকে আসা নারিকেল দিয়ে রান্না করা তরকারি ‘মালয় কারি’ থেকে, এটা কি জানতেন?
এরকম নানা চমকপ্রদ তথ্যের সাথে খাবারের সরস বর্ণনার বই ‘নোলা’। বইটা আপনাকে খাওয়ার ব্যাপারে, ইতিহাসের ব্যাপারে তথ্য তো দেবেই; সেই সাথে বইয়ের শেষে মেনশন করা আছে রেফারেন্সের বইগুলার নাম। সবমিলিয়ে ‘নোলা’ পড়ার এক্সপেরিয়েন্স ছিলো ভীষণ রকম ভালো। নন-ফিকশন, খাবার নিয়ে জানতে চাইলে আপনিও বইটা পড়তে পারেন। পোস্ট শেষ করার আগে বইতে থাকা আরেকটা ঘটনা ডিরেক্ট কপি করে শেয়ার করতে চাই।
❝ষোড়শ শতকে ইউরোপে দিনের সেরা খাওয়াটা হতো বেলা ১১টা নাগাদ। ঘুম থেকে উঠেই মানুষ খাই খাই করত কিনা জানা নেই, তবে করলেও টুকটাক যা খেত, তাকে বলা হত স্ন্যাপ বা স্ন্যাক। শব্দটা ডাচ শব্দ Snacken থেকে এসেছে, যার অর্থ চিবানো। এই ১১টার সময় বড়লোক, গরিব নির্বিশেষে যে খাওয়াটা খেত তার নাম ছিল 'ডিনার'। মজার ব্যাপার এই ডিনার শব্দের মূলে রয়েছে ফরাসি শব্দ disner বা desjeuner, যার মানে উপবাস ভঙ্গ করা বা ব্রেকফাস্ট। বুঝুন কি গেরো। বড়লোকদের ক্ষেত্রে এই ডিনার চলত প্রায় দুই তিন ঘন্টা ধরে। খাওয়ার সঙ্গে আলাপ, আড্ডা, ব্যবসার কথা সব হত এই ডিনারে। এই প্রসঙ্গে বলি, ডিনার সেরেই লন্ডনের অভিজাতরা ছুটতেন গ্লোব থিয়েটারে, নাটক দেখতে। কিন্তু নাটক শুরু হতে দুপুরের পরপরই। যাতে জায়গা মিস না হয়ে যায় তাই তারা তাদের চাকরদের আগে পাঠিয়ে দিতেন চেয়ার ধরতে। নিজেরা ডিনার সেরে ধীরে-সুস্থে আসতেন। নাটকের মাঝে দেখতে বসলে অনেক সময় নাটকের মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতেন না আর রেগে গিয়ে বেজায় হট্টগোল বাঁধিয়ে দিতেন। (ডিনারে সদ্য পান করে আসা পানীয়ও এই কাজে প্রভূত সাহায্য করত)। নাটকের কলাকুশলীরা তো লবেজান। এসব দেখে শেক্সপীয়ার নামের এক ছোকরা ভালো বুদ্ধি ঠাউরালেন। খেয়াল করে দেখলেন, ডিনার সেরে অভিজাতদের আসতে আসতে প্রায় তৃতীয় অঙ্ক শুরু হয়ে যায়। তাই তিনি নিজের নাটকগুলোকে এমনভাবেই লিখলেন, যাতে তৃতীয় অঙ্কের পরই নাটকের আসলে ঘটনা ঘটতে থাকে। প্রথম দুই অঙ্ক না দেখলেও চলে। ভেবে দেখুন, শুধু ডিনারের সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করতে শেক্সপীয়ারকে নাটকের ধরন পাল্টাতে হয়েছিলো।❞
বি:দ্র: শুরুতে যে অভিজাত মহলে জিলিপি, পোলাওকে জালেবী, পুলাভ বলে একটু ক্রিটিসাইজ করার চেষ্টা করেছিলাম, সেটা আসলে ব্যর্থ চেষ্টা। এই খাবারগুলো বাংলায় যে উৎস থেকে এসেছে সেগুলোর অথেনটিক নাম আসলে জালেবী, পুলাভ-ই। বাংলায় এসে জিলিপি আর পোলাও হয়ে গেছে।
ভালো খাবার যেমন খেতে মজা, ভালো বইও তেমন পড়তে মজা। আর সেই ভালো বইটা যদি খাওয়া-দাওয়া নিয়ে হয়, তাহলে তো একেবারে সোনায় সোহাগা।
খাবার নিয়ে মজার তথ্য আর গল্প নিয়ে ঠাসা এই বই। এই যেমন আগে কিন্তু ব্রেকফাস্টকে বলা হত ডিনার, মাঝে লাঞ্চ বলে কিছু হতো না, একেবারে সন্ধ্যায় যেয়ে সাপার করা হত। কারণ ষোড়শ শতকে ইউরোপে দিনের সেরা খাওয়াটা খাওয়া হতো বেলা ১১��া নাগাদ। ওইটাকেই তখন ডিনার বলতো। ফ্রেঞ্চ শেখার সময় খেয়াল করেছিলাম ব্রেকফাস্টকে সেখানে বলা হয় 'petit de déjeuner' অর্থাৎ উপবাস ভঙ্গ করা। সেখান থেকেই ব্রেকফাস্টের উৎপত্তি। এই তথ্য আগে জানা ছিল না, পড়তে যেয়ে জানতে পারলাম।
এছাড়াও আজকে যেহেতু আন্তর্জাতিক কফি দিবস, তাহলে আপনাদের সাথে একটু কফি কোত্থেকে এলো, সেটা নিয়ে গল্প করা যাক! প্রায় ১২শ বছর আগের কথা। ইথিওপিয়ার কাফা প্রদেশের এক মেষপালক একদিন দেখলেন ভেড়ার পালের ভেতর চার-পাঁচটা ভেড়া অন্যরকম আচরণ করছে, বেশ চনমনে উত্তেজিত ভাব। কী ব্যাপার তা দেখতে যেয়ে দেখলেন সেগুলো ঘাস না খেয়ে পাশের এক ঝোপ থেকে মাটিতে খসে পড়া লাল লাল ফল খাচ্ছে। আর খেয়েই লাফালাফি শুরু করেছে। একটু ভয়ে ভয়ে তিনিও দু-তিনটে ফল খেলেন। সাথে সাথেই নিজের ঝিমুনি ভাব কেটে গেল! এরপর তার কাছে থেকে একদল সন্যাসীরা সেই ফল নিয়ে এলেন মঠে গাছ লাগানোর জন্য। আর বহু ��েষ্টার পরে কাদাটে খয়েরি একটা তরল বানালেন, যা পান করলে রাতে প্রার্থনার সময় তাঁদের ঘুম পেত না। কাফা থেকেই এই গাছের নাম হল কফি।
তবে লেখক এও বলে দিয়েছেন এই কাহিনী আরবে বলতে গেলে নাকি মারধর খাওয়া লাগতে পারে! কারণ তাদের বিশ্বাস তারাই কফি আবিষ্কার করেছে। তবে এখন আমরা যে কফি খাই, তার রোস্টিং, গ্রাইন্ডিং, এমনকি ফিল্টারের পদ্ধতি আসলেই আরবদের আবিষ্কার। তারা বলে কফি শব্দটাও এসেছে আরবি ‘কাওয়া’ থেকে, যার মানে ‘খিদে না পাওয়া।’ তবে খ্রিস্ট ধর্মে একসময় কফিকে শয়তানের পানীয় বলা হতো কারণ বিধর্মীরা এটা পান করতেন। তাই কফি খাওয়ায় পোপের অনুমোদন ছিল না। ফলে খ্রিস্টানরা লুকিয়ে লুকিয়ে কফি পান করতেন। শেষে স্বয়ং পোপ অষ্টম ক্লেমেন্টও একদিন বাধ্য হয়ে কফির কাপে চুমুক দিলেন আর দিয়েই তাঁর মেজাজ এত ফুরফুরে হয়ে গেল, যে তিনি ঘোষণা করলেন, ‘এত ভালো পানীয়কে শয়তানের পানীয় বলাই যায় না। বরং এঁকে ব্যাপটাইজ করে খেস্টান বানিয়ে দেই।’ এক কফির গল্প বলতে যেয়েই কত কিছু বলে ফেললাম, এসপ্রেসো আর ক্যাপুচিনোর কাহিনী বরং আপনারা নিজেরা পড়ে নিয়েন! তবে একটা জিনিস জানিয়ে রাখি, আমরা এখন এত দাম দিয়ে যেসব খাবার খাচ্ছি, সেগুলো কিন্তু আগে যারা অস্বচ্ছল ছিলেন, তাদেরই আবিষ্কার করা খাবার। যেহেতু তাদের হাতে তেমন পয়সা-কড়ি থাকতো না, তাই কিভাবে কম উপাদানে খাওয়া শেষ করা যেত, তা নিয়েই তারা চিন্তা করতেন।
Let’s make a toast কথাটা কোত্থেকে এসেছে জানেন? রোমানরা মদের গ্লাসের তলায় একেবারে পোড়া জ্বলে যাওয়া একটা রুটির টুকরো ফেলে দিতেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল এতে নাকি মদের স্বাদ বাড়ে।
ফ্রেঞ্চ টোস্টের নাম কিন্তু আগে ফ্রেঞ্চ টোস্ট ছিল না। ব্রিটেনে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে অবধি এঁকে ডাকা হত জার্মান টোস্ট নামে। যেই না যুদ্ধ বাধল, দেশপ্রেমী ইংরেজরা জার্মান নামের সব কিছুকে নতুন করে নাম দিলেন। শুধু টোস্ট বা কফিই নয়, লেখক এখানে চায়ের গল্প বলেছেন, আরো বলেছেন কেক, হ্যামবার্গার আর হটডগের গল্প। আমার মত আগে লেখকও মনে করতেন হটডগ বুঝি কুকুরের মাংস দিয়ে তৈরি। পরে জানা গেল ১৫৬৪ সালে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের রাজা দ্বিতীয় ম্যাক্সমিলানের সময়কালে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে বেশ মোটাসোটা কোলবালিশের মতো একধরনের সসেজ তৈরি হত। এর নাম ছিল ফ্রাঙ্কফুর্টার। উনিশ শতকের শুরু শুরুতে জার্মান কশাই জন গ্রেগ লেহনার তাঁর দোকানে নতুন রেসিপিতে ফ্রাঙ্কফুর্টার বেচতে থাকেন। দেখতে একেবারে চকচকে, বাদামি আর রসালো। কে একজন দেখেই বলল, ‘আরে! এ তো অনেকটা সেই ডাশহুন্ড কুকুরের মতো দেখতে!’ ব্যস! আর যায় কোথায়? ফ্রাঙ্কফুর্টারের সঙ্গে ডাশহুন্ডের নাম এমনভাবে জড়িয়ে গেল যে লোকের মুখে মুখে এই কুকুরকে ‘সসেজ কুকুর’ নামে ডাকা হত।
আমি আজ পর্যন্ত বুঝতে পারি না, মানুষ কেন টাকা দিয়ে ফিশ অ্যান্ড চিপস কিনে খায়। তাও আবার বাংলাদেশে। এই খাবারটার উৎপত্তি ইংল্যান্ডে। যিশুকে শুক্রবার ক্রুশবিদ্ধ করায় খ্রিস্টানরা শুক্রবার মাংস খেতেন না। ষোড়শ শতক অবধি ব্যাপারটা নিয়ে বেজার বাড়াবাড়ি ছিল। কেউ যদি ভুল করে বা লোভের বশে শুক্রবার মাংস খেয়েও ফেলত তবে তার প্রাণদণ্ড অবধি হতে পারত। ইংরেজদের যত বিটলা বুদ্ধি। তারা ভাবলেন মাংস খেতে মানা, কিন্তু মাছের মাংস খেতে তো শাস্ত্রমতে বাধা নেই। তাই শুক্রবার হয়ে গেল ইংরেজদের মাছ খাবার দিন। সেখান থেকেই এলো ফিশ অ্যান্ড চিপস।
একবার আম্মু জিজ্ঞেস করেছিল ইংলিশ ব্রেকফাস্টে এত জিনিস কেন থাকে? আমাদের তো এক ভাজি আর দুইটা রুটি খেলেই সকালের নাস্তা শেষ! বইটা পড়তে যেয়ে বুঝলাম আসলে কাহিনী। একদম শুরুতে বলেছিলাম ইংরেজরা দিনের শেষ খাওয়াটা খেতেন সন্ধায়। ফলে অতক্ষণ খালি পেটে থাকায় সকালে তো খিদে পাবেই। তাই ইংল্যান্ডে সকাল সকাল উঠেই পেট ঠেসে খাবার একটা প্রবণতা জন্ম নিল। ১৭০০ সালের শেষদিকে ব্রিটেনের ব্রেকফাস্ট হত সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে, আর তাতে মদ, রুটি, মাংস থাকত। কিছুদিন বাদে তারা ভাবলেন, শুধু এই তিনটা কেন? বাকিরা কী দোষ করল? সেই থেকেই এল তাদের বুফে ব্রেকফাস্ট।
এবার একটু উপমহাদেশে আসা যাক। আগে যখন আজিমপুরে ছিলাম তখন প্রতি সপ্তাহে একবার হলেও বাখরখানি খাওয়া হতো। যদিও আমার নোনতাটা খুব একটা ভালো লাগে না, যাই হোক, বাকরখানির নামের পেছনে আছে এক করুণ ইতিহাস। হুবহু বই থেকে তুলে দিচ্ছি, "জনশ্রুতি অনুসারে, জমিদার আগা বাকের তথা আগা বাকির খাঁর নামানুসারে এই রুটির নামকরণ করা হয়েছে। নবাব মুর্শিদ কুলী খাঁর দত্তক ছেলে ছিলেন আগা বাকের। প্রখর মেধার অধিকারী আগা বাকের যুদ্ধবিদ্যাতেও পারদর্শী ছিলেন। রাজধানী মুর্শিদাবাদের নর্তকী খনি বেগম এবং আগা বাকের পরস্পরের প্রেমে পড়েন। কিন্ত উজিরপুত্র নগর কোতোয়াল জয়নাল খান ছিল পথের কাঁটা, সে খনি বেগমকে প্রেম নিবেদন করলে তিনি জয়নাল খানকে প্রত্যাখান করেন। প্রত্যাখ্যাত হয়ে জয়নাল খনি বেগমের ক্ষতির চেষ্টা করে এবং খবর পেয়ে বাকের সেখানে যান ও তলোয়ারবাজিতে জয়নালকে হারিয়ে দেন। অন্যদিকে জয়নালের দুই বন্ধু উজিরকে মিথ্যা খবর দেয় যে, বাকের জয়নালকে হত্যা করে লাশ গুম করেছে। উজির ছেলের হত্যার বিচার চায়। নবাব মুর্শিদ কুলী খাঁ পুত্র বাকেরকে বাঘের খাঁচায় নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেন। অবশেষে বাকেরের হাতে মারা যায় বাঘ। ইতিমধ্যে জয়নালের মৃত্যুর মিথ্যা খবর ফাঁস হয়ে গেছে ও সে জোর করে খনি বেগমকে ধরে নিয়ে গেছে দক্ষিণ বঙ্গে। উদ্ধার করতে যান বাকের খনি বেগমকে।
পিছু নেন উজির জাহান্দার খান। ছেলে জয়নাল খান বাকেরকে হত্যার চেস্টা করলে উজির নিজের ছেলেকে হত্যা করেন তলোয়ারের আঘাতে। এই অবস্থাতে জয়নাল খনি বেগমকে তলোয়ারের আঘাতে হত্যা করে। বাকেরগজ্ঞে সমাধিস্থ করা হয় খনি বেগমকে। আর বাকের সবকিছু ত্যাগ করে রয়ে গেলেন প্রিয়তমার সমাধির কাছে – দক্ষিণ বঙ্গে। বাকের খাঁর নামানুসারেই বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ (পটুয়াখালি-বরিশাল) অঞ্চলের নাম হয় বাকেরগঞ্জ। ঐতিহ্য্যবাহী বাকরখানি রুটির নামের পেছনেও রয়েছে এই বাকের-খনির প্রেমের ইতিহাস।"
এরপর লেখক একাধারে বলতে থাকেন গ্রানোলা, পিকনিক, সিরিয়াল, অমলেট, লুচি, কচুরি, পরোটা, পরিজ, কাবাব, পাস্তা, চাউমিন, মোমো, স্যুপ, সালাদ, স্টেক, মেয়োনিজ, খিচুড়িসহ আরো নানান খাবারের গল্প। পড়তে মজাই লেগেছে, পড়তে যেয়ে খিদেও পেয়েছে। সময় কাটানোর জন্য ভালো বই।
"Nola", means " Lust for Food" in Bengali. When i ordered for the book, i was a little bit confused to buy it, but after reading it, i must say it's an amazing book about food, classic food advertisements and entertaining stories about food, its origin and evolution.
There are a lot of things the writer has talked about in this book. From Bengali To Italy cuisine, Sweet to Sauce, Origin myth of Tea, Coffee and many more, he has narrated it in such a homely way, that you will feel like that you're having a nice hangout with your Geeky friend, having A little bit of Snacks and he is telling you different kind of food stories. The most amazing stories were about Breakfast, Dinner and Lunch time, in the intro. How the words generate, how they had made an impact on social life, how food has created war and famine.
The cover is mind blowing, it literally has blown my mind. And also inside, there's a lot of photos of food advertisements which will give you an old school feelings.
বই আমাদের কখনও কাঁদায়, কখনও হাসায়। আবার কখনও আবেগে আপ্লূত হয়ে কল্পনায় ভাসিয়ে দেয়। প্রকৃতির নিবিড় সঙ্গ পাইয়ে দেয় এই বই। রাগ, অভিমান, ভালোবাসা সবকিছু পাওয়া যায় বইতে। অনেক অজানা তথ্য পাই বই থেকে।
কিন্তু বই পড়ে যে খিদেও পাইয়ে দেয় সেটা আমার আগে জানা ছিল না বা তেমন অভিজ্ঞতাও ছিল না। নোলা বইটি পড়া মুহুর্তে খাবারের প্রতি একটা আকর্ষণ জন্ম দিবে, আপনি লোভ পেতে বাধ্য হবেন। এমন কোনো খাবার নেই যা বইতে স্থান পায় নি। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রাত্যহিক খাবার, দেশি-বিদেশি প্রায় সব ধরনের খাবার সম্পর্কে লিখা আছে বইটিতে। এছাড়া কোন খাবার কিভাবে আবিষ্কার হয়েছে, তাদের নামকরণসহ খাবারের ইতিহাস সম্পর্কেও জানতে পারবেন। বইটি নন-ফিকশন হলেও পড়তে কোনো বিরক্তবোধ আসবে না। বরং আগ্রহ নিয়ে পড়তে পারবেন।
উফফফফফ এই বই জবে থেকে দেখেছি, পড়ার লোভ সামলাতে পারছিলাম না, শুধু মাত্র নানান কাজের চাপে পড়ার সময় করে উঠতে পারছিলাম না।শেষমেষ পড়ে শেষ করলাম। ফেসবুকে বইটার কিছু ঝলক দেখেছিলাম, তাই দেখেই আমি মুগ্ধ। সম্প্রতি কৌশিক মজুমদারের কয়েকটি লেখা নজরে এসেছে, প্রশংসাও বেশ শুনেছি। "নোলা" দিয়েই শুরু করলাম।
বইটির স্বাদ অনবদ্য। প্রচ্ছদটিও আমার ভারী পছন্দ হয়েছে। নানান ধরনের খাবারের(বিশেষ করে বাঙালি খাবার) ইতিহাস জানতে আমি খুবই আগ্রহী, সেটি কোন দেশের, কিভাবে এলো, নামকরণ কিভাবে হলো এসব তথ্য জানতে খুবই ভালো লাগে। আর নোলা সেরকমই একটা বই। আমি যে প্রায়দিনই "কেলগস কর্নফ্লেক্স" খাই তার যে এমন ইতিহাস আছে না পড়লে জানাই হত না। আচ্ছা ভেবে দেখেছেন গোড়ার দিকে ভোজবাড়িতে কি কি মেনু থাকতো ? লুচি, পোলাও এসব কবে কিভাবে বাংলায় প্রবেশ করলো ?প্রতিদিনের চায়ের সঙ্গী বিস্কুট কিভাবে এলো ? পপুলার ফ্রেঞ্চ ফ্রাই কোথা থেকে এলো ?( ফ্রান্স থেকে নয় কিন্তু), ইটালিয়ান পাস্তা কিভাবে আবির্ভাব হলো কতপ্রকার ? আর জনপ্রিয় পিজ্জা কি সত্যিই ইটালিয়ান কুইজিন ? এছাড়াও আছে কত বড় নামী নামী কোম্পানির ( ম্যাকডোনাল্ড, কে এফ সি, ) নানান ইতিহাস।আমরা মাছে ভাতে বাঙালি কিভাবে হলাম ? রাজস্থানের ফেমাস কুইজিন ডাল বাটি চুরমা রান্না কিভাবে শুরু হলো? এরকম শত শত প্রশ্নের উত্তর মিলবে "নোলা" তে।আর হ্যা এই বইটিতে পেয়ে যাবেন নানান রান্নার বইএর হদিশ। শেষের পরিশিষ্ট অংশ টা কিজন্য ছিল !?🤔🤔😄
অনেক সময় তথ্যের ভারে বই জটিল হয়ে ওঠে, কিন্তু এখানে লেখক গল্প ছলে এমন ভাবে সব বর্ণনা করেছেন, তা বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠেছে। শেষে একটাই কথা বলবো লেখকের উদ্দেশ্যে, এরকম একটা বই লেখার জন্য ওনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ, অনেকদিন থেকেই এরকমই একটা বই খুঁজছিলাম।
বাঙ্গালীই যে একমাত্র ভোজন রসিক জাতি তা কিন্তু না। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এক এক দেশের মানুষের খাবার নিয়ে কোতুহলের শেষ ছিলোনা কখনোই। আবার চিরাচরিত খাবারকে একটু ঘুরিয়ে পেচিয়ে ভিন্ন এক সফিস্টিক্যাট ডিশ বানানোর রেওয়াজও বহু কাল আগ ধরেই চলে আসছে।
কিন্তু এই যে এতো সুন্দর ও অদ্ভুত খাবারের নাম, আপনার কি কখনো জানতে ইচ্ছে হয়নি এই নাম কিভাবে এলো? বা কোন খাবারের গোরা কোন দেশ বা জাতি থেকে এলো?
আপনি জানেন কি, আমরা সকালের যেই খাবারকে ব্রেকফাস্ট বা নাস্তা বলি সেটাকে একসময় ডিনার বলা হতো? যদি তা-ই ছিলো তবে কিভাবে তা ব্রেকফাস্টে পরিনত হলো?
আবার, যদিও আরব দেশের লোকজন দাবী করে কফি তাদের দেশ থেকে উৎপত্তি, তা আসলে ইথিওপিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমের কাফা প্রদেশ থেকে এসেছে। আবার কফির বিভিন্ন নামের পিছনেও কিন্তু কিছু ইতিহাস আছে।
এলিট লোকজন এই যে সবার হাতের গ্লাসের পানীয় খাওয়ার আগে গ্লাসে গ্লাসে হালকা ঠুকে নেয়, এটা মূলত এসেছে মধ্যযুগের ইংরেজ রাজাদের আমল থেকে। কেউ তাদের পানীয়তে বিষ দিয়েছে কিনা তাই ভয়ে চালাকি করে তারা অন্যের গ্লাসের সাথে নিজেদের গ্লাস ঠুকতেন যেন বিষ থাকলে তা অন্যের গ্লাসে লেগে যায়। কারন মরলে একা মরবে কেন?
এই যে আমরা সেন্ডউইচ খাই, এর আবিস্কার হয় তাস খেলার আসনে। আবার পুরান ঢাকার জনপ্রিয় বাকরখানি যা দেশজুড়ে পরিচিত, এর উৎপত্তি কি আসলেই ঢাকায়? জানেন কি এর পেছনে আছে এক প্রেমের ট্রাজেডি?
এমন শতাধিক খাবার নিয়ে জানা অজানা মজার মজার তথ্য আছে বইটিতে।
*******
মজার বই হলেও আমার এ বই শেষ করতে এক বছর সময় লাগলো। না, বই পড়তে ভালো লাগেনি এমন কিছু না।
কথা হলো মজার মজার লোভনীয় খাবারের গল্প পড়তে পড়তে মনে হয় চোঁখের সামনে যেন সেই ব্যাপারগুলো ঘটছে। আর ঠিক তখনই ক্ষুধা লেগে যায় এবং আফসোস লাগে।
এছাড়া আমি নন ফিকশন রিডার না বলা চলে। তাই এই বই ওই বই পড়ার ফাঁকফোকরে একটা দুটা খাবারের গল্প পড়ে সময় কাটিয়েছি।
লেখক প্রতিটা খাবারের পেছনের ইতিহাস ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী রম্যভাবে তুলে এনেছে বইতে। তাই বইটা পড়তে পছন্দের খাবারের মতোই সুস্বাদু লেগেছে।
দেশী বিদেশি নানা রকম খাবার, এদের আদি উৎস ও নামকরনের পেছনের গল্প নিয়ে সাজানো বইটি সর্বজন পাঠ্য; অন্তত প্রতিদিনের খাওয়া খাবার গুলোর ইতিহাস জানার জন্যে হলেও।
খাবার আর রান্না নিয়ে রেসিপিবুকের বাইরেও যে বই লেখা যায় তার অন্যতম উদাহরণ কল্লোল লাহিড়ীর উপন্যাস 'ইন্দুবালা ভাতের হোটেল'। রান্না নিয়ে চমৎকার আরো একটি বই পড়ছি - কৌশিক মজুমদারের 'নোলা'। নন-ফিকশন বই, রান্নার বিভিন্ন ইতিহাস কত রিসার্চ করে যে তুলে এনেছেন লেখক। লাঞ্চ, ডিনার, ফাস্টফুড, মাছ, মিষ্টি, পানীয় অনেক ভাগে খাবারের জন্মকাহিনী বর্ণনা করেছেন। ভালো লাগছে খুব, সময় নিয়ে রয়ে-সয়ে পড়ছি।
কৌশিক মজুমদারের লেখার সাথে পরিচিত থাকলে আপনি অবশ্যই জানেন তিনি কতটা গুছিয়ে লেখেন। একটা খাবারের বই, যা কিনা নিরেট ননফিকশন, তাকে গল্পের মত করে উপস্থাপন করেছেন। আমাদের নিত্যকার প্লেটের বিভিন্ন মেনুর অনেক অজানা এবং মজার কাহিনী আছে এখানে। পড়ে মজা পেয়েছি খুব।
মানুষটা এত্ত এত্ত খাবারের এত্ত এত্ত ইনফরমেশন দিছেন এই বইয়ে, আর তার পিছনে যে এত্ত এত্ত বইপত্র ঘাটাঘাটি করছেন তার জন্য পুরস্কার দেয়া উচিত ।
This book is a full Platter serving non-fiction with such delicacy that it leaves a lasting savor.
The book covers various subjects regarding food starting from Luchi, Kichuri, Fish, Sondesh, Rosogolla, Pan to Maggi, Pizza, Mayonnaise, KFC, etc. It also covered many aspects of foods such as history of breakfast-lunch-dinner, Menu Card, street food, Tagore's fooding habits, etc. Wines and beverages are also there.
The great thing about this book, is that it narrates the histories in a layman's language and thus the trivia's get digested without any Digestant.
A book for every trivia lover and obviously a FOODIE!
রসগোল্লা থেকে এগ বেনেডিক্ট, কফি থেকে কেচাপ বালিগঞ্জ থেকে বার্লিন কিছুই বাদ রাখেননি লেখক। শতেক রকমের খাবারের উৎপত্তি আর মজার ইতিহাস নিয়ে সাজানো বইটি অত্যন্ত উপাদেয়। কৌশিক মজুমদার সুলেখক।