শকুনির পাশা-র সঙ্গে আমার অন্তরঙ্গ পরিচয় হয় আজ থেকে প্রায় আড়াই দশক আগে। নারায়ণ সান্যালের অদ্বিতীয় সৃষ্টি 'আজি হতে শতবর্ষ পরে' বইয়ের 'পৃথিবী: গল্প (১৯৭৬)'-এ অধ্যাপক কালিচরণ চন্দ্রকান্তকে শুনিয়েছিলেন সেই উপাখ্যান। তাতেই প্রথম পড়েছিলাম সুবলরাজের সপরিবারে কুরু-কারাগারে নিক্ষিপ্ত হওয়ার এবং আটভাই ও বৃদ্ধ বাবা-মা'র জন্য একমুষ্টি তণ্ডুল বরাদ্দের কাহিনি। বৃদ্ধ রাজা বুঝেছিলেন, এই একমুষ্টি তণ্ডুলের পেছনে আছে তার জন্য পিতা ও সন্তানদের কামড়াকামড়ি করে মরার তথা মারার পৈশাচিক পরিকল্পনা। তখন তিনি সেই দুর্দৈব অতিক্রমের উপায় নির্ধারণ করেন। কী বলেছিলেন তিনি? "...আমরা নয়জনে স্বেচ্ছামৃত্যু বরণ করব অনাহারে। সেটা কঠিন নয়, তার চেয়ে কঠিন কাজ হবে দশম জনের। নিকটতম আত্নীয়ের অনাহারজনিত মৃত্যু স্বচক্ষে দেখেও তাকে ওই একমুষ্টি ভিক্ষার আহারে বেঁচে থাকতে হবে। প্রত্যেকটি মৃত্যুপথযাত্রীকে তাকে শেষ আশ্বাস দিতে হবে— এর প্রতিশোধ সে নেবে। কুরুরাজের বংশকে সে নির্বংশ করবে— ওই একই নারকীয় পরিকল্পনায়৷ তারা যেন ভাইয়ে-ভাইয়ে কামড়া-কামড়ি করে নির্বংশ হয়! বলো, কে সেই দশম জন হতে স্বীকৃত? কে বেঁচে থাকতে রাজি আছ?" একে-একে সবাই অধোবদন হল। শেষে শকুনি বললে, "আপনি আশীর্বাদ করুন, মহাভাগ! আপনাদের রক্তের ঋণ যেন আমি পরিশোধ করতে পারি।" বৃদ্ধ তাঁর পাঁজর-সর্বস্ব বুকে ওকে টেনে নিয়ে বলেছিলেন, "তুমিই পারবে শকুনি! শোনো, আমার অনাহার-মৃত্যুর পর আমাকে সৎকার কোরো না। আমার বুকের পাঁজর ছিঁড়ে নিয়ে পাশা বানিয়ো। বৈরীনির্যাতনের যে বাসনা নিয়ে আমি মরছি, তা আমার বুকের পাঁজরে লুকিয়ে থাকবে। পাশা তোমার ডাক শুনবে! কুরুকুল ধ্বংস করবে!" পরে অনেকবার অনেক জায়গায় পড়েছি যে আখ্যান প্রক্ষিপ্ত। 'মূল' মহাভারতে এ-সব কিচ্ছু নেই নাকি। হয়তো তাই৷ কিন্তু বন্ড-কাঁপানো স্ক্যারামাংগা বলে গেছেন, "ওয়ান্স ইজ হ্যাপেনস্টান্স, টোয়াইস ইজ কো-ইনসিডেন্স, থ্রাইস ইজ এনিমি অ্যাকশন।" শকুনির নানা পরামর্শ ও কার্যক্রম দেখলে একথা বুঝতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয় না যে অত্যন্ত কুশলী এক ট্যাকটিশিয়ান বড়ো কিছু মুভ আর বাকি সময়ে ছোট্ট-ছোট্ট বাটারফ্লাই এফেক্টের মাধ্যমে এক অমিতবলশালী রাজবংশকে ধ্বংস করেছেন ভেতর থেকে। কেমন হয়, যদি এই 'এনিমি উইদিন'-এর দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা হয় মহাভারত? সোশ্যাল মিডিয়ায় যাঁরা শাস্ত্র পুরাণাদির চর্চা করেন, তাঁদের কাছে সুচেতনা সেন কুমার-এর নাম সুপরিচিত। সকলেই মানবেন, মহাকাব্যের এই বিনির্মাণ কার্যে তিনি কোনোমতেই অনধিকারী নন। কিন্তু 'সৌবল শকুনি' নামের এই গ্রন্থরচনান্তে সাহিত্যিক গুণমানের বিচারে তিনি কি সফল হলেন?
আগে লিখি কী-কী আমার ভালো লেগেছে। প্রথমত, সমস্ত ধরনের অলৌকিক ব্যাখ্যা ও ঘটনাক্রম বর্জন করে যে বিকল্প ভাষ্যটি এখানে তুলে ধরা হয়েছে— সে গান্ধারীর শতপুত্রের হোক বা দ্যূতসভায় দ্রৌপদী'র বস্ত্রের— তার জন্য কোনো প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। দ্বিতীয়ত, ঘটনাক্রমের সঙ্গে পূর্বপরিচয়ের ফলে পাঠক লেখার গতি অনুমানের ক্ষেত্রে আত্মতুষ্টির শিকার হতে পারতেন। সেই অভ্যস্ত পথের বাইরে আসতে তাঁকে প্রায় বাধ্য করা হয়েছে মূল মহাভারতে অনুল্লিখিত কিছু সাক্ষাৎ ও কথোপকথনের মাধ্যমে। এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তৃতীয়ত, তৎসম শব্দের বাহুল্য সত্ত্বেও এই লেখা অত্যন্ত গতিময়। এতে সৌন্দর্য, ক্রূরতা, পূর্বরাগের মাধুর্য থেকে ক্রোধের বিষবাষ্প— প্রতিটি বর্ণনাই যথাযথ থেকেছে। শুধু "দ্বিপ্রাহরিক ভোজনের পর সম্ভাষণ করল" জাতীয় প্রয়োগ সাধু ভাষার জবরদস্তি, নয়তো গুরুচণ্ডালী গোছের ঠেকেছে।
আর কী-কী ভালো লাগেনি? ১) গান্ধারী ও শকুনির মধ্যে সূচনালগ্নের আন্তঃক্রিয়ার বর্ণনা আমার অকারণে দীর্ঘায়িত বলে মনে হয়েছে৷ আবেগের ওই স্ফূরণ কাহিনিতে কোনো প্রভাব ফেলেনি, শুধু গতিকে শ্লথ করেছে। একইভাবে কুরুবংশের নানা নাম ও কাম (সর্বার্থে)-এর সঙ্গে পাঠকের পরিচয় করিয়ে দেওয়াতেও কিঞ্চিৎ গতিলোপই হয়েছে বলে আমার ধারণা। ২) গান্ধারী, কুন্তী, দ্রৌপদী— প্রায় প্রতিটি প্রধান নারী চরিত্রের নানা দুর্বলতা ও ভ্রান্তি উন্মোচনে নির্মম হয়েছেন সুচেতনা। এর ফলে মহাভারতীয় গাথাটি অটুট থেকেছে বটে, কিন্তু পাদপ্রদীপের আলো থেকে সরে গেছেন প্রতিহিংসার অনলে দগ্ধ সৌবল। বরং এঁদের নিয়ে নানা ভাবনায় তাঁর যে রূপটি প্রতিভাত হয়েছে তা এক পরম কারুণিক ও শুভচিন্তকের। ৩) কাহিনির কাঠামোয় বিমলকৃষ্ণ মতিলাল তথা নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী'র যৌক্তিক বিশ্লেষণ অনুসৃত হয়েছে দেখে বড়ো ভালো লাগল। কিন্তু সৌবলের পরিবর্তে বাসুদেবই তার ফলে অনেকাংশে কুরুকুলের ভাগ্যনিয়ন্তা হয়ে উঠেছেন৷ শেষে ভীষ্ম ও গান্ধারী'র সঙ্গে কথোপকথনে শকুনি নিজেকে বড়ো বেশি উন্মোচিত করে ফেলেছেন বলেই আমার মনে হয়েছে। ৪) এই অতি চমৎকার বইটিতে বানানরীতি একেবারে সেকেলে দেখে কিঞ্চিৎ ব্যথিত হলাম। মহাকাব্যের মহিমা তার চির-আধুনিকত্বে। মহাকাব্যিক কাহিনিতেও আধুনিক বানানই প্রত্যাশিত ছিল। বইয়ের প্রচ্ছদটিও বিসদৃশ লেগেছে। কিন্তু এই আক্ষেপগুলো এজন্যই করছি, যেহেতু দীর্ঘ-দীর্ঘদিন পর কোনো লেখা পড়তে গিয়ে আমার ওই নারায়ণী পাঠ মনে পড়ে গায়ে কাঁটা দিল— "পাশা তোমার ডাক শুনবে!" ভরসা রাখি, পাঠক সুচেতনা'র এই প্রয়াসকে উপেক্ষা করবেন না। মহাভারতের এই নবপাঠ তাঁদের অপেক্ষায় আছে।
ছোটবেলা থেকে যেভাবে আমরা শকুনিকে চিনেছি, তা হলপুরোটাই একটা খল চরিত্র। কুব্জ শরীর আর ঠোঁটে ক্রুর হাসি। সর্বদাই যেন কিভাবে পাণ্ডব ও দ্রৌপদীর ক্ষতি করা যায়।
এই "সৌবল শকুনি" সম্পূর্ণ অন্য শকুনিকে পাঠকের সামনে এনে।
গল্পের শুরু থেকেই শকুনিকে একজন আদর্শবান হিসাবে দেখানো হয়েছে। যে তার রাজ্যর কিভাবে ভালো করে যায় তার চেষ্টায় সদা ব্যস্ত।
একজন কুটিল মানুষের থেকে বেশি, তাকে অনেক দায়িত্ববান ভ্রাতা হিসাবে দেখা যায়।
পুরো বইটি তৎসম ভাষায় লেখা। কিন্তু খুব সহজেই লেখিকা পুরো গল্পটাকে লেখকের পাঠ উপযোগী করে তুলেছেন। প্রত্যেকটা প্লটের transition খুব smoothly।
বইয়ের নাম- সৌবল শকুনি লেখক- সুচেতনা সেন কুমার প্রকাশক- মুখার্জি পাবলিশিং
আচ্ছা, 'শকুনি' নামটা শুনলেই আমাদের মনে প্রথম কোন ছবি ভেসে ওঠে? একজন খঞ্জ, একচক্ষু ব্যক্তি পাশা নিয়ে বসে আছেন অধিদেবনের সামনে, ওষ্ঠপ্রান্তে ফুটে উঠেছে একচিলতে কুটিল হাসি- এই তো? কিন্তু ভদ্রলোকের চোখের দিকে কখনও তাকিয়ে দেখেছেন কি? সেখানে কত জ্বালা, কত দ্বেষ, কি গভীর প্রতিহিংসা জাজ্জ্বল্যমান হয়ে রয়েছে?
বর্তমানে পৌরাণিক কাহিনীর প্রতি মানুষের আগ্ৰহ লক্ষ্যণীয়ভাবে বেড়েছে, তার কারণ লকডাউনে রামায়ণ-মহাভারতের পুনঃসম্প্রচারই হোক বা অন্য কিছু- পাঠকেরা পৌরাণিক উপাখ্যানগুলি সম্পর্কে জানতে চাইছেন এবং পুরাতনকে নূতনের আলোকে দেখতে চাইছেন, তা প্রতিদিন বইপোকার ওয়ালে হওয়া পোস্টগুলি থেকেই বোঝা যায়। বর্তমান ব্যস্ততার যুগে দৃশ্যশ্রাব্য মাধ্যমের আবেদন যে পাঠ্য মাধ্যমের চেয়ে অনেকই বেশি, আশা করি সে বিষয়ে কেউ দ্বিমত পোষণ করবেন না। কিন্তু এখানেই চলে আসে একটা বড় প্রশ্নচিহ্ন। মানুষ স্বয়ং স্রষ্টার তৈরি চরিত্রগুলির সঙ্গে একাত্ম হতে পারছেন তো? নাকি দুধের বদলে পিটুলিগোলা জল খাওয়ানোর মতো বিনোদনের নামে সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস পরিবেশন করা হচ্ছে পাঠকের সামনে?
আর এখানেই প্রথম বাজিটি মেরেছেন সুচেতনা সেন কুমার তাঁর 'সৌবল শকুনি' বইটিতে। মাননীয় বি.আর. চোপড়ার এবং সম্প্রতি স্টার প্লাসে হওয়া মহাভারতে শকুনির যে ইমেজারি, তাকে তিনি সম্পূর্ণ ভেঙে গড়েছেন এই বইয়ে। তাঁর মনশ্চক্ষে শকুনি ধরা দিয়েছেন অশ্বারোহণে পটু, সুদক্ষ তীরন্দাজ, সুদর্শন এক পুরুষ রূপে। তিনি টিপিক্যাল 'সিরিয়ালি' ভিলেনের মতো নিজের রাজ্য ছেড়ে বোন-ভগ্নীপতির সংসারে অন্নধ্বংস আর কূটকচালি করে দিনযাপন করেন না, বরং কি ভাবে গান্ধার আরও সুরক্ষিত হবে, কোন উপায়ে সাম্রাজ্য বিস্তার করে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটানো যাবে- এই-ই তাঁর একমাত্র ধ্যানজ্ঞান। উপন্যাসটি নাতিবৃহৎ হলেও প্রায় সম্পূর্ণ মহাভারতের ঘটনাবলীকে এর মধ্যে ধরানো হয়েছে, তাই লেখিকা পর্ব ভাগ না কররলেও এর সুস্পষ্ট তিনটি ভাগ আমার চোখে পড়েছে এবং আমি প্রতিটি পর্ব ধরে ধরেই বইটির বিষয়বস্তু সম্পর্কে পর্যালোচনা করব।
উপন্যাসের শুরুই হচ্ছে এক অশ্বারোহণ প্রতিযোগিতা দিয়ে, যেখানে অংশগ্রহণ করেছেন শকুনি ও গান্ধারী আর বিচারকের আসনে রয়েছেন তাঁদের দুই অনুজ- অচল ও বৃষক। প্রতিযোগিতা শেষ হয় অমীমাংসিত ভাবে এবং সেই সূত্র ধরে নারীজাতির প্রতি শকুনি তাঁর মনোভাব ব্যক্ত করেন অপূর্ব শব্দঝংকারে। এরপর ক্রমশ উপন্যাস এগোতে থাকে এবং গল্পের ছলে বহু জানা-অজানা তথ্য পরিবেশন করে চলেন লেখিকা, যা মনে পড়িয়ে দেয় তথ্যবহুল গল্প লেখার ক্ষেত্রে সত্যজিৎ রায়ের উচ্চারিত সাবধানবাণীকে। লেখিকা খুব সুন্দরভাবে এই বিষয়টি সামলেছেন, তথ্যবহুল হলেও একবারের জন্যও তথ্যভারাক্রান্ত মনে হয়নি তাঁর লেখনীকে। এবং গল্পের চলনের ক্ষেত্রে দারুণভাবে সাহায্য করেছে তাঁর সুন্দর শব্দচয়ন। বিশেষত প্রাণপ্রিয়া ভগ্নী গান্ধারীর সঙ্গে শকুনির একান্তে কাটানো মুহূর্তগুলি খুব সুন্দরভাবে ধরা দিয়েছে লেখিকার দক্ষ কলমের আঁচড়ে। আর্যাবর্তের দৃষ্টিতে 'হীনরাজ্য' গান্ধারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য, সেখানকার প্রজাদের মনোভাব, তাদের রাজভক্তি, গান্ধারের রাজবংশের প্রজাপ্রীতি, দেশপ্রেম- সবকিছুই চমৎকারভাবে ধরা দিয়েছে উপন্যাসের প্রথম পর্বে বা বলা ভালো গান্ধারীর প্রাক-বিবাহ পর্বে। সেইসঙ্গে ছোট্ট পরিসরের মধ্যেও দেখানো হয়েছে তৎকালীন ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি- যা লেখিকার পঠনের গভীরতাকে সূচিত করে।
বৈয়াসকী মহাভারতে না থাকলেও বিভিন্ন লোককথায় প্রচলিত রয়েছে গান্ধারীর মাঙ্গলিক হওয়ার উপাখ্যান এবং সেই সূত্রে ছাগলের সঙ্গে তাঁর বিবাহে সেই দোষ ক্ষালনের বিষয়টি, যা কুরুকুলপিতামহ ভীষ্মের গোচরে এলে তিনি বীভৎস অত্যাচার চালিয়ে গান্ধারকে শ্মশানস্তূপে পরিণত করেন আর সেই শ্মশানের বুকেই জন্ম নেয় আগেকার শকুনির দেহে এক নতুন মানুষ, যার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান- যেনতেন প্রকারে অত্যাচারী কুরুরাষ্ট্রের ধ্বংসসাধন করে এক ধর্মরাজ্যের প্রতিষ্ঠা; যেখানে হবে না কোনো নারীর অপমান, যেখানে আস্ফালন করবে না ক্ষমতার উলঙ্গ অসি, যেখানে বাহুবলের ওপরে বিজয়ী হবে হৃদয়বল। সুচেতনাদেবী এই পর্বে শকুনির হৃদয়ের যাতনা ফুটিয়ে তুলেছেন অনুপম শব্দচয়নে। বইয়ের পাতা থেকে শকুনি যেন তার সমস্ত লজ্জা, ঘৃণা, অসহায়তা, ক্রোধ, বীরত্ব আর সর্বোপরি প্রতিশোধস্পৃহা নিয়ে জীবন্ত হয়ে ধরা দেয় আমাদের কাছে। সেইসঙ্গে জীবন্ত হয়ে ওঠে ধৃতরাষ্ট্রের রাজ্যলোলুপতা ও চূড়ান্ত পুরুষতান্ত্রিক মনোবৃত্তি, গান্ধারীর আর্তনাদ, ভীষ্মের অন্ধ বংশগৌরব, সুবলের তাচ্ছিল্য আর কুরুসৈন্যদের নিষ্ঠুরতা।
এরপরেই গল্প ঢুকে যায় মহাভারতের মূল কাহিনীতে, বৃহত্তর রাজনীতির অঙ্গণে যার প্রধান কুশীলব পীতবেশধারী, শিখিপাখা সমন্বিত কিরীট পরিহিত, উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের এক যুবক। তাঁর সঙ্গে শকুনির সম্পর্কের টানাপোড়েনই তৃতীয় পর্বের মূল উপজীব্য বিষয়। এই প্রসঙ্গেই আসে মহাভারতের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া কয়েকটি মুহূর্ত, যথা- পাণ্ডবদের জন্ম, দ্রোণের প্রশিক্ষণে অস্ত্রশিক্ষা প্রর্দশনের রঙ্গমঞ্চে পাণ্ডবদের বীর্যের প্রকাশ, যুধিষ্ঠিরের যৌবরাজ্যাভিষেক, পাণ্ডবদের বারণাবতে প্রেরণ, দ্রৌপদীর স্বয়ংবর, পাণ্ডবদের ইন্দ্রপ্রস্থ লাভ ও রাজসূয় যজ্ঞের মাধ্যমে কুরু-পাণ্ডবের চিরস্থায়ী বৈরিতার সূত্রপাত, দ্যূতসভা, পাণ্ডবদের বনবাস ও অজ্ঞাতবাস এবং পরিশেষে অষ্টাদশ দিবস ব্যাপী কুরুক্ষেত্রের মহাসংগ্ৰাম। এই পর্ব সম্পর্কে বিশেষ কিছু বললাম না, কারণ ঘটনা কমবেশি সকলেরই জানা। কেবল শকুনির মুখ দিয়ে বলানো লেখিকার নিজস্ব ভারতভাবনা পাঠককে মুগ্ধ করবে কিনা বলতে পারব না, তবে ভাবতে বাধ্য করবে, এ কথা অনস্বীকার্য। ভবিষ্যতে যদি কেউ এ পথে এগোতে চান, তবে আপনাকে কৃতজ্ঞ থাকতেই হবে সুচেতনা সেন কুমারের 'সৌবল শকুনি'র কাছে।
কোন কোন জায়গা নজর কেড়েছে:
যে অংশগুলি পড়ে মুগ্ধতার আমেজ এসেছে, সেগুলির কথা আগেই বলেছি। এছাড়াও যে বিষয়গুলি নজর কেড়েছে, সেগুলি হল: ১) কুন্তীর সঙ্গে শকুনির সম্পর্ক ২) নকুল ও শকুনির অসমবয়সী বন্ধুত্ব, যার আভাস মাত্র একটি বাক্যে অননুকরণীয় ভঙ্গিতে দিয়েছেন লেখিকা। ৩) পাণ্ডুর চরিত্রনির্মাণ ৪) কুরুযুদ্ধের দশম দিনে ভীষ্ম ও শকুনি- দুই চিরশত্রুর অবিস্মরণীয় কথোপকথন। ৫) কৃষ্ণ ও শকুনির সম্পর্কের এক অদ্ভুত সমীকরণ- যা সুচেতনাদেবীর আগে কেউ দেখিয়েছেন বলে আমার অন্তত জানা নেই। ৬) At last but not the least, বিশেষত প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বে এক অদ্ভুত মায়াময় ভাষার প্রয়োগ।
কোন কোন জায়গা খারাপ লেগেছে:
১) ধৃষ্টদ্যূম্নের জন্মপ্রসঙ্গে ইন্দোনেশিয়ান মহাভারতে প্রচলিত এক কাহিনীর অনুপ্রবেশ ঘটানো- যা সর্বৈব ভুল প্রমাণিত হয় মহাভারত ও হরিবংশে বর্ণিত ঘটনাবলীর প্রমাণে। এই প্রসঙ্গের অবতারণা করার কোনো প্রয়োজনই ছিল না, যেখানে আলোচ্য বিষয়ের সঙ্গে এর দূরদূরান্ত পর্যন্ত কোনো সংযোগ নেই। ২) রাজসূয় যজ্ঞ চলাকালীন দ্রৌপদী-হিড়িম্বার মধ্যে কার্যত কলতলার ঝগড়া বাধানো, যার উৎস সম্ভবত কাশীদাসী মহাভারতের আশ্বমেধিক পর্ব। এরও কোনো প্রয়োজন ছিল না, শকুনির চরিত্রে আলো ফেলার সঙ্গে এই ঘটনার বর্ণনা সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যবিহীন। ৩) শাম্ব-লক্ষণার বিবাহ মহাভারতেও একটি অবহেলিত অধ্যায়। তাকে এত মহিমান্বিত করে এত বড় আকারে বর্ণনা করার কি প্রয়োজন ছিল বুঝলাম না, মাঝেমাঝে মনে হচ্ছিল শকুনি নয়, লক্ষণাচরিত লেখার জন্যই বোধহয় এই কাহিনীর অবতারণা। ৪) মাঝেমাঝে ঘটা তথ্যপ্রমাদ। যদিও সেগুলো উপেক্ষণীয়ই বলা চলে, এখানে অন্য কেউ হলে কিছু বলার থাকত না, কিন্তু এতক্ষণ ধরে পাঠককে এত জানা-অজানা তথ্য সরবরাহ করেছেন যিনি, তাঁর কাছ থেকে এ ধরনের ভুল মেনে নেওয়া যায় না। আশা করব, পরের সংস্করণে এই প্রমাদগুলি তিনি ঠিক করে নেবেন। ৫) আচ্ছা আপনাদের মনে আছে 'ভীষ্মদ্রোণতটা জয়দ্রথজলা গান্ধারনীলোৎপলা...' শ্লোকটি? যেখানে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধকে একটি রণনদীর সঙ্গে তুলনা করে ভীষ্ম ও দ্রোণকে এই নদীর দুই তীর, জয়দ্রথকে নদীর জল, কর্ণকে বেলাভূমি, শল্যকে হাঙর, অশ্বত্থামা-বিকর্ণকে কুমির ও দুর্যোধনকে নদীর আবর্তের সঙ্গে তুলনা করে শকুনিকে তুলনা করা হয়েছিল এই নদীতে প্রস্ফূটিত নীলপদ্মের সঙ্গে? অর্থাৎ শকুনিই ছিলেন কৌরব সেনা-আকীর্ণ রণনদীর মূল শোভা, ঠিক যেমন নদীতে প্রস্ফূটিত ইন্দিবর। তা কৌরবসেনার মস্তিষ্ক যিনি, যিনি স্বপক্ষীয় সেনাদলের শোভাবর্ধন করেন এবং কুরুযুদ্ধের অন্যতম কারণ- তাঁকে নিয়ে মাত্র ১৪০ পাতা খরচ করাটা একেবারেই বালখিল্যতা নয় কি? এই কাহিনী অন্তত দুই বা তিন খণ্ডে প্রকাশিত হলে তবে স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে জাস্টিস করতেন। তার ওপর উপরের প্রথম তিনটি পয়েন্টে বর্ণিত ঘটনাগুলি তাঁর লেখার জায়গা এতটাই খেয়ে ফেলেছে যে তিনি হয়তো ইচ্ছে থাকলেও অনেককিছু বলতে পারেননি। নচেৎ নারীর স্থান এবং প্রকৃত মর্যাদা নিয়ে যে লেখিকা উপন্যাসে এতখানি জায়গা খরচ করেছেন, তিনি পাঁচজনের পত্নীত্বে বৃত হওয়ার কালে দ্রৌপদীর মানসিক যন্ত্রণা এতই সংক্ষেপে সারলেন যে কহতব্য নয়। এই কারণে প্রথম দুই পর্বের তুলনায় তৃতীয় পর্বে তাঁর গল্প বলার স্বাভাবিক ছন্দও ব্যাহত হয়েছে অনেকখানি। ৬) প্রচ্ছদ সম্পর্কে যত কম কথা বলা যায় ততই ভালো। এত ভালো বইয়ের এমন জঘন্য প্রচ্ছদ just beyond imagination। সেইসঙ্গে অবাক করেছে মোটিফের অনুপস্থিতি। অবশ্য এই বিষয়গুলিতে লেখিকার চেয়ে প্রকাশকের দায় অনেক বেশি।
মুদ্রণপ্রমাদ খুব বেশি চোখে পড়েনি।
বইয়ের রিভিউ তো দিলাম, এবার একটু প্রকাশকের রিভিউ দেওয়া যাক। গত বইমেলায় প্রকাশিত এই বইটির প্রকাশকের তরফ থেকে কোনো প্রচার আমি অন্তত দেখিনি। বাজারে বেশিরভাগ সময়ই unavailable, এত ভালো বইকে পাঠকের হাতে তুলে দেওয়ার সদিচ্ছা বা তাগিদের চিহ্নমাত্রও লক্ষ্য করা যায় না। এ ধরনের কাজের গুরুত্ব অনুধাবন করার মতো ক্ষমতা নেই যাঁদের, তাঁরা কেন এদিকে হাত বাড়ান, সেটাই মাথায় ঢোকে না। লেখিকার প্রতি আমার ব্যক্তিগত সাজেশন হবে, চুক্তি শেষ হওয়ামাত্রই সত্ত্বর তিনি বইটি পরিমার্জিত (এবং সম্ভব হলে পরিবর্ধিত) আকারে পুনর্মুদ্রণের ব্যবস্থা করুন এবং অবশ্যই বর্তমান প্রকাশকের কাছ থেকে নয়।
বিষয়টি স্বভাবতই বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। শকুনি? টেলিভিশন-সহ বিভিন্ন মিডিয়ামের উপস্থাপনায় যে চরিত্রটিকে আমরা দ্বিমাত্রিক খলনায়কের ভঙ্গিমায় অবতীর্ণ হতে দেখে-শুনে আসছি এতদিন, সেই চরিত্রটির মধ্যে এমন কী গভীরতা থাকতে পারে, যা ভিত্তি করে একটা গোটা বই লিখে ফেলা যায়? — ঠিক এই প্রশ্নটার উত্তর জানার জন্যই আলোচ্য বইটি পড়ার প্রাথমিক তাগিদ জেগেছিল মনে। অন্য কোনও পূর্ব-প্রত্যাশা ছিল না একেবারেই, কারণ সামগ্রিকভাবে কী পেতে চলেছি, তা নিয়ে খুব একটা ধারণা ছিল না বইটি পড়ার আগে।
একটি স্বল্প-আলোচিত চরিত্রকে মূল প্রতিপাদ্য করতে গিয়ে কি চেনা ছকের বাইরে হাঁটতে হবে? — সোজাসাপটা উত্তর হল, না, একেবারেই তা নয়। বইটি শুরু থেকে শেষের দিকে যত এগোবে, ততই পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, এখানে মূল উপজীব্য একটাই। মহাকাব্য মহাভারত। ভিন্ন বলতে কেবল সমস্তকিছু উপস্থাপিত হয়েছে সৌবল শকুনির দৃষ্টিভঙ্গিতে। গান্ধার রাজ্যে শকুনি ও গান্ধারীর মধ্যেকার ভাইবোনের মধুর সম্পর্ক থেকে শুরু হয়ে, কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে শকুনির অন্তিম পরিণতি অবধি ব্যাপ্ত এই পুনর্বিন্যাসরূপী উপন্যাস।
এতকিছু আলোচনা করার পরেও অবশ্য একটি প্রশ্ন খুব স্বাভাবিক। কেন? কী প্রয়োজনীয়তা এতসবের? — এর উত্তর পাঠকভেদে নানারকমের হলেও আমার ব্যক্তিগত অভিমত একটিই। যেহেতু ভিন্নমনস্ক চরিত্ররাই মহাকাব্যটির মূল ভিত্তিপ্রস্তর, তাই ঘটনাক্রমের পাশাপাশি চরিত্রগুলির বিশ্লেষণও খুবই প্রাসঙ্গিক পাঠকের চিন্তাশীলতার ক্ষুধা নিবারণের ক্ষেত্রে। একটি কথা খুবই সত্যি যে, ইতিহাসের পাতায় কোনও মানবচরিত্র-ই সম্পূর্ণ সাদা বা সম্পূর্ণ কালো হতে পারে না। নানা প্রাবল্যের ধূসরতাই বাস্তব সত্য। — তবুও সেই ধূসরতার স্বরূপ উদঘাটন করা-ই অনেকক্ষেত্রে অবহেলিত। আর ঠিক সেই বিন্দু থেকেই আলোচ্য আখ্যানের উৎপত্তি।
সমস্ত আখ্যানটির লেখনী নিয়ে আলোচনা করার বিষয়টি এক্ষেত্রে অবশ্য ভীষণ সহজ, বেশি শব্দ খরচের প্রয়োজনটুকু মনে হয়নি। বলিষ্ঠ।মূল উপজীব্য হওয়া সত্ত্বেও সৌবল নয়, বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণ-ই সর্বময় — ঠিক যেমনটা হওয়ার কথা। সমস্ত ব্যাপারটাই আশ্চর্যজনকভাবে “true to its roots” ছন্দে নির্মিত। এসবের পাশাপাশি গদ্যের ভাষার দিকটিও প্রশংসার দাবি রাখে। এছাড়া মুদ্রণ প্রমাদের বিষয়টিও খুব বেশি নেই। তবে বেশ কিছু জায়গায় ‘উদ্দেশে’-র বদলে ‘উদ্দেশ্যে’-এর অশুদ্ধ প্রয়োগ চোখে পড়েছে। এই সামান্যকিছু ত্রুটি পরবর্তী সংস্করণে সংশোধন করে নেওয়া বাঞ্ছনীয়।
অবশ্যপাঠ্য কি না, তা বলব না এবারে। কিছুকিছু বই এমন হয়, যা নিজেই তাঁর পাঠক খুঁজে নেয়। এইটিও সেরকম।
মহাভারতের ঘৃণ্যতম চরিত্রগুলির মধ্যে একেবারে প্রথম সারিতেই জ্বলজ্বল করে গান্ধাররাজ শকুনির নাম। কর্ণ-দুর্যোধন পছন্দের চরিত্র হতেই পারে অনেকের। কিন্তু শকুনি? শুধুমাত্র শঠতা দিয়ে ঘেরা আদ্যোপান্ত এক খলচরিত্র। তিনি শৃগালের মত ধূর্ত এক ঠগ; জুয়ার ঠেকে চুরি করে সর্বস্ব লুটে নেওয়া এক তস্করের থেকে বেশী কিছু মনে হয়না তাকে। তারপর আরেকটু গভীরে ঢুকলে একটা প্রশ্ন জাগে মনে। কেন করলেন শকুনি এমন? এই যে ভদ্রলোক নিজের রাজ্যপাট ছেড়ে সারাজীবন বোনের শ্বশুরবাড়িতে পড়ে রইলেন হাঁটুর বয়সী ভাগ্নেগুলোকে বদবুদ্ধি দিয়ে দিয়ে তাদের মাথাগুলো চিবিয়ে খাওয়ার জন্য – তা কি নিতান্তই স্বভাবদোষ? নাকি তাঁরও অন্তরে রয়েছে এমন কিছু না বলা রহস্য, যা তাঁর মনস্তত্ত্বের সাথে মিশে তাকে বিপথে চালিত করলো? আরো একটু ঘাঁটাঘাটি করলে পাওয়া যায় সেই অসহায় ভাইটির কথা, যাকে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপে নতিস্বীকার করে প্রাণপ্রিয় বোনটিকে তুলে দিতে হয়েছিল এক শক্তিধর রাজ্যের অন্ধ রাজকুমারের হাতে। আরও পাওয়া যায় এমন এক কাহিনী যা ব্যাসদেব তাঁর মহাকাব্যে লেখেননি। নিরপেক্ষ বিচারে যে আখ্যানের নৃশংসতা কল্পনাতীত। মহামতি ভীষ্মের হাতে গান্ধাররাজ সুবল ও তাঁর পুত্রদের সেই কারাবাস- যেখানে খাদ্য হিসেবে বরাদ্দ প্রত্যেকের জন্য এক কণা চাল। সকলে মিলে তাঁদের অন্নের ভাগ দিলেন শকুনিকে, প্রতিশোধের আগুনটি যেন কখনো না নেভে। পিতা ও ভ্রাতাগণের অংশের আয়ু নিয়ে বেঁচে রইলেন শকুনি, শুধুমাত্র এই কুরুবংশকে ভিতর থেকে ক্ষয় করে ধ্বংশ করে দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে। মূল মহাভারতের অংশ না হলেও এই গল্প বহুল প্রচলিত, এবং এই কাহিনীর উপরই শকুনির ভিত্তিস্থাপন করেছেন লেখিকা। কুরুপান্ডবের যুদ্ধ নয়, লিখেছেন শকুনির প্রতিশোধের গল্প।
প্রতিনায়কের চোখ থেকে মহাকাব্যকে নতুন ভাবে দেখার একটা দারুণ মজা রয়েছে। প্রতিনায়কের চোখে তথাকথিত নায়কগণের দোষত্রুটি নির্ভুলভাবে প্রতিবিম্বিত হয়, ঠিকভুলের ন্যায়দন্ডে তার নিরপেক্ষ বিচার হয়। পরম পূজনীয় ভীষ্ম তাই মহাভারতের খলনায়ক শকুনির চোখের আয়নায় প্রকাশ পান এক শক্তিমদে আসক্ত অত্যাচারী রাজপ্রতিনিধিরূপে। অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্র ধরা পরেন এক রাজ্যলোলুপ অসভ্য হীনচরিত্রের পুরুষরূপে। কুরুবংশের মহান রাজাদের প্রকৃতরূপ স্পষ্টরূপে ব্যক্ত করতে শকুনির তাই গলা কাঁপে না। ঠিকভুলের নিক্তিতে বিচার করতে পারেন তিনি পঞ্চপান্ডবকেও। শকুনির চোখে তাই মহাভারতের এক সামগ্রিক চিত্র আমরা দেখতে পাই এই কাহিনীতে। দেখতে পাই প্রবল প্রতাপশালী রাজবংশের ধ্বংসগাঁথা কিভাবে রচিত হয় ছোট ছোট পাপের ফলে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের আগুনে; কিভাবে এক অসহায় ভাইয়ের একাগ্র প্রতিশোধে ভিতর থেকে গুঁড়িয়ে যায় শতাব্দীপ্রাচীন সেই ইমারত। আর রয়েছেন গান্ধারের রাজকুমার সৌবল; মহাভারতের অন্যতম খলচরিত্রের আড়ালে চিরকালীনভাবে ঢাকা পড়ে গিয়েছিলেন যে ছোট্ট এক পার্বত্যরাজ্যের সেই ঝকঝকে তরুণ- অশ্বচালনায়, বীরত্বে, কূটবুদ্ধিতে, রাজনৈতিক প্রাজ্ঞতায় যাঁর নাম থাকতে পারতো ইতিহাসের প্রথম সারিতে- নিজের রাজ্যটিকে প্রাণের চেয়েও বেশী ভালোবেসে তাকে আরো সুন্দর, আরো গৌরবান্বিত করে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন যিনি… সেই সুবলকুমার শকুনিকে শঠতা ও খলতার আবরণ থেকে বের করে এনে তাঁকে এক পূর্ণাঙ্গ পুরুষরূপে চিত্রিত করেছেন লেখিকা। আর সেইসঙ্গে তাঁর অন্তরের বেদনাকে সুললিত ভাষায় প্রতিধ্বনিত করেছেন ছাপার অক্ষরে।
লেখিকা মহাভারতের বিভিন্ন অলৌকিক ঘটনার ব্যাখ্যায় মুন্সীয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। বিশেষত শতপুত্রের জন্মের পিছনের যে রহস্যজনক ইঙ্গিত, তা পড়ে শিহরিত হয়েছি। এই পর্যায়েই যেন কুরুবংশের উপর কঠিনতম প্রতিশোধটি নিয়েছেন শকুনি। কৃষ্ণ ও শকুনির মধ্যের এক অপূর্ব সমীকরণ দেখতে পাওয়া যায় এই কাহিনীতে। সাধারণত মহাভারত সংক্রান্ত গল্পগুলিতে কৃষ্ণ বনাম শকুনির দ্বন্দ্বের চিত্রই দেখা যায়। কিন্তু এখানে যেন শকুনি কৃষ্ণেরই অনুগামী। শকুনির কাছে যা ব্যক্তিগত প্রতিশোধ, শ্রীকৃষ্ণ তাকেই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের সাপেক্ষে একটি সংগঠিত উদ্দেশ্যের দিকে চালিত করেন। কাহিনীর ভাষা সহজ, সুন্দর। মহাকাব্যের বিনির্মাণসূচক তৎসম শব্দের প্রয়োগ ও সুললিত বিবরণ পরিমিত, বাহুল্য নেই। কিছু কিছু জায়গায় সাধুচলিতের মিশ্রণ টুকটাক চোখে লাগলেও তা নগণ্য। সব মিলিয়ে এই বই সুখপাঠ্য।
কয়েকটি অনুযোগ রয়েছে, একে একে বলি। প্রথমত, আমার মনে হয়েছে এই কাহিনীর প্রতিটি চরিত্রই বড় একমাত্রিক। অর্থাৎ ভালো হলে খুব ভালো, খারাপ হলে অত্যন্ত খারাপ। মধ্যেকার ধূসর পরিধিতে তাদের নিয়ে খুব একটা বিচরণ লেখক করেননি। এই কাহিনীর নায়ক শকুনি, তাই খলতার মিথ্যা আবরণ পেরিয়ে অন্য আলোতে তাঁকে দেখাই এই কাহিনীর উপজীব্য; কিন্তু এই আলো তাকে শুদ্ধ চরিত্রের এক আদর্শপুরুষরূপে প্রদর্শিত করতে চায়। ফলে চরিত্রের ধূসরতার দিকটি সেভাবে ফুটে ওঠে না। কারুণ্য ও সমব্যথীত্বের আবরণে তাঁর প্রতিশোধের আগুনটা চাপা পড়ে যায় কোথাও। শকুনির চরিত্রের বিভিন্ন ‘শেড’ আরো স্পষ্টভাবে উন্মোচন করতে পারলে প্রতিশোধ কাহিনী হিসেবে এই গল্প আরো টানটান হত বলে মনে হয়েছে। তাছাড়া গান্ধারীর চরিত্রটি বড় দুর্বল মনে হয়েছে। মহাভারতের ব্যক্তিত্বময়ী মহারাণীর কথা যদি একেবারে ভুলে গিয়ে এই গান্ধারীকে শুধুমাত্র নিঃসহায় এক ভগিনীরূপেও কল্পনা করি, তবু যেন শুরুতে তাঁর চরিত্রের যে উজ্জ্বল উপস্থিতি ছিল, শকুনির সাথে সহজ কথোপকথনে তাঁর চরিত্রের যে দিক প্রকাশ পেয়েছিল, তা কোথায় হারিয়ে যায়। শুধুই পড়ে থাকে নীরবে যন্ত্রণা সহ্য করেও স্বামীর সামান্য মন পেতে প্রাণপাত করতে থাকা এক অসহায়া রমণী। কুন্তীর ক্ষেত্রেও এই কথা কিছুটা প্রযোজ্য, যদিও কুন্তীর খুব একটা উপস্থিতি নেই। আবার আরো বেশ কিছু চরিত্র প্রয়োজন অনুসারে গুরুত্ব পায় না। কর্ণ, দুর্যোধন, দুঃশাসন ও শকুনির সেই দুষ্টচতুষ্টয় জোটের মধ্যেকার রসায়ন খুব একটা পরিষ্ফুট হয় না। কর্ণকে অন্যভাবে দেখানোর প্রস্তুতি নেওয়া হলেও সেদিকটা স্পষ্ট হয়না খুব একটা। কর্ণ ও কৃষ্ণের মধ্যে একটা সমীকরণ তৈরির চেষ্টা হয় বটে, কিন্তু তাও গল্পের গতি অনুসারে মাঝপথে দিকভ্রষ্ট মনে হয়। তাছাড়া বেশ কিছু কিছু ঘটনার অনাবশ্যক অবতারণা হয়েছে বলে মনে হয়েছে। কাশীদাসী মহাভারতের হিড়িম্বা ও দ্রৌপদীর তুমুল ‘ঝগড়ার’ অংশটি উপস্থাপন করার দরকার ছিল না। শাম্ব, লক্ষ্মণা ও কর্ণের ছেলেকে নিয়ে এতগুলি পৃষ্ঠারও কোনো প্রয়োজন ছিল না মনে হয়েছে। ধৃষ্টদ্যুম্ন, শিখন্ডী প্রভৃতির যে ‘ব্যাকগ্রাউন্ড’ লেখিকা এনেছেন তা অনাবশ্যক- কারণ গল্পে তা কিছুই যোগ করেনা।
তবে সবকিছু মিলিয়ে সৌবল শকুনির পাঠ বেশ উপভোগ্য। মহাভারতকে নতুন আঙ্গিকে দেখতে, নতুনভাবে ভাবতে সাহায্য করে এই লেখা। ধন্যবাদ জানাই লেখিকাকে।
সৌবল শকুনি • সুচেতনা সেন কুমার ___________________________ কথায় বলে ‘যাহা নাই (মহা)ভারতে, তাহা নাই ভারতে’
আর যে দেশে এইরকম সুবিশাল মহাকাব্য রয়েছে সেই দেশের অধিবাসীদের জীবন যে তাকে ঘিরেই আবর্তিত হবে সেকথা বলাই বাহুল্য। ফলে যুগযুগ ধরে ভারতের বিভিন্ন ভাষায় মহাভারত নিয়ে অগুনতি গল্প, উপন্যাস, নাটক, চলচ্চিত্রের সৃষ্টি হয়েছে।
তাহলে লেখিকা সুচেতনা সেন কুমারের ‘সৌবল শকুনি’ কোন ক্ষেত্রে আলাদা? আর সমগ্র বই শুধুমাত্র এক তথাকথিত চক্রান্তকারীকে কেন্দ্র করে রচিত হল কেন? এইসব প্রশ্ন মনে নিয়ে বইটি পড়তে বসেছিলাম। কারণ শকুনি কোনোকালেই আমার প্রিয় চরিত্র ছিলেন না, সেটাই স্বাভাবিক নয় কি!
ছোটবেলা থেকে মা-ঠাকুমার মুখ থেকে শুনে শুনে ‘শকুনি মামা’র যে চিত্র মনে মনে গড়ে উঠেছিল তা খুব একটা আশাপ্রদ নয়! তবে প্রিয় বোনের জীবনকে চোখের সামনে নরক হতে দেখা, নিজের রাজ্য ত্যাগ করে বোনের প্রাপ্য অধিকার পাইয়ে দেবার জন্য দিনানিপাত করা, ভাগ্নেদের ক্ষমতার শীর্ষে বসানোর প্রচেষ্টা, বিভিন্ন মায়ার অধিকারী হওয়া – এলেম তো ছিলই! নয়তো কূটনীতিতে শ্রীকৃষ্ণকে টক্কর দেওয়া কি এতই সোজা।
তাই বইটি যখন পড়তে শুরু করলাম দেখলাম লেখিকাও ঠিক এইসব বিষয় নিয়ে ভেবেছেন। শুধু তাই নয় তাঁর স্বাদু গদ্য ও ‘গ্র্যান্ড’ চিন্তাভাবনা আমার কল্পনার জানালার সব পাল্লা খুলে দিয়েছে। আমি শকুনির প্রতি ক্রোধান্বিত তো দুরস্ত, মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ছি। শুধু তাই নয়, পাঠ শেষে মনে হয়েছে বইটা আরও খানিকটা বড় হলে হয়তো ভালো হত! সুচেতনা দিদি, স্যালুট!
বইটির প্রকাশক একলব্য প্রকাশন, মহাভারতের আরও এক বিখ্যাত চরিত্রের নামে। অদ্ভুত সমাপতন! আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই বইয়ের সূত্রেই আমি ২০২১ সালের শেষে একলব্য প্রকাশনের নাম জানতে পারি, বাকিটা ইতিহাস!
সুচেতনা সেন কুমার-এর ‘সৌবল শকুনি’ কেবল একটি উপন্যাস নয়, এটি একটি বিশিষ্ট চিন্তা ও সাহিত্যকর্ম যা মহাভারতের অচ্ছুৎ চরিত্র শকুনির পুনর্নির্মাণ ঘটায়। আমাদের প্রজন্মের মানুষজন যেখানে শকুনিকে খলনায়ক হিসেবে গণ্য করে, সেখানে লেখিকা এক নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর চরিত্রকে আবিষ্কার করেছেন। এই পুনর্নির্মাণ শুধু সাহিত্যের পুনরাবৃত্তি নয়; এটি রাজনৈতিক, সামাজিক এবং নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভিন্ন চেতনাকে উপস্থাপন করে।
শকুনি কেবল আড়ালের ষড়যন্ত্রকারী নন, বরং ইতিহাসের পরিদৃশ্য থেকে উঠে আসা এক প্রতিজ্ঞাবদ্ধ রাষ্ট্রনায়ক। লেখিকার সূক্ষ্ম ভাষাশৈলী ও চরিত্র রূপান্তর আমাদের বোঝায় যে খলনায়কের প্রতিটি পদক্ষেপে রাজনৈতিক দর্শন এবং মানসিক উৎপীড়ন বিদ্যমান। তাঁর আত্মঘাতী প্রতিশোধের পথ ধরে আমাদের সামনে উঠে আসে একটি বৃহত্তর ন্যায়বোধের অন্বেষণ।
নির্ভীকভাবে, লেখিকা শকুনির চরিত্রে নারীর ক্ষমতায়নকে তুলে ধরেছেন। গান্ধারী, পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে উদ্ভাসিত হয়েছেন। তাছাড়া, শকুনি-দ্রৌপদী সম্পর্কের পুনর্বিবেচনার মাধ্যমে নারীচেতনাকে বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছেন। এই বই স্পষ্ট করে দেয় যে রাজনৈতিক তর্ক ও নৈতিক দ্বন্দ্বের মধ্যে নারীর সশক্ত উপস্থিতি অপরিহার্য।
রাজনীতি বনাম ধর্মনীতি সহ দর্শনীয় দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে চলমান শকুনি ও কৃষ্ণের সম্পর্ক এক গভীর আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের সূচনা করে। তাঁদের সংঘাত শুধুমাত্র নৈতিকতার কিংবা রাজনীতির নয়, বরং মানবিক প্রকৃতির প্রতিফলন; যেখানে শকুনি কেবল খালি প্রতিশোধের এক মানবিক চরিত্র নয়, বরং তিনি ইতিহাসের একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন।
লেখিকার এই রচনা পাঠকের চিন্তার আকাশে নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করে। ফলে আশা রাখি, শাস্ত্র ও পুরাণ প্রেমীরা তাঁর এই শ্রমকে অবহেলা করবেন না। নমস্কার!
এবার এককথায় আসি! আমার রাতজাগা সার্থক। তথাকথিত "বেস্টসেলার" ঐতিহাসিক পড়ে যেসব পাপ আমি করেছি তার খানিক হলেও প্রায়শ্চিত্ত করতে পারলাম মনে হয়। তবে অতৃপ্তি একটা আছেই, সেটা চোয়া ঢেকুরের নয়। এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল বলে।মনে হচ্ছিল আরো কিছু থাকলে যেন বেশ হতো। ১. নিজ চক্ষে কর্ণের পরিণতির দৃশ্যটা। ২. গদাযুদ্ধ ভীম আর দুর্যোধনের, সেখানে পরাজয়। এ দুটো দৃশ্যেই শকুনিকে মানসিক দ্বন্দ্বটা আরো ভালো ভাবে ফোটানো যেত। সে একাধারে খুশি ও দুঃখী। ৩. যেখানে শেষ দৃশ্যে কৃষ্ণ কে প্রত্যক্ষ করছে শকুনি। একটা বিশ্বরূপ গোছের দৃশ্য থাকলে! আহা মাশা আল্লাহ!😍😘
তবে এই লেখা মনে থেকে যাবে। শিখলাম অনেক কিছু। চলতে থাকুক কলম।