ভারতীয় রেল পৃথিবীর অন্যতম বড়ো কোম্পানি। ভারতীয় রেলের নিজস্ব নানারকম সমস্যার জন্য আছে নিজস্ব তদন্ত-বিভাগ। লেখক সেই বিভাগের একজন তদন্তকারী আধিকারিক হিসাবে নিজের চোখে দেখা নানা ঘটনার ভিতর থেকে ১১টি গল্পের মতো কাহিনীকে এখানে মলাটবদ্ধ করলেন।
"রেলমানুষের তদন্তকথা" কোনো প্রত্যাশা নিয়ে পড়িনি বলে বেশি ভালো লাগলো সম্ভবত। তুষার সরদার ব্যক্তিজীবনে ছিলেন ভারতীয় রেলওয়ের চিফ পার্সোনেল ইন্সপেক্টর। তিনি তার পেশাগত জীবনের নানাবিধ অভিজ্ঞতার গল্প বলেছেন বইতে। মূল বিষয় তদন্ত হলেও বিচিত্র শ্রেণিপেশার মানুষ, তাদের ততোধিক বিচিত্র জীবন, তুষার সরদারের স্বকীয় ভাষাশৈলী আর নিজস্ব জীবনদর্শন এর গুণে বইটি হয়ে উঠেছে অত্যন্ত স্বাদু। শেষ গল্প "পাহাড়ের মতো মানুষ" বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সিরিজের পরের বইগুলোও আগ্রহ নিয়ে পড়বো।
ট্রুথ ইজ স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশন, কথাটা যতই একঘেয়ে হোক, কিছুদিন পরে পরেই সেটা মাথায় আসতে বাধ্য। তুষার সরদারের চাকরিজীবনের অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে লেখা 'রেলমানুষের তদন্তকথা' পড়ে আরো একবার সেটা মনে হলো। লেখক ছিলেন ইন্ডিয়ান রেলওয়ের চীফ পার্সোনেল ইন্সপেক্টর; কর্মচারীদের চাকরি ও ব্যক্তিজীবন সংক্রান্ত অনেক বিষয়ে তাঁকে তদন্ত করতে হয়েছে, সেগুলোর উপর ভিত্তি করেই এই বই। মানুষের কুটিলতা, জটিলতা আর বদবু্দ্ধি দেখে মাঝে মাঝে যেমন হলিউডি সাইকো ভিলেনদের কথা মনে পড়ে যায়, একইভাবে মানষেরই সরলতা আর উদারতা দেখে সিনেমার নায়কদেরও তুচ্ছ মনে হয়। মানুষের চেয়ে জটিল আর বিচিত্র জীব সৃষ্টিজগতে আর কী আছে?
পড়লে সময়টা ভাল কাটবে, পয়সা দিয়ে কিনলে সেটা উসুলও হবে, আমার যেমন হয়েছে। রেটিং সাড়ে তিন। প্রসঙ্গত, আমি একটু ব্যবসায়ী পাঠক, টাকা খরচ করে বই কিনলে অন্তত ৩ দেয়ার মত হলে বলি যে, টাকাটা 'উঠে এসেছে'।
এগারোটা বাস্তব কাহিনীর মাঝে মানবিকতার সত্য, করুণ আর আশ্চর্য সব নিদর্শন পেলাম। বর্ণনা নিখাদ মোলায়েম। ভালো লাগবে পড়তে। রেলওয়ের কর্মচারীদের প্রশাসনিক সুবিধাদি নিশ্চিত করার মতো একটা দায়িত্বে ছিলেন লেখক। কাজের প্রয়োজনে যেসব বিচিত্র ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলেন, সেসব লিখেছেন। উনার লেখা মেদহীন, অতিরঞ্জিত বা অলৌকিক কিছু নেই, আরামদায়ক, সুখপাঠ্য বই।
ভারত সরকারের একটা দপ্তর আছে যাদের কাজ রেলে চাকুরিরত অকালমৃত কিংবা নিরুদ্দেশ কর্মচারীর পরিবারের সাহায্যে কাজ করা। ঠিকঠাক ব্যাক্তির নিকট অনুদান যাচ্ছে কিনা কিংবা উপযুক্ত উত্তরাধিকারীই চাকুরির সুপারিশ পাচ্ছে কিনা তা নিয়ে তদন্ত করতে গিয়ে বেশকিছু আকর্ষণীয় ঘটনা পেলেন। সেগুলো এক মলাটে এনে নাম দিলেন "রেলমানুষের তদন্তকথা"। সেখানে স্বল্প উপার্জনে চলা পরিবারগুলোর অসহায়ত্বের তীক্ষ্মতা বেশ সুনিপুণ কৌশলে ফুটানোর চেষ্টা রয়েছে। একবারে প্রথম গল্পটাই সবচেয়ে পছন্দের যেখানে অর্থলোভী কুটিল মানুষের বিপরীতে সারল্যের মহিমা নিয়ে উপস্থিত এক চরিত্রকে দেখি। এই অসহায়ত্ব আর সারল্য প্রায় সবগুলো গল্পেই মজুদ।
ভারতীয় রেল পৃথিবীর অন্যতম বড়ো কোম্পানি। ভারতীয় রেলের নিজস্ব নানারকম সমস্যা, যেমন কোনো মৃত কর্মচারীর পাওনা টাকাপয়সা তাঁর উপযুক্ত উত্তরাধিকারকে পৌঁছে দেওয়া, অথবা সেই বিভাগের কর্মী সংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগ, এসব সমাধান করার জন্য আছে রেলের নিজস্ব তদন্ত-বিভাগ। এই বইয়ের লেখক সেই বিভাগের একজন তদন্তকারী আধিকারিক। নিজের চোখে দেখা ও অনুসন্ধান করা নানা ঘটনা নিয়ে এগারোটি কাহিনী রচিত হয়েছে এই বইটিতে। দারোগা প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের দারোগার দপ্তর থেকে শুরু করে সুপ্রতিম সরকারের গোয়েন্দাপীঠ লালবাজার, এই সিরিজের প্রত্যেকটি বই আসল মানুষ ও আসল ঘটনার কথা বলে। সেইসব সমস্যার সমাধান সবসময় হয়তো নিখুঁতভাবে হয় না, কিন্তু তাতে এই বইগুলির জনপ্রিয়তার জৌলুশ মোটেই কমে যায়নি। এখানে এই বইটির ক্ষেত্রেও এক কথা প্রযোজ্য। শুধু পার্থক্য এই যে এই তদন্তগুলো খুন বা চুরির তদন্ত নয়, লেখক নিজে তদন্তকারী অফিসার হলেও পুলিশ বা গোয়েন্দা নন। এই সমস্যাগুলো একটু অন্যরকম। পরিস্থিতির কাছে মানুষের অসহায়তা, শঠতা, এবং সর্বোপরি সবকিছুতে ছাপিয়ে কিছু মানুষের সততা ও মনুষ্যত্ববোধ, সবকিছু উঠে সে এক একটি কাহিনীতে।
যারা real life Stories পড়তে পছন্দ করেন তাঁরা পড়তে পারেন।
লেখক পেশায় ভারতীয় রেলের একজন আধিকারিক। চাকরি সমাপ্তির পরে পেনশন, পেমেন্ট সংক্রান্ত কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। এ সংক্রান্ত কাজ করতে গিয়ে প্রায়শই মাঠ পর্যায়ে তদন্ত করতে হয়েছে তাঁকে।
এ-সব তদন্ত করতে গিয়ে তিনি বিচিত্র অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। তাঁর এ-সব অভিজ্ঞতার সংকলন এ বই। বেশ ব্যাতিক্রমধর্মী একটা বই। পড়ে বেশ লাগলো।
ভারতীয় রেল। পৃথিবীর বৃহত্তম রেলওয়ে নেটওয়ার্ক। দেশ জুড়ে জাল বিস্তার করে সমগ্র দেশকে এক অচ্ছেদ্য বন্ধনে জুড়ে রেখেছে। এই বৃহৎ মন্ত্রকে অকালমৃত, নিরুদিষ্ট বা কোনও আকস্মিক কারণ বশত সময়ের আগেই অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক, কর্মচারী ও অধিকারিকদের পরিবারের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ ও সাহায্যের জন্য ভারতীয় রেলে সম্পূর্ণ পৃথক একটি দপ্তর আছে। এই দপ্তর কর্মরতদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের জন্যও কাজ করে থাকে। এই সব কাজ ছাড়াও এই দপ্তর সমগ্র রেল পরিবারের অন্তর্বর্তী বিভিন্ন জটিল ঘটনার তদন্ত করে সমাধান করে। লেখক তুষার সরদার ��ই দপ্তরে একজন চিফ পার্সোনাল ইন্সপেক্টরের পদে দীর্ঘ ছাব্বিশ বছর সসম্মানে চাকরি করেছেন। চাকরি সূত্রে লেখককে বিভিন্ন মন মানসিকতার ও বিভিন্ন সামাজিক অবস্থানের মানুষের সংস্পর্শে আসতে হয়েছে। এক একজন মানুষের এক এক রকমের সমস্যা ও জীবনের গতি প্রকৃতির ঘূর্ণিপাক। বহু মানুষের বহু ধরণের সমস্যার সমাধানে লেখককে ঘুরতে হয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। মৃত কর্মচারীর পরিবারের অনুসন্ধানে পার হয়েছেন দুর্গম রাস্তা। অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারে সঞ্চিত হয়েছে মণিমাণিক্য। সেই সমস্ত অভিজ্ঞতার ডালি তিনি সাজিয়ে দিয়েছেন “রেলমানুষের তদন্তকথা” বইয়ে। এই বইয়ে মোট এগারোটি গল্প আছে। যদিও রহস্য অক্ষত রাখার তাগিদে গল্পের বর্ণনায় আমি যাবনা। গল্পগুলো হল -
১. নিরুদ্দেশের গহনে। ২. পাখী মেয়ের অপরূপকথা। ৩. নারী বড় বিচিত্ররূপিণী। ৪. মৃতদেহ অথবা লাভের কড়ি। ৫. ভ্রষ্ট জায়া – জননী। ৬.অপরাধী ও “অপরাধ”। ৭.মা-হারার সন্ধানে। ৮. গৌরী দে র বৃত্তান্ত । ৯. নারী দক্ষ যাদুকরী। ১০. প্রতারণার বেড়াজাল। ১১. পাহাড়ের মতো মানুষ।
কর্মরত অবস্থায় অকালমৃত্যুর শিকার, রোগ বা বিকলাঙ্গ হওয়ার কারণে অবসরপ্রাপ্ত কিংবা নিরুদ্দেশের গহনে হারানো কর্মরত কর্মচারীদের পরিবারের সদস্যদের সুবিধার জন্য পেনশনের ভাতা থেকে শুরু করে উত্তরাধিকার সূত্রে পরিবারের একজন সদস্যকে চাকরি দেওয়া পর্যন্ত তাদেরকে প্রাপ্য কড়ায় গণ্ডায় বুঝিয়ে দেয় ভারতীয় রেল। তবে সঠিক ও সুযোগ্য দাবীদারের কাছে তাঁদের অধিকারের বস্তু ঠিকভাবে পৌঁছালো কিনা সেটা নিশ্চিত করতে হয় সবার আগে। দাবিদার মাত্রই যে প্রকৃত উত্তরাধিকারী তা নয়। কম্পেনসেশন-পেনশনের টাকার প্রতি লোভ, সরকারি চাকরির প্রতি লোভ ছেলে – মেয়ে – স্বামী – স্ত্রী এমনকি পিতা – মাতাকে দিয়েও করিয়ে নেয় বহুবিধ অমানবিক অপরাধীমূলক কাজ। অনেক সময় এই সমস্ত অপরাধের হদিশ পুলিশ প্রশাসনেরও দৃষ্টির অগোচরে থেকে যায়। এর উপর থাকে উপর মহলের ও রাজনৈতিকমহলের বিভিন্ন নেতা মন্ত্রীদের বিভিন্ন চাপ। এই সমস্ত বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করেও সমস্যা সমাধানের জন্য দরকার হয় তদন্ত। নিখুঁতভাবে খতিয়ে দেখার প্রয়োজন হয় দাবীদারের পক্ষ থেকে পেশ করা প্রাপ্ত তথ্যের। সুদীর্ঘ ছাব্বিশ বছরের তদন্তমূলক কর্মজীবনে লেখককে তদন্তের খাতিরে বহু মানুষের ব্যক্তিগত পরিসরে প্রবেশ করতে হয়েছে। আর তার থেকেই মানব মনের জটিল গোলকধাঁধায় ঘুরতে ঘুরতে মানুষ চেনার, মানুষের ব্যবহার দেখে তাঁর সম্পর্কে ধারণা করার এক বিরল ক্ষমতা অর্জন করেছেন তিনি।
‘রেলমানুষ’ লেখক কাজের সূত্রে পরিচিত হয়েছেন এমন সমস্ত মানুষদের সাথে যারা জীবনের ভিন্ন ভিন্ন জটিল সমস্যায় জর্জরিত। কারো জীবনে প্রিয়জন হারানোর শোক এসেছে হঠাৎ করে, কেউ প্রিয়জনকে হারিয়েছেন দীর্ঘ রোগভোগের পর আবার কেউ নিজেই লোভের বশবর্তী হয়ে কেড়ে নিয়েছেন প্রাণ। কেউ আকস্মিক কোনও পরিস্থিতির শিকার হয়ে চাকরি থেকে অবসর নিতে বাধ্য হয়েছেন অথচ তাঁর পেনশনভাতার দরখাস্ত থেকে উঠে আসে এক অনন্য কাহিনী। আবার কারো নিরুদ্দেশের সন্ধানে তাঁর পরিবারের খোঁজ করতে গিয়ে ‘রেলমানুষ’ অর্জন করেছেন গায়ে কাঁটা দেওয়া এক অভিজ্ঞতা। এক একটি গল্প এক একজন মানুষের বিচিত্র মানসিক দিক উন্মোচন করে। মায়া- মমতা – ভালোবাসায় মোড়া মন থেকে শুরু করে হিংসা-লোভ- কুটিলতা – ব্যাভিচারের মত জটিলতায় আবদ্ধ মন উন্মোচন করে বাকরহিত হয়ে গেছেন 'রেলমানুষ'।
তদন্তমূলক সত্যিঘটনা পড়ার আগ্রহ থেকে এর আগে সুপ্রতীম সরকারের "গোয়েন্দাপীঠ লালবাজার", চিত্রদীপ চক্রবর্তীর “আড়ালে আততায়ী” বা প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের “দারোগার দপ্তরে” বইগুলো পড়েছিলাম। তাই এই বইয়ের বিষয়বস্তু সত্য ঘটনা সম্বলিত তা জানার পর খুব স্বাভাবিকভাবেই এই বই পড়ার জন্য আগ্রহী হই। এই বইয়ের ঘটনাগুলো হয়ত অন্যান্য তদন্তমূলক বইয়ের ঘটনার ন্যায় রোমহর্ষক নয়; কিন্তু এই বই অন্যান্য অনেক বইয়ের ভিড়েও স্বতন্ত্রতা দাবী করে বেশ কয়েকটি কারণে।
এক - বইয়ের ভাষা অত্যন্ত সাবলীল ও সহজবোধ্য। মাটির কাছাকাছি থেকে সাধারণ পাঠকের জন্যই যেন লেখা। বইয়ের কোনও একটি অংশও এমন নেই যা বুঝতে কারো অসুবিধা হবে। অযথা দুর্বোধ্য এবং বিপুল পরিমাণ তথ্য দিয়ে পাঠককে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা নেই। সহজবোধ্য ও সাবলীল কথ্য ভাষার ব্যবহার লেখা মনোগ্রাহী করে তুলেছে।
দুই – প্রাপ্তবয়স্ক বিষয়ও অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে শালীনতা বজায় রেখে যে যথাযথভাবে পেশ করা যায় তার উৎকৃষ্ট নমুনা এই বই। প্রাপ্তবয়স্ক বিষয়কে সঠিক স্থানে, সঠিক মাত্রায় এবং অবশ্যই প্রয়োজনে তা প্রকাশ করা হয়েছে। অযথা শুধুমাত্র বইয়ের বিক্রি বাড়ানোর অভিপ্রায়ে জোর করে তা আরোপ করা হয়নি।
তিন – অকারণে শুধুমাত্র পৃষ্ঠা সংখ্যা বাড়ানোর জন্য কোনও বিষয়েরই অকারণ বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে বই পাঠের গতি রোধ করা হয়নি।
চার – সবথেকে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল অন্যান্য তদন্তমূলক বইয়ের মত এটি কাঠখোট্টা রসহীন নয়। যে কোনও একটি ঘটনার বিবরণে পরিবেশ ও পরিস্থিতির ভূমিকা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় স্থান দখল করে। লেখক নিপুণভাবে, একজন দক্ষ চিত্রকরের ন্যায় ঘটনার পরিবেশ ও পরিস্থিতির আনুষঙ্গিক বর্ণনা করেছেন। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল যেন কোনও কবি গল্প রচনা করেছেন। প্রায় প্রতিটি গল্পেই ছোট ছোট অথচ নিখুঁত সেই সমস্ত বর্ণনা আমাদের মুগ্ধ করে দেয়। এই প্রসঙ্গে কয়েকটি উদাহরণ দিতে চাই।
জরাগ্রস্ত প্লাস্টার খসা নোনা ঘেয়ো দেয়াল। বারান্দায় একসময় ইটের খোয়া দিয়ে ঢালাই ফেলা হয়েছিল। এখন খোয়াগুলো এখানে-ওখানে উঠে গেছে। ফলে খুব এবড়োখেবড়ো হয়ে গেছে বারান্দাটা। ওপরে পুরোনো টালির অসমতল ছাউনি। একটু জোরালো বৃষ্টি হলেই চুইয়ে জল পড়ে বারান্দায়। ভিজে ভিজে হয়ে আছে এখানে-ওখানে। পরের ভেতরেও তাহলে জল পড়ে মনে হয়৷
বারান্দায় সামনে নীচে একচিলতে উঠোন। একটা কোণে এক শীর্ণ ফুল- ফলহীন পেঁপে গাছ খুব কুণ্ঠিত ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। উঠোনের বাকি অংশ লম্বা লম্বা ঘন ঘাস আর নানান আগাছায় ভরতি হয়ে আছে। তার ভেতর থেকে সম্ভবত পোকামাকড় খুঁজতে থাকা একটা মাঝারি আকারের হেলে সাপ আস্তে আস্তে বেরিয়ে এসে একটু থমকে গিয়ে আবার ভেতরে ঢুকে গেল।
বারান্দার একধারে একটা রং-চটা টিনের চেয়ারে বসে আছি। ঘামছি।
আবহাওয়ার অবস্থা বোঝাতে লেখক বলেছেন–
বর্ষার পড়ন্ত দুপুর। আকাশে মেঘের আনাগোনা নেই আজ। আছে বিচ্ছিরি গুমোট গরম আর স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া। এই দেখা যাচ্ছে রোদ ঢেকে দিয়ে মোটা মোটা মেঘ ঝুলে পড়ছে • আবার একটু পরেই পাতলা মেঘের চাদর ঢাকা রুগ্ণ ঘোলাটে রোদ্দুর। ঘোলাটে রোদ্দুর দেখলে কেন জানি না আমার বড়ো মন খারাপ হয়।
বিবিধ মানব চরিত্রের সংস্পর্শে এসে তাঁদের ব্যক্তিগত বিষয়ের খোঁজ নিতে গিয়ে মানুষকে চেনার যে বিরল ক্ষমতা অর্জন করেছিলেন সেই প্রসঙ্গ ব্যক্ত করেছেন –
কখনো-কখনো কাউকে,কোনো মানুষকে দেখবার পরই আমার এক রকম অদ্ভুত অনুভূতি হয়। এর পেছনে আমার কোনো সচেতন বা সক্রিয় ভূমিকা থাকে না। সকলের ক্ষেত্রে সবসময়ই যে এমনটা হয় তাও না। কাউকে কাউকে দেখবার পর মনে হয়েছে,- এ পেটসর্বস্ব, - কেউ বা দেহ সর্বস্ব, কেউ হয়তো জ্ঞান-নম্র,-কেউ বা বেয়াড়া রাগী,-কেউ বা খুব স্পর্শকাতর, কারো মাঝে ভারী বিনয়,সৌজন্যবোধে অনন্য,- কারো চোখেমুখে স্পষ্ট খুনীর করাল ছায়া।
অবশ্য শুধু পুরুষ নয়, নারীও আমার মনে বিচিত্র ভঙ্গে প্রতিফলিত হয়। কেউ ভীমক্রোধা,- কেউ বা বাগেশ্রীর অবরোহণের কোমল গান্ধার। কারও হাবভাব শ্রাবণের মে���ের মতো কোমল সিক্ত,কেউ হয়তো মরুভূমির কণ্টকপূর্ণ ক্যাকটাস। এইমাত্র কাঁচাঘুম-ভাঙা চেহারায় যে নারী এসে দাঁড়িয়েছে, তার সারা শরীরে লেপ্টে আছে নিবিড় অপার বাৎসল্যের মেদুরতা।
এই সমস্ত কারণকেও ছাপিয়ে যায় এক একটি ঘটনার জটিল সমাধানে তাঁর উপস্থিত বুদ্ধির চমক, অসম্ভব কঠিন পরিস্থিতিতেও যা তাঁকে নিজের কর্তব্যে অবিচল থাকতে সাহায্য করে। শত প্রলোভন, শত নিষিদ্ধ হাতছানিও তাঁকে নিজের কাজের থেকে গাফিলতি করতে বা চারিত্রিক পদস্খলনে ব্যর্থ হয়। আমরাও খোঁজ পাই এক অজানা অচেনা ‘রেলমানুষ'-এর এবং তাঁকে ঘিরে তৈরি হওয়া একগুচ্ছ জটিল–কুটিল–মানবিক–শান্ত–অশান্ত–বিবেকবান–বিবেকহীন মানুষদের নিয়ে গড়ে ওঠা এক রহস্যময় জগতেরও।
মানুষ বড়ই বিচিত্র। একেক মানব মন যে একেক রকম, সেটা জীবনপথে চললেই টের পাওয়া যায়। তবে একটা ক্ষেত্রে বেশিরভাগ মানুষ একপথে চলে, সেটা হচ্ছে টাকার লোভ। তুষার সরদারের রেলমানুষের তদন্তকথা পড়লেই একথার সার্থকতা বোঝা যায়। ১১ টি সত্য কাহিনীতে তুলে এনেছেন মানব মনের নিচতা, কুটিলতা, আঁধার কিংবা পাহাড়ের মতন উঁচু কিন্তু বিনীত মানুষের কথা। অপরাধী ও 'অপরাধ' গল্পটা বোধ করি আমাকে সবচেয়ে ছুঁয়ে গেছে। মানুষের অসহায়ত্ব কি তাকে খুনি বানিয়ে ফেলে নাকি মাঝে মাঝে তিনটা তাজা প্রাণকে বাঁচাতে একজন অসুস্থকে খুন করা জায়েজ হয়ে যায়!!! প্রশ্নটা তোলা থাকল যারা বই পরবেন তাদের জন্য। "পাহাড়ের মতো মানুষ" পড়ে জানতে পারবেন কতিপয় মানুষরূপী ঈশ্বরের গল্প, চরম দারিদ্র্য যাদের আত্মমর্যাদা, মনুষত্ত কেঁড়ে নেয়নি। ভ্রষ্ট জায়া-জননী, মা-হারার সন্ধানে কেসে, প্রতারণার বেড়াজাল পড়ে লেখকের প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে আসবে। আসলে সব গল্পেই লেখক তার মনুষত্তের শতভাগ পরিচয় দিয়েছেন। প্রতারণার বেড়াজাল কেসটিতে লেখক তো নিজের মান সম্মান, চাকরি সবকিছুর উপর বাজি ধরেছিলেন একটা মানুষকে সাহায্য করবেন বলে। সবশেষে বলতে চাই, Truth is stranger than fiction এই বাক্যটির প্রমাণ জানতে চাইলে রেলমানুষের তদন্তকথা পড়ুন।
সাহিত্যের ক্ষেত্রে বড্ড ক্লিশে একটা প্রবাদ Truth is stranger than fiction. কিন্তু সেরকম সত্য ঘটনা খোঁজে বের করে সেটাকে সাহিত্যর রূপ দিতে জহুরী হাতের প্রয়োজন। তুষার সরদার ছিলেন ভারত রেলওয়ের চিফ পার্সোনেল ইন্সপেকটর। পেশায় আমলা হলেও ছোটবেলা থেকেই যে লেখার জগতে তার ভালোই আনাগোনা তার ছাপ পুরো বইতেই পাওয়া যাবে। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই।
"ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ঘণ্টার কাঁটাটা একেবারে সোজা ওপরের দিকে মুখ তুলে একটু জিরিয়ে নেবে কিনা ভাবছিল। কিন্তু মিনিটের কাঁটাটা দশ-বারো পা ডানদিকে এগিয়ে গিয়ে তাকে আসার জন্য খুব ডাকাডাকি করছে।"
বেলা ১২:১০ কে এরকম ভাষায় বর্ণনা করা সহজ কাজ নয়। মনে হতে পারে একটু বাহুল্যতা হয়ে গেলো বোধহয় কিন্তু পড়ার সময় একটু ভিন্ন ধাঁচের লেখা কিন্তু ভালোই লাগে। এরকম পুরো বইতেই লেখক উন্নত সাহিত্যমান বজায় রাখার চেষ্ঠা করেছেন।
মোট এগারোটি তদন্তকথা বা গল্প বর্ণিত হয়েছে বইজুড়ে। ব্যক্তিগতভাবে আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে 'নারী বড়ো বিচিত্ররূপিণী'। যদিও এটি বইয়ের সেরা গল্প কোনোভাবেই নয় তবে এ ধরনের লেখা সবসময়ই আমার ভালো লাগে। এছাড়া মোটামোটি ভালো লেগেছে সবগুলোই। তবে লেখকের নিজেকে অতিভদ্র বানানোর চেষ্টা কিছুটা হলেও বিরক্তিকর লেগেছে। আরেকটা ব্যাপার খারাপ না ঠিক বরং অদ্ভুত লেগেছে যে লেখক পুরো বইয়ের কোথাও নিজের পরিবারের কথা উল্লেখ করেননি। নিজেকে চারিত্রিক ভাবে যতটা সাধুপুরুষ বানানোর চেষ্টা করেছেন সেই হিসাবে পরিবারের দু চারটে কথা গল্পচ্ছলে উঠে আসাটাই বরং স্বাভাবিক ছিলো। জানিনা বিষয়টা ইচ্ছাকৃত কিনা তবে একটু অদ্ভুত লেগেছে।
ট্রু স্টোরি তেমন পড়া হয়না। আর ইদানীং থ্রিলারের বাইরে তেমন কিছু পড়াই হচ্ছেনা। নিজের কমফোর্ট জোনের বাইরে গিয়ে নতুন কিছু পড়তে বেশ ভালো লেগেছে। হাতে থাকলেও এই সিরিজের দ্বিতীয় কিস্তি কিছুদিন পরে পড়াই ভালো হবে।